সংবাদ

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা: কারণ, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ


জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস
জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস
প্রকাশ: ৪ মে ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা: কারণ, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ
নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় ও সমন্বয়ের ঘাটতিও পেঁয়াজের বাজারকে অস্থির করে

পেঁয়াজ বাংলাদেশের রান্নাঘরের অপরিহার্য পণ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠেছে। কখনো দাম হঠাৎ বেড়েছে, আবার কখনো বাম্পার ফলনের পর কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এ অস্থিরতা কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনির্ভরতার জটিল সম্পর্ক। 

বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ৩.৪২ মিলিয়ন টন থেকে ৪ মিলিয়ন টনের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো হিসাবে উৎপাদন দেশের চাহিদার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি বলে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে প্রায়ই ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ হলো ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারে সরবরাহের অসামঞ্জস্য। পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। 

সঠিকভাবে শুকানো, বাতাস চলাচল, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, রোগাক্রান্ত বাল্ব বাছাই এবং ˆবজ্ঞানিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হলে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হতে পারে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে কার্যকর সরবরাহ কমে যায়। মৌসুমি সরবরাহের চাপ ও অফ-সিজন ঘাটতিও বাজার অস্থিরতার বড় কারণ। পেঁয়াজের বড় অংশ নির্দিষ্ট মৌসুমে বাজারে আসে। তখন সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যায় এবং কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু কয়েক মাস পর সংরক্ষিত পেঁয়াজ কমে গেলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়, দাম আবার বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই পণ্যে কৃষক ও ভোক্তা দুই সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন— মৌসুমে

কৃষক কম দাম পান, আর অফ-সিজনে ভোক্তা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ভারতনির্ভর আমদানি। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ প্রধানত ভারতের ওপর নির্ভর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেড়ে গেলে বা উৎপাদন কমলে ভারত রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে

বাংলাদেশের বাজারে। ২০১৯ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০২০ এবং ২০২৩ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একক উৎসনির্ভর আমদানি একটি বড় ঝুঁকি। নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় ও সমন্বয়ের ঘাটতিও পেঁয়াজ বাজারকে অস্থির করে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কখনো আমদানি সীমিত করা হয়, আবার ভোক্তার দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি খুলে দেয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি সময়মতো, তথ্যভিত্তিক এবং পূর্বপরিকল্পিত না হয়, তাহলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি খুলে দিলে দাম পড়ে যায়। আবার ঘাটতির সময় দেরিতে আমদানি করলে ভোক্তাকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হয়। বাজার তথ্যের ঘাটতি ও মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও অস্থিরতা বাড়ায়। দেশে কত পেঁয়াজ উৎপাদিত হলো, কতটা সংরক্ষিত আছে, কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটা বাজারে আসবে এবং কতটা আমদানি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সরকার অনেক সময় অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে গুজব, আতঙ্ক, অতিরিক্ত মজুত, হঠাৎ আমদানি কিংবা হঠাৎ দামপতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজারে কারসাজি বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২৩ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। আবার উৎপাদন বেশি হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে কৃষক লোকসানে পড়েন। অর্থাৎ পেঁয়াজ খাতে একদিকে ভোক্তার জন্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে কৃষকের জন্য দামপতনের ঝুঁকি— দুই-ই বিদ্যমান। 

এই পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৃদ্ধিকে কার্যকর সরবরাহে রূপান্তর করা। উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ দুর্বল থাকলে তা বাজার স্থিতিশীল করতে পারে না। 

আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাজারকে বাইরের সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে রাখে। কৃষক উৎপাদন খরচ, রোগবালাই, জলবায়ু ঝুঁকি ও দামের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। আবার ভোক্তার জন্য সহনীয় দাম নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য যেন নষ্ট না হয়— এই ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন। বীজ, জাত, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার তথ্য—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত

ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। উত্তরণের জন্য সবার আগে পেঁয়াজের সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। সাধারণ কোল্ড

স্টোরেজ পেঁয়াজের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়। পেঁয়াজের জন্য দরকার বায়ু চলাচলযুক্ত, কম খরচের, গ্রামভিত্তিক ও কৃষকবান্ধব সংরক্ষণাগার। সংরক্ষণ ক্ষতি কমাতে ধরৎ-ভষড়ি সধপযরহব বা অনুরূপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না; কৃষকদের সঠিকভাবে পেঁয়াজ শুকানো, পঁৎরহম, মৎধফরহম, রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। 

অফ-সিজন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে সরবরাহ খুব বেশি মৌসুমনির্ভর। 

গ্রীষ্মকালীন বা অফ-সিজন জাত, জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সারা বছরের সরবরাহ ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে

এবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। আমদানি নীতি হতে হবে আগাম, তথ্যভিত্তিক ও ক্যালেন্ডারভিত্তিক। আমদানি হঠাৎ বন্ধ বা হঠাৎ খুলে দিলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। মৌসুম শুরুর আগেই উৎপাদন পূর্বাভাস, মজুত পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ক্ষতি, চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে আমদানি পরিকল্পনা করা দরকার। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং অফ-সিজনে ঘাটতির আগেই পরিকল্পিত আমদানি নিশ্চিত করা হলে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই উপকৃত হবে। আমদানির উৎস ˆবচিত্র্যময় করা দরকার। ভারত কাছের দেশ হওয়ায় পরিবহন সহজ ও খরচ কম, কিন্তু একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মায়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক, মিসরসহ সম্ভাব্য বিকল্প উৎস আগেই চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহ চুক্তি প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। 

বাজার তথ্য ও মজুত মনিটরিং শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। ইউনিয়ন, উপজেলা, আড়ত, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার থেকে নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোথায় কত পেঁয়াজ আছে, কতটা নষ্ট হচ্ছে, কতটা বাজারে আসতে পারে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গুজব ও আতঙ্ক কমবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দরকার। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পেঁয়াজ উৎপাদন টেকসই হবে না। পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও জমির খরচ বাড়ছে। বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষক পরের বছর আবাদ কমিয়ে দেন; তখন আবার ঘাটতি তৈরি হয়। এ জন্য মৌসুমভিত্তিক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ক্রয়, সমবায়ভিত্তিক সংরক্ষণ এবং স্বল্পসুদে সংরক্ষণ ঋত চালু করা যেতে পারে। পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো গেলে বাজারের চাপ কমবে। পেঁয়াজ থেকে ফ্লেক্স, পাউডার, পেস্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করা গেলে উদ্বৃত্ত মৌসুমে কৃষক বিকল্প বাজার পাবেন। অফ-সিজনে এসব শিল্পজাত পণ্য বাজার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋত এবং বাজার সংযোগ জরুরি। 

গবেষণা ও সম্প্রসারণকে আরও কার্যকর করতে হবে। উচ্চফলনশীল, রোগসহনশীল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য এবং অফ-সিজন উপযোগী জাত উদ্ভাবন ও দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের সঠিক বীজ নির্বাচন, সময়মতো রোপণ, রোগ ব্যবস্থাপনা, ফসল তোলা, curing ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে কৃষি সম্প্রসারণের মূল অংশ করতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি, মৌসুমি সরবরাহের চাপ, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, ভারতনির্ভরতা এবং বাজার তথ্যের ঘাটতি। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাইরের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলে। আবার সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধিও প্রমাণ করেছে, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে বেশি উৎপাদন কৃষকের জন্য নিশ্চয়তা দেয় না। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—বছরজুড়ে স্থিতিশীল সরবরাহ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার সহনীয় দাম এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা। 

[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা: কারণ, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

পেঁয়াজ বাংলাদেশের রান্নাঘরের অপরিহার্য পণ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠেছে। কখনো দাম হঠাৎ বেড়েছে, আবার কখনো বাম্পার ফলনের পর কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এ অস্থিরতা কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনির্ভরতার জটিল সম্পর্ক। 

বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ৩.৪২ মিলিয়ন টন থেকে ৪ মিলিয়ন টনের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো হিসাবে উৎপাদন দেশের চাহিদার কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি বলে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে প্রায়ই ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ হলো ফসল-পরবর্তী ক্ষতি, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বাজারে সরবরাহের অসামঞ্জস্য। পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। 

সঠিকভাবে শুকানো, বাতাস চলাচল, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, রোগাক্রান্ত বাল্ব বাছাই এবং ˆবজ্ঞানিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হলে উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হতে পারে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে কার্যকর সরবরাহ কমে যায়। মৌসুমি সরবরাহের চাপ ও অফ-সিজন ঘাটতিও বাজার অস্থিরতার বড় কারণ। পেঁয়াজের বড় অংশ নির্দিষ্ট মৌসুমে বাজারে আসে। তখন সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমে যায় এবং কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু কয়েক মাস পর সংরক্ষিত পেঁয়াজ কমে গেলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়, দাম আবার বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই পণ্যে কৃষক ও ভোক্তা দুই সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন— মৌসুমে

কৃষক কম দাম পান, আর অফ-সিজনে ভোক্তা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ভারতনির্ভর আমদানি। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ প্রধানত ভারতের ওপর নির্ভর করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেড়ে গেলে বা উৎপাদন কমলে ভারত রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে

বাংলাদেশের বাজারে। ২০১৯ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর দেশে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০২০ এবং ২০২৩ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একক উৎসনির্ভর আমদানি একটি বড় ঝুঁকি। নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় ও সমন্বয়ের ঘাটতিও পেঁয়াজ বাজারকে অস্থির করে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কখনো আমদানি সীমিত করা হয়, আবার ভোক্তার দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানি খুলে দেয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যদি সময়মতো, তথ্যভিত্তিক এবং পূর্বপরিকল্পিত না হয়, তাহলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি খুলে দিলে দাম পড়ে যায়। আবার ঘাটতির সময় দেরিতে আমদানি করলে ভোক্তাকে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হয়। বাজার তথ্যের ঘাটতি ও মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও অস্থিরতা বাড়ায়। দেশে কত পেঁয়াজ উৎপাদিত হলো, কতটা সংরক্ষিত আছে, কতটা নষ্ট হয়েছে, কতটা বাজারে আসবে এবং কতটা আমদানি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও তাৎক্ষণিক তথ্য সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সরকার অনেক সময় অনুমানের ওপর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে গুজব, আতঙ্ক, অতিরিক্ত মজুত, হঠাৎ আমদানি কিংবা হঠাৎ দামপতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজারে কারসাজি বা অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২৩ সালে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। আবার উৎপাদন বেশি হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে কৃষক লোকসানে পড়েন। অর্থাৎ পেঁয়াজ খাতে একদিকে ভোক্তার জন্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে কৃষকের জন্য দামপতনের ঝুঁকি— দুই-ই বিদ্যমান। 

এই পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন বৃদ্ধিকে কার্যকর সরবরাহে রূপান্তর করা। উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ দুর্বল থাকলে তা বাজার স্থিতিশীল করতে পারে না। 

আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাজারকে বাইরের সিদ্ধান্তের ঝুঁকিতে রাখে। কৃষক উৎপাদন খরচ, রোগবালাই, জলবায়ু ঝুঁকি ও দামের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। আবার ভোক্তার জন্য সহনীয় দাম নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য যেন নষ্ট না হয়— এই ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন। বীজ, জাত, সংরক্ষণ প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার তথ্য—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত

ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। উত্তরণের জন্য সবার আগে পেঁয়াজের সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। সাধারণ কোল্ড

স্টোরেজ পেঁয়াজের জন্য সবসময় উপযুক্ত নয়। পেঁয়াজের জন্য দরকার বায়ু চলাচলযুক্ত, কম খরচের, গ্রামভিত্তিক ও কৃষকবান্ধব সংরক্ষণাগার। সংরক্ষণ ক্ষতি কমাতে ধরৎ-ভষড়ি সধপযরহব বা অনুরূপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না; কৃষকদের সঠিকভাবে পেঁয়াজ শুকানো, পঁৎরহম, মৎধফরহম, রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে। 

অফ-সিজন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি। বর্তমানে সরবরাহ খুব বেশি মৌসুমনির্ভর। 

গ্রীষ্মকালীন বা অফ-সিজন জাত, জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে সারা বছরের সরবরাহ ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে

এবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। আমদানি নীতি হতে হবে আগাম, তথ্যভিত্তিক ও ক্যালেন্ডারভিত্তিক। আমদানি হঠাৎ বন্ধ বা হঠাৎ খুলে দিলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। মৌসুম শুরুর আগেই উৎপাদন পূর্বাভাস, মজুত পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ক্ষতি, চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে আমদানি পরিকল্পনা করা দরকার। কৃষকের ফসল ওঠার সময় আমদানি নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং অফ-সিজনে ঘাটতির আগেই পরিকল্পিত আমদানি নিশ্চিত করা হলে কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই উপকৃত হবে। আমদানির উৎস ˆবচিত্র্যময় করা দরকার। ভারত কাছের দেশ হওয়ায় পরিবহন সহজ ও খরচ কম, কিন্তু একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মায়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক, মিসরসহ সম্ভাব্য বিকল্প উৎস আগেই চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহ চুক্তি প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। 

বাজার তথ্য ও মজুত মনিটরিং শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। ইউনিয়ন, উপজেলা, আড়ত, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার থেকে নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোথায় কত পেঁয়াজ আছে, কতটা নষ্ট হচ্ছে, কতটা বাজারে আসতে পারে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গুজব ও আতঙ্ক কমবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি দরকার। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে পেঁয়াজ উৎপাদন টেকসই হবে না। পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও জমির খরচ বাড়ছে। বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষক পরের বছর আবাদ কমিয়ে দেন; তখন আবার ঘাটতি তৈরি হয়। এ জন্য মৌসুমভিত্তিক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ক্রয়, সমবায়ভিত্তিক সংরক্ষণ এবং স্বল্পসুদে সংরক্ষণ ঋত চালু করা যেতে পারে। পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানো গেলে বাজারের চাপ কমবে। পেঁয়াজ থেকে ফ্লেক্স, পাউডার, পেস্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করা গেলে উদ্বৃত্ত মৌসুমে কৃষক বিকল্প বাজার পাবেন। অফ-সিজনে এসব শিল্পজাত পণ্য বাজার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋত এবং বাজার সংযোগ জরুরি। 

গবেষণা ও সম্প্রসারণকে আরও কার্যকর করতে হবে। উচ্চফলনশীল, রোগসহনশীল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য এবং অফ-সিজন উপযোগী জাত উদ্ভাবন ও দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের সঠিক বীজ নির্বাচন, সময়মতো রোপণ, রোগ ব্যবস্থাপনা, ফসল তোলা, curing ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকে কৃষি সম্প্রসারণের মূল অংশ করতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পেঁয়াজ বাজারের অস্থিরতার মূল কারণ উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি, মৌসুমি সরবরাহের চাপ, দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, ভারতনির্ভরতা এবং বাজার তথ্যের ঘাটতি। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাইরের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলে। আবার সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধিও প্রমাণ করেছে, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না হলে বেশি উৎপাদন কৃষকের জন্য নিশ্চয়তা দেয় না। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত—বছরজুড়ে স্থিতিশীল সরবরাহ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার সহনীয় দাম এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা। 

[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত