গত ১৮ এপ্রিল শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে একদিনে এত মৃত্যু ২০১৬ সালে একবার ঘটেছিল। ওই বছর মে মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে দুই দিনে সারাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে ৮১ জনের। বলা হয় এনিয়ে কারও কিছু করার নেই এ হলো প্রকৃতির মার। আসলে কি তাই নাকি আমাদের কিছু করনীয় আছে। সেকথায় পরে আসছি তার আগে আরো একটা হিসাব দেখা যাক। ২০১৫ সালে বজ্রপাতে ১৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছিল। কী ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি ভাবলে গা শিউরে ওঠে। দুই দিনে যখন ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটে তখন আমি গ্রামে ছিলাম। এনিয়ে অনেক রকম কথা বলতে শুনেছি তখন মানুষকে।আমাদের গ্রামীন জনপদে বজ্রপাতকে ঠাটাপড়া বা বাজপড়া বলা হয় অনেক এলাকায়। তবে যায়-ই বলা হোক এনিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে মানুষের মনে। বৃষ্টিবাদল-ঝড়বাতাসের দিনে। গ্রামের মানুষ যারা মাঠে-ময়দানে কাজেকামে অবস্থান করেন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মারাও পড়েন যেমন খবরে এসেছে। দেখা যায় ঠাটাপড়া বা বাজপড়া এরকম দুটো ভয়ঙ্কর শব্দ সমাজে চলে এসেছে একটা অভিশাপ রূপে । এর থেকে বড় অভিশাপ আর কিছু হতে পারে না। যেমন ‘ও যেন ঠাটা পড়ে মরে’ বা ওর অমুক যেন ‘মাথায় বাজ পড়ে মরে’ এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর হয় না। এখন অবশ্য মানুষ ওই অভিশাপ বা বদদোওয়া এসব আর তেমন আমলে নেয় না। বজ্রপাতে মানুষ মারা যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর ভয়াবহতার কথাও নতুন কিছু না। চোখের পলকে একটা সুস্থ-সবল মানুষ ঝলসে গিয়ে প্রাণ হারায় । ঝড়ঝঞ্ঝা জলোচ্ছাসে প্রলয় কাণ্ড ঘটতে পারে। বেশি ঘটাতে পারে ভূমিকম্প। কিন্তু এসবে মানুষের কিছু করণীয় নেই। বলা হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ুর কারণে এগুলো বেড়ে গেছে। সেটা এখানে বিষয় না। বিষয় বজ্রপাত এবং বজ্রপাত নিয়ে লোকে কী বলে।শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে বজ্রপাতের আতঙ্ক কম। কারণ বহুতল ভবন বিনির্মাণে বজ্রপাত প্রতিরোধে এক ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। যেমন নির্মাণ কাজের শুরুতেই (ফাউন্ডেশনের আগেই) বোরিং করে একেবারে মাটির গভীরে নির্দিষ্ট কিছু মেটাল বসিয়ে দেয়া হয় এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটা বিশেষ তার ওপরে তুলে ভবনের আর্থিং করা হয়। এতে কাজ হয়। নাহলে আজকের দুনিয়ার চেহারা পাল্টে যেত। কারণ বাজ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় পড়ে। ফাঁকা মাঠে একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকলে সেখানে যদি বাজ পড়ে ওই লোকটার মাথায় পড়বে যেহেতু তার নিকটবর্তী তার থেকে উঁচু কিছু নেই। তাই বলা হয় এমন হলে একেবারে মাটিতে শুয়ে পড়তে হবে। আবার কোন গাছের একেবারে নিচে না দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়াতে হবে। কেননা বাজ পড়লে ওই গাছটাতে পড়বে। এখানে আবার একটু কথা বলে, তাহলে ওই বড় বড় মহিরুহু বটবৃক্ষ-অশ্বত্থ উজাড় হয়ে যাওয়ার আগে ওদের ওপর তো বাজ পড়তে দেখা যায়নি। এখন লোকে বলছে সেই বিশাল বিশাল আকৃতির দিগন্তজোড়া বৃক্ষরাজি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণেই বজ্রপাতে প্রাণহানি বেড়ে গেছে। মনে করা হয় ওগুলোই হয়তো বজ্রপাত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখত। এমন সব বৃক্ষরাজি বহুত ছিল আমরাই দেখেছি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নদীর বাঁকে বাঁকে বিলের ধারে ধারে তারা ছিল যেন পাহারাদার। এলাকার ল্যান্ডমার্ক। আমাদের বিলের চার ধারে চারটা বিশাল আকৃতির বৃক্ষ ছিল। দেখে মনে হতো চারদিকে যেন চারটা মা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে চোখের সামনে সব নিধন হয়ে গেল। নিধন হয়ে গেল সেই যত্রতত্র থাকা তালগাছের সারি। দেখা গেছে ধারে কাছে তালগাছ থাকলে বজ্রপাত তার ওপরই ঘটেছে। মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। আমরাই দেখেছি ফাকা মাঠে যত্রতত্র ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ থেকেছে। এখন সেই বড় বড় বট-অশ্বত্থ-ঝাউ-তাল ফুরিয়ে এলেও বেড়েছে সামাজিক বনায়ন যার ভেতর প্রধানত রয়েছে মেহগনি গাছ । আমাদের বৃহত্তর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া এলাকায় এত পরিমাণে সামাজিক বনায়ন হয়েছে যে রাস্তার দুই ধারে সেই ধানক্ষেত-পাটখেত আর চোখে পড়ে না। মেহগনিগাছ দ্রুত বাড়ে। চাষবাসের ঝামেলা নেই। কয়েক বছর গেলেই একটা গাছের দাম হয়ে যায় হাজার হাজার টাকা। কাজেই চারদিকে এখন ওই মেহগনি গাছে ভরপুর। গ্রামবাসীই আবার বলছে এ গাছ নাকি মাটি থেকে পানি শোষণ করে বেশি। এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে গোটা দেশ—সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর যে বিষয়টা নিয়ে বলতে শোনা যায় তা হলো, এক সময় আমাদের দেশে মাঠে-ময়দানে বিল-খালে শিলাখণ্ড মাটিতে পোতা থাকতে দেখেছে মানুষ। আমিও দেখেছি। আমার বয়সের অনেকেই দেখে থাকবেন মনে করি। সেগুলো মাটি থেকে এক-দেড় হাত পরিমাণ উঁচু ছিল এবং প্রস্থে ছিল মানান মতো। একবারের একটা ঘটনা বলি। আমরা ৫-৬ জন কিশোর-যুবক আনন্দে মেতে উঠেছিলাম বিলের মাঝে পানিতে। সেখানে ছিল এরকম একটা শিলাখন্ড। আমার দেখা অন্যগুলোর থেকে সেটা বেশ বড় ছিল। বিলের মাঝে বলে হয়তোবা আকারে বড় হয়ে থাকবে। সেটা ছিল বাঁকা হয়ে। সেখানে পানি ছিল আমাদের কোমর-বুক সমান হবে। কি খেয়াল হলো, একজন বলে উঠলো— ধরো দেখি ওটাকে সোজা করা যায় কি-না। শুরু হয়ে গেল দহরম মহরম। ২-৩ জন করে একেক বারে সেই কাদাপানিতে মাথা-মুখ ডুবিয়ে শুরু হলো কাজ। কিন্তু না, কিছুতেই কিছু করা গেল না। এতে বোঝা যায় মাটির নিচেও তার অনেকখানি ছিল। যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলায় আমার বাড়ি। এটা ১৯৬৩-৬৪ সালের কথা।তারপর এক সময় সম্ভবত আশির দশকে কি তার একটু আগে-পরে হবে, শোনা গেল কারা না কারা ওইগুলো সব রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনা ঠিকই। তারপর দ্রুতই ওগুলো সারা দেশ থেকে উধাও হয়ে গেল। লোকমুখে শোনা গেল, ওগুলোর ভেতরে নাকি কোনো মূল্যবান ধাতব পদার্থ ছিল। এখন কিছু একটা যে ওর ভেতর ছিল তা বোধ হয় ধরে নেয়া যায়। তা না হলে দেখতে দেখতে ওগুলো এমন ভাবে উধাও হয়ে যাবে কেন। এখন গ্রামের কিছু মানুষ যাদের একটু বয়স হয়েছে তারা মনে করছেন ওগুলো সরিয়ে ফেলার কারণে বা না থাকার কারণে বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কারণ তারা মনে করেন ওগুলোর ভেতরে এমন একটা কিছু ছিল যা বজ্রপাত টেনে বা শুষে নিত। তবে কেউ ভেতরের সেই জিনিসটা দেখেছে বলে শোনা যায়নি। সত্য-মিথ্যা এখানে বিষয় নয়। গুজবেও অনেক কিছু হয়। তবে ওই জিনিসটা যে বিভিন্ন স্থানে বসান ছিল এটা সত্য। সারাদেশ থেকে উধাও হয়ে গেল এটাও সত্য। তা বজ্রপাত থেকে মানুষ বাঁচানোর উদ্দেশে কোন এক সময় ওগুলো বসান হোক আর জমির মৌজা-সীমানা নির্ধারণের জন্যই বসান হোক এখন সেগুলো নেই এটাও সত্য। গ্রামাঞ্চল থেকে সেই মহিরুহু বৃক্ষরাজি নিধন হয়ে গেছে এটাও সত্য।এঅবস্থায় সাধারণ মানুষের এরকম দুটো বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার যুক্তি জানি না কেউ উড়িয়ে দিতে পারেন কি না।অন্যদিকে শহরের মানুষের জীবন রক্ষার্থে ভবনগুলোর সাথে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হওয়া গেছে তা মাঠে-ময়দানে কোনোভাবে যুক্ত করে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষার্থে কেউ এগিয়ে আসবেন কি না সেটাও দেখার বিষয়।[লেখক: প্রাবন্ধিক]