দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একক পরিবারের নিয়ন্ত্রণ রোখার লক্ষ্যে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’-এ বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই কড়া পদক্ষেপ ও প্রস্তাবনাগুলো শিথিল করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
একই পরিবারের মধ্য থেকে পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে দুইজনে আনা এবং একটানা দায়িত্ব পালনের সময়সীমা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করার প্রস্তাব দুটিই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংবাদের কাছে আসা ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ উপেক্ষা করে এক পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্যকে পরিচালক হিসেবে রাখার বিদ্যমান আইনটিই বহাল রাখার পক্ষে সায় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচালকদের টানা মেয়াদের সীমা বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ বছর করার কথা বললেও নীতিনির্ধারকরা তা ৯ বছর নির্ধারণের বিষয়ে একমত হয়েছেন। মূলত শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও অন্যান্য অংশীজনদের দাবির মুখে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৬’-এর খসড়া পুনরায় সংশোধন করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্ব ও মেয়াদের বর্তমান বিধান বজায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এহেন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, "আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের সমর্থক ব্যাংক মালিকরা ব্যবসার সব নিয়ম কানুন তোয়াক্কা না করে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে এমন একটি আইন পাস করিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে একই পরিবারের তিনজন সদস্য ব্যাংকের পর্ষদে বসতে পারেন এবং একজন পরিচালক টানা ১২ বছর মেয়াদে থাকতে পারেন। সে সময়ও বাংলাদেশ ব্যাংক একে সমর্থন করেনি।"
ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কায়েমের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "এই সংশোধনীগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এমন সংস্কৃতির অবসান ঘটানো যেখানে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার একটি ব্যাংককে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে। এই সংশোধনীগুলো আনা না হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। পূর্বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করবেন। ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত পরিবারকেন্দ্রিক ব্যাংকে পরিণত হবে।"
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবিত খসড়ায় ঋণখেলাপি পরিচালকদের শাস্তির বিধান কঠিন করার কথা বলা হলেও পর্যালোচনা সভায় তা অনেকটাই সহজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পূর্বে কোনো পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেই পদ বাতিলের যে নিয়ম আনার কথা ছিল, তা বাদ পড়ছে। এমনকি পদ হারানোর পর পুনরায় পর্ষদে ফেরার বিরতিকাল বা 'কুলিং-অফ পিরিয়ড' কমিয়ে মাত্র ছয় মাস করার সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। এর বাইরে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকের পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার যে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ৪৭ ধারায় রয়েছে, সেটিও শিথিল করার প্রক্রিয়া চলছে।
নতুন বিধানে বলা হচ্ছে, কোনো ব্যাংকে অনিয়ম হলে পুরো পর্ষদ বাতিল না করে বিদ্যমান পর্ষদকে বহাল রেখেই প্রশাসক বসানো যাবে। তবে কৌশলে ভিন্ন সম্পর্কের দোহাই দিয়ে যাতে একই পরিবারের একাধিক স্বজন পর্ষদে আসতে না পারেন, সেজন্য ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞাকে আরও স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, একাধিক সংকটগ্রস্ত ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব বহাল রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, "কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা বিশাল অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন যোগাবে এবং ব্যাংকের সুশাসন ও নীতি-নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই কারণেই তাদের বিনিয়োগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা ধার্য করা হয়নি।"
তিনি আরও জানান, কাতারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও মুসলিম দেশগুলোর থেকে বিদেশি বিনিয়োগ টানতেই এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, দ্রুতই বাংলাদেশ ব্যাংক খসড়াটি চূলচেরা বিশ্লেষণ শেষে চূড়ান্ত করে ফেরত পাঠাবে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেরিয়ে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই পাস করার জন্য তোলা হতে পারে।

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একক পরিবারের নিয়ন্ত্রণ রোখার লক্ষ্যে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’-এ বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই কড়া পদক্ষেপ ও প্রস্তাবনাগুলো শিথিল করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
একই পরিবারের মধ্য থেকে পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে দুইজনে আনা এবং একটানা দায়িত্ব পালনের সময়সীমা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করার প্রস্তাব দুটিই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংবাদের কাছে আসা ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ উপেক্ষা করে এক পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্যকে পরিচালক হিসেবে রাখার বিদ্যমান আইনটিই বহাল রাখার পক্ষে সায় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিচালকদের টানা মেয়াদের সীমা বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ বছর করার কথা বললেও নীতিনির্ধারকরা তা ৯ বছর নির্ধারণের বিষয়ে একমত হয়েছেন। মূলত শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও অন্যান্য অংশীজনদের দাবির মুখে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৬’-এর খসড়া পুনরায় সংশোধন করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্ব ও মেয়াদের বর্তমান বিধান বজায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এহেন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, "আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের সমর্থক ব্যাংক মালিকরা ব্যবসার সব নিয়ম কানুন তোয়াক্কা না করে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে এমন একটি আইন পাস করিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে একই পরিবারের তিনজন সদস্য ব্যাংকের পর্ষদে বসতে পারেন এবং একজন পরিচালক টানা ১২ বছর মেয়াদে থাকতে পারেন। সে সময়ও বাংলাদেশ ব্যাংক একে সমর্থন করেনি।"
ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কায়েমের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "এই সংশোধনীগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এমন সংস্কৃতির অবসান ঘটানো যেখানে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার একটি ব্যাংককে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে। এই সংশোধনীগুলো আনা না হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। পূর্বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন, এখন বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করবেন। ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত পরিবারকেন্দ্রিক ব্যাংকে পরিণত হবে।"
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবিত খসড়ায় ঋণখেলাপি পরিচালকদের শাস্তির বিধান কঠিন করার কথা বলা হলেও পর্যালোচনা সভায় তা অনেকটাই সহজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পূর্বে কোনো পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেই পদ বাতিলের যে নিয়ম আনার কথা ছিল, তা বাদ পড়ছে। এমনকি পদ হারানোর পর পুনরায় পর্ষদে ফেরার বিরতিকাল বা 'কুলিং-অফ পিরিয়ড' কমিয়ে মাত্র ছয় মাস করার সুযোগ খোঁজা হচ্ছে। এর বাইরে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকের পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার যে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ৪৭ ধারায় রয়েছে, সেটিও শিথিল করার প্রক্রিয়া চলছে।
নতুন বিধানে বলা হচ্ছে, কোনো ব্যাংকে অনিয়ম হলে পুরো পর্ষদ বাতিল না করে বিদ্যমান পর্ষদকে বহাল রেখেই প্রশাসক বসানো যাবে। তবে কৌশলে ভিন্ন সম্পর্কের দোহাই দিয়ে যাতে একই পরিবারের একাধিক স্বজন পর্ষদে আসতে না পারেন, সেজন্য ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞাকে আরও স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, একাধিক সংকটগ্রস্ত ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব বহাল রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, "কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা বিশাল অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন যোগাবে এবং ব্যাংকের সুশাসন ও নীতি-নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই কারণেই তাদের বিনিয়োগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা ধার্য করা হয়নি।"
তিনি আরও জানান, কাতারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও মুসলিম দেশগুলোর থেকে বিদেশি বিনিয়োগ টানতেই এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, দ্রুতই বাংলাদেশ ব্যাংক খসড়াটি চূলচেরা বিশ্লেষণ শেষে চূড়ান্ত করে ফেরত পাঠাবে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেরিয়ে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই পাস করার জন্য তোলা হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন