সংবাদ

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ মাত্র ২.৩ ভাগ


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ৬ মে ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ মাত্র ২.৩ ভাগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ।

গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মুখে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চাহিদা না বাড়ায়, বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

‘ফস্টারিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চ মূল্য এবং মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার মূল্য ৫৯.৭ শতাংম কমে যাওয়া এবং তেলের মূল্য নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় কমেনি।

আইইইএফএ জ্বালানি বাজার, প্রবণতা ও নীতিমালা সম্পর্কিত বিষয় বিশ্লেষণ করে। সংস্থাটির লক্ষ্য একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই ও লাভজনক জ্বালানি অর্থনীতিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা।

প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএ এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা (০.০৭৭ ডলার) এবং ৫.৯ টাকা (০.০৪৮ ডলার) ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

এছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। ২৫ শতাংশ এর কম লোড ফ্যাক্টরে চলা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৬.৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল ৬ টাকা।”

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১.৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে পুর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে, যেখানে রিগ্যাসিফিকেশন ও টার্মিনাল ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।

অন্যদিকে, গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩.৮ শতাংশ-এর তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত।

বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব- তাই সরকারকে শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শফিকুল আলম বলেন, “বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের কাছেই রয়েছে- বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করা। স্পিনিং রিজার্ভ ও গ্রিড ব্যালান্সিংয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার চাইলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যাতে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যায়।”

গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ বিবিআইএন কাঠামোর আওতায় নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্পোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (সিপিপিএ)-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন, যাতে পোশাক শিল্পসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাদের কার্যক্রম ডিকার্বনাইজ করতে পারে। যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো করছে এ ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের রাজস্ব কমে যাবে, আইইইএফএ এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।

শফিকুল আলম আরো বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫,৬৬০ কোটি টাকা (৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার)। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপও বাড়াবে । তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যা আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমাতে সহায়তা করবে”। 

প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে

১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২.৩ শতাংশ আসে, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। 

২. শুধুমাত্র মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে তেমন নয় । ব্যয়বহুল পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট, অব্যবহৃত উচ্চ সক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা আর্থিক চাপ অব্যাহত রাখছে।

 ৩. এলএনজি’র উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হতে পারে। 

৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিবিআইএন কাঠামোর মাধ্যমে আন্তঃ সীমান্ত জ্বালানি সহযোগিতা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাস সরবরাহ উন্নয়ন- এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬


নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ মাত্র ২.৩ ভাগ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬

featured Image

গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মুখে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চাহিদা না বাড়ায়, বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

‘ফস্টারিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চ মূল্য এবং মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় কয়লার মূল্য ৫৯.৭ শতাংম কমে যাওয়া এবং তেলের মূল্য নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় কমেনি।

আইইইএফএ জ্বালানি বাজার, প্রবণতা ও নীতিমালা সম্পর্কিত বিষয় বিশ্লেষণ করে। সংস্থাটির লক্ষ্য একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই ও লাভজনক জ্বালানি অর্থনীতিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা।

প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএ এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা (০.০৭৭ ডলার) এবং ৫.৯ টাকা (০.০৪৮ ডলার) ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

এছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। ২৫ শতাংশ এর কম লোড ফ্যাক্টরে চলা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৬.৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল ৬ টাকা।”

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১.৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে পুর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে, যেখানে রিগ্যাসিফিকেশন ও টার্মিনাল ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।

অন্যদিকে, গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩.৮ শতাংশ-এর তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত।

বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব- তাই সরকারকে শুল্ক মওকুফের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শফিকুল আলম বলেন, “বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আমাদের কাছেই রয়েছে- বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করা। স্পিনিং রিজার্ভ ও গ্রিড ব্যালান্সিংয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার চাইলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যাতে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যায়।”

গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ বিবিআইএন কাঠামোর আওতায় নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্পোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (সিপিপিএ)-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন, যাতে পোশাক শিল্পসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাদের কার্যক্রম ডিকার্বনাইজ করতে পারে। যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো করছে এ ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের রাজস্ব কমে যাবে, আইইইএফএ এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।

শফিকুল আলম আরো বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫,৬৬০ কোটি টাকা (৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার)। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপও বাড়াবে । তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যা আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমাতে সহায়তা করবে”। 

প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে

১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২.৩ শতাংশ আসে, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। 

২. শুধুমাত্র মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে তেমন নয় । ব্যয়বহুল পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট, অব্যবহৃত উচ্চ সক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা আর্থিক চাপ অব্যাহত রাখছে।

 ৩. এলএনজি’র উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হতে পারে। 

৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিবিআইএন কাঠামোর মাধ্যমে আন্তঃ সীমান্ত জ্বালানি সহযোগিতা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাস সরবরাহ উন্নয়ন- এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত