প্রাসাদের নগরী মেক্সিকো সিটির প্রাচীন আজতেকা স্টেডিয়ামে যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিট) বিশ্বকাপের সর্ববৃহৎ আসরের পর্দা ওঠে। লাতিন পপের রানি শাকিরার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘দাই দাই’।
নাইজেরিয়ান সুপারস্টার বার্না বয়ের সঙ্গে এই গানে ফুটবল উৎসবের যাদুকরী শুরুর ইশারা মিললো। শুধু গান নয়, এই আয়োজনের প্রতিটি সুরের টিকিটের একাংশ ফিফার ১০ কোটি ডলারের বৈশ্বিক শিক্ষা তহবিলে যাবে- ফুটবলকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক বানালো এই উদ্বোধন।
ঐতিহ্যবাহী পাপেল পিকাডো (মেক্সিকোর কাগজ কেটে শিল্প তৈরির এক অনন্য কৌশল) দৃশ্যপটে আলো ফেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। আদিবাসী শিল্পীরা লয়ে বাজালেন তাদের পূর্বপুরুষের ছন্দ। লিলা ডাউন্স স্প্যানিশ ও ইংরেজিতে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানালেন- “পৃথিবীর মানুষ, তোমাদের স্বাগত জানাই মেক্সিকোতে।” ভাষার দেয়াল ভেঙে শুধু ফুটবলের কথাই বললেন তিনি।
এরপর পরপর মঞ্চ মাতাতে থাকেন ড্যানি ওশেন, জনপ্রিয় গায়িকা বেলিন্ডা এবং কিংবদন্তি কুম্বিয়া ব্যান্ড ‘লস অ্যানজেলেস আজুলেস’। তারা পরিবেশন করেন অফিসিয়াল অ্যালবামের গান ‘পোর এয়া’। মঞ্চের আলো নিভে এলো যখন কিংবদন্তি রক গ্রুপ ‘মানা’ বাজাল ‘ওই মি আমোর’। দীর্ঘ লাল ট্রেঞ্চকোটে ফের ওলভেরার সেই সুর যখন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রতিধ্বনিত হয়, ৪৫ হাজার দর্শক একসূত্রে বাঁধা পড়েন।এর আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনও তিন স্বাগতিক দেশের ভিন্ন ভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়নি। ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ আয়োজন করলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল কেবল সিউলে। ফিফা এ রেকর্ড ভেঙেছে এবার।
মেক্সিকো সিটির পর শুক্রবার (১২ জুন) কানাডার টরন্টোতে দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে; যেখানে মঞ্চ মাতাবেন কানাডিয়ান তারকারা। এরপর শনিবার (১৩ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে তৃতীয় ও শেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন কেটি পেরি। ফুটবল এখন কেবল খেলা নয়, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মঞ্চও বটে।
আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোতে পুরো আয়োজন নিয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। তবে একটি সূক্ষ্ম বিতর্কও ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ইংরেজি নেটওয়ার্ক ফক্স স্পোর্টস শাকিরার পারফরম্যান্সের পুরোটা সম্প্রচার করেনি। তার বদলে অ্যালেক্সি লালাস ও টিয়েরি অঁরির বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্ব পায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, কারণ স্প্যানিশ ভাষার টেলিমুন্ডো নেটওয়ার্ক পুরো অনুষ্ঠান দেখিয়েছে। ফক্সের বিরুদ্ধে সমালোচনা সত্ত্বেও, বিশ্বব্যাপী ১২ কোটি দর্শকের বেশি প্রত্যক্ষ করেছে উদ্বোধনী এই জাঁকজমক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া দুই ধরনের। শাকিরার জোরালো উপস্থিতি ও এনার্জিকে অনেকে প্রশংসা করলেও, ‘দাই দাই’ এর আফ্রোবিটস অংশের করিওগ্রাফি অপেশাদার মনে হয়েছে অনেকে।টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেউ কেউ এ অনুষ্ঠানকে ‘ওয়াকায় ওয়াকার পর হতাশাজনক’ বলছেন। ‘এটা দারুণ নয়’, ‘শুধু শাকিরা নয়, পুরো ব্যাপারটাই ফ্লপ’- এমন মন্তব্য ইউটিউব ও টুইটারে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নির্বিচারে প্রশংসাও কম নয়। ‘শোয়ের মানচিত্রে কলম্বিয়ার পতাকা উড়িয়েছেন শাকিরা’- লিখেছেন অনেকে।
দাপুটে এই আয়োজনে শুধু পপ নক্ষত্রই ঝলমল করেনি, বরং পুরো মেক্সিকো সংস্কৃতির ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্টার লাইনআপে ছিলেন:শাকিরা ও বার্না বয়- ‘দাই দাই’ শিরোনামের অফিসিয়াল বিশ্বকাপ গান। জে বালভিন- ল্যাটিন র্যাপের জাদু নিয়ে মঞ্চে হাজির। বেলিন্ডা ও লস অ্যানজেলেস আজুলেস- ঐতিহ্য ও আধুনিক পপের সংমিশ্রণ।
ড্যানি ওশেন-’পার্টিজাডো’ গানটি পরিবেশন।মেক্সিকান রক ব্যান্ড মানা- ‘ওই মি আমোর’ গেয়ে সৃষ্টি করলেন গ্যালারিতে উন্মাদনা।আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ ও টাইল- মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশন। এছাড়া, হলিউড তারকা সালমা হায়েক পিনো অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন। ফিফার বার্তা ছিল স্পষ্ট: ফুটবলের রাজনৈতিক সীমানা ভাঙার ক্ষমতা আছে, আর সেটা শুরু হলো আজতেকায়।বিরতির সময়ে ফিফা বিশ্বকাপের দুই কলসাস পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনাকে স্মরণ করে। পেলে ও ম্যারাডোনা দুজনের বিশ্বকাপ জয়ের সিংহভাগ জয় সাক্ষী হয়েছিল এই মেক্সিকান মাঠে- পেলে ১৯৭০ সালে, ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে। তাদের আদরের স্তম্ভে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শাকিরার পারফরম্যান্স শেষে পৃথিবীর কোটি চোখ তখন উদ্বোধনী ম্যাচে- মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা। আলোর খেলা থেমে শুরু হয় আরেক ধরনের জাদু। বিশ্বকাপ, সব বাধা ভেঙে শুরু হলো তার দৌড়। আজকের স্মৃতি হয়তো আরও কাউকে অনুপ্রাণিত করবে ফুটবলের মাঠে।মেক্সিকো সিটির পর টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অপেক্ষা। ফুটবলের ধর্মীয় উৎসব আবার শুরু হলো।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
প্রাসাদের নগরী মেক্সিকো সিটির প্রাচীন আজতেকা স্টেডিয়ামে যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিট) বিশ্বকাপের সর্ববৃহৎ আসরের পর্দা ওঠে। লাতিন পপের রানি শাকিরার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘দাই দাই’।
নাইজেরিয়ান সুপারস্টার বার্না বয়ের সঙ্গে এই গানে ফুটবল উৎসবের যাদুকরী শুরুর ইশারা মিললো। শুধু গান নয়, এই আয়োজনের প্রতিটি সুরের টিকিটের একাংশ ফিফার ১০ কোটি ডলারের বৈশ্বিক শিক্ষা তহবিলে যাবে- ফুটবলকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক বানালো এই উদ্বোধন।
ঐতিহ্যবাহী পাপেল পিকাডো (মেক্সিকোর কাগজ কেটে শিল্প তৈরির এক অনন্য কৌশল) দৃশ্যপটে আলো ফেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। আদিবাসী শিল্পীরা লয়ে বাজালেন তাদের পূর্বপুরুষের ছন্দ। লিলা ডাউন্স স্প্যানিশ ও ইংরেজিতে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানালেন- “পৃথিবীর মানুষ, তোমাদের স্বাগত জানাই মেক্সিকোতে।” ভাষার দেয়াল ভেঙে শুধু ফুটবলের কথাই বললেন তিনি।
এরপর পরপর মঞ্চ মাতাতে থাকেন ড্যানি ওশেন, জনপ্রিয় গায়িকা বেলিন্ডা এবং কিংবদন্তি কুম্বিয়া ব্যান্ড ‘লস অ্যানজেলেস আজুলেস’। তারা পরিবেশন করেন অফিসিয়াল অ্যালবামের গান ‘পোর এয়া’। মঞ্চের আলো নিভে এলো যখন কিংবদন্তি রক গ্রুপ ‘মানা’ বাজাল ‘ওই মি আমোর’। দীর্ঘ লাল ট্রেঞ্চকোটে ফের ওলভেরার সেই সুর যখন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রতিধ্বনিত হয়, ৪৫ হাজার দর্শক একসূত্রে বাঁধা পড়েন।এর আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনও তিন স্বাগতিক দেশের ভিন্ন ভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়নি। ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ আয়োজন করলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল কেবল সিউলে। ফিফা এ রেকর্ড ভেঙেছে এবার।
মেক্সিকো সিটির পর শুক্রবার (১২ জুন) কানাডার টরন্টোতে দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে; যেখানে মঞ্চ মাতাবেন কানাডিয়ান তারকারা। এরপর শনিবার (১৩ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে তৃতীয় ও শেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন কেটি পেরি। ফুটবল এখন কেবল খেলা নয়, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মঞ্চও বটে।
আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোতে পুরো আয়োজন নিয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। তবে একটি সূক্ষ্ম বিতর্কও ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ইংরেজি নেটওয়ার্ক ফক্স স্পোর্টস শাকিরার পারফরম্যান্সের পুরোটা সম্প্রচার করেনি। তার বদলে অ্যালেক্সি লালাস ও টিয়েরি অঁরির বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্ব পায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, কারণ স্প্যানিশ ভাষার টেলিমুন্ডো নেটওয়ার্ক পুরো অনুষ্ঠান দেখিয়েছে। ফক্সের বিরুদ্ধে সমালোচনা সত্ত্বেও, বিশ্বব্যাপী ১২ কোটি দর্শকের বেশি প্রত্যক্ষ করেছে উদ্বোধনী এই জাঁকজমক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া দুই ধরনের। শাকিরার জোরালো উপস্থিতি ও এনার্জিকে অনেকে প্রশংসা করলেও, ‘দাই দাই’ এর আফ্রোবিটস অংশের করিওগ্রাফি অপেশাদার মনে হয়েছে অনেকে।টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেউ কেউ এ অনুষ্ঠানকে ‘ওয়াকায় ওয়াকার পর হতাশাজনক’ বলছেন। ‘এটা দারুণ নয়’, ‘শুধু শাকিরা নয়, পুরো ব্যাপারটাই ফ্লপ’- এমন মন্তব্য ইউটিউব ও টুইটারে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নির্বিচারে প্রশংসাও কম নয়। ‘শোয়ের মানচিত্রে কলম্বিয়ার পতাকা উড়িয়েছেন শাকিরা’- লিখেছেন অনেকে।
দাপুটে এই আয়োজনে শুধু পপ নক্ষত্রই ঝলমল করেনি, বরং পুরো মেক্সিকো সংস্কৃতির ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্টার লাইনআপে ছিলেন:শাকিরা ও বার্না বয়- ‘দাই দাই’ শিরোনামের অফিসিয়াল বিশ্বকাপ গান। জে বালভিন- ল্যাটিন র্যাপের জাদু নিয়ে মঞ্চে হাজির। বেলিন্ডা ও লস অ্যানজেলেস আজুলেস- ঐতিহ্য ও আধুনিক পপের সংমিশ্রণ।
ড্যানি ওশেন-’পার্টিজাডো’ গানটি পরিবেশন।মেক্সিকান রক ব্যান্ড মানা- ‘ওই মি আমোর’ গেয়ে সৃষ্টি করলেন গ্যালারিতে উন্মাদনা।আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ ও টাইল- মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশন। এছাড়া, হলিউড তারকা সালমা হায়েক পিনো অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন। ফিফার বার্তা ছিল স্পষ্ট: ফুটবলের রাজনৈতিক সীমানা ভাঙার ক্ষমতা আছে, আর সেটা শুরু হলো আজতেকায়।বিরতির সময়ে ফিফা বিশ্বকাপের দুই কলসাস পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনাকে স্মরণ করে। পেলে ও ম্যারাডোনা দুজনের বিশ্বকাপ জয়ের সিংহভাগ জয় সাক্ষী হয়েছিল এই মেক্সিকান মাঠে- পেলে ১৯৭০ সালে, ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে। তাদের আদরের স্তম্ভে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শাকিরার পারফরম্যান্স শেষে পৃথিবীর কোটি চোখ তখন উদ্বোধনী ম্যাচে- মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা। আলোর খেলা থেমে শুরু হয় আরেক ধরনের জাদু। বিশ্বকাপ, সব বাধা ভেঙে শুরু হলো তার দৌড়। আজকের স্মৃতি হয়তো আরও কাউকে অনুপ্রাণিত করবে ফুটবলের মাঠে।মেক্সিকো সিটির পর টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অপেক্ষা। ফুটবলের ধর্মীয় উৎসব আবার শুরু হলো।

আপনার মতামত লিখুন