সংবাদ

শিকাগোর ইটভাটা আর টোকিওর টাওয়ারের ফারাক কী?


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১ মে ২০২৬, ০১:১৯ এএম

শিকাগোর ইটভাটা আর টোকিওর টাওয়ারের ফারাক কী?
অফিসের দিকে ছুটে চলছে মানসিক শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

১৮৮৬ সালে শ্রমিকেরা মরেছিল আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে। আজকের ‘হোয়াইট কলার’ কর্মী মরছেন দশ ঘণ্টার চেয়েও বেশি- অফিস চেয়ারেই। তাহলে শিকাগোর ইটভাটা আর টোকিওর টাওয়ারের মধ্যে ফারাক কোথায়? ইতিহাস কি সত্যিই পূর্ণ বৃত্তে এসে দাঁড়িয়েছে?

জাপানের টোকিওর করপোরেট অফিসের ছবিতে কী দেখি? গভীর রাতেও সেখানে জ্বলছে আলো। ক্লান্ত কর্মকর্তারা চেয়ারে হেলান দিয়ে, চোখ বুজে বসে থাকেন। কেউ কেউ লিখে যান, ‘ওভারওয়ার্কড, অফিসেই চিরবিদায়।

শিকাগোর যে লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে, সেটা সত্যিই ইতিহাসের মাইলফলক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই ওই জয়কে ধরে রাখতে পেরেছি?

১৩৯ বছর আগে শ্রমিকরা ইটভাটা আর গোলাবারুদ কারখানায় কাজ করতেন। আজ আমরা বসে আছি এয়ারকন্ডিশন্ড অফিসে। কায়িক পরিশ্রম অনেক কমেছে, বেড়েছে মানসিক চাপ। 

স্বামী-সন্তান, বাবা-মায়ের জন্য নয়- বরং ‘ডেডলাইন’, ‘কেপিআই’, ‘টার্গেট’ এসব শব্দের পেছনে ছুটছি আমরা। ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, খাওয়া-দাওয়া অনিয়মিত। শরীর আছে কিন্তু কর্মশক্তি নেই; মন আছে কিন্তু সেখানেও নেই স্বস্তি।

জাপানকে বলা হয় ‘করপোরেট যোদ্ধাদের দেশ’। ‘কারোশি’ শব্দটি জাপানি- অর্থ ‘অতিরিক্ত পরিশ্রমে মৃত্যু’। সরকারি হিসেব বলছে, প্রতি বছর হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতে গিয়ে মারা যান জাপানে। আর যারা বাঁচেন, তাদের অনেকেরই আছে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, বিষণ্ণতায়।

ঐতিহাসিকভাবে জাপান কে হয়ে উঠেছি পৃথিবীর সবচেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ দেশ। অর্থনৈতিক উন্নতি, প্রযুক্তি আর বিলাসিতার এত ছড়াছড়িতেও মানুষরা বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পায় না কেন?

টোকিওর কোনো অফিসে চোখ রাখুন। রাত ১২টায়ও অর্ধেকের বেশি লাইট জ্বলতে দেখবেন। সেখানকার তরুণ প্রজন্ম বলছে, ‘আমরা বাঁচতে এসেছি, কেবল কাজ করতে নয়।’ কিন্তু তবুও প্রতিযোগিতার নামে, পদোন্নতির আশায়, অথবা বসের চোখরাঙানির ভয়ে তারা থামতে পারেন না।

আমরা এখনও বলতে পারি, এ দেশের মানসিক শ্রমের বাজার ‘বিকাশশীল’ পর্যায়ে। আইটি সেক্টর দেখুন, ব্যাংক ম্যানেজার দেখুন, বারো- চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করাটা ‘স্বাভাবিক’। শরীর খারাপের ছুটি? বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে বলে দেওয়া হয়, ‘এখন প্রোজেক্ট চলছে।’ 

একাধিক এনজিও ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে মানসিক শ্রমজীবীদের অনেকেই ভুগছেন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অবসাদ ও মাইগ্রেনে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের অফিস আর বাড়ির চাপ সামলাতে গিয়ে অবস্থা আরও সঙ্কটাপন্ন।

শিকাগোর ইটভাটায় ঠোঁটফাটা শ্রমিকের হাতে ছিল পিকহ্যান্ডেল। অফিস চেয়ারে বসা তরুণ-তরুণীর হাতে মাউস আর কিবোর্ড। দুজনের কাজের ধরন আলাদা, কিন্তু অস্বস্তি, ক্লান্তি আর অধিকার বঞ্চনার চিত্র অনেকটা একই। 

একটা বড় সমস্যা হলো, মানসিক শ্রমের ‘ক্ষয়ক্ষতি’ চোখে দেখা যায় না। কায়িক ক্লান্তি দেখা যায়, অফিসের মানসিক জ্বালাপোড়া দেখা যায় না- ফলে অসুস্থ ব্যক্তিকে বোঝানো কঠিন।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ এবং ‘ওয়ার্ক–লাইফ ব্যালান্স’-এর কথা বলি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের কাঠামো প্রায় নেই। বরং দীর্ঘ সময় কাজ করাটাকেই ‘নিষ্ঠা’ ও ‘ইমপ্যাক্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে যায়।

আমাদের সমাজে এখনই সংস্কার দরকার। মানসিক শ্রমিকের জন্য পরিষ্কার আইন, কাজের সময়ের সীমা, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং আর নিয়মিত ‘অফ–ডে’ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কৃতিতে বদল চাই: ‘অফিস ফুরোলেই শেষ, সেটা খাওয়া–ঘুমানোর সময় নয় বরং নিজের সময়’- এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা চাই।

কিছু প্রতিষ্ঠান এখন ‘মেন্টাল হেলথের ছুটি’ চালু করেছে, অনেকে ‘ফ্লেক্সি টাইম’ দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসবকে ‘মূলধারা’য় আনতে প্রয়োজন জনসচেতনতা, শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আর আইনানুগ বাধ্যবাধকতা।

কায়িক শ্রম

শিকাগোর ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, আন্দোলনের মাধ্যমেই অধিকার আসে। আজকের মে দিবস শুধু স্পিচ আর শুভেচ্ছাবাণীতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানসিক শ্রমিকদের জন্যও সমান অধিকার আদায়ের নতুন সূচনা হোক। 

কারণ অফিসের কেয়ারিকুলাম মৃত্যু (ডেথ এডুকেশন), বিষণ্ণতা, উদ্বেগ- এ তো সেই শিকাগো থেকেও ভয়ংকর; সেখানে কমপক্ষে একটা ছুটি ছিল মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার আগ অবধি? নাকি আর সেটাও না?

এখন সময় এসেছে ‘মানসিক শ্রমের ইসিবি’ (মানসিক শ্রমের পুঞ্জীভূত ক্ষয়ক্ষতি) নামক অলিখিত নোটিস থেকে বের হয়ে আসার। মে দিবসের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘নতুন প্রভাত’ যেন সকলের জন্য ফিরে আসে- পোশাকশ্রমিকের যেমন, তেমনি কিবোর্ড আর মাউসধারী কর্মীর জন্যও

১৮৮৬ সালের ১ মে জনৈক শ্রমিক হয়তো নিজের শিশুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?’ আজ সেই প্রশ্ন হয়তো আমাদেরই উত্তর দেওয়ার পালা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬


শিকাগোর ইটভাটা আর টোকিওর টাওয়ারের ফারাক কী?

প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬

featured Image

১৮৮৬ সালে শ্রমিকেরা মরেছিল আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে। আজকের ‘হোয়াইট কলার’ কর্মী মরছেন দশ ঘণ্টার চেয়েও বেশি- অফিস চেয়ারেই। তাহলে শিকাগোর ইটভাটা আর টোকিওর টাওয়ারের মধ্যে ফারাক কোথায়? ইতিহাস কি সত্যিই পূর্ণ বৃত্তে এসে দাঁড়িয়েছে?

জাপানের টোকিওর করপোরেট অফিসের ছবিতে কী দেখি? গভীর রাতেও সেখানে জ্বলছে আলো। ক্লান্ত কর্মকর্তারা চেয়ারে হেলান দিয়ে, চোখ বুজে বসে থাকেন। কেউ কেউ লিখে যান, ‘ওভারওয়ার্কড, অফিসেই চিরবিদায়।

শিকাগোর যে লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে, সেটা সত্যিই ইতিহাসের মাইলফলক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই ওই জয়কে ধরে রাখতে পেরেছি?

১৩৯ বছর আগে শ্রমিকরা ইটভাটা আর গোলাবারুদ কারখানায় কাজ করতেন। আজ আমরা বসে আছি এয়ারকন্ডিশন্ড অফিসে। কায়িক পরিশ্রম অনেক কমেছে, বেড়েছে মানসিক চাপ। 

স্বামী-সন্তান, বাবা-মায়ের জন্য নয়- বরং ‘ডেডলাইন’, ‘কেপিআই’, ‘টার্গেট’ এসব শব্দের পেছনে ছুটছি আমরা। ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, খাওয়া-দাওয়া অনিয়মিত। শরীর আছে কিন্তু কর্মশক্তি নেই; মন আছে কিন্তু সেখানেও নেই স্বস্তি।

জাপানকে বলা হয় ‘করপোরেট যোদ্ধাদের দেশ’। ‘কারোশি’ শব্দটি জাপানি- অর্থ ‘অতিরিক্ত পরিশ্রমে মৃত্যু’। সরকারি হিসেব বলছে, প্রতি বছর হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতে গিয়ে মারা যান জাপানে। আর যারা বাঁচেন, তাদের অনেকেরই আছে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, বিষণ্ণতায়।

ঐতিহাসিকভাবে জাপান কে হয়ে উঠেছি পৃথিবীর সবচেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ দেশ। অর্থনৈতিক উন্নতি, প্রযুক্তি আর বিলাসিতার এত ছড়াছড়িতেও মানুষরা বেঁচে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পায় না কেন?

টোকিওর কোনো অফিসে চোখ রাখুন। রাত ১২টায়ও অর্ধেকের বেশি লাইট জ্বলতে দেখবেন। সেখানকার তরুণ প্রজন্ম বলছে, ‘আমরা বাঁচতে এসেছি, কেবল কাজ করতে নয়।’ কিন্তু তবুও প্রতিযোগিতার নামে, পদোন্নতির আশায়, অথবা বসের চোখরাঙানির ভয়ে তারা থামতে পারেন না।

আমরা এখনও বলতে পারি, এ দেশের মানসিক শ্রমের বাজার ‘বিকাশশীল’ পর্যায়ে। আইটি সেক্টর দেখুন, ব্যাংক ম্যানেজার দেখুন, বারো- চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করাটা ‘স্বাভাবিক’। শরীর খারাপের ছুটি? বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে বলে দেওয়া হয়, ‘এখন প্রোজেক্ট চলছে।’ 

একাধিক এনজিও ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে মানসিক শ্রমজীবীদের অনেকেই ভুগছেন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অবসাদ ও মাইগ্রেনে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের অফিস আর বাড়ির চাপ সামলাতে গিয়ে অবস্থা আরও সঙ্কটাপন্ন।

শিকাগোর ইটভাটায় ঠোঁটফাটা শ্রমিকের হাতে ছিল পিকহ্যান্ডেল। অফিস চেয়ারে বসা তরুণ-তরুণীর হাতে মাউস আর কিবোর্ড। দুজনের কাজের ধরন আলাদা, কিন্তু অস্বস্তি, ক্লান্তি আর অধিকার বঞ্চনার চিত্র অনেকটা একই। 

একটা বড় সমস্যা হলো, মানসিক শ্রমের ‘ক্ষয়ক্ষতি’ চোখে দেখা যায় না। কায়িক ক্লান্তি দেখা যায়, অফিসের মানসিক জ্বালাপোড়া দেখা যায় না- ফলে অসুস্থ ব্যক্তিকে বোঝানো কঠিন।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ এবং ‘ওয়ার্ক–লাইফ ব্যালান্স’-এর কথা বলি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের কাঠামো প্রায় নেই। বরং দীর্ঘ সময় কাজ করাটাকেই ‘নিষ্ঠা’ ও ‘ইমপ্যাক্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে যায়।

আমাদের সমাজে এখনই সংস্কার দরকার। মানসিক শ্রমিকের জন্য পরিষ্কার আইন, কাজের সময়ের সীমা, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং আর নিয়মিত ‘অফ–ডে’ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কৃতিতে বদল চাই: ‘অফিস ফুরোলেই শেষ, সেটা খাওয়া–ঘুমানোর সময় নয় বরং নিজের সময়’- এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা চাই।

কিছু প্রতিষ্ঠান এখন ‘মেন্টাল হেলথের ছুটি’ চালু করেছে, অনেকে ‘ফ্লেক্সি টাইম’ দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসবকে ‘মূলধারা’য় আনতে প্রয়োজন জনসচেতনতা, শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আর আইনানুগ বাধ্যবাধকতা।

কায়িক শ্রম

শিকাগোর ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, আন্দোলনের মাধ্যমেই অধিকার আসে। আজকের মে দিবস শুধু স্পিচ আর শুভেচ্ছাবাণীতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানসিক শ্রমিকদের জন্যও সমান অধিকার আদায়ের নতুন সূচনা হোক। 

কারণ অফিসের কেয়ারিকুলাম মৃত্যু (ডেথ এডুকেশন), বিষণ্ণতা, উদ্বেগ- এ তো সেই শিকাগো থেকেও ভয়ংকর; সেখানে কমপক্ষে একটা ছুটি ছিল মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার আগ অবধি? নাকি আর সেটাও না?

এখন সময় এসেছে ‘মানসিক শ্রমের ইসিবি’ (মানসিক শ্রমের পুঞ্জীভূত ক্ষয়ক্ষতি) নামক অলিখিত নোটিস থেকে বের হয়ে আসার। মে দিবসের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘নতুন প্রভাত’ যেন সকলের জন্য ফিরে আসে- পোশাকশ্রমিকের যেমন, তেমনি কিবোর্ড আর মাউসধারী কর্মীর জন্যও

১৮৮৬ সালের ১ মে জনৈক শ্রমিক হয়তো নিজের শিশুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?’ আজ সেই প্রশ্ন হয়তো আমাদেরই উত্তর দেওয়ার পালা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত