বাল্যবিবাহ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় একশ্রেণির ম্যারেজ রেজিস্টার বা কাজীর বিরুদ্ধে গোপন রেজিস্ট্রারে বিয়ের তথ্য নথিভুক্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিবন্ধনের বাইরে আলাদা খাতায় এসব বাল্যবিবাহ নথিভুক্ত করে তা আড়ালে রাখা হচ্ছে। পরবর্তীতে ছেলে বা মেয়ে সাবালক হলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তা মূল রেজিস্ট্রারে তোলা হয়। এর ফলে দাম্পত্য কলহ, যৌতুক বা নির্যাতনের শিকার হলেও কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, মান্দা, মহাদেবপুর, আত্রাই ও রানীনগর উপজেলায় এই চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। মান্দার একটি পরিবার জানায়, ২০২৩ সালে তাদের সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ের বিয়ে হয়। বাল্যবিবাহ হওয়ায় কাজী কোনো নকল (কাবিননামা) দেননি। এখন যৌতুকের জন্য মেয়েকে মারধর করে পাঠিয়ে দিলেও বিয়ের দালিলিক প্রমাণ না থাকায় আদালতে মামলা করতে পারছেন না তারা। একই চিত্র দেখা গেছে মহাদেবপুরেও, যেখানে চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া এক শিশুর বিয়ের পর এখন তিন মাস বয়সী একটি সন্তান থাকলেও সেই বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের কাজী আমীনুল ইসলাম। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, ‘যেসব বিয়ের নকল দিলে মামলার সম্ভাবনা থাকে, সেগুলো আমরা দিই না। পরে বয়স হলে পরিবেশ বুঝে নকল দেওয়া হয়।’ মান্দার মৈনম ইউনিয়নের কাজী মোসাদ্দেক হোসেন সুলতানও একই সুরে বলেন, অনেক কাজীই এভাবে কাজ করছেন।
নওগাঁ জেলা রেজিস্টারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলায় ৪ হাজার ৩৯৬টি বিয়ে এবং ২ হাজার ৫৮৪টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। তবে এই হিসাবের বাইরে গোপন রেজিস্ট্রারে হওয়া বিয়ের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নওগাঁ জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, ‘নোটারি পাবলিক বা এফিডেভিট দিয়ে বিয়ের কোনো আইনি বৈধতা নেই। নাবালকদের বিয়ে নিবন্ধনে সহায়তা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ জেলা কাজী সমিতির সভাপতি কাজী এম এম আমীনুল ইসলাম জানান, অনিয়মের অভিযোগে আত্রাইয়ের কাজী আব্দুল রাজ্জাক ও রানীনগরের কাজী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে।
জেলা রেজিস্টার মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কাজী আব্দুল রাজ্জাক বর্তমানে হাজতে রয়েছেন। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, ‘বাল্যবিবাহ ও অবৈধ নিবন্ধনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে জড়িত কাজীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আপনার মতামত লিখুন