সম্পর্কের জটিলতা, কর্মক্ষেত্রের ব্যস্ততা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা - নানা কারণে মানসিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কথা বলে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ আবার হাঁটতে বের হন। আর কারও কাছে খাবার হয়ে ওঠে মন ভালো করার উপায়। মন খারাপ বা চাপের মুহূর্তে বারবার খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা আবেগের বশে খাওয়া।
এটি স্বতন্ত্র খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। তবে অভ্যাসটি দীর্ঘস্থায়ী হলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কখন শারীরিক ক্ষুধা থেকে খাচ্ছেন আর কখন আবেগের কারণে খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত শরীরের প্রয়োজন মেটাতে ক্ষুধা লাগলে মানুষ খাবার খান। কিন্তু আবেগের বশে খাওয়ার ক্ষেত্রে মন খারাপ, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপ থেকেই খাবারের প্রতি তাগিদ তৈরি হয়। এ সময় শরীরের চাহিদার তুলনায় বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
মন ভালো না থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরির আগ্রহও কমে যেতে পারে। তখন সহজে পাওয়া যায় এমন ফাস্ট ফুড কিংবা বেশি চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। নিয়মিত এমনটি হলে ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগের বশে খাওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রাপ্তি-সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে কখন ক্ষুধা লাগছে কিংবা কখন পেট ভরে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।
শারীরিক ক্ষুধার সঙ্গে এই প্রবণতার একটি পার্থক্য হলো, আবেগের বশে খাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা তৈরি হয়। বিশেষ করে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উদ্বেগ বা পেটে অস্বস্তির মতো অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা কয়েকভাবে
প্রকাশ পেতে
পারে। যেমন:
· মন খারাপ হলেই খাবার খেতে শুরু করা
· দ্রুত খাবার খাওয়া
· প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলা
· ফাস্ট ফুডের প্রতি ঘন ঘন আকর্ষণ তৈরি হওয়া
· নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করা
· খাওয়ার পর অপরাধবোধ বা লজ্জা পাওয়া
· অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া
মন খারাপের সময় খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫ হাজার ৮৬৩ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের প্রায় একজন প্রায়ই বা খুব ঘন ঘন আবেগের বশে খাবার খান।
মানসিক চাপ, রাগ, দুঃখ, উদ্বেগ ও একঘেয়েমির মতো অনুভূতি এ অভ্যাসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যে কেউ এমন প্রবণতার শিকার হতে পারেন। তবে গবেষণায় নারীদের মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ প্রবণতা কমতেও পারে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজেদের ইচ্ছা বা তাগিদ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাদের আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা আত্মনিয়ন্ত্রণে সক্ষম ব্যক্তিদের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
খাবারের ধরনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পরিশোধিত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রাপ্তি-সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। এসব খাবারে ক্যালরির পরিমাণ বেশি হওয়ায় বারবার খাওয়ার ইচ্ছাও তৈরি হতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা সামলাতে খাবারের বিকল্প হিসেবে মানসিক স্বস্তি পাওয়ার অন্য উপায় খুঁজে নেওয়া যেতে পারে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ সামলানোর বিকল্প কৌশল এ অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
কিছু বিষয়
অনুসরণ করতে
পারেন:
· মন অন্যদিকে ফেরান: মন খারাপ হলে খাবারের দিকে না ঝুঁকে হাঁটতে বের হন কিংবা পছন্দের কোনো কাজে সময় দিন।
· কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন: বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিলে মানসিক চাপ সামলাতে সুবিধা হতে পারে।
· মনোযোগ দিয়ে খান: খাওয়ার আগে সত্যিই ক্ষুধা লেগেছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে খান এবং খাবারের স্বাদে মনোযোগ দিন।
· খাদ্যাভ্যাস লিখে রাখুন: কখন কী খাচ্ছেন এবং সে সময় আপনার মানসিক অবস্থা কেমন, তা লিখে রাখলে নিজের অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে।
· বিকল্প খাবার প্রস্তুত রাখুন: ঘরে চিনিযুক্ত ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম রাখুন। ফ্রিজে ধুয়ে ও কেটে রাখা সবজি রাখতে পারেন।
· শরীরচর্চা করুন: ব্যায়াম নেতিবাচক আবেগ ও বিষণ্নতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার তাগিদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে পুষ্টিবিদ কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। নিজের আবেগের কারণ চিহ্নিত করা এবং তা সামলানোর স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি শেখা এ অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, মন খারাপ হলেই খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া আর প্রতিবার আবেগের কারণে খাওয়া এক বিষয় নয়। তবে খাবার যদি নিয়মিত মানসিক চাপ সামলানোর প্রধান উপায় হয়ে ওঠে, তাহলে নিজের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সম্পর্কের জটিলতা, কর্মক্ষেত্রের ব্যস্ততা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা - নানা কারণে মানসিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কথা বলে স্বস্তি খোঁজেন, কেউ আবার হাঁটতে বের হন। আর কারও কাছে খাবার হয়ে ওঠে মন ভালো করার উপায়। মন খারাপ বা চাপের মুহূর্তে বারবার খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা আবেগের বশে খাওয়া।
এটি স্বতন্ত্র খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। তবে অভ্যাসটি দীর্ঘস্থায়ী হলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কখন শারীরিক ক্ষুধা থেকে খাচ্ছেন আর কখন আবেগের কারণে খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত শরীরের প্রয়োজন মেটাতে ক্ষুধা লাগলে মানুষ খাবার খান। কিন্তু আবেগের বশে খাওয়ার ক্ষেত্রে মন খারাপ, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপ থেকেই খাবারের প্রতি তাগিদ তৈরি হয়। এ সময় শরীরের চাহিদার তুলনায় বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
মন ভালো না থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরির আগ্রহও কমে যেতে পারে। তখন সহজে পাওয়া যায় এমন ফাস্ট ফুড কিংবা বেশি চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। নিয়মিত এমনটি হলে ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগের বশে খাওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রাপ্তি-সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে কখন ক্ষুধা লাগছে কিংবা কখন পেট ভরে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।
শারীরিক ক্ষুধার সঙ্গে এই প্রবণতার একটি পার্থক্য হলো, আবেগের বশে খাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা তৈরি হয়। বিশেষ করে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উদ্বেগ বা পেটে অস্বস্তির মতো অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা কয়েকভাবে
প্রকাশ পেতে
পারে। যেমন:
· মন খারাপ হলেই খাবার খেতে শুরু করা
· দ্রুত খাবার খাওয়া
· প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলা
· ফাস্ট ফুডের প্রতি ঘন ঘন আকর্ষণ তৈরি হওয়া
· নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করা
· খাওয়ার পর অপরাধবোধ বা লজ্জা পাওয়া
· অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া
মন খারাপের সময় খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫ হাজার ৮৬৩ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের প্রায় একজন প্রায়ই বা খুব ঘন ঘন আবেগের বশে খাবার খান।
মানসিক চাপ, রাগ, দুঃখ, উদ্বেগ ও একঘেয়েমির মতো অনুভূতি এ অভ্যাসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যে কেউ এমন প্রবণতার শিকার হতে পারেন। তবে গবেষণায় নারীদের মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ প্রবণতা কমতেও পারে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজেদের ইচ্ছা বা তাগিদ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাদের আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা আত্মনিয়ন্ত্রণে সক্ষম ব্যক্তিদের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
খাবারের ধরনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পরিশোধিত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রাপ্তি-সংশ্লিষ্ট কার্যপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। এসব খাবারে ক্যালরির পরিমাণ বেশি হওয়ায় বারবার খাওয়ার ইচ্ছাও তৈরি হতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার প্রবণতা সামলাতে খাবারের বিকল্প হিসেবে মানসিক স্বস্তি পাওয়ার অন্য উপায় খুঁজে নেওয়া যেতে পারে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ সামলানোর বিকল্প কৌশল এ অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
কিছু বিষয়
অনুসরণ করতে
পারেন:
· মন অন্যদিকে ফেরান: মন খারাপ হলে খাবারের দিকে না ঝুঁকে হাঁটতে বের হন কিংবা পছন্দের কোনো কাজে সময় দিন।
· কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন: বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিলে মানসিক চাপ সামলাতে সুবিধা হতে পারে।
· মনোযোগ দিয়ে খান: খাওয়ার আগে সত্যিই ক্ষুধা লেগেছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে খান এবং খাবারের স্বাদে মনোযোগ দিন।
· খাদ্যাভ্যাস লিখে রাখুন: কখন কী খাচ্ছেন এবং সে সময় আপনার মানসিক অবস্থা কেমন, তা লিখে রাখলে নিজের অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে।
· বিকল্প খাবার প্রস্তুত রাখুন: ঘরে চিনিযুক্ত ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম রাখুন। ফ্রিজে ধুয়ে ও কেটে রাখা সবজি রাখতে পারেন।
· শরীরচর্চা করুন: ব্যায়াম নেতিবাচক আবেগ ও বিষণ্নতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আবেগের বশে খাওয়ার তাগিদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে পুষ্টিবিদ কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। নিজের আবেগের কারণ চিহ্নিত করা এবং তা সামলানোর স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি শেখা এ অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, মন খারাপ হলেই খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া আর প্রতিবার আবেগের কারণে খাওয়া এক বিষয় নয়। তবে খাবার যদি নিয়মিত মানসিক চাপ সামলানোর প্রধান উপায় হয়ে ওঠে, তাহলে নিজের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন