মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির দাপট ও প্লাস্টিক-অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর সহজলভ্যতায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় দেড় হাজার পরিবার এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন এই জনপদের কারিগররা।
জেলার ঘিওর, শিবালয়, দৌলতপুর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে একসময় বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের ব্যাপক কদর ছিল। কারিগররা গ্রাম ঘুরে বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করে নিপুণ হাতে তৈরি করতেন ধামা, কাঠা, দাঁড়িপাল্লা, পাটি, দোলনা ও খেলনাসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। ঘিওর, বরংগাইল, তরা, মহাদেবপুরসহ বিভিন্ন হাটে এসব পণ্যের প্রচুর বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের সস্তা ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহারের কাছে হার মানছে এই আদি শিল্প।
সরেজমিনে ঘিওর উপজেলার বড়টিয়া ঋষিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় কারিগরদের করুণ চিত্র। প্রবীণ বেতশিল্পী সুধীর দাশ (৭২) বলেন, ‘বহু কষ্টে বাপ-দাদার এই পেশাটি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন আর আগের মতো লাভ নেই। কাঁচামাল বা বেতের দাম বেড়ে গেছে, অথচ তৈরি পণ্যের দাম নেই। সরকারি কোনো সহায়তাও আমরা পাই না।’ একই গ্রামের সুনীল সরকার ও দুর্গা রানীসহ অনেকে জানান, কাঁচামালের অভাব এবং আর্থিক সংকটের কারণে তারা পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও বিসিক বা অন্য কোনো সংস্থা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না। কারিগরদের দাবি, এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং বেশি করে বাঁশ ও বেত চাষের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, বাঁশ ও বেত শিল্প আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ৮০ বা ৯০-এর দশকেও এর যে চাহিদা ছিল, তা এখন বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে অচিরেই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আপনার মতামত লিখুন