সংবাদ

বাবা-মা-ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় ছোট্ট মহিমা


জেলা বার্তা পরিবেশক, কুষ্টিয়া
জেলা বার্তা পরিবেশক, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম

বাবা-মা-ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় ছোট্ট মহিমা
বাবা, মা ও ছোট ভাই এখন শুধুই স্মৃতি।

কলকাতার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও শ্বশুরের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছাবে আগামী শনিবার। কিন্তু এই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রাণপণ কঠিন হয়ে উঠছে সাত বছর বয়সী মহিমার জন্য।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) কুষ্টিয়া শহরের আডুয়াপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের বাসায় গিয়ে দেখা যায়—ছোট্ট মহিমা অনেকটা চুপচাপ সময় কাটাচ্ছে। দেয়ালে টাঙানো বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের ছবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। সহপাঠীরা ঘিরে বসে থাকলেও কথায় সাড়া দিচ্ছে না শিশুটি।

শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিল মঙ্গলবার রাতে। ঘুমানোর আগে ভিডিওকলে বাবা দেবাশীষ দত্ত তাকে নতুন জামা, চকলেট আর খেলনা দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বুধবারই তারা দেশে ফিরবেন। কিন্তু কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে লাগা ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই শেষ করে দিয়েছে সেই সব স্বপ্ন। চকলেট-খেলনার বদলে এখন বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের নিথর দেহের অপেক্ষায় ছটফট করছে সে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, কলকাতায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বৃহস্পতিবার লাশ দেশে ফেরার কথা থাকলেও জটিলতায় সময় বাড়ছে। এখন শনিবার নাগাদ লাশ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

মহিমা

বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে স্বজনের আহাজারি। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত একমাত্র ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন। শোকে স্তব্ধ বাবা দিলীপ কুমার দত্ত। আত্মীয়স্বজন সান্ত্বনা দিতে চাইলেও থামছে না আহাজারি।

কলকাতার আগুনে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৪০), তার স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং আফসানার বাবা আকরাম আলী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দেবাশীষ। তার মৃত্যুতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট্ট মহিমার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হার্টের রোগী দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘কয়েকদিন আগে স্ট্রোক করেছি। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। বাসাভাড়া, সংসারের খরচ—সব দেবাশীষই চালাত। এখন কে আমাদের দেখবে? মহিমার পড়ালেখার খরচই বা কে দেবে? আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’

দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিনের রক্তের কণিকা ভেঙে যাওয়ার সমস্যা ছিল। ছেলে স্বর্ণশীষের কণ্ঠে ছিল জড়তা। শ্বশুর আকরাম আলীও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। গত ৩ আগস্ট তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সপরিবারে ভারতে যান দেবাশীষ। দেশে রেখে যান সাত বছরের মহিমাকে।

বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার কলকাতায় ফেরেন তারা। দেশে ফেরার কথা থাকলেও মেয়ের জন্য কেনাকাটা করতে একদিন বেশি কলকাতায় থেকে যান দেবাশীষ। ওঠেন নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে। ওই রাতেই আগুনে পুড়ে যায় তাদের সব স্বপ্ন।

দেবাশীষ দত্ত ‘আজকের পত্রিকা’র কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। পেশাগত জীবনে সৎ ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।

ভালোবেসে আফসানাকে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ। প্রায় নয় বছর আগে তাদের সংসার শুরু। ধর্ম আলাদা হলেও ভালোবাসায় কোনো বাধা আসেনি। মহিমা ও স্বর্ণশীষ—দুই সন্তানকে ঘিরে ছিল তাদের ছোট্ট পৃথিবী। সেই পৃথিবী এখন পুড়ে ছাই।

মহিমার মা ও বাবা

দেবাশীষের সঙ্গে গত ৩ আগস্ট চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন তার ভায়রা মিটু। মঙ্গলবার চিকিৎসা শেষে তাঁরা একসঙ্গে কলকাতায় ফেরেন। দেবাশীষ পরিবার নিয়ে হোটেলে উঠলেও ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে মিটু ওইদিনই দেশে ফিরে আসেন। একদিন আগে দেশে ফেরায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

মহিমার ছোট্ট জীবনে এখন আর বাবা হাতে করে চকলেট নিয়ে ফিরবেন না। স্কুলে যাওয়ার সময় পাশে থাকবেন না মা। আবদার করলে বাবা খেলনা কিনে দেবেন না। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সুযোগও আর ফিরবে না। জীবনে কী হারিয়েছে, সেই নির্মম সত্যটি যেন এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি ছোট্ট মহিমা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


বাবা-মা-ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় ছোট্ট মহিমা

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কলকাতার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও শ্বশুরের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছাবে আগামী শনিবার। কিন্তু এই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রাণপণ কঠিন হয়ে উঠছে সাত বছর বয়সী মহিমার জন্য।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) কুষ্টিয়া শহরের আডুয়াপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের বাসায় গিয়ে দেখা যায়—ছোট্ট মহিমা অনেকটা চুপচাপ সময় কাটাচ্ছে। দেয়ালে টাঙানো বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের ছবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। সহপাঠীরা ঘিরে বসে থাকলেও কথায় সাড়া দিচ্ছে না শিশুটি।

শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিল মঙ্গলবার রাতে। ঘুমানোর আগে ভিডিওকলে বাবা দেবাশীষ দত্ত তাকে নতুন জামা, চকলেট আর খেলনা দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বুধবারই তারা দেশে ফিরবেন। কিন্তু কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে লাগা ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই শেষ করে দিয়েছে সেই সব স্বপ্ন। চকলেট-খেলনার বদলে এখন বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের নিথর দেহের অপেক্ষায় ছটফট করছে সে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, কলকাতায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বৃহস্পতিবার লাশ দেশে ফেরার কথা থাকলেও জটিলতায় সময় বাড়ছে। এখন শনিবার নাগাদ লাশ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

মহিমা

বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে স্বজনের আহাজারি। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত একমাত্র ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন। শোকে স্তব্ধ বাবা দিলীপ কুমার দত্ত। আত্মীয়স্বজন সান্ত্বনা দিতে চাইলেও থামছে না আহাজারি।

কলকাতার আগুনে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৪০), তার স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং আফসানার বাবা আকরাম আলী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দেবাশীষ। তার মৃত্যুতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট্ট মহিমার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হার্টের রোগী দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘কয়েকদিন আগে স্ট্রোক করেছি। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। বাসাভাড়া, সংসারের খরচ—সব দেবাশীষই চালাত। এখন কে আমাদের দেখবে? মহিমার পড়ালেখার খরচই বা কে দেবে? আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’

দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিনের রক্তের কণিকা ভেঙে যাওয়ার সমস্যা ছিল। ছেলে স্বর্ণশীষের কণ্ঠে ছিল জড়তা। শ্বশুর আকরাম আলীও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। গত ৩ আগস্ট তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সপরিবারে ভারতে যান দেবাশীষ। দেশে রেখে যান সাত বছরের মহিমাকে।

বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার কলকাতায় ফেরেন তারা। দেশে ফেরার কথা থাকলেও মেয়ের জন্য কেনাকাটা করতে একদিন বেশি কলকাতায় থেকে যান দেবাশীষ। ওঠেন নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে। ওই রাতেই আগুনে পুড়ে যায় তাদের সব স্বপ্ন।

দেবাশীষ দত্ত ‘আজকের পত্রিকা’র কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। পেশাগত জীবনে সৎ ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।

ভালোবেসে আফসানাকে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ। প্রায় নয় বছর আগে তাদের সংসার শুরু। ধর্ম আলাদা হলেও ভালোবাসায় কোনো বাধা আসেনি। মহিমা ও স্বর্ণশীষ—দুই সন্তানকে ঘিরে ছিল তাদের ছোট্ট পৃথিবী। সেই পৃথিবী এখন পুড়ে ছাই।

মহিমার মা ও বাবা

দেবাশীষের সঙ্গে গত ৩ আগস্ট চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন তার ভায়রা মিটু। মঙ্গলবার চিকিৎসা শেষে তাঁরা একসঙ্গে কলকাতায় ফেরেন। দেবাশীষ পরিবার নিয়ে হোটেলে উঠলেও ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে মিটু ওইদিনই দেশে ফিরে আসেন। একদিন আগে দেশে ফেরায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

মহিমার ছোট্ট জীবনে এখন আর বাবা হাতে করে চকলেট নিয়ে ফিরবেন না। স্কুলে যাওয়ার সময় পাশে থাকবেন না মা। আবদার করলে বাবা খেলনা কিনে দেবেন না। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সুযোগও আর ফিরবে না। জীবনে কী হারিয়েছে, সেই নির্মম সত্যটি যেন এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি ছোট্ট মহিমা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত