সংবাদ

কার্নিশে ঝোলা তরুণকে গুলি, ট্রাইব্যুনালে রায় রোববার


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

কার্নিশে ঝোলা তরুণকে গুলি, ট্রাইব্যুনালে রায় রোববার
ছবি : সংগৃহীত

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করা এবং অন্য দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল রোববার।

গত ১৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর রায়ের এই দিন নির্ধারণ করে।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

প্রসিকিউটর এম এইচ তামিম জানিয়েছেন, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এই মামলার রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এই মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এ মামলার অভিযুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে কেবল রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার আছেন। বাকি চার আসামি বর্তমানে পলাতক। তারা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান এবং রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছিল। তখন প্রসিকিউশন আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে জানায়, ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। গত ৪ মার্চ রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও প্রসিকিউশন পক্ষ নতুন করে ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ (ভিডিও ফুটেজ) জমা দেওয়ার আবেদন করলে রায় পিছিয়ে যায়।

তখন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশনের’ ভিডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি কার নির্দেশে গুলি করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। ওই ভিডিওটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি কি না, তা যাচাইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল সেটিকে ‘অথেনটিক’ বা সঠিক বলে গ্রহণ করেন।

এদিকে, মামলার একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকার গত ১০ জুন ট্রাইব্যুনালে পুনর্জবানবন্দি দিয়ে অভিযোগ করেন, প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ওই স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছেন। তবে প্রসিকিউটর জোহা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জোহা স্বীকার করেছেন যে ভিডিওতে জিজ্ঞাসাবাদকারী ব্যক্তিটি তিনি নিজে, তবে কোনো জোরজবরদস্তির ঘটনা ঘটেনি।

পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার মূলত সেই ভিডিও নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর তাকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে ওসি (যে থানা থেকে চঞ্চলকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেই থানার ওসি) সাহেব তাকে তার কক্ষে নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ও একজন নারী সেই ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন। সেই পুরুষ লোকটি ওসির কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন। নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা নামে পরিচয় দেন সেই পুরুষ লোক।

পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার বলেন, এরপর জোহা বলেন, তিনি যা বলবেন, তা তাকে (চঞ্চলকে) স্বীকার করতে হবে। তখন চঞ্চল চন্দ্র বলেন, তিনি রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে গুলি করেননি। তখন জোহা তার সঙ্গে উগ্র আচরণ করেন এবং তার কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বলেন।

জবানবন্দিতে চঞ্চল বলেন, ‘আমি তার কথায় রাজি না হলে সে আমাকে ভয়ভীতি দেখায়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমাকে সেনাবাহিনীর দ্বারা মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমার নিকটাত্মীয়-স্বজনকে হত্যার হুমকি দেয়। তখন ওসি সাহেব (গ্রেপ্তারের সময় যে থানায় চঞ্চল দায়িত্বে ছিলেন, সেই থানার ওসি) বলেন, “জোহা যা বলে তা মেনে নাও।” পরবর্তীকালে আমি ওই জবানবন্দি দিই, যা রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করেছেন। বস্তু প্রদর্শনী-ঠ-তে (যে ভিডিওতে চঞ্চল গুলি করার কথা স্বীকার করেন) বিবৃত জবানবন্দি প্রদানের সময় আমার মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল।’

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন আমির হোসেন নামে এক তরুণ। তিনি ছাদের কার্নিশ ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই দিনে ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে আরও দুজন নিহত হন।

গত বছরের ৭ আগস্ট এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামীকাল এই আলোচিত মামলার রায় আসতে যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬


কার্নিশে ঝোলা তরুণকে গুলি, ট্রাইব্যুনালে রায় রোববার

প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬

featured Image

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করা এবং অন্য দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল রোববার।

গত ১৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর রায়ের এই দিন নির্ধারণ করে।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করবেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

প্রসিকিউটর এম এইচ তামিম জানিয়েছেন, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এই মামলার রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এই মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এ মামলার অভিযুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে কেবল রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার আছেন। বাকি চার আসামি বর্তমানে পলাতক। তারা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান এবং রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছিল। তখন প্রসিকিউশন আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে জানায়, ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে আসামিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। গত ৪ মার্চ রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও প্রসিকিউশন পক্ষ নতুন করে ‘ডিজিটাল এভিডেন্স’ (ভিডিও ফুটেজ) জমা দেওয়ার আবেদন করলে রায় পিছিয়ে যায়।

তখন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ‘এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশনের’ ভিডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি কার নির্দেশে গুলি করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। ওই ভিডিওটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি কি না, তা যাচাইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল সেটিকে ‘অথেনটিক’ বা সঠিক বলে গ্রহণ করেন।

এদিকে, মামলার একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকার গত ১০ জুন ট্রাইব্যুনালে পুনর্জবানবন্দি দিয়ে অভিযোগ করেন, প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ওই স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছেন। তবে প্রসিকিউটর জোহা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জোহা স্বীকার করেছেন যে ভিডিওতে জিজ্ঞাসাবাদকারী ব্যক্তিটি তিনি নিজে, তবে কোনো জোরজবরদস্তির ঘটনা ঘটেনি।

পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার মূলত সেই ভিডিও নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর তাকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে ওসি (যে থানা থেকে চঞ্চলকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেই থানার ওসি) সাহেব তাকে তার কক্ষে নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ও একজন নারী সেই ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন। সেই পুরুষ লোকটি ওসির কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন। নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা নামে পরিচয় দেন সেই পুরুষ লোক।

পুনর্জবানবন্দিতে চঞ্চল সরকার বলেন, এরপর জোহা বলেন, তিনি যা বলবেন, তা তাকে (চঞ্চলকে) স্বীকার করতে হবে। তখন চঞ্চল চন্দ্র বলেন, তিনি রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে গুলি করেননি। তখন জোহা তার সঙ্গে উগ্র আচরণ করেন এবং তার কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বলেন।

জবানবন্দিতে চঞ্চল বলেন, ‘আমি তার কথায় রাজি না হলে সে আমাকে ভয়ভীতি দেখায়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমাকে সেনাবাহিনীর দ্বারা মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি তাতেও রাজি না হলে সে আমার নিকটাত্মীয়-স্বজনকে হত্যার হুমকি দেয়। তখন ওসি সাহেব (গ্রেপ্তারের সময় যে থানায় চঞ্চল দায়িত্বে ছিলেন, সেই থানার ওসি) বলেন, “জোহা যা বলে তা মেনে নাও।” পরবর্তীকালে আমি ওই জবানবন্দি দিই, যা রাষ্ট্রপক্ষ দাখিল করেছেন। বস্তু প্রদর্শনী-ঠ-তে (যে ভিডিওতে চঞ্চল গুলি করার কথা স্বীকার করেন) বিবৃত জবানবন্দি প্রদানের সময় আমার মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল।’

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন আমির হোসেন নামে এক তরুণ। তিনি ছাদের কার্নিশ ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই দিনে ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে আরও দুজন নিহত হন।

গত বছরের ৭ আগস্ট এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামীকাল এই আলোচিত মামলার রায় আসতে যাচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত