চায়ের স্বর্গরাজ্য ও পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় তিন বছর ধরে একজনও নারী শিক্ষক নেই। প্রায় ৬০০ ছাত্রীর এই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষক না থাকায় বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য, মানসিক সহায়তা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সংকট তৈরি হয়েছে।
একাধিকবার আবেদন এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার পরও চলমান শিক্ষক বদলির তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম না থাকায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। অনুমোদিত ১৯টি শিক্ষক পদের মধ্যে বর্তমানে ছয়টি শূন্য। বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষকও নেই। সর্বশেষ কর্মরত নারী শিক্ষক তিন বছর আগে মারা যাওয়ার পর থেকে নতুন কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন হয়নি। সম্প্রতি একজন ধর্ম শিক্ষককে ডেপুটেশনে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
গত ১৬ থেকে ২৩ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ৩৮ জন শিক্ষককে বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে বদলি করলেও শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক বলে, “আমরা অনেক বিষয়ে পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারি না। বিশেষ করে মাসিক বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হলে ছোট শ্রেণির মেয়েরা খুব বিপাকে পড়ে। একজন নারী শিক্ষক থাকলে এসব সমস্যা সহজে জানানো যেত।”
আরেক শিক্ষার্থী বৈশাখী পাল জানায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদান করলেও মেয়েদের কিছু বিষয় নারী শিক্ষকের সঙ্গেই আলোচনা করা স্বাভাবিক। নারী শিক্ষক না থাকায় গার্লস গাইডের কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিভাবক আব্দুর রহিম বলেন, “আমার মেয়ের কোনো সমস্যা হলে বাসায় এসে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে। বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকলে মেয়েরা প্রয়োজনের সময় সেখানেও সহায়তা পেত।”
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “পাঠদানে কোনো সমস্যা না হলেও ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তারা পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এছাড়া বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম ও প্রতিযোগিতায় দূরে যেতে হলে নারী শিক্ষকের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।”
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আফম আব্দুল হাই ডন বলেন, “বয়ঃসন্ধিকাল মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে একজন নারী শিক্ষক থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজে নিজের সমস্যার কথা জানাতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ পায়। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকা জরুরি।”
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলেন, “নারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ মার্চ আবারও নারী শিক্ষক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল সিলেট বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় বিদ্যালয়টিতে নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২১ মে সেই সিদ্ধান্ত মাউশিতে পাঠানো হয়। ”
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘গত ২০ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সিলেট অঞ্চলের পরিচালকও নারী শিক্ষক পদায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ঢাকায় আবেদন করেন।’
তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীও দ্রুত দুই থেকে তিনজন নারী শিক্ষক পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন। তবে এখনো কোনো পদায়ন হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম জিয়াউল হায়দার হেনরী বলেন, “এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমার দায়িত্ব হলো আদেশ বাস্তবায়ন করা।”
অন্যদিকে, মাউশির উপপরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, “নতুন পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে আবেদনকারী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পদায়ন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সেখানে থাকতে চান না।”
১৯৩০ সালে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, জমিদার ও সমাজ সংস্কারক রাধানাথ দেব চৌধুরী তার মায়ের নামে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এর নাম হয় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জন করলেও শিক্ষক সংকটের কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন নারী শিক্ষক না থাকা শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গেও জড়িত। তাই দ্রুত অন্তত কয়েকজন নারী শিক্ষক এবং একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
চায়ের স্বর্গরাজ্য ও পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় তিন বছর ধরে একজনও নারী শিক্ষক নেই। প্রায় ৬০০ ছাত্রীর এই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষক না থাকায় বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য, মানসিক সহায়তা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সংকট তৈরি হয়েছে।
একাধিকবার আবেদন এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার পরও চলমান শিক্ষক বদলির তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম না থাকায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। অনুমোদিত ১৯টি শিক্ষক পদের মধ্যে বর্তমানে ছয়টি শূন্য। বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষকও নেই। সর্বশেষ কর্মরত নারী শিক্ষক তিন বছর আগে মারা যাওয়ার পর থেকে নতুন কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন হয়নি। সম্প্রতি একজন ধর্ম শিক্ষককে ডেপুটেশনে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
গত ১৬ থেকে ২৩ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ৩৮ জন শিক্ষককে বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে বদলি করলেও শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক বলে, “আমরা অনেক বিষয়ে পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারি না। বিশেষ করে মাসিক বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হলে ছোট শ্রেণির মেয়েরা খুব বিপাকে পড়ে। একজন নারী শিক্ষক থাকলে এসব সমস্যা সহজে জানানো যেত।”
আরেক শিক্ষার্থী বৈশাখী পাল জানায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদান করলেও মেয়েদের কিছু বিষয় নারী শিক্ষকের সঙ্গেই আলোচনা করা স্বাভাবিক। নারী শিক্ষক না থাকায় গার্লস গাইডের কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিভাবক আব্দুর রহিম বলেন, “আমার মেয়ের কোনো সমস্যা হলে বাসায় এসে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে। বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকলে মেয়েরা প্রয়োজনের সময় সেখানেও সহায়তা পেত।”
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “পাঠদানে কোনো সমস্যা না হলেও ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তারা পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এছাড়া বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম ও প্রতিযোগিতায় দূরে যেতে হলে নারী শিক্ষকের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।”
শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আফম আব্দুল হাই ডন বলেন, “বয়ঃসন্ধিকাল মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে একজন নারী শিক্ষক থাকলে শিক্ষার্থীরা সহজে নিজের সমস্যার কথা জানাতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ পায়। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক থাকা জরুরি।”
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলেন, “নারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ মার্চ আবারও নারী শিক্ষক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল সিলেট বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় বিদ্যালয়টিতে নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২১ মে সেই সিদ্ধান্ত মাউশিতে পাঠানো হয়। ”
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘গত ২০ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সিলেট অঞ্চলের পরিচালকও নারী শিক্ষক পদায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ঢাকায় আবেদন করেন।’
তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীও দ্রুত দুই থেকে তিনজন নারী শিক্ষক পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন। তবে এখনো কোনো পদায়ন হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম জিয়াউল হায়দার হেনরী বলেন, “এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমার দায়িত্ব হলো আদেশ বাস্তবায়ন করা।”
অন্যদিকে, মাউশির উপপরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, “নতুন পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে আবেদনকারী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পদায়ন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সেখানে থাকতে চান না।”
১৯৩০ সালে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, জমিদার ও সমাজ সংস্কারক রাধানাথ দেব চৌধুরী তার মায়ের নামে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এর নাম হয় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ শতাংশ সাফল্য অর্জন করলেও শিক্ষক সংকটের কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন নারী শিক্ষক না থাকা শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গেও জড়িত। তাই দ্রুত অন্তত কয়েকজন নারী শিক্ষক এবং একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন