এখন বৈশাখ মাস। গ্রামে আছি। কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হিসেবে হাওরাঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ বড়োই বলা যায়। এখন বোরোধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। ভাটি বাংলার মানুষের মূল ফসল এই বোরোধান। এটা বছরে একবার হয়। এর ওপরই চলে কৃষকের বারো মাসের ভালো-মন্দ জীবন। স্মরণাতীত কাল থেকেই ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ আয়-ব্যয়, আর আটপৌরে জীবন যাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বিল-ঝিল আর হাওরের বোরো ধানের সোঁদাগন্ধ। বোরো ধানের ফলন বরাবরই ভালো হয়, বেশির ভাগ সময়েই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। যদিও এর সঙ্গে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতন দুর্ভাগ্য লেগে থাকে। এতদস্বত্বেও হাওরের মানুষ অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। দুর্যোগ বলতে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ভেতরেও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কৃষকরা তাদের জীবিকার মতন ধান সংগ্রহ করে নিতে পারে।
২.
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবারের দুর্যোগ সম্পূর্ণ অন্যরকম, মাত্র ৫-৬ দিনের অতিবৃষ্টি এসে তলিয়ে দেয় হাজার হাজার হেক্টর প্রায় পেকে ওঠা ধানের জমি। পানি সরে যাচ্ছে না কিছুতেই, কারণ নানা স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ব্রিজ কালভার্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, খাল, নালা, সংকোচিত হয়েছে যত্রতত্র। এবার স্বচোখে ধান লওয়া আর কৃষকের অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা দেখে অশ্রুপাত করা ছাড়া যেন উপায় নেই। এমনিতেই বোরো ব্যয়বহুল ফসল। এর উৎপাদন অধিক হওয়ার পেছনে প্রয়োজন পড়ে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক প্রভৃতির। কৃষকরা লোন করে, এনজিওর কিস্তি পরিশোধের দায় নেয়, গ্রামীণ সুদের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে টাকা এনে বোরো ধান চাষ করে থাকে। তাদের ভরসা ধান তুলে সব ঋণের বোঝা নামিয়ে স্বস্তির হাসি হাসবে। না, এবার তা হচ্ছে না, কৃষক ধান ওঠাতে পারছে না মূলত বিরূপ আবহাওয়া আর হাতে নগত টাকার অভাবে।
৩.
আরেকটা অনির্বচনীয় দৃশ্য যা বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হলো ধানের বাজার মূল্য। এর কোনো দাম নেই। মনে হয়, মানুষ শুধু চাল খায়, ধানের দরকার নেই। মাঠে মাঠে ভেজা ধান পড়ে আছে, কেনার কেউ নেই। আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ফেলনা বস্তুর নামই ধান। দেখা যায়, এক মণ ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। আর একজন দিনমজুর বা রোজ কামলার মজুরি ১৫০০-১৬০০ টাকা। বৃষ্টির কারণে জমিতে তারা বেশি সময় থাকতে পারছেনা। অথচ এদের জন্যে দু’বেলা খাবারও সরবরাহ করতে হচ্ছে কৃষককেই। যেখানে একজন মজুর দিনে ২০০০ টাকার ধান কাটতে পারছে না, তাকে দু’বেলা খাবার এবং ১৬শ’ টাকা দিতে হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কৃষক আর জমির মালিকরা? তারা জমির তলিয়ে যাওয়া ধান আনবে নাকি জমিতেই বিলীন হতে দিবে তা স্থির করে ওঠতে পারছে না। সহানীয় একজন প্রবীণ কৃষক জানালেন, ‘গত ৫০ বছরে তিনি এমন আবহাওয়ার বিপর্যয় দেখেননি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু’চার ঘণ্টার জন্যও সূর্যের আলোর দেখে নাই। কাটা ধানে চারা গজিয়ে উঠেছে, খর পচে গলে যাচ্ছে। এতে গরু-বাছুরের খাবারের সংকট দেখা দিবে। এবার ভাটি অঞ্চলের কৃষক ধান হারানোর পাশাপাশি গরু-মহিষও হারাবে’।
সামনে অল্প ক’দিনের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে কোরবানির হাট বসবে। ভাটি বাংলায় এবার যারা গরু লালন-পালন করছে বেশি দামের আশায় তারাও আশাহত হয়ে পড়েছে। কারণ গোখাদ্য সংকট দেখা দিবে।
৪.
গ্রামে ক্রমেই কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী দিনমজুরের সংখ্যা। নানাবিধ পেশায় তারা জড়িয়ে পড়েছে। যারা গ্রামে থাকছে তাদের একটা অংশ নিকটতম হাট-বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, রিকশা বাইসাইকেল, চাস্টলসহ বিভিন্ন গ্যারেজে কাজ করছে। সামান্য কিছু অংশ বিদেশে, আরেকটা অংশ শহরে চলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামে জুতার কাজ বা রিকশা অটোরিকশা ইত্যাদিতে জড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জমিওয়ালা কৃষকের তুলনায় দিনমজুরের সংখ্যা কম। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই নিজের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। কৃষকের অবস্থা এমন যে, হয় সে জমির ধান কেটে আনবে অথবা ফেলে দিবে।
আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি চুক্তিতে দিয়ে দিচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে দিতে তারা চাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে ধান হবে সর্বোচ্চ ১৮-২০ মণ। আর মধ্যস্বত্ব ভোগীরা সুযোগ বুঝে ভেজা ধানই ক্রয় করছে মণপ্রতি ৭০০ টাকা দামে। এ যেন গ্রামীণ কৃষকদের জন্যে এক করুণ ও হতাশার চিত্র।
গ্রামের কৃষিতে দিনমজুরের এমন ভয়াবহ সংকট নিরসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ˆনরাজ্যকর পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে পারে না। সরকারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এদিকে নজর দিতে হবে। দেশের শহরকেন্দ্রিক লাখ লাখ শ্রমিককে গ্রামে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীতে যে কয়েক লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা চালক রয়েছে এদের ফেরানোর একটা উদ্যাগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে ফেরাতে হবে। কেননা, বলা হয়, ঢাকা শহরের বহুমাত্রিক অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত, স্থানীয় মস্তান ও বখাটেদের সঙ্গে এদের ওঠাবসা। এরা অনেকে একাধিক ঘর সংসার করেছে।
নারী নির্যাতন ও পাচারের মতন অপরাধেও তারা জড়িত এমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হরহামেশাই বের হচ্ছে। আরেকটি অপরাধ হলো, শহরজুড়ে মোটর চালিত অটোরিকশার রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। অবৈধ লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে প্রতিদিন। তারা রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভাড়ায় যাচ্ছে, ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে। শহরের ভিভিআইপি রোডে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্রাব- পায়খানার দুর্গন্ধে ঢাকার রাস্তার ফুটপাত ধরে পথচারীদের চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে নজর দেয়া সরকার/সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজধানী শহরের চিত্র এমনট নয়। নাগরিক সেবার প্রধান শর্ত হলো শহরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা যেকোনো সরকারের জন্যে সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করা হয়। কাজেই এ একটা মূল জায়গায় হাত দিলে হয়তো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক ধারা ফিরে আসতে পারে। আজকাল কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এতে সন্দেহ নাই তথাপি শ্রমিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলে কৃষকরা বছরে তিনবার ফসল তুলতে পারতো। শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হতো। দেশে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেত। এগুলো একটি অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত বিষয়।
কাজেই নতুন সরকারকে গ্রাম, শহর, মহানগর, রাজধানী সবকিছু নিয়ে সামষ্টিক ভাবে ভাবতে হবে। আবহমান গ্রাম ও আদি কৃষককে বাঁচানোর জন্যে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
[লেখক: গল্পকার]

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
এখন বৈশাখ মাস। গ্রামে আছি। কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হিসেবে হাওরাঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ বড়োই বলা যায়। এখন বোরোধান কাটার ভরা মৌসুম চলছে। ভাটি বাংলার মানুষের মূল ফসল এই বোরোধান। এটা বছরে একবার হয়। এর ওপরই চলে কৃষকের বারো মাসের ভালো-মন্দ জীবন। স্মরণাতীত কাল থেকেই ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ আয়-ব্যয়, আর আটপৌরে জীবন যাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে বিল-ঝিল আর হাওরের বোরো ধানের সোঁদাগন্ধ। বোরো ধানের ফলন বরাবরই ভালো হয়, বেশির ভাগ সময়েই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। যদিও এর সঙ্গে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতন দুর্ভাগ্য লেগে থাকে। এতদস্বত্বেও হাওরের মানুষ অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। দুর্যোগ বলতে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ভেতরেও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কৃষকরা তাদের জীবিকার মতন ধান সংগ্রহ করে নিতে পারে।
২.
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবারের দুর্যোগ সম্পূর্ণ অন্যরকম, মাত্র ৫-৬ দিনের অতিবৃষ্টি এসে তলিয়ে দেয় হাজার হাজার হেক্টর প্রায় পেকে ওঠা ধানের জমি। পানি সরে যাচ্ছে না কিছুতেই, কারণ নানা স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ব্রিজ কালভার্টের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, খাল, নালা, সংকোচিত হয়েছে যত্রতত্র। এবার স্বচোখে ধান লওয়া আর কৃষকের অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা দেখে অশ্রুপাত করা ছাড়া যেন উপায় নেই। এমনিতেই বোরো ব্যয়বহুল ফসল। এর উৎপাদন অধিক হওয়ার পেছনে প্রয়োজন পড়ে পর্যাপ্ত পানি, সার, কীটনাশক প্রভৃতির। কৃষকরা লোন করে, এনজিওর কিস্তি পরিশোধের দায় নেয়, গ্রামীণ সুদের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান দিয়ে শোধ করার শর্তে টাকা এনে বোরো ধান চাষ করে থাকে। তাদের ভরসা ধান তুলে সব ঋণের বোঝা নামিয়ে স্বস্তির হাসি হাসবে। না, এবার তা হচ্ছে না, কৃষক ধান ওঠাতে পারছে না মূলত বিরূপ আবহাওয়া আর হাতে নগত টাকার অভাবে।
৩.
আরেকটা অনির্বচনীয় দৃশ্য যা বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হলো ধানের বাজার মূল্য। এর কোনো দাম নেই। মনে হয়, মানুষ শুধু চাল খায়, ধানের দরকার নেই। মাঠে মাঠে ভেজা ধান পড়ে আছে, কেনার কেউ নেই। আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে ফেলনা বস্তুর নামই ধান। দেখা যায়, এক মণ ধানের দাম সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। আর একজন দিনমজুর বা রোজ কামলার মজুরি ১৫০০-১৬০০ টাকা। বৃষ্টির কারণে জমিতে তারা বেশি সময় থাকতে পারছেনা। অথচ এদের জন্যে দু’বেলা খাবারও সরবরাহ করতে হচ্ছে কৃষককেই। যেখানে একজন মজুর দিনে ২০০০ টাকার ধান কাটতে পারছে না, তাকে দু’বেলা খাবার এবং ১৬শ’ টাকা দিতে হচ্ছে। কোন দিকে যাবে কৃষক আর জমির মালিকরা? তারা জমির তলিয়ে যাওয়া ধান আনবে নাকি জমিতেই বিলীন হতে দিবে তা স্থির করে ওঠতে পারছে না। সহানীয় একজন প্রবীণ কৃষক জানালেন, ‘গত ৫০ বছরে তিনি এমন আবহাওয়ার বিপর্যয় দেখেননি। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু’চার ঘণ্টার জন্যও সূর্যের আলোর দেখে নাই। কাটা ধানে চারা গজিয়ে উঠেছে, খর পচে গলে যাচ্ছে। এতে গরু-বাছুরের খাবারের সংকট দেখা দিবে। এবার ভাটি অঞ্চলের কৃষক ধান হারানোর পাশাপাশি গরু-মহিষও হারাবে’।
সামনে অল্প ক’দিনের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে কোরবানির হাট বসবে। ভাটি বাংলায় এবার যারা গরু লালন-পালন করছে বেশি দামের আশায় তারাও আশাহত হয়ে পড়েছে। কারণ গোখাদ্য সংকট দেখা দিবে।
৪.
গ্রামে ক্রমেই কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী দিনমজুরের সংখ্যা। নানাবিধ পেশায় তারা জড়িয়ে পড়েছে। যারা গ্রামে থাকছে তাদের একটা অংশ নিকটতম হাট-বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে, রিকশা বাইসাইকেল, চাস্টলসহ বিভিন্ন গ্যারেজে কাজ করছে। সামান্য কিছু অংশ বিদেশে, আরেকটা অংশ শহরে চলে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামে জুতার কাজ বা রিকশা অটোরিকশা ইত্যাদিতে জড়িয়ে গেছে। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জমিওয়ালা কৃষকের তুলনায় দিনমজুরের সংখ্যা কম। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই নিজের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। কৃষকের অবস্থা এমন যে, হয় সে জমির ধান কেটে আনবে অথবা ফেলে দিবে।
আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি চুক্তিতে দিয়ে দিচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কেটে দিতে তারা চাচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এতে ধান হবে সর্বোচ্চ ১৮-২০ মণ। আর মধ্যস্বত্ব ভোগীরা সুযোগ বুঝে ভেজা ধানই ক্রয় করছে মণপ্রতি ৭০০ টাকা দামে। এ যেন গ্রামীণ কৃষকদের জন্যে এক করুণ ও হতাশার চিত্র।
গ্রামের কৃষিতে দিনমজুরের এমন ভয়াবহ সংকট নিরসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধরনের ˆনরাজ্যকর পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে পারে না। সরকারকে কৃষি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এদিকে নজর দিতে হবে। দেশের শহরকেন্দ্রিক লাখ লাখ শ্রমিককে গ্রামে ফেরাতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীতে যে কয়েক লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা ও অটোরিকশা চালক রয়েছে এদের ফেরানোর একটা উদ্যাগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে ফেরাতে হবে। কেননা, বলা হয়, ঢাকা শহরের বহুমাত্রিক অপরাধের সঙ্গে এরা জড়িত। মূলত মাদকাসক্ত, স্থানীয় মস্তান ও বখাটেদের সঙ্গে এদের ওঠাবসা। এরা অনেকে একাধিক ঘর সংসার করেছে।
নারী নির্যাতন ও পাচারের মতন অপরাধেও তারা জড়িত এমন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হরহামেশাই বের হচ্ছে। আরেকটি অপরাধ হলো, শহরজুড়ে মোটর চালিত অটোরিকশার রাজত্ব কায়েম করেছে তারা। অবৈধ লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে প্রতিদিন। তারা রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভাড়ায় যাচ্ছে, ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে। শহরের ভিভিআইপি রোডে রাত-বিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রশ্রাব- পায়খানার দুর্গন্ধে ঢাকার রাস্তার ফুটপাত ধরে পথচারীদের চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে নজর দেয়া সরকার/সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজধানী শহরের চিত্র এমনট নয়। নাগরিক সেবার প্রধান শর্ত হলো শহরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটা যেকোনো সরকারের জন্যে সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করা হয়। কাজেই এ একটা মূল জায়গায় হাত দিলে হয়তো গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক ধারা ফিরে আসতে পারে। আজকাল কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এতে সন্দেহ নাই তথাপি শ্রমিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং শ্রমিকের প্রাচুর্য থাকলে কৃষকরা বছরে তিনবার ফসল তুলতে পারতো। শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হতো। দেশে খাদ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পেত। এগুলো একটি অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত বিষয়।
কাজেই নতুন সরকারকে গ্রাম, শহর, মহানগর, রাজধানী সবকিছু নিয়ে সামষ্টিক ভাবে ভাবতে হবে। আবহমান গ্রাম ও আদি কৃষককে বাঁচানোর জন্যে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন