সংবাদ

হরিণের সংখ্যা বাড়লেও থামছে না চোরাশিকার


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, খুলনা
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, খুলনা
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১০:১৬ এএম

হরিণের সংখ্যা বাড়লেও থামছে না চোরাশিকার
সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে বিচরণরত চিত্রা হরিণ। ছবিঃ সংবাদ

সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বাড়লেও থামছে না চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা ও রক্ষীর সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরাশিকারি চক্র। এমনকি এই বন্য প্রাণী রক্ষা ও চোরাচালান রোধে যুক্ত পুলিশ সদস্যদের একাংশের বিরুদ্ধেও শিকারিদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি গত ১২ মে দুপুরে খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে জব্দ করা সেই মাংস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জেলা পুলিশ ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করেছে।

একইভাবে সুন্দরবনের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আবদুস সালামের বিরুদ্ধেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৭ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের কালাবগির কালসার খালপাড় এলাকায় বন বিভাগের একটি টহল দল বিষ প্রয়োগে ধরা প্রায় ৩০০ কেজি চিংড়িসহ পাঁচজনকে আটক করে। পরে স্থানীয় এক ডিপো মালিকের সঙ্গে ‘রফাদফা’ করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশ্য স্টেশন কর্মকর্তা আবদুস সালাম এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, আটক ব্যক্তিদের কাছে নৌকার বৈধ পাস এবং অল্প মাছ থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় বিষ দিয়ে মাছ শিকারের পাশাপাশি ওই চক্রটির বিরুদ্ধে নিয়মিত হরিণ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালাবগি ও সুতারখালী এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সুন্দরবনে অন্তত ১৫০টি চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। পেশাদার এই শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া গেলেও জেলা শহরগুলোতে এর দাম ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। উৎসব-পার্বণ আসলেই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস উপহার দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। শৌখিন ব্যক্তিরা হরিণের চামড়া ও শিং দিয়ে ড্রইংরুম সাজান।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, ‘বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যে পরিমাণ মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি অভিযানে বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল গডফাদাররা ধরা পড়ে না। দুর্বল আইনের কারণে আসামিরা জামিনে এসে আবার একই কাজ করে।’

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম বন বিভাগ এবং বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব বন বিভাগ গঠিত। ২০২৩ সালের আইইউসিএন (IUCN) জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে, যা ২০০৪ সালে ছিল ৮৩ হাজার।

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ ও ৩৮০টি ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২টি মামলায় ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম বন বিভাগে গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ৭৪৮টি হাঁটা ফাঁদ উদ্ধারসহ ৫০টি মামলা করা হয়েছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে আমরা নিয়মিত মাংস ও ফাঁদ জব্দ করছি। তবে বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ।’

রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় ও কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দফতর) সূত্রে জানানো হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল অপরাধমুক্ত রাখতে তাদের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ৩১ মে ২০২৬


হরিণের সংখ্যা বাড়লেও থামছে না চোরাশিকার

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

featured Image

সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বাড়লেও থামছে না চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা ও রক্ষীর সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরাশিকারি চক্র। এমনকি এই বন্য প্রাণী রক্ষা ও চোরাচালান রোধে যুক্ত পুলিশ সদস্যদের একাংশের বিরুদ্ধেও শিকারিদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি গত ১২ মে দুপুরে খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পরে জব্দ করা সেই মাংস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জেলা পুলিশ ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করেছে।

একইভাবে সুন্দরবনের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা আবদুস সালামের বিরুদ্ধেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৭ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের কালাবগির কালসার খালপাড় এলাকায় বন বিভাগের একটি টহল দল বিষ প্রয়োগে ধরা প্রায় ৩০০ কেজি চিংড়িসহ পাঁচজনকে আটক করে। পরে স্থানীয় এক ডিপো মালিকের সঙ্গে ‘রফাদফা’ করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশ্য স্টেশন কর্মকর্তা আবদুস সালাম এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, আটক ব্যক্তিদের কাছে নৌকার বৈধ পাস এবং অল্প মাছ থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় বিষ দিয়ে মাছ শিকারের পাশাপাশি ওই চক্রটির বিরুদ্ধে নিয়মিত হরিণ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালাবগি ও সুতারখালী এলাকার বাসিন্দারা বলেন, সুন্দরবনে অন্তত ১৫০টি চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। পেশাদার এই শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া গেলেও জেলা শহরগুলোতে এর দাম ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। উৎসব-পার্বণ আসলেই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস উপহার দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। শৌখিন ব্যক্তিরা হরিণের চামড়া ও শিং দিয়ে ড্রইংরুম সাজান।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, ‘বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। যে পরিমাণ মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দু-একটি অভিযানে বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল গডফাদাররা ধরা পড়ে না। দুর্বল আইনের কারণে আসামিরা জামিনে এসে আবার একই কাজ করে।’

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম বন বিভাগ এবং বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব বন বিভাগ গঠিত। ২০২৩ সালের আইইউসিএন (IUCN) জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে, যা ২০০৪ সালে ছিল ৮৩ হাজার।

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ ও ৩৮০টি ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২টি মামলায় ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম বন বিভাগে গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ৭৪৮টি হাঁটা ফাঁদ উদ্ধারসহ ৫০টি মামলা করা হয়েছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে আমরা নিয়মিত মাংস ও ফাঁদ জব্দ করছি। তবে বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ।’

রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় ও কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দফতর) সূত্রে জানানো হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল অপরাধমুক্ত রাখতে তাদের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত