সংবাদ

অর্থনৈতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির বিপন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াই


মোহাম্মদ জাফর সাদেক
মোহাম্মদ জাফর সাদেক
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম

অর্থনৈতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির বিপন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াই
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের দর্পণ সাক্ষ্য দেয় যে, কৃষিই ছিল তার প্রাণস্পন্দন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি

একটি জাতির সংস্কৃতি কেবল তার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ—গীত, নৃত্য বা উৎসবের অলংকারিক আবরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত উৎস প্রোথিত থাকে সেই জাতির জীবনসংগ্রাম এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সুগভীর মৌল কাঠামোর মধ্যে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের দর্পণ সাক্ষ্য দেয় যে, কৃষিই ছিল তার প্রাণস্পন্দন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তবে সমকালীন বিশ্বে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের যবনিকা ঘটলেও এক সূক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের গ্রাস করছে। এই প্রক্রিয়ার নিগূঢ় লক্ষ্য হলো— একটি জাতিকে তার স্বকীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত করে পরনির্ভরশীল করে তোলা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীনম্মন্যতার চশমায় দেখতে বাধ্য করা। 

মানব সভ্যতার ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল সর্বদা একরৈখিক থাকেনি। একদা যা ছিল উন্মুক্ত তলোয়ার আর কামানের গর্জন, কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয়েছে সূক্ষ্মতর এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে, যাকে আন্তোনিও গ্রামসি ‘সাংস্কৃতিক হেজিমনি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় শোষক গোষ্ঠী কেবল ভৌগোলিক সীমানা দখল করে ক্ষান্ত হয় না, বরং তারা অবদমিত জাতির অবচেতন মনে এক প্রকার ‘স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি’ উৎপাদন করে। সাম্রাজ্যবাদের এই নব্য রূপটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এখানে শোষিত মানুষটি তার শিকলকে অলঙ্কার মনে করতে শেখে। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাককে ‘আধুনিকতার মাপকাঠি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদের অজান্তেই হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ‘অনগ্রসর’ মনে করে তা বর্জন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। 

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শেকড় প্রোথিত থাকে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে। কার্ল মার্ক্স বর্ণিত ‘ভিত্তি’ ও ‘উপরি কাঠামো’র সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন কোনো জাতির উৎপাদন পদ্ধতি বদলে যায়, তখন তার সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিও বদলে যেতে বাধ্য। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মেরুদণ্ড ছিল কৃষি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়িত পুঁজিতন্ত্রের যুগে সেই কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে কৃষককে এক অন্তহীন পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে সমাজব্যবস্থা ‘উৎপাদন’ থেকে সরে গিয়ে ‘ভোগবাদে’ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কনজ্যুমারিজমের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে সৃজনশীল উৎপাদক থেকে নিষ্ক্রিয় ক্রেতায় পরিণত করা। আর এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে আমাদের উৎসবে; যেখানে নবান্ন বা হালখাতা ছিল মাটির সঙ্গে মানুষের সংযোগ, সেখানে আজ ‘বার্থ ডে ’ বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র মতো কর্পোরেট দিবসগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। 

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসক লর্ড মেকলে ভারতে ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেছিলেন এমন এক ‘বাদামী চামড়ার সাহেব’ শ্রেণী তৈরি করতে, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। আজ কয়েক দশক পরেও আমরা সেই ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এটিই হলো ফ্রাঞ্জ ফ্যানোন বর্ণিত কালো চামড়া ও সাদা মুখোশের সংকট। উপনিবেশবাদ যখন কোনো জাতির ওপর চেপে বসে, তখন সে সেই জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করে তাকে আত্মবিস্মৃত করে তোলে। ফলে অবদমিত মানুষটি মুক্তি বলতে বোঝে শোষকের মতো হওয়াকে। এই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দী হওয়ার ফলে আধুনিক বিশ্বে আমরা দেখছি এক ধরনের স্বেচ্ছাধীন দাসত্ব, যেখানে কোনো শেকল দৃশ্যমান নয়, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। 

ভাষার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো যেমনটা দেখিয়েছেন, কোনো জাতির মনোজগৎকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে আগে তার ভাষাকে উপনিবেশমুক্ত করতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ঘর। যখন কোনো জাতি তার নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান বা উচ্চতর জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিদেশি ভাষার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে আসলে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে এই ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ আরও তীব্রতর হয়েছে। অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে পশ্চিমা মানদণ্ডকেই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, ফলে আমাদের নিজস্ব মিথ, লোকগাথা, লোকসাহিত্য ও গ্রামীণ প্রজ্ঞাগুলো আধুনিক ‘স্মার্ট’ সংস্কৃতির ভিড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। 

বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় আর একটি ভয়াবহ দিক হলো ‘ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন’। এর লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যময় পৃথিবীকে একটি একঘেয়ে একক বাজারে পরিণত করা। এই প্রক্রিয়ায় ছোট জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব পোশাক, আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস এবং লোকসংগীতকে হয় বিলুপ্ত করা হচ্ছে, নয়তো ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। আজ বাউল গান বা আদিবাসী নৃত্য তার আদি দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন শিল্পের বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর আসলে এক প্রকার ‘ডি-কালচারাইজেশন’, যেখানে সংস্কৃতি তার যাপিত জীবনের সত্যতা হারিয়ে কেবল প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত হয়। 

এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল হলো ‘অ্যালিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ যখন তার নিজের ঐতিহ্যকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন সে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে নিমজ্জিত হয়। সে তার নিজের মাটির গন্ধে লজ্জা পায়, নিজের লোকজ ঐতিহ্যকে ‘খেত’ বা ‘অনগ্রসর’ মনে করে ঘৃণা করতে শেখে। এটিই হলো সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়, যেখানে শোষিত নিজেই নিজের সত্তাকে অস্বীকার করে শোষকের প্রতিকৃতি হতে চায়। এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে পশ্চিমা জগত প্রাচ্যের এক কৃত্রিম এবং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে হলে আমাদের ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা পাল্টা বয়ান তৈরি করতে হবে। 

প্রতিরোধের এই লড়াইয়ে হোমি কে ভাবা’র ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরায়ণ তত্ত্বটি আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ যখন তার সংস্কৃতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন আমরা তাকে হুবহু গ্রহণ না করে আমাদের নিজস্ব ছাঁচে রূপান্তর করতে পারি। যেমন, পশ্চিমা বিজ্ঞানকে আমরা বর্জন করব না, বরং তাকে আমাদের গ্রামীণ কৃষি-প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করব। এই সমন্বয়ই হবে আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। জ্ঞান-উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন আমরা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেব, তখনই শুরু হবে প্রকৃত বিনির্মাণ। যখন আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের বদলে দেশজ শ্রমের ফসল বেছে নিই, তখন আমরা আসলে বিশ্বপুঁজির শৃঙ্খলকেই আঘাত করি। 

পরিশেষে, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ রুখতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইকে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সাংস্কৃতিক লড়াই মানে হলো নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান বজায় রেখে নিজস্ব মৌলিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে নিমগ্ন হওয়া। এটিই হলো এই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক সংগ্রাম। আমরা যদি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী করতে পারি, তবেই আমাদের উপরি কাঠামো বা সংস্কৃতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। শিকড়চ্যুত এই উন্নয়ন আসলে এক প্রকার মরূকরণ; তাই মাটির গভীর থেকে রসদ সংগ্রহ করেই আমাদের ডালপালা মেলতে হবে বিশ্বের আকাশে। নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধের মেলবন্ধনেই রচিত হতে পারে উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের প্রকৃত স্বাধীনতার ইশতেহার। এই সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরন্তর, যেখানে প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি উৎসব হবে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ত্রিশাল কারিগরী কলেজ, ময়মনসিংহ]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬


অর্থনৈতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির বিপন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াই

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬

featured Image

একটি জাতির সংস্কৃতি কেবল তার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ—গীত, নৃত্য বা উৎসবের অলংকারিক আবরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত উৎস প্রোথিত থাকে সেই জাতির জীবনসংগ্রাম এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সুগভীর মৌল কাঠামোর মধ্যে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের দর্পণ সাক্ষ্য দেয় যে, কৃষিই ছিল তার প্রাণস্পন্দন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তবে সমকালীন বিশ্বে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের যবনিকা ঘটলেও এক সূক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের গ্রাস করছে। এই প্রক্রিয়ার নিগূঢ় লক্ষ্য হলো— একটি জাতিকে তার স্বকীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত করে পরনির্ভরশীল করে তোলা এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে হীনম্মন্যতার চশমায় দেখতে বাধ্য করা। 

মানব সভ্যতার ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল সর্বদা একরৈখিক থাকেনি। একদা যা ছিল উন্মুক্ত তলোয়ার আর কামানের গর্জন, কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয়েছে সূক্ষ্মতর এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে, যাকে আন্তোনিও গ্রামসি ‘সাংস্কৃতিক হেজিমনি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় শোষক গোষ্ঠী কেবল ভৌগোলিক সীমানা দখল করে ক্ষান্ত হয় না, বরং তারা অবদমিত জাতির অবচেতন মনে এক প্রকার ‘স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি’ উৎপাদন করে। সাম্রাজ্যবাদের এই নব্য রূপটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এখানে শোষিত মানুষটি তার শিকলকে অলঙ্কার মনে করতে শেখে। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার জীবনদর্শন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাককে ‘আধুনিকতার মাপকাঠি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজেদের অজান্তেই হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ‘অনগ্রসর’ মনে করে তা বর্জন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। 

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শেকড় প্রোথিত থাকে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে। কার্ল মার্ক্স বর্ণিত ‘ভিত্তি’ ও ‘উপরি কাঠামো’র সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন কোনো জাতির উৎপাদন পদ্ধতি বদলে যায়, তখন তার সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিও বদলে যেতে বাধ্য। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মেরুদণ্ড ছিল কৃষি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়িত পুঁজিতন্ত্রের যুগে সেই কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে কৃষককে এক অন্তহীন পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে সমাজব্যবস্থা ‘উৎপাদন’ থেকে সরে গিয়ে ‘ভোগবাদে’ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কনজ্যুমারিজমের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে সৃজনশীল উৎপাদক থেকে নিষ্ক্রিয় ক্রেতায় পরিণত করা। আর এই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটে আমাদের উৎসবে; যেখানে নবান্ন বা হালখাতা ছিল মাটির সঙ্গে মানুষের সংযোগ, সেখানে আজ ‘বার্থ ডে ’ বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র মতো কর্পোরেট দিবসগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। 

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসক লর্ড মেকলে ভারতে ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেছিলেন এমন এক ‘বাদামী চামড়ার সাহেব’ শ্রেণী তৈরি করতে, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। আজ কয়েক দশক পরেও আমরা সেই ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এটিই হলো ফ্রাঞ্জ ফ্যানোন বর্ণিত কালো চামড়া ও সাদা মুখোশের সংকট। উপনিবেশবাদ যখন কোনো জাতির ওপর চেপে বসে, তখন সে সেই জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করে তাকে আত্মবিস্মৃত করে তোলে। ফলে অবদমিত মানুষটি মুক্তি বলতে বোঝে শোষকের মতো হওয়াকে। এই মনস্তাত্ত্বিক খাঁচায় বন্দী হওয়ার ফলে আধুনিক বিশ্বে আমরা দেখছি এক ধরনের স্বেচ্ছাধীন দাসত্ব, যেখানে কোনো শেকল দৃশ্যমান নয়, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। 

ভাষার প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো যেমনটা দেখিয়েছেন, কোনো জাতির মনোজগৎকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে আগে তার ভাষাকে উপনিবেশমুক্ত করতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ঘর। যখন কোনো জাতি তার নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান বা উচ্চতর জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিদেশি ভাষার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে আসলে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে এই ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ আরও তীব্রতর হয়েছে। অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে পশ্চিমা মানদণ্ডকেই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, ফলে আমাদের নিজস্ব মিথ, লোকগাথা, লোকসাহিত্য ও গ্রামীণ প্রজ্ঞাগুলো আধুনিক ‘স্মার্ট’ সংস্কৃতির ভিড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। 

বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় আর একটি ভয়াবহ দিক হলো ‘ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন’। এর লক্ষ্য হলো বৈচিত্র্যময় পৃথিবীকে একটি একঘেয়ে একক বাজারে পরিণত করা। এই প্রক্রিয়ায় ছোট জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব পোশাক, আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাস এবং লোকসংগীতকে হয় বিলুপ্ত করা হচ্ছে, নয়তো ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। আজ বাউল গান বা আদিবাসী নৃত্য তার আদি দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে কেবল পর্যটন শিল্পের বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির এই রূপান্তর আসলে এক প্রকার ‘ডি-কালচারাইজেশন’, যেখানে সংস্কৃতি তার যাপিত জীবনের সত্যতা হারিয়ে কেবল প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত হয়। 

এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল হলো ‘অ্যালিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। মানুষ যখন তার নিজের ঐতিহ্যকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন সে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকটে নিমজ্জিত হয়। সে তার নিজের মাটির গন্ধে লজ্জা পায়, নিজের লোকজ ঐতিহ্যকে ‘খেত’ বা ‘অনগ্রসর’ মনে করে ঘৃণা করতে শেখে। এটিই হলো সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়, যেখানে শোষিত নিজেই নিজের সত্তাকে অস্বীকার করে শোষকের প্রতিকৃতি হতে চায়। এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে পশ্চিমা জগত প্রাচ্যের এক কৃত্রিম এবং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে হলে আমাদের ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা পাল্টা বয়ান তৈরি করতে হবে। 

প্রতিরোধের এই লড়াইয়ে হোমি কে ভাবা’র ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরায়ণ তত্ত্বটি আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ যখন তার সংস্কৃতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন আমরা তাকে হুবহু গ্রহণ না করে আমাদের নিজস্ব ছাঁচে রূপান্তর করতে পারি। যেমন, পশ্চিমা বিজ্ঞানকে আমরা বর্জন করব না, বরং তাকে আমাদের গ্রামীণ কৃষি-প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত করব। এই সমন্বয়ই হবে আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। জ্ঞান-উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন আমরা আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেব, তখনই শুরু হবে প্রকৃত বিনির্মাণ। যখন আমরা বিদেশি ব্র্যান্ডের বদলে দেশজ শ্রমের ফসল বেছে নিই, তখন আমরা আসলে বিশ্বপুঁজির শৃঙ্খলকেই আঘাত করি। 

পরিশেষে, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ রুখতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইকে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সাংস্কৃতিক লড়াই মানে হলো নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান বজায় রেখে নিজস্ব মৌলিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনে নিমগ্ন হওয়া। এটিই হলো এই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক সংগ্রাম। আমরা যদি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী করতে পারি, তবেই আমাদের উপরি কাঠামো বা সংস্কৃতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। শিকড়চ্যুত এই উন্নয়ন আসলে এক প্রকার মরূকরণ; তাই মাটির গভীর থেকে রসদ সংগ্রহ করেই আমাদের ডালপালা মেলতে হবে বিশ্বের আকাশে। নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাবোধের মেলবন্ধনেই রচিত হতে পারে উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের প্রকৃত স্বাধীনতার ইশতেহার। এই সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী এবং নিরন্তর, যেখানে প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি উৎসব হবে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ত্রিশাল কারিগরী কলেজ, ময়মনসিংহ]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত