সংবাদ

কলকাতায় কোরবানির 'ধারা বদল'


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১০:০৩ এএম

কলকাতায় কোরবানির 'ধারা বদল'

​পশ্চিমবঙ্গে এবারের কোরবানির ঈদে গরু জবাইকে ঘিরে এক নজিরবিহীন ও ভিন্নতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি মূলত আইনি কাঠামো, আইনের প্রয়োগে পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অবস্থানের যৌথ প্রভাবের ফল।

প্রথমত আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতে গরু জবাই সংক্রান্ত কোনো একক কেন্দ্রীয় আইন নেই; এটি সম্পূর্ণ রাজ্যভিত্তিক আইনের আওতাধীন।

পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালের ‘অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়স বা শারীরিক অবস্থা এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকের অনুমোদন সাপেক্ষে গরু জবাই নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে গরু জবাই সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞামূলক আইনগুলোকে বৈধতা দিয়ে রাজ্যগুলোকে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের স্বাধীনতা দেয়। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কোরবানির সময় একটি প্রথাগত নমনীয় প্রশাসনিক তদারকি ব্যবস্থা চালু থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কঠোরতা ও নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ক্ষেত্রটি বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।

​আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির এই সরাসরি প্রভাব পড়েছে কোরবানির বাজারে। ঈদের আগে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার গরুর হাটগুলোতে পশুর সরবরাহ থাকলেও মুসলিম ক্রেতারা গরু কেনা এক প্রকার ‘বয়কট’ করায় চাহিদা ব্যাপক কমে যায়। ফলে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ হাটে গরু আনা কমিয়ে দেন। ক্রেতারা কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশঙ্কাই নয়, বরং নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেও গরু কেনা থেকে বিরত থাকেন। ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গরু নিয়ে 'কট্টর' অবস্থানের উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শুধু সন্দেহবশত গরু বিক্রি বা জবাইয়ের ভুয়া খবরে দলবদ্ধ হামলার মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন মানুষকে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন পর্যন্ত কোনো সুবিচার পাননি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর এই বিচারহীনতার নজির থেকে তৈরি হওয়া আতঙ্কও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।

​নিরাপত্তা ও আইনি অনিশ্চয়তার জন‌্য অনেক পরিবারে আগে থেকে লালিত-পালিত গরু থাকা সত্ত্বেও তারা শেষ পর্যন্ত কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ গরু কোরবানি না করে বিকল্প হিসেবে খাসি ও ভেড়া কোরবানি করার পথ বেছে নিয়েছেন। উদ্ভূত সামাজিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে খাসি ও ভেড়ার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোই কোরবানির প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যার জন‌্য কোরবা‌নিতে চড়া মূল‌্য দি‌য়ে খা‌সি ও ভেড়া কিন‌তে হ‌য়ে‌ছে।

সব মিলিয়ে, আইনের দীর্ঘদিনের অস্তিত্ব, প্রয়োগের ধরনে সাম্প্রতিক কড়াকড়ি, ক্ষমতা‌সিন‌দের কট্টর ম‌নোভাব এবং সমাজের ভেতর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবে এবারের কোরবানির চিত্র পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬


কলকাতায় কোরবানির 'ধারা বদল'

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬

featured Image

​পশ্চিমবঙ্গে এবারের কোরবানির ঈদে গরু জবাইকে ঘিরে এক নজিরবিহীন ও ভিন্নতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি মূলত আইনি কাঠামো, আইনের প্রয়োগে পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অবস্থানের যৌথ প্রভাবের ফল।

প্রথমত আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতে গরু জবাই সংক্রান্ত কোনো একক কেন্দ্রীয় আইন নেই; এটি সম্পূর্ণ রাজ্যভিত্তিক আইনের আওতাধীন।

পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালের ‘অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়স বা শারীরিক অবস্থা এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকের অনুমোদন সাপেক্ষে গরু জবাই নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে গরু জবাই সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞামূলক আইনগুলোকে বৈধতা দিয়ে রাজ্যগুলোকে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের স্বাধীনতা দেয়। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কোরবানির সময় একটি প্রথাগত নমনীয় প্রশাসনিক তদারকি ব্যবস্থা চালু থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কঠোরতা ও নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ক্ষেত্রটি বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।

​আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির এই সরাসরি প্রভাব পড়েছে কোরবানির বাজারে। ঈদের আগে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার গরুর হাটগুলোতে পশুর সরবরাহ থাকলেও মুসলিম ক্রেতারা গরু কেনা এক প্রকার ‘বয়কট’ করায় চাহিদা ব্যাপক কমে যায়। ফলে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ হাটে গরু আনা কমিয়ে দেন। ক্রেতারা কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশঙ্কাই নয়, বরং নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেও গরু কেনা থেকে বিরত থাকেন। ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গরু নিয়ে 'কট্টর' অবস্থানের উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শুধু সন্দেহবশত গরু বিক্রি বা জবাইয়ের ভুয়া খবরে দলবদ্ধ হামলার মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন মানুষকে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন পর্যন্ত কোনো সুবিচার পাননি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর এই বিচারহীনতার নজির থেকে তৈরি হওয়া আতঙ্কও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।

​নিরাপত্তা ও আইনি অনিশ্চয়তার জন‌্য অনেক পরিবারে আগে থেকে লালিত-পালিত গরু থাকা সত্ত্বেও তারা শেষ পর্যন্ত কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ গরু কোরবানি না করে বিকল্প হিসেবে খাসি ও ভেড়া কোরবানি করার পথ বেছে নিয়েছেন। উদ্ভূত সামাজিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে খাসি ও ভেড়ার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোই কোরবানির প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যার জন‌্য কোরবা‌নিতে চড়া মূল‌্য দি‌য়ে খা‌সি ও ভেড়া কিন‌তে হ‌য়ে‌ছে।

সব মিলিয়ে, আইনের দীর্ঘদিনের অস্তিত্ব, প্রয়োগের ধরনে সাম্প্রতিক কড়াকড়ি, ক্ষমতা‌সিন‌দের কট্টর ম‌নোভাব এবং সমাজের ভেতর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবে এবারের কোরবানির চিত্র পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত