কদিন ধরে টানা বৃষ্টি আর সীমান্ত দিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি জায়গায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে আধা পাকা ও পাকা ধান। এতে ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক। সারাবছরের খোরাক হারিয়ে জেলার হাওরজুড়ে এখন কৃষকের হাহাকার।
জামালগঞ্জ উপজেলার কৃষক আজগর আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধারদেনা করে এক ফসলি জমিতে আবাদ করেছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল। এখন পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’
শাল্লা উপজেলার আরেক কৃষক জানান, অনেক কষ্টে কিছু ধান কেটে বাড়িতে আনলেও রোদের অভাবে শুকাতে পারছেন না। ভেজা ধানে চারা গজিয়ে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। গবাদিপশুর খড়ও ভেসে গেছে বন্যায়। খাদ্যের অভাবে অনেকে পশু বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের বড় গৃহস্থ আব্দুল গফুর ২২ জন সদস্যের পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। আড়াই লাখ টাকা খরচ করে আবাদ করা ধান এখন পানির নিচে।
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের কৃষক আনিসুর রহমান জানান, শ্রমিক সংকটে অর্ধেক ধান কাটার পর বৃষ্টির কারণে তাও নষ্ট হওয়ার পথে। তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন হাওরেও একই চিত্র।
এদিকে ধান কাটার শ্রমিক সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসন গত ২৯ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত জেলার সব বালু-পাথর মহাল ও শুল্ক স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। শ্রমিকদের হাওরে ধান কাটায় অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলায় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ধান কাটায় সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, জলাবদ্ধতায় এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৯৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। জেলায় এবার ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরে ৬২ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তিনি আরও জানান, ধান শুকানোর জন্য জেলার ১০টি ড্রায়ার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান ধান শুকানোর জন্য জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদ ভবন উন্মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তিন মাসের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, নদী ভরাট হওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণেই এই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হলেও অনেক জায়গায় তা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
কৃষকেরা আরও জানান, বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় তারা বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন। এক মণ ধান ফলাতে যেখানে ১ হাজার ২০০ টাকার মতো খরচ হচ্ছে, বাজারে সেই ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০-৮০০ টাকায়। ফলে ফসল রক্ষা করতে পারলেও খরচের টাকা তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
আপনার মতামত লিখুন