কীর্তনখোলার বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বরিশাল। নদীর দুই পাড়ে ছড়িয়ে আছে অপরূপ সৌন্দর্য। বেলতলা খেয়াঘাট থেকে ডিসিঘাট, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পেরিয়ে কেডিসি হয়ে চাঁদমারি খেয়াঘাট- সাত কিলোমিটার নদী তীর ঘেঁষা এই পথটাই হয়ে উঠতে পারত বরিশালের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সেখানে উঁকি দিচ্ছে অবহেলা আর অনিশ্চয়তা।
কীর্তনখোলা নদী বেষ্টিত বরিশালের নদী তীরবর্তী শহররক্ষা বাঁধ ধরে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে চমৎকার পর্যটন সম্ভাবনা। নদী পাড় ঘেঁষা ‘সেলফি সড়ক’ যেন এক টুকরো স্বপ্ন। ত্রিশ গোডাউন এলাকা থেকে গ্যাস টারবাইন এলাকা পর্যন্ত এই সড়কটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। তবে সৌন্দর্যের মাঝেই হিমশিম খেতে হয় পর্যটকদের।
কেডিসি থেকে চাঁদমারি আর ত্রিশ গোডাউন থেকে গ্যাস টারবাইন এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ না থাকায় হাঁটু কাদাজলে ভিজতে হয় দর্শনার্থীদের। অবৈধ দোকানপাট আর বখাটে আড্ডার কারণে পর্যটকরা ঝুঁকি নিতে চান না। বেশির ভাগ দর্শক চরকাউয়া খেয়াঘাট বা ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত এসেই ফিরে যান। নদী তীর ধরে সোজা বেড়িবাঁধ না থাকায় ঘুরপথ পেরিয়ে যেতে হয় কেডিসি বা চাঁদমারিতে।
চাঁদমারি খেয়াঘাটের সাগরদি খালের ওপর নির্মিত ব্রিজটির একাংশ গত আট বছর ধরে অসমাপ্ত পড়ে আছে। অথচ প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতি এই এলাকায়। ব্রিজটি ব্যবহার করতে নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও খুঁটি দিয়ে স্লাপ বানিয়ে নিয়েছেন স্থানীয়রা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই স্লাপে পা পিছলে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু, নারী ও বৃদ্ধ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মনু মিয়া বলেন, ‘চরকাউয়া খেয়াঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত এবং চাঁদমারি খেয়াঘাটের ওপার থেকে ত্রিশ গোডাউন ও বধ্যভূমি এলাকায় প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ সৌন্দর্য বর্ধন কাজ করেছিলেন। এরপর থেকে এই এলাকার উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা দেখায়নি কেউ।’
ডিসিঘাটের ভাটারখালের ওপর একটি ব্রিজ সম্প্রতি সংস্কার করে নিরাপদ করা হয়েছে। লোহা দিয়ে ঢালাই করে চমৎকার পথ তৈরি হওয়ায় সেখানে যাতায়াত বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু চাঁদমারির ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে এভাবেই।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ ব্রিজটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ২০১৯ সালে এর নির্মাণ শেষ করলেও ব্রিজের দুপাশের সংযোগ তৈরি হয়নি। এখনো অসমাপ্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ জানান, ‘মুক্তিযোদ্ধা পার্ক সীমানা পেরোলেই হেরিংবন সড়ক রয়েছে কেডিসি পর্যন্ত। কিন্তু বস্তি এলাকার লোকেরা নদী পাড়ে দোকানপাট তুলে হাঁটাচলার পথ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। কেডিসি পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। কেডিসি থেকে চাঁদমারি খেয়াঘাট আসতে হয় ঘুরপথে।’
এই ব্রিজের ব্যবস্থাপনা কারা করবে- তা নিয়েও রয়েছে দায়িত্বের জটিলতা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল জানান, ‘শহররক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। ডিসিঘাট থেকে কেডিসি ও চাঁদমারি খেয়াঘাট বাঁধ সংস্কার করা হবে। তবে ব্রিজ বা পুল এগুলো সিটি করপোরেশনের কাজ।’
অথচ নগর চিন্তাবিদ ও বরিশাল সাহিত্য সংসদের সহসভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি ব্রিজ দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এবং এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এটি কখনোই প্রত্যাশা নয়। জনগণের সহজ যোগাযোগ পথ বাস্তবায়িত না হওয়ায় মানুষ চলাচলে কষ্ট পাচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আশা, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক থেকে চাঁদমারি খেয়াঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়ক প্রশস্ত করা হলে, অবৈধ দোকানপাট ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হলে এবং চাঁদমারির ভাঙা ব্রিজটি সংস্কার করে সড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে বরিশালের পর্যটন খাত চাঙ্গা হবে। শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু থেকে বেলতলা পর্যন্ত সাত কিলোমিটার নদী তীরবর্তী এলাকা দখলমুক্ত করে নদীর পাড়ে হাঁটার উপযোগী করে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।কীর্তনখোলার বুকে প্রতিদিন ভেসে ওঠে পর্যটনের স্বপ্ন। সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিকে যদি সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে একদিন বরিশালও পর্যটকদের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে এখনও পেরিয়ে যেতে হবে অবহেলা আর অনিশ্চয়তার অনেক বাঁধা।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
কীর্তনখোলার বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বরিশাল। নদীর দুই পাড়ে ছড়িয়ে আছে অপরূপ সৌন্দর্য। বেলতলা খেয়াঘাট থেকে ডিসিঘাট, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পেরিয়ে কেডিসি হয়ে চাঁদমারি খেয়াঘাট- সাত কিলোমিটার নদী তীর ঘেঁষা এই পথটাই হয়ে উঠতে পারত বরিশালের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সেখানে উঁকি দিচ্ছে অবহেলা আর অনিশ্চয়তা।
কীর্তনখোলা নদী বেষ্টিত বরিশালের নদী তীরবর্তী শহররক্ষা বাঁধ ধরে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে চমৎকার পর্যটন সম্ভাবনা। নদী পাড় ঘেঁষা ‘সেলফি সড়ক’ যেন এক টুকরো স্বপ্ন। ত্রিশ গোডাউন এলাকা থেকে গ্যাস টারবাইন এলাকা পর্যন্ত এই সড়কটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। তবে সৌন্দর্যের মাঝেই হিমশিম খেতে হয় পর্যটকদের।
কেডিসি থেকে চাঁদমারি আর ত্রিশ গোডাউন থেকে গ্যাস টারবাইন এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ না থাকায় হাঁটু কাদাজলে ভিজতে হয় দর্শনার্থীদের। অবৈধ দোকানপাট আর বখাটে আড্ডার কারণে পর্যটকরা ঝুঁকি নিতে চান না। বেশির ভাগ দর্শক চরকাউয়া খেয়াঘাট বা ডিসিঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত এসেই ফিরে যান। নদী তীর ধরে সোজা বেড়িবাঁধ না থাকায় ঘুরপথ পেরিয়ে যেতে হয় কেডিসি বা চাঁদমারিতে।
চাঁদমারি খেয়াঘাটের সাগরদি খালের ওপর নির্মিত ব্রিজটির একাংশ গত আট বছর ধরে অসমাপ্ত পড়ে আছে। অথচ প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতি এই এলাকায়। ব্রিজটি ব্যবহার করতে নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও খুঁটি দিয়ে স্লাপ বানিয়ে নিয়েছেন স্থানীয়রা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই স্লাপে পা পিছলে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু, নারী ও বৃদ্ধ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মনু মিয়া বলেন, ‘চরকাউয়া খেয়াঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত এবং চাঁদমারি খেয়াঘাটের ওপার থেকে ত্রিশ গোডাউন ও বধ্যভূমি এলাকায় প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ সৌন্দর্য বর্ধন কাজ করেছিলেন। এরপর থেকে এই এলাকার উন্নয়নে খুব একটা ভূমিকা দেখায়নি কেউ।’
ডিসিঘাটের ভাটারখালের ওপর একটি ব্রিজ সম্প্রতি সংস্কার করে নিরাপদ করা হয়েছে। লোহা দিয়ে ঢালাই করে চমৎকার পথ তৈরি হওয়ায় সেখানে যাতায়াত বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু চাঁদমারির ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে এভাবেই।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ ব্রিজটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ২০১৯ সালে এর নির্মাণ শেষ করলেও ব্রিজের দুপাশের সংযোগ তৈরি হয়নি। এখনো অসমাপ্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ জানান, ‘মুক্তিযোদ্ধা পার্ক সীমানা পেরোলেই হেরিংবন সড়ক রয়েছে কেডিসি পর্যন্ত। কিন্তু বস্তি এলাকার লোকেরা নদী পাড়ে দোকানপাট তুলে হাঁটাচলার পথ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। কেডিসি পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। কেডিসি থেকে চাঁদমারি খেয়াঘাট আসতে হয় ঘুরপথে।’
এই ব্রিজের ব্যবস্থাপনা কারা করবে- তা নিয়েও রয়েছে দায়িত্বের জটিলতা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল জানান, ‘শহররক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। ডিসিঘাট থেকে কেডিসি ও চাঁদমারি খেয়াঘাট বাঁধ সংস্কার করা হবে। তবে ব্রিজ বা পুল এগুলো সিটি করপোরেশনের কাজ।’
অথচ নগর চিন্তাবিদ ও বরিশাল সাহিত্য সংসদের সহসভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি ব্রিজ দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এবং এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এটি কখনোই প্রত্যাশা নয়। জনগণের সহজ যোগাযোগ পথ বাস্তবায়িত না হওয়ায় মানুষ চলাচলে কষ্ট পাচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আশা, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক থেকে চাঁদমারি খেয়াঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়ক প্রশস্ত করা হলে, অবৈধ দোকানপাট ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হলে এবং চাঁদমারির ভাঙা ব্রিজটি সংস্কার করে সড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে বরিশালের পর্যটন খাত চাঙ্গা হবে। শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু থেকে বেলতলা পর্যন্ত সাত কিলোমিটার নদী তীরবর্তী এলাকা দখলমুক্ত করে নদীর পাড়ে হাঁটার উপযোগী করে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।কীর্তনখোলার বুকে প্রতিদিন ভেসে ওঠে পর্যটনের স্বপ্ন। সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিকে যদি সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে একদিন বরিশালও পর্যটকদের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে এখনও পেরিয়ে যেতে হবে অবহেলা আর অনিশ্চয়তার অনেক বাঁধা।

আপনার মতামত লিখুন