বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ (১,১৫,৬১৭ জন) এবং মোট মারা গেছেন ৩৫৭ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও ১,৩৬৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহের (সপ্তাহ ৪২) হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৩০৫ জন এবং সাপ্তাহিক মৃত্যু ১৫ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট, প্লাটিলেটের জন্য স্বজনদের হাহাকার এবং প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরব্যাপী প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরাসরি ও গভীর ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অনিয়মিত পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। উপযুক্ত তাপমাত্রায় মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বহিঃস্থ ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সুপ্তিকাল বহুলাংশে কমে আসে। ফলে একটি সংক্রমিত এডিস মশা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবন নির্মাণ এলাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র এবং বাসাবাড়ির ছাদবাগানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে। ফলে কেবল হাসপাতালমুখী চিকিৎসা দিয়ে এই জটিল পরিবেশগত ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সামলানো একেবারেই অসম্ভব।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতিগুলো মূলত ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ানিર્ભর’। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব বাড়লে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো কিংবা মশা নিধনে রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর সাময়িক তৎপরতা চোখে পড়ে। অথচ কোথায় মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃক ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতখানি বজায় রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ছিটানো কেবল বিপুল অর্থেরই অপচয় ঘটায় না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের চরম ক্ষতি সাধন করে। তাই লার্ভার উৎস নির্মূল, নিয়মিত পতঙ্গতাত্ত্বিক জরিপ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পদ্ধতি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ডেঙ্গু প্রাণী থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ নয়; সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ান হেলথের প্রয়োগ বলতে মানুষ, বাহক মশা, পরিবেশ ও জলবায়ুর সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা বোঝায়। এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে কেবল কাগজ-কলমে বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই টাস্কফোর্সে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও ওয়ান হেলথ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করে ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থলের অবস্থান এবং হাসপাতালের রোগীসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে, যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিকদের ওপর দায় চাপিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নালা পরিষ্কার ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত নজরদারি ও আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত শুধু কতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার ভিত্তিতে নয়; বরং কতটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেল এবং কতটি জীবন রক্ষা করা গেল, তার ভিত্তিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।
[লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক সদস্য]

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো সাময়িক বা নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষ (১,১৫,৬১৭ জন) এবং মোট মারা গেছেন ৩৫৭ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও ১,৩৬৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহের (সপ্তাহ ৪২) হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৩০৫ জন এবং সাপ্তাহিক মৃত্যু ১৫ জন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকট, প্লাটিলেটের জন্য স্বজনদের হাহাকার এবং প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট করে যে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বছরব্যাপী প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
ডেঙ্গুর এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরাসরি ও গভীর ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অনিয়মিত পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ও ভাইরাসের বিস্তারকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করছে। উপযুক্ত তাপমাত্রায় মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বহিঃস্থ ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বা ভাইরাস সংক্রমণক্ষম হয়ে ওঠার সুপ্তিকাল বহুলাংশে কমে আসে। ফলে একটি সংক্রমিত এডিস মশা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবন নির্মাণ এলাকা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র এবং বাসাবাড়ির ছাদবাগানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে। ফলে কেবল হাসপাতালমুখী চিকিৎসা দিয়ে এই জটিল পরিবেশগত ও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সামলানো একেবারেই অসম্ভব।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতিগুলো মূলত ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ানিર્ભর’। মহামারি বা প্রাদুর্ভাব বাড়লে কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো কিংবা মশা নিধনে রাসায়নিক ওষুধ ছিটানোর সাময়িক তৎপরতা চোখে পড়ে। অথচ কোথায় মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, কোন কোন এলাকায় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃক ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা কতখানি বজায় রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক ছিটানো কেবল বিপুল অর্থেরই অপচয় ঘটায় না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য ও অন্যান্য উপকারী পতঙ্গের চরম ক্ষতি সাধন করে। তাই লার্ভার উৎস নির্মূল, নিয়মিত পতঙ্গতাত্ত্বিক জরিপ, নগর বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশবান্ধব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পদ্ধতি মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ডেঙ্গু প্রাণী থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ নয়; সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ওয়ান হেলথের প্রয়োগ বলতে মানুষ, বাহক মশা, পরিবেশ ও জলবায়ুর সম্পর্ককে একসঙ্গে বিবেচনা করা বোঝায়। এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে কেবল কাগজ-কলমে বা প্রশাসনিক সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এই টাস্কফোর্সে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ও ওয়ান হেলথ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত করে ওয়ান হেলথ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য, মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থলের অবস্থান এবং হাসপাতালের রোগীসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে একটি জাতীয় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে, যেন মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে সচেতন হতে হবে। তবে নাগরিকদের ওপর দায় চাপিয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নালা পরিষ্কার ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত নজরদারি ও আন্তমন্ত্রণালয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত শুধু কতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তার ভিত্তিতে নয়; বরং কতটি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা গেল এবং কতটি জীবন রক্ষা করা গেল, তার ভিত্তিতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।
[লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাবেক সদস্য]

আপনার মতামত লিখুন