রাত সাড়ে ৯টা। গ্রামের নিস্তব্ধ রাস্তা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ভ্যান। জ্বলছে চার্জার লাইট। কিন্তু ভ্যানচালক নেই। কয়েক গজ দূরে ধানক্ষেতের কোণায় পড়ে আছে একটি ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। যেন থেমে গেছে এক চালকের শেষযাত্রা।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের ব্যাশপুর রাস্তার জিয়া শিমুলিয়া নামক স্থানে গত ৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটে যাওয়া এই রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে পাঁচ দিনে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা থেকে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে হত্যার নাটকীয় রহস্য।
ঘটনার রাতে স্থানীয় লোকজন প্রথমে দেখেন, রাস্তার পাশে একটি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। এর চার্জার লাইট জ্বলছে। কিন্তু আশপাশে কেউ নেই। কয়েক গজ দূরেই ধানক্ষেতে পড়ে আছে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত।
নিহতের নাম মিঠু হোসেন (৪০)। তিনি আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকণ্ঠপুর (উত্তরপাড়া) গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে। পেশায় ভ্যানচালক।
প্রতিদিনের মতো বুধবারও ভ্যান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মিঠু। কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর আগেই থামলো তার চাকা। ঘটনাস্থলে তার ব্যবহৃত চার্জার ভ্যানটি অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। ভ্যানের আলো জ্বলছিল। কিন্তু তাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ছিল না।
প্রথমে এলাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়। কে এই খুনি? কেনই বা নৃশংস হত্যাকাণ্ড? ভ্যান তো লুট হয়নি, আলো জ্বলছিল। অর্থের লোভে হত্যা নয় তাহলে? নাকি কোনো পূর্বশত্রুতা?
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। নিহতের পরিবার বদলগাছী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশনায় বদলগাছী থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়।
তদন্তকারীরা আশপাশের আলামত সংগ্রহ করেন। ভ্যানচালকের মোবাইল ফোনের কল লিস্ট ও লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। একপর্যায়ে সন্দেহের তীর যায় আধাইপুর ইউনিয়নের পাত্ররাবাড়ি গ্রামের লুৎফর রহমান বাবুর ছেলে রিফাত হোসেনের (২০) দিকে।
তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে জানা যায়, হত্যার পরপরই রিফাত বদলগাছী থেকে নওগাঁ, সেখান থেকে রাজশাহী এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার আশুলিয়ায় পালিয়ে যায়। সেখানে সে আত্মগোপনে রয়েছে।
গত ১৩ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অসিত কুমার পালসহ পুলিশের একটি দল। ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে আশুলিয়া থানাধীন কুড়গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
রিফাত পুলিশকে জানায়, ঘটনার দিন রাতে সে মিঠুর ভ্যানে চড়ে বাড়ি যাচ্ছিল। মিঠু ভ্যান চালাচ্ছিলেন, আর রিফাত পেছনে বসা ছিল। পথে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই ঝগড়া চরমে ওঠে।
একপর্যায়ে রিফাত মিঠুকে ভ্যান থেকে ফেলে দেয়। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ঘাড়, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে পালিয়ে যায়। খুনের পর সে বদলগাছী ছেড়ে নওগাঁ, তারপর রাজশাহী হয়ে ঢাকায় চলে যায়।
বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।’আসামিকে আদালতের মাধ্যমে নওগাঁ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন ও মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে।’
তবে হত্যার কারণ এখন পর্যন্ত পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পূর্বশত্রুতা বা বাকবিতণ্ডাই আসল কারণ? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে? ভ্যানটি অক্ষত রেখে খুনি কেন পালালো? জ্বলন্ত আলো কি কোনো ইঙ্গিত ছিল?
আসামির আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুরো রহস্য উদঘাটন হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
রাত সাড়ে ৯টা। গ্রামের নিস্তব্ধ রাস্তা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ভ্যান। জ্বলছে চার্জার লাইট। কিন্তু ভ্যানচালক নেই। কয়েক গজ দূরে ধানক্ষেতের কোণায় পড়ে আছে একটি ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। যেন থেমে গেছে এক চালকের শেষযাত্রা।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের ব্যাশপুর রাস্তার জিয়া শিমুলিয়া নামক স্থানে গত ৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটে যাওয়া এই রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে পাঁচ দিনে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা থেকে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে হত্যার নাটকীয় রহস্য।
ঘটনার রাতে স্থানীয় লোকজন প্রথমে দেখেন, রাস্তার পাশে একটি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। এর চার্জার লাইট জ্বলছে। কিন্তু আশপাশে কেউ নেই। কয়েক গজ দূরেই ধানক্ষেতে পড়ে আছে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত।
নিহতের নাম মিঠু হোসেন (৪০)। তিনি আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকণ্ঠপুর (উত্তরপাড়া) গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে। পেশায় ভ্যানচালক।
প্রতিদিনের মতো বুধবারও ভ্যান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মিঠু। কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর আগেই থামলো তার চাকা। ঘটনাস্থলে তার ব্যবহৃত চার্জার ভ্যানটি অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। ভ্যানের আলো জ্বলছিল। কিন্তু তাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ছিল না।
প্রথমে এলাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়। কে এই খুনি? কেনই বা নৃশংস হত্যাকাণ্ড? ভ্যান তো লুট হয়নি, আলো জ্বলছিল। অর্থের লোভে হত্যা নয় তাহলে? নাকি কোনো পূর্বশত্রুতা?
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। নিহতের পরিবার বদলগাছী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশনায় বদলগাছী থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়।
তদন্তকারীরা আশপাশের আলামত সংগ্রহ করেন। ভ্যানচালকের মোবাইল ফোনের কল লিস্ট ও লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। একপর্যায়ে সন্দেহের তীর যায় আধাইপুর ইউনিয়নের পাত্ররাবাড়ি গ্রামের লুৎফর রহমান বাবুর ছেলে রিফাত হোসেনের (২০) দিকে।
তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে জানা যায়, হত্যার পরপরই রিফাত বদলগাছী থেকে নওগাঁ, সেখান থেকে রাজশাহী এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার আশুলিয়ায় পালিয়ে যায়। সেখানে সে আত্মগোপনে রয়েছে।
গত ১৩ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অসিত কুমার পালসহ পুলিশের একটি দল। ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে আশুলিয়া থানাধীন কুড়গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
রিফাত পুলিশকে জানায়, ঘটনার দিন রাতে সে মিঠুর ভ্যানে চড়ে বাড়ি যাচ্ছিল। মিঠু ভ্যান চালাচ্ছিলেন, আর রিফাত পেছনে বসা ছিল। পথে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই ঝগড়া চরমে ওঠে।
একপর্যায়ে রিফাত মিঠুকে ভ্যান থেকে ফেলে দেয়। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ঘাড়, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে পালিয়ে যায়। খুনের পর সে বদলগাছী ছেড়ে নওগাঁ, তারপর রাজশাহী হয়ে ঢাকায় চলে যায়।
বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।’আসামিকে আদালতের মাধ্যমে নওগাঁ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন ও মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে।’
তবে হত্যার কারণ এখন পর্যন্ত পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পূর্বশত্রুতা বা বাকবিতণ্ডাই আসল কারণ? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে? ভ্যানটি অক্ষত রেখে খুনি কেন পালালো? জ্বলন্ত আলো কি কোনো ইঙ্গিত ছিল?
আসামির আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুরো রহস্য উদঘাটন হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আপনার মতামত লিখুন