হাওর হলো বাটি বা গামলা আকৃতির বিশাল, নিচু জলাভূমি। ধরে নেয়া যায় যে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাগর’ থেকে স্থানীয় উচ্চারণে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি, কারণ বর্ষায় এটি সাগরে রূপ নেয়। সাধারণত ভূ-গাঠনিক কারণে সৃষ্ট এবং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে সমুদ্রের মতো রূপ ধারণ করে। হাওর মূলত একটি মৌসুমি জলাভূমি, যেখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে ফসলি জমি ও চারণভূমিতে পরিণত হয়। হাওরের মূল ˆবশিষ্ট্য হলো— ১. এটি পিরিচ আকৃতির ভূ-গাঠনিক অবনমন, ২. মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায়) হাওরগুলোর অবস্থান, ৩. নদী ও খাল থেকে পানি এসে হাওর পূর্ণ হয়, ৪. হাওর অঞ্চল ধান চাষ, মাছ উৎপাদন এবং পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, ৫. হাওর, বাঁওড়, বিল, ঝিল বা নদী থেকে ভিন্ন, কারণ এটি বর্ষায় নদী অববাহিকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে রাখে। বাংলাদেশে ছোট-বড় ৪১৪টি থেকে ৪২৩টি হাওর রয়েছে।
অর্থনীতির বিবেচনায় দেখা যায় যে, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রণালী কৃষিনির্ভর। হাওরগুলোতে প্রধানত ৬ মাস পানি থাকে এবং ৬ মাস শুকনা ভূমিতে এক ফসলি বোরো ধান চাষ করা হয়। হাওরের জীবন অত্যন্ত ˆবচিত্র্যময় হলেও দারিদ্র্য, যাতায়াত সমস্যা ও বন্যায় ফসলহানির কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নতর। মূলত বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা এখানকার প্রধান জীবিকা। হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রার প্রধান দিকগুলো হলো—
১. বছরের অর্ধেক সময় এলাকা জলমগ্ন থাকে, তাই মাছ ধরা এবং বাকি সময়ে বোরো ধান চাষই প্রধান পেশা। আগাম বন্যা বা অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে চরম খাদ্য সংকটে পড়েন হাওরবাসী। ২. দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী এবং দারিদ্র্যের হার বেশি। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ৪. বর্ষাকালে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। ৫. যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ৬. বসতঘরগুলো সাধারণত উঁচু ঢিবির ওপর তৈরি করা হয়। এখানকার বসতিগুলো ‘গুচ্ছগ্রাম’ বা ছোট ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। ৭. অপরিকল্পিত পাকা রাস্তা ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, যা কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ৮. হাওর অঞ্চল মাছ ও নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী (যেমন: কচ্ছপ, ভোঁদড়) এবং পাখির একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে (প্রধানত সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ৭টি জেলা) দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। হাওর অঞ্চলের বোরো ধান দেশের চালের চাহিদার একটি বড় অংশ যোগান দেয় এবং এই অঞ্চলের ধানের ওপর জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী মে ২০২৬-এর তথ্যমতে, হাওরের ৭টি জেলায় ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বন্যামুক্ত আছে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি ছিল। প্রতি বছর এভাবে শস্যহানিতে হাওরের কৃষক সর্বস্বান্ত হন। দারিদ্র্যের নিচে এখানকার বহু মানুষ বসবাস করছে।
হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বিভিন্ন বছরে ভিন্ন হলেও তা গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাওরের সম্পদের ক্ষতির প্রধান দিকগুলো হলো—
১. প্রধানত বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর ১০ লাখ টনের বেশি চাল নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২. পানি দূষণ, অক্সিজেনের অভাব এবং অসময়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ মারা যায়। ২০১৬-১৭ সালের মতো বড় বন্যায় শুধু মাছের ক্ষতির পরিমাণই ৪১ কোটি টাকার বেশি ছিল। ৩. ধান পচে যাওয়ায় এবং পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি গোখাদ্য নষ্ট হয়। ৪. অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার এবং বালু জমে হাওরের ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক মাছের প্রজননস্থল ধ্বংস করছে। মূলত অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল হাওরের মানুষের স্বপ্ন ও জীবন-জীবিকা প্রতি বছরই বিপন্ন করে তোলে।
হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা বা অকাল বন্যা হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন কারণ দায়ী। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো—
১. হাওরগুলো ভারতের মেঘালয় ও আসামের সীমান্ত ঘেঁষা। ওইসব পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নেমে এসে হাওর এলাকা প্লাবিত করে। ২. ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওড়ে বন্যা হয়, কারণ হাওর মূল সমতল ভূমি থেকে বাটি আকৃতির নিচু এলাকা। তাই হাওর অঞ্চল বাটির মতো নিচু, চারপাশে নদী থেকে পানি গড়িয়ে এখানে জমা হয়। ৩. গত তিন দশকে হাওরে বহমান প্রায় ৮৬ শতাংশ নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) অস্বাভাবিক ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা অকাল বন্যা ডেকে আনে। ৫. হাওরের ভেতর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ৬. সময়মতো বাঁধ মেরামত না করা বা দুর্বল বাঁধের কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত জমিতে ঢুকে পড়ে। মূল বিষয়: হাওরের বন্যা মূলত পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার একটি সম্মিলিত ফল।
হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (২০১২-২০৩২) বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগের আধুনিকায়ন করা। হাওর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও চলমান উদ্যোগগুলো হলো—
১. হাওড়ে বহমান ১৭টি নদী ভিন্ন খাতে (পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, যোগাযোগ ইত্যাদি) সংস্কারে ১৫৪টি প্রকল্প ১৬টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২. সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে হাওরের ফসল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ৩. কৃষকদের সহায়তা ও নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ৪. বোরো ফসল রক্ষায় সরাসরি ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান কেনা, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন এবং কম সময়ে ফলন দেওয়া (৯০-৯৫ দিনে) আমন ধানের নতুন জাত আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৬. হাওরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে এবং নদী-খাল খননের মাধ্যমে নাব্য রক্ষা করার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ৭. হাওর এলাকায় সাবমারসিবল (পানিতে ডুবে যায় এমন) রাস্তা ও উড়াল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বর্ষায় নৌপথ এবং শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথ হিসেবে কাজ করে। ৮. হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র তৈরি এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা শুধু ফাইলবন্দী থাকলে হবে না, এর বাস্তব রূপ দিতে হবে। কারণ অভাব এখন হাওরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের মানুষের এই অভাব দূর করতে হলে উপরোল্লিখিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬
হাওর হলো বাটি বা গামলা আকৃতির বিশাল, নিচু জলাভূমি। ধরে নেয়া যায় যে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাগর’ থেকে স্থানীয় উচ্চারণে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি, কারণ বর্ষায় এটি সাগরে রূপ নেয়। সাধারণত ভূ-গাঠনিক কারণে সৃষ্ট এবং বর্ষাকালে পানিতে ডুবে সমুদ্রের মতো রূপ ধারণ করে। হাওর মূলত একটি মৌসুমি জলাভূমি, যেখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে ফসলি জমি ও চারণভূমিতে পরিণত হয়। হাওরের মূল ˆবশিষ্ট্য হলো— ১. এটি পিরিচ আকৃতির ভূ-গাঠনিক অবনমন, ২. মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলায়) হাওরগুলোর অবস্থান, ৩. নদী ও খাল থেকে পানি এসে হাওর পূর্ণ হয়, ৪. হাওর অঞ্চল ধান চাষ, মাছ উৎপাদন এবং পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, ৫. হাওর, বাঁওড়, বিল, ঝিল বা নদী থেকে ভিন্ন, কারণ এটি বর্ষায় নদী অববাহিকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে রাখে। বাংলাদেশে ছোট-বড় ৪১৪টি থেকে ৪২৩টি হাওর রয়েছে।
অর্থনীতির বিবেচনায় দেখা যায় যে, হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রণালী কৃষিনির্ভর। হাওরগুলোতে প্রধানত ৬ মাস পানি থাকে এবং ৬ মাস শুকনা ভূমিতে এক ফসলি বোরো ধান চাষ করা হয়। হাওরের জীবন অত্যন্ত ˆবচিত্র্যময় হলেও দারিদ্র্য, যাতায়াত সমস্যা ও বন্যায় ফসলহানির কারণে জীবনযাত্রার মান নিম্নতর। মূলত বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা এখানকার প্রধান জীবিকা। হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রার প্রধান দিকগুলো হলো—
১. বছরের অর্ধেক সময় এলাকা জলমগ্ন থাকে, তাই মাছ ধরা এবং বাকি সময়ে বোরো ধান চাষই প্রধান পেশা। আগাম বন্যা বা অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে গেলে চরম খাদ্য সংকটে পড়েন হাওরবাসী। ২. দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী এবং দারিদ্র্যের হার বেশি। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ৪. বর্ষাকালে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। ৫. যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ৬. বসতঘরগুলো সাধারণত উঁচু ঢিবির ওপর তৈরি করা হয়। এখানকার বসতিগুলো ‘গুচ্ছগ্রাম’ বা ছোট ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। ৭. অপরিকল্পিত পাকা রাস্তা ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, যা কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ৮. হাওর অঞ্চল মাছ ও নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী (যেমন: কচ্ছপ, ভোঁদড়) এবং পাখির একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে (প্রধানত সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই ৭টি জেলা) দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। হাওর অঞ্চলের বোরো ধান দেশের চালের চাহিদার একটি বড় অংশ যোগান দেয় এবং এই অঞ্চলের ধানের ওপর জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী মে ২০২৬-এর তথ্যমতে, হাওরের ৭টি জেলায় ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বন্যামুক্ত আছে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি ছিল। প্রতি বছর এভাবে শস্যহানিতে হাওরের কৃষক সর্বস্বান্ত হন। দারিদ্র্যের নিচে এখানকার বহু মানুষ বসবাস করছে।
হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বিভিন্ন বছরে ভিন্ন হলেও তা গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাওরের সম্পদের ক্ষতির প্রধান দিকগুলো হলো—
১. প্রধানত বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রতি বছর ১০ লাখ টনের বেশি চাল নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২. পানি দূষণ, অক্সিজেনের অভাব এবং অসময়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ মারা যায়। ২০১৬-১৭ সালের মতো বড় বন্যায় শুধু মাছের ক্ষতির পরিমাণই ৪১ কোটি টাকার বেশি ছিল। ৩. ধান পচে যাওয়ায় এবং পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি গোখাদ্য নষ্ট হয়। ৪. অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার এবং বালু জমে হাওরের ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক মাছের প্রজননস্থল ধ্বংস করছে। মূলত অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল হাওরের মানুষের স্বপ্ন ও জীবন-জীবিকা প্রতি বছরই বিপন্ন করে তোলে।
হাওরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা বা অকাল বন্যা হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন কারণ দায়ী। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো—
১. হাওরগুলো ভারতের মেঘালয় ও আসামের সীমান্ত ঘেঁষা। ওইসব পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নেমে এসে হাওর এলাকা প্লাবিত করে। ২. ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওড়ে বন্যা হয়, কারণ হাওর মূল সমতল ভূমি থেকে বাটি আকৃতির নিচু এলাকা। তাই হাওর অঞ্চল বাটির মতো নিচু, চারপাশে নদী থেকে পানি গড়িয়ে এখানে জমা হয়। ৩. গত তিন দশকে হাওরে বহমান প্রায় ৮৬ শতাংশ নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-মে) অস্বাভাবিক ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা অকাল বন্যা ডেকে আনে। ৫. হাওরের ভেতর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ৬. সময়মতো বাঁধ মেরামত না করা বা দুর্বল বাঁধের কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত জমিতে ঢুকে পড়ে। মূল বিষয়: হাওরের বন্যা মূলত পাহাড়ি ঢল এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার একটি সম্মিলিত ফল।
হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (২০১২-২০৩২) বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগের আধুনিকায়ন করা। হাওর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও চলমান উদ্যোগগুলো হলো—
১. হাওড়ে বহমান ১৭টি নদী ভিন্ন খাতে (পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, যোগাযোগ ইত্যাদি) সংস্কারে ১৫৪টি প্রকল্প ১৬টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২. সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে হাওরের ফসল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ৩. কৃষকদের সহায়তা ও নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। ৪. বোরো ফসল রক্ষায় সরাসরি ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান কেনা, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন এবং কম সময়ে ফলন দেওয়া (৯০-৯৫ দিনে) আমন ধানের নতুন জাত আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৬. হাওরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে এবং নদী-খাল খননের মাধ্যমে নাব্য রক্ষা করার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ৭. হাওর এলাকায় সাবমারসিবল (পানিতে ডুবে যায় এমন) রাস্তা ও উড়াল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বর্ষায় নৌপথ এবং শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথ হিসেবে কাজ করে। ৮. হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র তৈরি এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা শুধু ফাইলবন্দী থাকলে হবে না, এর বাস্তব রূপ দিতে হবে। কারণ অভাব এখন হাওরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের মানুষের এই অভাব দূর করতে হলে উপরোল্লিখিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন