পান্তা- গ্রামীণ বাংলার সকালের খাবার যা পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যের স্মারক| এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অংশ| ‘পান্তা’ প্রত্যয় সাধিত শব্দ; পানি+তা (ভাত) = পান্তা অর্থাৎ পানিতে ভেজানো ভাত বা পানি ভাত| সাধারণত রাতের খাবার শেষে যে অতিরিক্ত ভাত থেকে যায় সেটাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে বিভিন্ন ধরনের গাজনকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ভাতের শর্করা ভেঙে ইথানলওল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে| ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় এবং তখন পচনকারী ব্যাকটেরিয়া আর ভাত নষ্ট করতে পারে না- এজন্যই এটি স্বীকৃত ভাত সংরক্ষণ পদ্ধতি|
সকালে সেই ভাত সাধারণত পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ও লবণসহ খাওয়া হয়| তাছাড়া, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, যেমন: আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, শুটকিভর্তা, ডালভর্তা, মরিচপোড়া, সরিষার তেল, শাক ভাজা, ডালের বড়া, মাছ ভাজা ও তরকারি দিয়ে পান্তা খাওয়া হয়| আবার, পান্তা আর নারকেল, সে এক চমৎকার সমন্বয়! একবার কেউ খেলে বার বার খেতে ইচ্ছা করবে| কখনো আলাদা করে পান্তা ভাতের শুধু জলীয় অংশটুকু যা আমানি নামে পরিচিত - খাওয়া হয়| যেকোনো ধরনের ভাতেই পানি মিশিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করা যায়| তবে, সাধারণত তলাল বা আতপ চালের ভাতের পান্তা স্বাদে এবং পুষ্টিগুণে এগিয়ে| আর ভাত যদি হয় সুগন্ধি চালের, যেমন: বাসমতি, রানী স্যালুট, কাঁচড়া, চিনিগুঁড়া, বাংলামতি বা কালোজিরার, তাহলে তা স্বাদে হয় অনন্য| বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে পান্তা খাওয়ার প্রবণতার ভিন্নতা দেখা যায়, যেমন: বরিশাল অঞ্চলের মানুষ পান্তা বেশি খেয়ে থাকেন| দেশে গরমকালে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন বেশি|
মূলত ভাত যাদের প্রধান খাদ্য, পান্তা তাদের কাছে পরিচিত| বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পান্তা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে| গ্রীষ্মে এসব অঞ্চলে তাপমাত্রাও আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ভাত খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায়| কিন্তু, ভাত যদি পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় তাহলে তা আর নষ্ট হয় না| এভাবেই ভাত সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবেই পান্তা ভাতের প্রচলন|
পান্তা বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু, অন্ধপ্রদেশ ও কেরালায় খাওয়া হয়| তবে, অঞ্চল ভেদে পান্তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়| যেমন: আসামে পান্তা ভাতকে পঁইতা ভাত বা পন্তা ভাত বলে; উড়িষ্যায় বলে পোখালো, আর তামিলনাড়ুতে বলে প্যাযায়সাদাম| তবে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়াতে ও পান্তার মতো খাবারের প্রচলন আছে, যা তৈরির প্রক্রিয়া যেমন ভিন্ন, স্বাদও তেমন ভিন্ন|
পান্তা ভাতের ইতিহাস আনুমানিক দুই হাজার বছরের পুরনো হলেও কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মুঘল আমলে এ খাবারের প্রচলন বাড়ে| সেসময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আগতদর্শক শ্রোতাদেরকে পান্তা খেতে দেয়া হতো| আর বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শহুরে বাঙালি সমাজ বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে পালন শুরু করে| এসব অনুষ্ঠানে পান্তা ভাতই আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু| আর এখন শহুরে সমাজে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াতো হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশে ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলে পান্তা খাওয়ার ধুমপড়ে যায়| আমাদের মনে আছে, বছর পাঁচেক আগে পান্তা ভাতের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলো হয়েছিল| এর বড় কারণ ছিল ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ প্রতিযোগিতা ২০২১| উক্ত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী পান্তা ভাতের মতো একটি অত্যন্ত সাদামাটাও আটপৌরে খাবার পরিবেশন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন| কিশোয়ার ওই প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা ও সার্ডিন মাছ ভাজা উপস্থাপন করে এ পুরস্কার জিতে নেন|
পান্তা ভাত এতই জনপ্রিয় যে যুগে যুগে একে নিয়ে অনেক প্রবাদ-প্রবচন রচিত হয়েছে| এসব প্রবাদ-প্রবচনের কোন কোনটি শক্তি ও সক্ষমতার পরিচায়ক, যেমন:
পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল;
শাশুড়ি নাই, ননদ নাই, কার বা করি ডর,
আগে খাই পান্তা, শেষে লেপি ঘর|
অথবা, বাঁদির কামে জোসনাই, পান্তা ভাত খাস নাই|
আবার, কোন কোনটি আর্থিক সামর্থ্যের ইঙ্গিতবহ| যেমন:
পান্তা ভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি; নুন আনতে পান্তা ফুরায়|
মোটে মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা|
অথবা, মাগা ভাত তার আবার বাসি আর পান্ত|
আবার, কোন কোনটি স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশক| যেমন:
কী কথা বলবো সই, পান্তা ভাতে টক দই| অথবা, কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি|
পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেক বেশি| বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক পৃথক গবেষণায় বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে| গবেষণা লব্ধ ফলাফল বলছে, পান্তা ভাতে (প্রতি ১০০ গ্রাম) আয়রনের পরিমাণ ৩.৪ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম (২২ গুণ), ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৫০মিলিগ্রাম (৪০ গুণ), আর পটাশিয়ামের পরিমাণ ৭৭ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৩৯ মিলিগ্রাম (১১ গুণ) হয়| অন্যদিকে, সোডিয়াম এর পরিমাণ ৪৭৫ মিলিগ্রাম থেকে কমে ৩০৩ মিলি গ্রাম হয়| আর সেজন্যই পান্তা ভাতের স্বাদ কিছুটা পানসে এবং আমরা লবণ মিশিয়ে খেয়ে থাকি| অন্য একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে জিংক এবং ভিটামিন-বি (বি২- রাইবোফ্লাভিন, বি৬- পাইরিডক্সিন, বি১২-সায়ানোকোবালামিন) এর পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়|
তাহলে প্রশ্ন জাগে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ কীভাবে বাড়ে? চাল তথা শস্য জাতীয় সকল খাবারে ফাইটেট নামক অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা খনিজ লবণসমূহ, যেমন: আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক শক্ত বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে| ফলে, আমাদের শরীর এই সমস্ত খনিজ লবণ শোষণ করতে পারে না| কিন্তু ভাতকে যখন কয়েক ঘণ্টা (৮-১২ঘণ্টা) ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয় যার ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়| ফলাফল, ফাইটেটে আবদ্ধ খনিজ লবণসমূহ মুক্ত হয় এবং আমাদের দেহ সহজেই সেগুলো শোষণ করতে পারে| ফলশ্রুতিতে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যায়|
তাছাড়া, পান্তা ভাত শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোলেস্টেরল কমায়, অধিকশক্তিযোগায়, হজমের সহায়তা করে, ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বকের শ্রীবৃদ্ধি করে, পেটের আলসার নিরাময় করে এবং এলার্জি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে| পান্তা ভাত আমাদের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া (সাধারণত দই এ যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়) এর উৎস হিসেবে ও কাজ করে|
তবে, এত সব উপকারিতার সঙ্গে কিছু ক্ষতি কর দিকও বিদ্যমান, যেমন: অনেক সময় তৈরির প্রক্রিয়ার ক্রুটি বা অসাবধানতার কারণে পান্তা ভাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে এবং তার ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ-ব্যাধি হতে পারে| আবার, দীর্ঘক্ষণ (১৮ ঘণ্টার অধিক) ভাত ভিজিয়ে রাখলে অ্যালকোহল তৈরি হয় যা খেলে শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ঘুম ঘুম হতে পারে| আর ও মনে রাখা দরকার যে পান্তা ভাত আর বাসি ভাত এক নয়| রাতের অতিরিক্ত ভাত কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে দিলে সকালে তাকে বাসি ভাত বলে| পান্তা ভাত যেখানে উপাদেয়, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণে অনন্য, বাসি ভাত সেখানে জীবাণুযুক্ত, অস্বাস্থ্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| তাই, পান্তা ভাত আদরনীয় হলে ও বাসি ভাত বর্জনীয়!
পান্তা- বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, আপন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক| গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পান্তা টনিক হিসেবে কাজ করে| যদিও পান্তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, শুধুমাত্র নিকট অতীতে পান্তার এতসব গুণের কথা জানতে পেরেছি আমরা| জয় হোক পান্তার, জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতির!
[লেখক: অধ্যাপক, অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়]

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পান্তা- গ্রামীণ বাংলার সকালের খাবার যা পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যের স্মারক| এটি বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অংশ| ‘পান্তা’ প্রত্যয় সাধিত শব্দ; পানি+তা (ভাত) = পান্তা অর্থাৎ পানিতে ভেজানো ভাত বা পানি ভাত| সাধারণত রাতের খাবার শেষে যে অতিরিক্ত ভাত থেকে যায় সেটাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে বিভিন্ন ধরনের গাজনকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ভাতের শর্করা ভেঙে ইথানলওল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে| ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় এবং তখন পচনকারী ব্যাকটেরিয়া আর ভাত নষ্ট করতে পারে না- এজন্যই এটি স্বীকৃত ভাত সংরক্ষণ পদ্ধতি|
সকালে সেই ভাত সাধারণত পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা ও লবণসহ খাওয়া হয়| তাছাড়া, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, যেমন: আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, শুটকিভর্তা, ডালভর্তা, মরিচপোড়া, সরিষার তেল, শাক ভাজা, ডালের বড়া, মাছ ভাজা ও তরকারি দিয়ে পান্তা খাওয়া হয়| আবার, পান্তা আর নারকেল, সে এক চমৎকার সমন্বয়! একবার কেউ খেলে বার বার খেতে ইচ্ছা করবে| কখনো আলাদা করে পান্তা ভাতের শুধু জলীয় অংশটুকু যা আমানি নামে পরিচিত - খাওয়া হয়| যেকোনো ধরনের ভাতেই পানি মিশিয়ে পান্তা ভাত তৈরি করা যায়| তবে, সাধারণত তলাল বা আতপ চালের ভাতের পান্তা স্বাদে এবং পুষ্টিগুণে এগিয়ে| আর ভাত যদি হয় সুগন্ধি চালের, যেমন: বাসমতি, রানী স্যালুট, কাঁচড়া, চিনিগুঁড়া, বাংলামতি বা কালোজিরার, তাহলে তা স্বাদে হয় অনন্য| বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে পান্তা খাওয়ার প্রবণতার ভিন্নতা দেখা যায়, যেমন: বরিশাল অঞ্চলের মানুষ পান্তা বেশি খেয়ে থাকেন| দেশে গরমকালে অর্থাৎ মার্চ থেকে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন বেশি|
মূলত ভাত যাদের প্রধান খাদ্য, পান্তা তাদের কাছে পরিচিত| বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পান্তা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে| গ্রীষ্মে এসব অঞ্চলে তাপমাত্রাও আর্দ্রতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ভাত খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায়| কিন্তু, ভাত যদি পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় তাহলে তা আর নষ্ট হয় না| এভাবেই ভাত সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবেই পান্তা ভাতের প্রচলন|
পান্তা বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, তামিলনাড়ু, অন্ধপ্রদেশ ও কেরালায় খাওয়া হয়| তবে, অঞ্চল ভেদে পান্তাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়| যেমন: আসামে পান্তা ভাতকে পঁইতা ভাত বা পন্তা ভাত বলে; উড়িষ্যায় বলে পোখালো, আর তামিলনাড়ুতে বলে প্যাযায়সাদাম| তবে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়াতে ও পান্তার মতো খাবারের প্রচলন আছে, যা তৈরির প্রক্রিয়া যেমন ভিন্ন, স্বাদও তেমন ভিন্ন|
পান্তা ভাতের ইতিহাস আনুমানিক দুই হাজার বছরের পুরনো হলেও কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মুঘল আমলে এ খাবারের প্রচলন বাড়ে| সেসময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আগতদর্শক শ্রোতাদেরকে পান্তা খেতে দেয়া হতো| আর বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শহুরে বাঙালি সমাজ বাংলা নববর্ষকে ঘটা করে পালন শুরু করে| এসব অনুষ্ঠানে পান্তা ভাতই আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু| আর এখন শহুরে সমাজে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াতো হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে| উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশে ফুটপাত থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলে পান্তা খাওয়ার ধুমপড়ে যায়| আমাদের মনে আছে, বছর পাঁচেক আগে পান্তা ভাতের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলো হয়েছিল| এর বড় কারণ ছিল ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ প্রতিযোগিতা ২০২১| উক্ত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী পান্তা ভাতের মতো একটি অত্যন্ত সাদামাটাও আটপৌরে খাবার পরিবেশন করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন| কিশোয়ার ওই প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা ও সার্ডিন মাছ ভাজা উপস্থাপন করে এ পুরস্কার জিতে নেন|
পান্তা ভাত এতই জনপ্রিয় যে যুগে যুগে একে নিয়ে অনেক প্রবাদ-প্রবচন রচিত হয়েছে| এসব প্রবাদ-প্রবচনের কোন কোনটি শক্তি ও সক্ষমতার পরিচায়ক, যেমন:
পান্তা ভাতের জল, তিন পুরুষের বল;
শাশুড়ি নাই, ননদ নাই, কার বা করি ডর,
আগে খাই পান্তা, শেষে লেপি ঘর|
অথবা, বাঁদির কামে জোসনাই, পান্তা ভাত খাস নাই|
আবার, কোন কোনটি আর্থিক সামর্থ্যের ইঙ্গিতবহ| যেমন:
পান্তা ভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি; নুন আনতে পান্তা ফুরায়|
মোটে মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা|
অথবা, মাগা ভাত তার আবার বাসি আর পান্ত|
আবার, কোন কোনটি স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশক| যেমন:
কী কথা বলবো সই, পান্তা ভাতে টক দই| অথবা, কিসের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি|
পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেক বেশি| বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক পৃথক গবেষণায় বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে| গবেষণা লব্ধ ফলাফল বলছে, পান্তা ভাতে (প্রতি ১০০ গ্রাম) আয়রনের পরিমাণ ৩.৪ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম (২২ গুণ), ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৫০মিলিগ্রাম (৪০ গুণ), আর পটাশিয়ামের পরিমাণ ৭৭ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে ৮৩৯ মিলিগ্রাম (১১ গুণ) হয়| অন্যদিকে, সোডিয়াম এর পরিমাণ ৪৭৫ মিলিগ্রাম থেকে কমে ৩০৩ মিলি গ্রাম হয়| আর সেজন্যই পান্তা ভাতের স্বাদ কিছুটা পানসে এবং আমরা লবণ মিশিয়ে খেয়ে থাকি| অন্য একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে জিংক এবং ভিটামিন-বি (বি২- রাইবোফ্লাভিন, বি৬- পাইরিডক্সিন, বি১২-সায়ানোকোবালামিন) এর পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়|
তাহলে প্রশ্ন জাগে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ কীভাবে বাড়ে? চাল তথা শস্য জাতীয় সকল খাবারে ফাইটেট নামক অ্যান্টিনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা খনিজ লবণসমূহ, যেমন: আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক শক্ত বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে| ফলে, আমাদের শরীর এই সমস্ত খনিজ লবণ শোষণ করতে পারে না| কিন্তু ভাতকে যখন কয়েক ঘণ্টা (৮-১২ঘণ্টা) ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয় যার ফলে ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়| ফলাফল, ফাইটেটে আবদ্ধ খনিজ লবণসমূহ মুক্ত হয় এবং আমাদের দেহ সহজেই সেগুলো শোষণ করতে পারে| ফলশ্রুতিতে, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সাধারণ ভাতের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যায়|
তাছাড়া, পান্তা ভাত শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোলেস্টেরল কমায়, অধিকশক্তিযোগায়, হজমের সহায়তা করে, ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বকের শ্রীবৃদ্ধি করে, পেটের আলসার নিরাময় করে এবং এলার্জি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে| পান্তা ভাত আমাদের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া (সাধারণত দই এ যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়) এর উৎস হিসেবে ও কাজ করে|
তবে, এত সব উপকারিতার সঙ্গে কিছু ক্ষতি কর দিকও বিদ্যমান, যেমন: অনেক সময় তৈরির প্রক্রিয়ার ক্রুটি বা অসাবধানতার কারণে পান্তা ভাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে এবং তার ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ-ব্যাধি হতে পারে| আবার, দীর্ঘক্ষণ (১৮ ঘণ্টার অধিক) ভাত ভিজিয়ে রাখলে অ্যালকোহল তৈরি হয় যা খেলে শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ঘুম ঘুম হতে পারে| আর ও মনে রাখা দরকার যে পান্তা ভাত আর বাসি ভাত এক নয়| রাতের অতিরিক্ত ভাত কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে দিলে সকালে তাকে বাসি ভাত বলে| পান্তা ভাত যেখানে উপাদেয়, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণে অনন্য, বাসি ভাত সেখানে জীবাণুযুক্ত, অস্বাস্থ্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ| তাই, পান্তা ভাত আদরনীয় হলে ও বাসি ভাত বর্জনীয়!
পান্তা- বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, আপন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক| গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পান্তা টনিক হিসেবে কাজ করে| যদিও পান্তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, শুধুমাত্র নিকট অতীতে পান্তার এতসব গুণের কথা জানতে পেরেছি আমরা| জয় হোক পান্তার, জয় হোক বাঙালি সংস্কৃতির!
[লেখক: অধ্যাপক, অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন