সংবাদ

ভাসানীর ধানের শীষ যেভাবে পেয়েছিল বিএনপি


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

ভাসানীর ধানের শীষ যেভাবে পেয়েছিল বিএনপি
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান আমলে ভাসানী ন্যাপের প্রতীক ছিল ধানের শীষ। যা পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। সেই প্রতীকের উৎপত্তি ও রূপান্তরের কাহিনি নিয়েই বরাবরই রয়েছে নানা বিতর্ক ও কৌতূহল। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগ ত্যাগ করে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের পক্ষের এই দলের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রতীকের, যা হবে সরল, জনবান্ধব ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য।

পছন্দটা গিয়ে পড়ে ধানের শীষের ওপর। কৃষকের সোনালি ফসল, বাংলার চিরচেনা ধানের শীষ- এটাই হয়ে ওঠে ভাসানীর ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক। কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও অধিকারের প্রতীক হিসেবে ভাসানী এই প্রতীকটি বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্তির পর ভাসানীর নেতৃত্বাধীন অংশ ধানের শীষ প্রতীক ধরে রাখে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই প্রতীক নিয়ে লড়াই করে ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানী মৃত্যুবরণ করলে ন্যাপের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেয় ।

এরই মধ্যে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে ভাসানীর ন্যাপের একটি বড় অংশ এতে যোগ দেয়। নেতৃত্ব দেন ন্যাপের তৎকালীন মহাসচিব মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তারাই সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ধানের শীষ প্রতীকটি।

রাজনৈতিক গবেষকরা বলেছেন, 'ভাসানী ন্যাপের বড় অংশ যখন মশিউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিতে মিশে যায়, তখন বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নেয়। জিয়াউর রহমান হয়তো তখন ধানের শীষ পছন্দ করেছিলেন'।

বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি করলেন, তখন তার মনে হয়েছে নৌকার মতো তাকেও একটি সর্বজনীন প্রতীক বেছে নিতে হবে। সে জন্য নৌকার মতো ধানের ছড়াকে বেছে নিলেন। তবে ধান না নিয়ে ধানের শীষ বেছে নেন। ধানের শীষের মধ্যে একটি কাব্যিব ভাব থাকে'।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করা হয় ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দেশের দ্বিতীয় এই সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপির প্রতীক ছিল এটি ।

বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দলটি গঠনের পর থেকে ভাসানীর প্রতীকটি তারা ব্যবহার করতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত আছে- ধানের শীষে বিএনপির অহংকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জনসভায় দাবি করেন, ‘১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন- তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম’।

তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। মওলানা ভাসানী মারা যান ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর। সে হিসাবে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে সরাসরি প্রতীক তুলে দেওয়ার সুযোগ ছিল না তার। বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ১৯৭৬ সালের নভেম্বরেই ভাসানীর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সমালোচকেরা বলছেন, তারেক রহমানের বক্তব্য ‘প্রতীকী অর্থে’ বলা হয়ে থাকতে পারে- ভাসানীর আদর্শ ও পথ অনুসরণ করায় জিয়া যেন তার ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকার’ পেয়েছেন, সেই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে আবদুল কাদের সিদ্দিকী ২০১৮ সালের এক নির্বাচনী সমাবেশে অনুরূপ দাবি করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।

ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, প্রতীকটি বিএনপিতে আসে মূলত দলীয় সমন্বয় ও নেতা-কর্মীদের যোগদানের মধ্য দিয়ে। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের বড় অংশ বিএনপিতে মিশে গেলে তারাই তাদের পুরনো প্রতীকটি নিয়ে আসেন। জিয়াউর রহমান সেটি গ্রহণ করেন।

মওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমান

প্রত্যক্ষ ‘হস্তান্তর’ না হলেও, ভাসানীর আদর্শ ও ন্যাপের রাজনৈতিক সত্তার উত্তরাধিকার হিসেবে ধানের শীষ বিএনপির হাতে আসে- এটাই বাস্তব চিত্র।

ধানের শীষের হস্তান্তরের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আয়না। কৃষকের সোনালি ফসল থেকে শুরু করে বামপন্থী দলের প্রতীক, পরে বিএনপির জাতীয় প্রতীক- এই পথপরিক্রমা যেমন দলীয় সমীকরণের, তেমনি প্রতীক রাজনীতিরও এক অনন্য দলিল।

মওলানা ভাসানীর স্বপ্নের ধানের শীষ আজ বিএনপির হাতে। কে কখন কার হাতে সেটি তুলে দিয়েছেন, সেই বিতর্ক ইতিহাসের পাতায় হয়তো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। তবে এটুকু নিশ্চিত- ধানের শীষ এখন গণমানুষের দলের প্রতীক, আর সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

প্রসঙ্গত, মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । তিনি ‘মজলুম জননেতা’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


ভাসানীর ধানের শীষ যেভাবে পেয়েছিল বিএনপি

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পাকিস্তান আমলে ভাসানী ন্যাপের প্রতীক ছিল ধানের শীষ। যা পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। সেই প্রতীকের উৎপত্তি ও রূপান্তরের কাহিনি নিয়েই বরাবরই রয়েছে নানা বিতর্ক ও কৌতূহল। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগ ত্যাগ করে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের পক্ষের এই দলের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি প্রতীকের, যা হবে সরল, জনবান্ধব ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য।

পছন্দটা গিয়ে পড়ে ধানের শীষের ওপর। কৃষকের সোনালি ফসল, বাংলার চিরচেনা ধানের শীষ- এটাই হয়ে ওঠে ভাসানীর ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক। কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও অধিকারের প্রতীক হিসেবে ভাসানী এই প্রতীকটি বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্তির পর ভাসানীর নেতৃত্বাধীন অংশ ধানের শীষ প্রতীক ধরে রাখে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই প্রতীক নিয়ে লড়াই করে ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানী মৃত্যুবরণ করলে ন্যাপের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেয় ।

এরই মধ্যে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে ভাসানীর ন্যাপের একটি বড় অংশ এতে যোগ দেয়। নেতৃত্ব দেন ন্যাপের তৎকালীন মহাসচিব মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তারাই সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ধানের শীষ প্রতীকটি।

রাজনৈতিক গবেষকরা বলেছেন, 'ভাসানী ন্যাপের বড় অংশ যখন মশিউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিতে মিশে যায়, তখন বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নেয়। জিয়াউর রহমান হয়তো তখন ধানের শীষ পছন্দ করেছিলেন'।

বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি করলেন, তখন তার মনে হয়েছে নৌকার মতো তাকেও একটি সর্বজনীন প্রতীক বেছে নিতে হবে। সে জন্য নৌকার মতো ধানের ছড়াকে বেছে নিলেন। তবে ধান না নিয়ে ধানের শীষ বেছে নেন। ধানের শীষের মধ্যে একটি কাব্যিব ভাব থাকে'।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করা হয় ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। দেশের দ্বিতীয় এই সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপির প্রতীক ছিল এটি ।

বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দলটি গঠনের পর থেকে ভাসানীর প্রতীকটি তারা ব্যবহার করতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত আছে- ধানের শীষে বিএনপির অহংকার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জনসভায় দাবি করেন, ‘১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন- তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম’।

তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। মওলানা ভাসানী মারা যান ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর। সে হিসাবে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে সরাসরি প্রতীক তুলে দেওয়ার সুযোগ ছিল না তার। বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ১৯৭৬ সালের নভেম্বরেই ভাসানীর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সমালোচকেরা বলছেন, তারেক রহমানের বক্তব্য ‘প্রতীকী অর্থে’ বলা হয়ে থাকতে পারে- ভাসানীর আদর্শ ও পথ অনুসরণ করায় জিয়া যেন তার ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকার’ পেয়েছেন, সেই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে আবদুল কাদের সিদ্দিকী ২০১৮ সালের এক নির্বাচনী সমাবেশে অনুরূপ দাবি করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।

ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, প্রতীকটি বিএনপিতে আসে মূলত দলীয় সমন্বয় ও নেতা-কর্মীদের যোগদানের মধ্য দিয়ে। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের বড় অংশ বিএনপিতে মিশে গেলে তারাই তাদের পুরনো প্রতীকটি নিয়ে আসেন। জিয়াউর রহমান সেটি গ্রহণ করেন।

মওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমান

প্রত্যক্ষ ‘হস্তান্তর’ না হলেও, ভাসানীর আদর্শ ও ন্যাপের রাজনৈতিক সত্তার উত্তরাধিকার হিসেবে ধানের শীষ বিএনপির হাতে আসে- এটাই বাস্তব চিত্র।

ধানের শীষের হস্তান্তরের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আয়না। কৃষকের সোনালি ফসল থেকে শুরু করে বামপন্থী দলের প্রতীক, পরে বিএনপির জাতীয় প্রতীক- এই পথপরিক্রমা যেমন দলীয় সমীকরণের, তেমনি প্রতীক রাজনীতিরও এক অনন্য দলিল।

মওলানা ভাসানীর স্বপ্নের ধানের শীষ আজ বিএনপির হাতে। কে কখন কার হাতে সেটি তুলে দিয়েছেন, সেই বিতর্ক ইতিহাসের পাতায় হয়তো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। তবে এটুকু নিশ্চিত- ধানের শীষ এখন গণমানুষের দলের প্রতীক, আর সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

প্রসঙ্গত, মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । তিনি ‘মজলুম জননেতা’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত