পহেলা বৈশাখ আমাদের ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন, কিন্তু বাস্তবে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক নীরব প্রশ্নপত্র| প্রতি বছর যখন বৈশাখ আসে, আমরা রঙে রঙিন হই, শোভাযাত্রায় হাঁটি, শুভেচ্ছা বিনিময় করি| শহরের রাজপথ মুখোশ, পুতুল, ঢাকের শব্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে| মনে হয়, আমরা এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি| কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই বাহ্যিক অগ্রগতির ভেতরে আমাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতি কতটা সত্যি?
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে| কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য হিজরি চান্দ্র সনের সঙ্গে সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়| শুরুতে এটি ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবে| ইতিহাসের এই রূপান্তরই প্রমাণ করে— যে কোনো প্রথা মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেলে তা কেবল হিসাবের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের অংশ|
আজ পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতা নয়; এটি এক সামাজিক মিলনমেলা| ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়| শুভ নববর্ষ শব্দটি তখন আর কেবল শুভেচ্ছা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের সমতার ভাষা| কিন্তু বাস্তব জীবনে এই সমতা কতটা স্থায়ী? উৎসব শেষে কি আমরা আবার পুরনো বিভাজনের দেয়াল তুলে দিই না?
হালখাতা এই দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক| ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন| গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, সম্পর্ক নবায়ন করা হয়| এই প্রথা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি বিশ্বাসের পুনর্গঠন| কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস কি কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি বাস্তব জীবনে তা টিকে থাকে? নাকি বছরের বাকি সময় আমরা আবার সন্দেহ, অবিশ্বাস আর স্বার্থের জালে জড়িয়ে পড়ি?
রমনার বটমূলে ভোরের সূর্যের সঙ্গে যখন - এসো হে বৈশাখ - ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই নতুন জীবনের আহ্বান জানাচ্ছে| এই গান শুধু সংগীত নয়, এটি এক দার্শনিক আহ্বান—পুরনো জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বাঁচার| কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই আহ্বান শুনি, নাকি এটি কেবল উৎসবের পটভূমির সুর হয়ে থাকে?
সবার অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা এই দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক| রঙিন মুখোশ, বিশাল প্রতীকী কাঠামো, লোকজ শিল্পের সমাহার—সব মিলিয়ে এটি এক চলমান শিল্পকর্ম| এর ভেতরে আছে অশুভের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ| কিন্তু সেই প্রতিবাদ কি কেবল কাগজে-রঙে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান দৃঢ়? শোভাযাত্রা যখন এগোয়, আমরা কি সত্যিই এগোই?
খাবারের দিক থেকেও পহেলা বৈশাখ এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা| পান্তা-ইলিশ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা হরেক রকমের ভর্তা —এই খাবারগুলো বাঙালির মাটির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক| কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি যখন শহুরে অভিজাত সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে| ঐতিহ্য কি তখন তার সহজতা হারায়? নাকি সেটিই তার বিবর্তন?
গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখের চিত্র আরও প্রাণবন্ত| সেখানে মেলা বসে, লোকজ গান গাওয়া হয়, খেলাধুলা ও নানান আয়োজন চলে| এই মেলা শুধু আনন্দের কেন্দ্র নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি চালিকাশক্তি| ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা এখানে তাদের জীবিকার সুযোগ পান| সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখানে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবে|
বিশ্বায়নের এই যুগে পহেলা বৈশাখ আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার ডাক দেয়| প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও আধুনিকতার প্রবাহে আমরা যতই এগোই, ততই আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার প্রয়োজন বেড়ে যায়| কারণ পরিচয়হীন অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কূন্যতায় পরিণত হতে পারে| তাই বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও|
এই দিনে আমরা নতুন পোশাক পরি, ছবি তুলি, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাই| কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমাদের চিন্তা, মনন ও আচরণ কি সত্যিই নতুন হয়? নাকি এটি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন, ভেতরের স্থবিরতা অক্ষণ্ন রেখে?
পহেলা বৈশাখ আসলে এক আয়নার মতো| এটি আমাদের দেখায় আমরা কেমন হতে পারতাম, আর বাস্তবে আমরা কেমন হয়ে আছি| এই আয়নায় যদি আমরা শুধু সাজসজ্জা দেখি, তবে তা অপূর্ণ দর্শন| কিন্তু যদি আমরা নিজেদের ভেতরের সমাজ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে দেখি, তবে সেটিই হবে প্রকৃত উপলব্ধি|
শহরের আলো, ঢাকের শব্দ, শোভাযাত্রার রং—সব মিলিয়ে এক দিনের জন্য আমরা যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করি| কিন্তু সেই জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে আমরা কতটা বদলাই? এই প্রশ্নই পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন|
এক কথায় পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল আনন্দ দেয় না; এটি আমাদের প্রশ্ন করে| আমাদের জাগিয়ে তোলে| আমাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়| শোভাযাত্রা হয়তো এগোয়, কিন্তু আমরা যদি না এগোই, তবে সেই রঙিন যাত্রা কেবল একটি প্রদর্শনী হয়েই থেকে যাবে| তাই নতুন বছরের এই দিনে প্রত্যাশা একটাই—আমরা যেন কেবল উৎসব উদযাপন না করি, বরং নিজেদের ভেতরেও এক নতুন সূচনা ঘটাই| চিন্তায়, চেতনায়, দায়িত্ববোধে ও মানবিকতায়| সবাইকে শুভ নববর্ষ|
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পহেলা বৈশাখ আমাদের ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন, কিন্তু বাস্তবে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক নীরব প্রশ্নপত্র| প্রতি বছর যখন বৈশাখ আসে, আমরা রঙে রঙিন হই, শোভাযাত্রায় হাঁটি, শুভেচ্ছা বিনিময় করি| শহরের রাজপথ মুখোশ, পুতুল, ঢাকের শব্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে| মনে হয়, আমরা এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি| কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই বাহ্যিক অগ্রগতির ভেতরে আমাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক অগ্রগতি কতটা সত্যি?
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে| কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য হিজরি চান্দ্র সনের সঙ্গে সৌর সনের সমন্বয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়| শুরুতে এটি ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে তা রূপ নেয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবে| ইতিহাসের এই রূপান্তরই প্রমাণ করে— যে কোনো প্রথা মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেলে তা কেবল হিসাবের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের অংশ|
আজ পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতা নয়; এটি এক সামাজিক মিলনমেলা| ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়| শুভ নববর্ষ শব্দটি তখন আর কেবল শুভেচ্ছা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের সমতার ভাষা| কিন্তু বাস্তব জীবনে এই সমতা কতটা স্থায়ী? উৎসব শেষে কি আমরা আবার পুরনো বিভাজনের দেয়াল তুলে দিই না?
হালখাতা এই দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক| ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন| গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, সম্পর্ক নবায়ন করা হয়| এই প্রথা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি বিশ্বাসের পুনর্গঠন| কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস কি কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি বাস্তব জীবনে তা টিকে থাকে? নাকি বছরের বাকি সময় আমরা আবার সন্দেহ, অবিশ্বাস আর স্বার্থের জালে জড়িয়ে পড়ি?
রমনার বটমূলে ভোরের সূর্যের সঙ্গে যখন - এসো হে বৈশাখ - ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই নতুন জীবনের আহ্বান জানাচ্ছে| এই গান শুধু সংগীত নয়, এটি এক দার্শনিক আহ্বান—পুরনো জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বাঁচার| কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই আহ্বান শুনি, নাকি এটি কেবল উৎসবের পটভূমির সুর হয়ে থাকে?
সবার অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা এই দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক| রঙিন মুখোশ, বিশাল প্রতীকী কাঠামো, লোকজ শিল্পের সমাহার—সব মিলিয়ে এটি এক চলমান শিল্পকর্ম| এর ভেতরে আছে অশুভের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ| কিন্তু সেই প্রতিবাদ কি কেবল কাগজে-রঙে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও আমাদের অবস্থান দৃঢ়? শোভাযাত্রা যখন এগোয়, আমরা কি সত্যিই এগোই?
খাবারের দিক থেকেও পহেলা বৈশাখ এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা| পান্তা-ইলিশ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা হরেক রকমের ভর্তা —এই খাবারগুলো বাঙালির মাটির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক| কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি যখন শহুরে অভিজাত সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটে| ঐতিহ্য কি তখন তার সহজতা হারায়? নাকি সেটিই তার বিবর্তন?
গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখের চিত্র আরও প্রাণবন্ত| সেখানে মেলা বসে, লোকজ গান গাওয়া হয়, খেলাধুলা ও নানান আয়োজন চলে| এই মেলা শুধু আনন্দের কেন্দ্র নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি চালিকাশক্তি| ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পীরা এখানে তাদের জীবিকার সুযোগ পান| সংস্কৃতি ও অর্থনীতি এখানে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবে|
বিশ্বায়নের এই যুগে পহেলা বৈশাখ আমাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার ডাক দেয়| প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও আধুনিকতার প্রবাহে আমরা যতই এগোই, ততই আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার প্রয়োজন বেড়ে যায়| কারণ পরিচয়হীন অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত কূন্যতায় পরিণত হতে পারে| তাই বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও|
এই দিনে আমরা নতুন পোশাক পরি, ছবি তুলি, সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাই| কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমাদের চিন্তা, মনন ও আচরণ কি সত্যিই নতুন হয়? নাকি এটি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন, ভেতরের স্থবিরতা অক্ষণ্ন রেখে?
পহেলা বৈশাখ আসলে এক আয়নার মতো| এটি আমাদের দেখায় আমরা কেমন হতে পারতাম, আর বাস্তবে আমরা কেমন হয়ে আছি| এই আয়নায় যদি আমরা শুধু সাজসজ্জা দেখি, তবে তা অপূর্ণ দর্শন| কিন্তু যদি আমরা নিজেদের ভেতরের সমাজ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে দেখি, তবে সেটিই হবে প্রকৃত উপলব্ধি|
শহরের আলো, ঢাকের শব্দ, শোভাযাত্রার রং—সব মিলিয়ে এক দিনের জন্য আমরা যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করি| কিন্তু সেই জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে আমরা কতটা বদলাই? এই প্রশ্নই পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন|
এক কথায় পহেলা বৈশাখ আমাদের কেবল আনন্দ দেয় না; এটি আমাদের প্রশ্ন করে| আমাদের জাগিয়ে তোলে| আমাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়| শোভাযাত্রা হয়তো এগোয়, কিন্তু আমরা যদি না এগোই, তবে সেই রঙিন যাত্রা কেবল একটি প্রদর্শনী হয়েই থেকে যাবে| তাই নতুন বছরের এই দিনে প্রত্যাশা একটাই—আমরা যেন কেবল উৎসব উদযাপন না করি, বরং নিজেদের ভেতরেও এক নতুন সূচনা ঘটাই| চিন্তায়, চেতনায়, দায়িত্ববোধে ও মানবিকতায়| সবাইকে শুভ নববর্ষ|
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন