বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি জেলা হলো লালমনিরহাট। এই জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান গুলোর মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ, বুড়িমাড়ি জিরো পয়েন্ট, তিনবিঘা করিডর, ৬৯ হিজরীর হারানো মসজিদ, কাকিনা জমিদার বাড়ি, তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি মন্দির অন্যতম।
গত ১৬- এপ্রিল তারিখ আমরা ৫ জন মিলে ভ্রমণে গিয়েছিলাম লালমনিরহাট জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনের জন্য । আমাদের এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিলাম আমিসহ উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের ( সদ্য অব:) শিক্ষক ইকবাল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক আব্দুস ছালাম, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শাহ আলম এবং শরীর চর্চা শিক্ষক ফরহাদ আহম্মেদ। দুই দিনের এই সফরে আমরা গাজীপুর থেকে লালমনিরহাটে যাই ট্রেনের মাধ্যমে।
১৬ এপ্রিল রাত সারে দশটার ট্রেনে আমরা জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করি। যদিও ট্রেনটি দেরিতে এসে রাত একটায় প্লাটফর্ম ছাড়ে। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন হয়ে শান্তাহার, বগুড়া গাইবান্ধা হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পরের দিন দুপুর ১২ টায় লালমনিরহাট পৌঁছায়। দীর্ঘ এই ট্রেন যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখে আমাদের অসাধারণ আনন্দ অনুভূত হয়। বিশেষ করে ট্রেনের ছুটে চলা ঝক ঝকাঝক শব্দ এবং দ্রুত গতিতে সবকিছুকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি দারুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। ভোরের প্রকৃতি, আবহমান গ্রাম বাংলার জনপদ, মাঠ ফসল ও মানুষের সাধারণ জীবনযাপনের এক সচিত্র রূপ ফুটে ওঠে চোখের সামনে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজের মন অজান্তে বলে ওঠে, " অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।"
দুপুর ১২ টায় আমরা লালমনিরহাট পৌঁছে একটা অটোরিকশা ভাড়া করে কাকিনা বাজার পর্যন্ত যাই। ওখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। কাকিনা বাজার থেকে একটা সিএনজি ভাড়া করি তিস্তা ব্যারেজ, তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুর পোতা ছিটমহল এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ঘুরে দেখার জন্য। সিএনজি চালক আমাদেরকে প্রথমে তিস্তা ব্যারেজ দেখার জন্য নিয়ে যায়। এখানে বলে রাখি, লালমনিরহাট জেলা হেডকোয়ার্টার থেকে এই দর্শনীয় স্থানগুলোর দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৯০ কিলোমিটার। জেলা শহর থেকে কাকিনা বাজারের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এই ২৫ কিলোমিটার পথ আমাদের অটোরিকশা দিয়ে যেতে হয়। লালমনিরহাট থেকে তিনবিঘা করিডোর পর্যন্ত ট্রেনেও যাতায়াত করা যায়। লালমনিরহাট আসতে দেরী হওয়ায় আমাদের ট্রেনের সময়সূচি মিস হয়।
তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় গিয়ে আমরা তিস্তা সেতু পাড় হই এবং ব্যারেজ পরিদর্শন করি। তিস্তা ব্যারেজ এলাকা মূলত পর্যটন কেন্দ্র। আরও অনেক পর্যটকদেরকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে দেখেছে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে রাখলাম স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার জন্য।
তিস্তা ব্যারেজ দেখা শেষ হলে আমরা সোজা তিনবিঘা করিডোর চলে আসি। আমরা যখন তিনবিঘা করিডোর পৌঁছাই তখন বিকাল ৪টা। তিনবিঘা করিডোর দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবির একজন সদস্য কাছে এসে আমাদের পরিচয় জানলো। এবং আমাদেরকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলো করিডোর এর জায়গাটুকু। যে করিডোর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা হয় সেটাই তিনবিঘা করিডোর এবং ভারতের অংশ।
ভারতের এই ক্ষুদ্র করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলে যেতে হয়৷ আমাদের বহনকারী সিএনজি নিয়েই আমরা করিডোরের ভিতরে প্রবেশ করি। করিডোর থেকে আঙ্গুরপোতা ৯ কিলোমিটার এবং দহগ্রাম ৬ কিলোমিটার। ছিটমহলের ভিতরে বাংলাদেশের শেষ সীমানায় ( শূন্য সীমানা লেখা রয়েছে) চমৎকার একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা আসরের নামাজের জন্য এখানে কিছুটা সময় কাটাই। এরপর ছিটমহলের ভিতরে থাকা চা বাগান পরিদর্শন করি।
ছিটমহলের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ কৃষি। ধান পাট শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয়। তবে এখানের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল হচ্ছে ভুট্টা। চতুর্দিকে শুধু ভুট্টা ক্ষেত। ভুট্টা চাষের ধরণ দেখে মুগ্ধ। কিছু জমির ভুট্টা তুলে ফেলা হয়েছে, কিছু জমিতে ভুট্টা পেকে আছে আবার কিছু জমিতে ভুট্টা মাত্র ধরতে শুরু করেছে। আরও মজার ব্যাপার আছে - কিছু কিছু জমিতে নতুন করে ভুট্টা গাছ বড় হয়ে ওঠছে মাত্র। লিচু বাগান রয়েছে পর্যাপ্ত। আম গাছও আছে প্রচুর। তবে কথা বলে জানা যায় এবার আমের ফলন কম হয়েছে।
এখানকার বাড়িঘর পাকা দালান, সেমি পাকা দালান ও টিন দিয়ে তৈরি। রাস্তা পাকা করা হয়েছে অনেকাংশই তবে সরু ও চিকন।
তিন বিঘা করিডোর মূলত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট ভূখণ্ড যার মালিক ভারত। কথা বলে জানা যায় , ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশেকে এটি ইজারা দেওয়া হয়েছে ৯০ বছরের জন্য। এটি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সাথে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের সংযোগ স্থাপন করে। তিনবিঘা আয়তনের জায়গা বলেই এর নাম তিনবিঘা করিডোর। এই করিডোরটি ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রশস্ত।
তিনবিঘা করিডোর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত ভারতের অংশ। এটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ। আগে এই তিনবিঘা করিডোর নির্দিষ্ট সময় খোলা থাকতো এবং বন্ধ করে দেওয়া হতো। এখন ২৪ ঘন্টা উন্মুক্ত থাকে।
তিনবিঘা করিডোরের ভিতরে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতার আয়তন হচ্ছে - ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার। পুরোটা জায়গা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অসম্ভব ভালো লেগেছে তিনবিঘা করিডোরের জীবন ও প্রকৃতি। দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলের এক বোন আমাদের সবাইকে তার ভুট্টা ক্ষেত থেকে চারটি করে কাঁচা ভুট্টা উপহার দেন। উপহারটি ছিল বেশি ভালো লাগার মতো বিষয়।
তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহল পরিদর্শন শেষে আমরা চলে যাই বুড়িমারী স্থলবন্দর জিরো পয়েন্ট। সময়টা ছিল ঠিক সন্ধ্যা মুহুর্ত। আমাদের বহনকারী সিএনজি থেকে নেমে এক নজর দেখে নিলাম স্থলবন্দরটিকে। আমরা ফিরে গেলাম বুড়িমারী স্থলবন্দর বাস কাউন্টারে। এস আর পরিবহন থেকে টিকেট সংগ্রহ করি বাড়ি ফেরার। সন্ধ্যা সারে সাতটায় বাসে চড়ে বসি গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ১৮ জুলাই ভোর পাঁচটায় আমরা গাজীপুর ফিরে আসি। চমৎকার কেটেছে ভ্রমণের সময়টুকু।
লালমনিরহাট জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর। এই তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে অবস্থিত একটি স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন হলেও বাংলাদেশ ইজারার মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে আসছে। উত্তরবঙ্গে ভ্রমণকারী পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর।
[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি জেলা হলো লালমনিরহাট। এই জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান গুলোর মধ্যে তিস্তা ব্যারেজ, বুড়িমাড়ি জিরো পয়েন্ট, তিনবিঘা করিডর, ৬৯ হিজরীর হারানো মসজিদ, কাকিনা জমিদার বাড়ি, তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি মন্দির অন্যতম।
গত ১৬- এপ্রিল তারিখ আমরা ৫ জন মিলে ভ্রমণে গিয়েছিলাম লালমনিরহাট জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনের জন্য । আমাদের এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিলাম আমিসহ উত্তরা হাইস্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের ( সদ্য অব:) শিক্ষক ইকবাল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক আব্দুস ছালাম, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শাহ আলম এবং শরীর চর্চা শিক্ষক ফরহাদ আহম্মেদ। দুই দিনের এই সফরে আমরা গাজীপুর থেকে লালমনিরহাটে যাই ট্রেনের মাধ্যমে।
১৬ এপ্রিল রাত সারে দশটার ট্রেনে আমরা জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করি। যদিও ট্রেনটি দেরিতে এসে রাত একটায় প্লাটফর্ম ছাড়ে। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়া রেলওয়ে স্টেশন হয়ে শান্তাহার, বগুড়া গাইবান্ধা হয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পরের দিন দুপুর ১২ টায় লালমনিরহাট পৌঁছায়। দীর্ঘ এই ট্রেন যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখে আমাদের অসাধারণ আনন্দ অনুভূত হয়। বিশেষ করে ট্রেনের ছুটে চলা ঝক ঝকাঝক শব্দ এবং দ্রুত গতিতে সবকিছুকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি দারুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। ভোরের প্রকৃতি, আবহমান গ্রাম বাংলার জনপদ, মাঠ ফসল ও মানুষের সাধারণ জীবনযাপনের এক সচিত্র রূপ ফুটে ওঠে চোখের সামনে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নিজের মন অজান্তে বলে ওঠে, " অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।"
দুপুর ১২ টায় আমরা লালমনিরহাট পৌঁছে একটা অটোরিকশা ভাড়া করে কাকিনা বাজার পর্যন্ত যাই। ওখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। কাকিনা বাজার থেকে একটা সিএনজি ভাড়া করি তিস্তা ব্যারেজ, তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুর পোতা ছিটমহল এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ঘুরে দেখার জন্য। সিএনজি চালক আমাদেরকে প্রথমে তিস্তা ব্যারেজ দেখার জন্য নিয়ে যায়। এখানে বলে রাখি, লালমনিরহাট জেলা হেডকোয়ার্টার থেকে এই দর্শনীয় স্থানগুলোর দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৯০ কিলোমিটার। জেলা শহর থেকে কাকিনা বাজারের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এই ২৫ কিলোমিটার পথ আমাদের অটোরিকশা দিয়ে যেতে হয়। লালমনিরহাট থেকে তিনবিঘা করিডোর পর্যন্ত ট্রেনেও যাতায়াত করা যায়। লালমনিরহাট আসতে দেরী হওয়ায় আমাদের ট্রেনের সময়সূচি মিস হয়।
তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় গিয়ে আমরা তিস্তা সেতু পাড় হই এবং ব্যারেজ পরিদর্শন করি। তিস্তা ব্যারেজ এলাকা মূলত পর্যটন কেন্দ্র। আরও অনেক পর্যটকদেরকে দেখলাম ঘুরে ঘুরে দেখেছে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে রাখলাম স্মৃতিতে রেখে দেওয়ার জন্য।
তিস্তা ব্যারেজ দেখা শেষ হলে আমরা সোজা তিনবিঘা করিডোর চলে আসি। আমরা যখন তিনবিঘা করিডোর পৌঁছাই তখন বিকাল ৪টা। তিনবিঘা করিডোর দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবির একজন সদস্য কাছে এসে আমাদের পরিচয় জানলো। এবং আমাদেরকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলো করিডোর এর জায়গাটুকু। যে করিডোর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা হয় সেটাই তিনবিঘা করিডোর এবং ভারতের অংশ।
ভারতের এই ক্ষুদ্র করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলে যেতে হয়৷ আমাদের বহনকারী সিএনজি নিয়েই আমরা করিডোরের ভিতরে প্রবেশ করি। করিডোর থেকে আঙ্গুরপোতা ৯ কিলোমিটার এবং দহগ্রাম ৬ কিলোমিটার। ছিটমহলের ভিতরে বাংলাদেশের শেষ সীমানায় ( শূন্য সীমানা লেখা রয়েছে) চমৎকার একটি মসজিদ রয়েছে। আমরা আসরের নামাজের জন্য এখানে কিছুটা সময় কাটাই। এরপর ছিটমহলের ভিতরে থাকা চা বাগান পরিদর্শন করি।
ছিটমহলের মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক কাজ কৃষি। ধান পাট শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয়। তবে এখানের প্রধান অর্থনৈতিক ফসল হচ্ছে ভুট্টা। চতুর্দিকে শুধু ভুট্টা ক্ষেত। ভুট্টা চাষের ধরণ দেখে মুগ্ধ। কিছু জমির ভুট্টা তুলে ফেলা হয়েছে, কিছু জমিতে ভুট্টা পেকে আছে আবার কিছু জমিতে ভুট্টা মাত্র ধরতে শুরু করেছে। আরও মজার ব্যাপার আছে - কিছু কিছু জমিতে নতুন করে ভুট্টা গাছ বড় হয়ে ওঠছে মাত্র। লিচু বাগান রয়েছে পর্যাপ্ত। আম গাছও আছে প্রচুর। তবে কথা বলে জানা যায় এবার আমের ফলন কম হয়েছে।
এখানকার বাড়িঘর পাকা দালান, সেমি পাকা দালান ও টিন দিয়ে তৈরি। রাস্তা পাকা করা হয়েছে অনেকাংশই তবে সরু ও চিকন।
তিন বিঘা করিডোর মূলত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট ভূখণ্ড যার মালিক ভারত। কথা বলে জানা যায় , ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশেকে এটি ইজারা দেওয়া হয়েছে ৯০ বছরের জন্য। এটি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সাথে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের সংযোগ স্থাপন করে। তিনবিঘা আয়তনের জায়গা বলেই এর নাম তিনবিঘা করিডোর। এই করিডোরটি ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রশস্ত।
তিনবিঘা করিডোর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত ভারতের অংশ। এটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ। আগে এই তিনবিঘা করিডোর নির্দিষ্ট সময় খোলা থাকতো এবং বন্ধ করে দেওয়া হতো। এখন ২৪ ঘন্টা উন্মুক্ত থাকে।
তিনবিঘা করিডোরের ভিতরে বাংলাদেশের দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতার আয়তন হচ্ছে - ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার। পুরোটা জায়গা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অসম্ভব ভালো লেগেছে তিনবিঘা করিডোরের জীবন ও প্রকৃতি। দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহলের এক বোন আমাদের সবাইকে তার ভুট্টা ক্ষেত থেকে চারটি করে কাঁচা ভুট্টা উপহার দেন। উপহারটি ছিল বেশি ভালো লাগার মতো বিষয়।
তিনবিঘা করিডোর, দহগ্রাম ও আঙ্গুরপোতা ছিটমহল পরিদর্শন শেষে আমরা চলে যাই বুড়িমারী স্থলবন্দর জিরো পয়েন্ট। সময়টা ছিল ঠিক সন্ধ্যা মুহুর্ত। আমাদের বহনকারী সিএনজি থেকে নেমে এক নজর দেখে নিলাম স্থলবন্দরটিকে। আমরা ফিরে গেলাম বুড়িমারী স্থলবন্দর বাস কাউন্টারে। এস আর পরিবহন থেকে টিকেট সংগ্রহ করি বাড়ি ফেরার। সন্ধ্যা সারে সাতটায় বাসে চড়ে বসি গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ১৮ জুলাই ভোর পাঁচটায় আমরা গাজীপুর ফিরে আসি। চমৎকার কেটেছে ভ্রমণের সময়টুকু।
লালমনিরহাট জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর। এই তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে অবস্থিত একটি স্বতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন হলেও বাংলাদেশ ইজারার মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে আসছে। উত্তরবঙ্গে ভ্রমণকারী পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে তিনবিঘা করিডোর।
[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

আপনার মতামত লিখুন