পৃথিবীর নানা দেশে মার্চের শেষে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপিত হয়| এথনিক কালচারের প্রকাশই এখানে মুখ্য| তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নওরোজ’ বা নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়| অঞ্চলভেদে নাম ‘নয়রোজ’ ‘নিউরোজ’ উপলক্ষে তিনদিন/সাতদিনব্যাপী বিশাল মেলা, উৎসব|
আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ| এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের এক অনিন্দ্য সুন্দর মিলনের বার্তা| আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না| সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা নগর বাঙালির হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে|
লেখাটির ভুমিকা অংশেই বাংলাপঞ্জিকা সূচনার গল্প সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপনা না করলে সামগ্রিক আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে| কী ভাবে শুরু হলো বাংলা ও বাঙালির বর্ষ গণনা| ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন| কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না| এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো| খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়| তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে| প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| ধর্মজাতপাত নিয়ে সম্রাট আকবরের কোনও গোঁড়ামি ছিল না, বরং খাঁটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি| ইতিহাস তা-ই বলে|
বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ| বাংলা নববর্ষ নিছক উৎসব নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক| মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই ঐতিহ্য বর্তমানে বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ঐক্যের বার্তা বহন করে| বর্ষবরণ মিলনের এমন এক উৎসব যা ঐক্যের বার্তা বহন করে আসে প্রতি বছর| ওই যে ঐক্যের বার্তা, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ বার্তা দিয়েছেন তার উৎসব নামক প্রবন্ধে| কী বলেছেন রবি ঠাকুর:
“...উৎসব একলার নহে| মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা| একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়|
মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম| তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে| আজ আমাদের কিসের উৎসব? শক্তির উৎসব| মানুষের মধ্যে কী আশ্চর্য শক্তি আশ্চর্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে! আপনার সমস্ত ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করিয়া মানুষ কোন ঊর্ধ্বে গিয়া দাঁড়াইয়াছে| “বাঙালির নববর্ষ তাই আংশিক নহে, এটি সমগ্র|
রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত ঐক্য ও মিলনের দর্শন যুক্ত ও মূর্ত্ত হচ্ছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে| নববর্ষ উদযাপনে আরও যুক্ত হচ্ছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শেকড়| আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে| আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও| ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার| বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি| বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো| ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে| জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা| তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে| বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ|
পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক| গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ| দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে| বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে| এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা| ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে| বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে| নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা|
নববর্ষ আদিম মানব গোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল| নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’| বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য| পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে| বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা| মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র| নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান|
বাংলা নববর্ষ, বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ের ইতিহাস অনন্য| পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নাই বললেই চলে| মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো| বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক| এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন| বাঙালির নববর্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ প্রবল| মূলত এ কারণেই, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় ঐক্য এতো দৃঢ় হয় যেখানে আর কোন দীনতা, পশ্চাতপদতা কাজ করতে পারেনা| বাঙালির জাতীয় জীবুনের বিভেদ, সংকীর্ণতা, অনৈক্য দূর করে জাতীয় শক্তিকে বলিয়ান করতে নববর্ষের মতো উৎসব নিয়ত প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে| আমাদের অন্তর্মূলের শক্তি হলো, শেকড়ে ফিরে যাওয়া| শেকড় থেকে আমরা ঐক্যতান বা কাছে আসার শক্তি সঞ্চয় করি| বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে| লোকজ উৎসব বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়না| প্রান্তিক বাঙালিদের জীবন প্রবাহের শক্তিই বাংলা নববর্ষকে আরও রঙিন আরও উৎসবমুখর করে তুলবে| শুভ নববর্ষ!
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
পৃথিবীর নানা দেশে মার্চের শেষে এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপিত হয়| এথনিক কালচারের প্রকাশই এখানে মুখ্য| তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নওরোজ’ বা নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়| অঞ্চলভেদে নাম ‘নয়রোজ’ ‘নিউরোজ’ উপলক্ষে তিনদিন/সাতদিনব্যাপী বিশাল মেলা, উৎসব|
আমাদের জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ| এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের এক অনিন্দ্য সুন্দর মিলনের বার্তা| আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না| সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা নগর বাঙালির হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে|
লেখাটির ভুমিকা অংশেই বাংলাপঞ্জিকা সূচনার গল্প সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপনা না করলে সামগ্রিক আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে| কী ভাবে শুরু হলো বাংলা ও বাঙালির বর্ষ গণনা| ভারতবর্ষে মুঘল সামাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন| কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না| এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো| খাজনা পরিশোধে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন| ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়| তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে| প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন পরে বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে| ধর্মজাতপাত নিয়ে সম্রাট আকবরের কোনও গোঁড়ামি ছিল না, বরং খাঁটি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন তিনি| ইতিহাস তা-ই বলে|
বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ| বাংলা নববর্ষ নিছক উৎসব নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক শক্তিশালী প্রতীক| মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত এই ঐতিহ্য বর্তমানে বাঙালির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ঐক্যের বার্তা বহন করে| বর্ষবরণ মিলনের এমন এক উৎসব যা ঐক্যের বার্তা বহন করে আসে প্রতি বছর| ওই যে ঐক্যের বার্তা, এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ বার্তা দিয়েছেন তার উৎসব নামক প্রবন্ধে| কী বলেছেন রবি ঠাকুর:
“...উৎসব একলার নহে| মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা| একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়|
মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম| তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে| আজ আমাদের কিসের উৎসব? শক্তির উৎসব| মানুষের মধ্যে কী আশ্চর্য শক্তি আশ্চর্য রূপে প্রকাশ পাইতেছে! আপনার সমস্ত ক্ষুদ্র প্রয়োজনকে অতিক্রম করিয়া মানুষ কোন ঊর্ধ্বে গিয়া দাঁড়াইয়াছে| “বাঙালির নববর্ষ তাই আংশিক নহে, এটি সমগ্র|
রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত ঐক্য ও মিলনের দর্শন যুক্ত ও মূর্ত্ত হচ্ছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনে| নববর্ষ উদযাপনে আরও যুক্ত হচ্ছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, বিপ্লব-বেঁচে থাকা, লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও সংগ্রামের শেকড়| আমাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে পাকিস্তান আমলে| আঘাত এসেছে বাংলাদেশ আমলেও| ষড়যন্ত্র করা হয়েছে ধর্মের নামে ভিনদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার| বাঙালি বীরের জাতি, সেটা মেনে নেয়নি| বাংলা নববর্ষে আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই ঘৃণ্য অপচেষ্টা ভেসে গেছে কচুরিপানার মতো| ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ অনুঘটকের মতো কাজ করেছে| জুগিয়েছে সামনে চলার অনন্ত প্রেরণা| তাই প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ প্রবল শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের সংকল্প নিয়ে হাজির হয় বাংলাদেশে| বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চেতনার চিরন্তন শিখা বাংলা নববর্ষ|
পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক| গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ| দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে| বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে| এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা| ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে| বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে| নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা|
নববর্ষ আদিম মানব গোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল| নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’| বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য| পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে| বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা| মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র| নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান|
বাংলা নববর্ষ, বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ের ইতিহাস অনন্য| পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নাই বললেই চলে| মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো| বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক| এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন| বাঙালির নববর্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অনুষঙ্গ প্রবল| মূলত এ কারণেই, বাংলা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় ঐক্য এতো দৃঢ় হয় যেখানে আর কোন দীনতা, পশ্চাতপদতা কাজ করতে পারেনা| বাঙালির জাতীয় জীবুনের বিভেদ, সংকীর্ণতা, অনৈক্য দূর করে জাতীয় শক্তিকে বলিয়ান করতে নববর্ষের মতো উৎসব নিয়ত প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে| আমাদের অন্তর্মূলের শক্তি হলো, শেকড়ে ফিরে যাওয়া| শেকড় থেকে আমরা ঐক্যতান বা কাছে আসার শক্তি সঞ্চয় করি| বাংলা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে| লোকজ উৎসব বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়না| প্রান্তিক বাঙালিদের জীবন প্রবাহের শক্তিই বাংলা নববর্ষকে আরও রঙিন আরও উৎসবমুখর করে তুলবে| শুভ নববর্ষ!
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন