উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সদ্য প্রয়াত আশা ভোঁসলে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ওয়াক্ত’- এ কণ্ঠ দিয়েছিলেন ‘আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু’ গানটিতে। এ গানে বারতা এটাই যে, তুমি আগে কী হয়েছে জানো না, পরে কী হবে, তাও জানো না। বর্তমান মুহুর্তটাই শুধু উপভোগ কর। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে আমাদের দেশের তরুণদের উদ্দেশে এ বার্তাই দিয়েছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দলও তাই দিশাহীন। বর্তমানের ক্ষমতা ও ভোগবিলাসিতা নিয়েই তারা মত্ত ছিলেন ও আছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়টা উপভোগ করেই ধারণা করছেন কিস্তি মাত!
তারা ইতিহাস পড়েছেন এবং অনেকের থেকে বেশিই পড়েছেন। শুধু পড়াশোনাই নয়, তাদের অনেকের বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক ‘কুশলতা’ অনেকক্ষেত্রে ঈর্ষনীয়! তাদের অনেকেই ছাত্রলীগে জায়গা করে নেয়ার জন্য, ‘বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি’ দেয়ার মতো কুশলী ছিলেন। আবার সাধারণ তরুণদের মাঝে তাদের বিচরণ থাকায় তারা বুঝেছিলেন বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম ইতিহাস নিয়ে শেখ হাসিনা দিবানিশি যে এক তরফা রেকর্ড বাজিয়ে চলছিলেন এবং ইতিহাসকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাতে করে দেশবাসী বিশেষত তরুণ প্রজন্ম বিরক্তই ছিল। এটাও, তারা বুঝেছিলেন ঐ ইতিহাস তো বটেই এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না।
বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাধীনতাপরবর্তী প্রজন্ম বিশেষত ’৭৫ পরবর্তী যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে স্বাভাবিক পন্থায় পরিচিত হতে পারেনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পরিবর্তন হয়েছে। ১৬-৫৫ বছর বয়স্ক মানুষ মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। অর্থাৎ ৯ কোটির কম-বেশি। আর ১৬-৪০ বছরের মধ্যে রয়েছে ৮ কোটির কিছু বেশি মানুষ। দেশের রাজনীতি অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে এই মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০% হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের সকল শাসক গোষ্ঠীই ক্ষমতা আঁকড়ে রেখে ক্ষমতার স্বাদ তরুণদের একটা অংশে বিতরণ করে তাদের নিজ রাজনৈতিক প্রভাবে রাখতে চেয়েছে। এমনকি সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন কোটার অপব্যবহার পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু তরুণ সমাজের মনোজগতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলসমূহ এমনকি সব থেকে অগ্রসর চিন্তার দাবিদার বামপন্থীরাও সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। প্রকৃতি তো শূন্যতা পছন্দ করে না। তাই শূন্যতা পূরণ হয়েছে আশা ভোঁসলের গানের কথায় — ‘জো ভি হ্যায়, বাস ইয়াহি এক পাল হ্যায়’ অর্থাৎ জীবন কেবল এই বর্তমান মুহূর্তেই বিদ্যমান, বর্তমানই সবকিছু। এই ধরনের চিন্তাধারায়— সব থেকে বড় ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। কিন্তু জাতি, দেশ, সভ্যতা শুধু বর্তমানকে নিয়ে নয়। দেশের প্রকৃত জন্ম ইতিহাস তা যত অতীতেরই হোক বর্তমানকে তো তা জানতে হবে, জানাতে হয়ও বটে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের ব্যর্থতার এ পরিণতি আমাদের দীর্ঘ সময় যাবত বইতে হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক কবি হুমায়ূন আজাদের একটা বহুল প্রচারিত উক্তি হলো— সত্য একবার বলতে হয়, বারবার বললে তা মিথ্যা মনে হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অনেকটা সে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে যে কোন ইস্যুতে সকাল-বিকেল আওয়ামী লীগ নেতাদের সবার বক্তৃতার শুরু হচ্ছে, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক, যার জন্ম না হলে ... ইত্যাদি। এবং ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করে শোক প্রকাশ, স্মৃতি তর্পন করার পরে দলীয় নেত্রীর বন্দনা — ৫/১০ মিনিট চলে এভাবে। তারপরে স্বল্প কথায় যে ইস্যু নিয়ে সভা হোক না কেনো প্রতিপক্ষ দলকে টেনে এনে তাদের সম্পর্কে কিছু উপহাসমূলক কথাবার্তা বলে এবং কিছু উন্নয়ন কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিয়ে সভা শেষ। একটি রাজনৈতিক দলের যে নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রচার এবং তার ভিত্তিতে কর্মী সমর্থকদেরসহ মানুষকে সে রাজনীতির ভিত্তিতে সমবেত করার কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। একটা সময়ে এসে ‘স্বাধীনতা আর উন্নয়ন’-এর জপ ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না।
সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা দিবস পালনে আর বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ হয়ে উঠলেন। নিজের দু-একটি অভিজ্ঞতা বলি। ২০২৪- এর ১৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারী বেসরকারি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জুলাই মাসের প্রথম দিকে ঐ সব প্রতিষ্ঠানের সিইওদের এক সভা ডেকে যথাযথ মর্যাদার সাথে জাতীয় শোকদিবস পালনের কর্মসূচিসমূহ অবগত করেন এবং সব প্রতিষ্ঠানকে তা পালনের নির্দেশ দেন। সভায় বক্তব্য রাখতে যেয়ে একটি কোম্পানির অপেক্ষাকৃত তরুণ তুর্কি সিইও অতি উৎসাহী ভংগীতে বলেন, নির্দেশিত কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি তার কোম্পানি ঐ দিন গরু জবাই করে গরিব মানুষকে খাওয়াবে। গরু জবাই দেয়ার জন্য ঐ সিইওকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর পরই ‘জুলাই বিপ্লব’ এর সাফল্য উপলক্ষে তিনি গরু জবাই দিয়ে শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। মুজিব শতবর্ষ পালনের সময় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক প্রশাসক হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বক্তৃতায় তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের সব কর্মচারীর উদ্দেশে বললেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী সবাইকে মুখস্থ করতে হবে এবং তিনি ঐ বিষয়ে যে কোনো সময় যে কারো পরীক্ষা নেবেন। সেই প্রশাসক মহোদয় এখন আবার বিএনপি আমলে তদবির করছেন ঐ নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য। তার যুক্তি তার সহোদর বিএনপি করতেন এবং আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভাইয়ের কারণে এখন ঐ ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ কে পুরস্কৃত করতে হবে। এর চেয়ে আরও অনেক মজার ঘটনা হয়তো পাঠকদের জানা আছে। এভাবে অসংখ্য দিবস পালনের নামে এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেওয়ার জন্য স্তুতি করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে কার্যত অসম্মানই করা হতো।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকবে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সে সরকারের রুটিন ওয়ার্ক। এসব নিয়ে অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরও আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে হালকা করে ফেলে। অবশ্য পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা খুবই সাহসী এবং প্রশংসিত ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়েছিলেন। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখায় তার ইতিবাচক কাজগুলোও সৈ্বরাচারী এবং কতৃত্ববাদী আচরণের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। আর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যে ৮০% তরুণদের কথা বলছিলাম তাদের কাছে প্রধান বিষয় হচ্ছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য পারিশ্রমিক, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন বা সুশাসন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন তরুণ নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল হয়তোবা এসব এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় অগ্রসর হবে। কিন্তু কিছু স্ট্যান্টবাজি ছাড়া এবং দ্রুত, অতিদ্রুত ক্ষমতার হিস্যা পাওয়ার মোহে তারাও প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই আছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ক্ষমতার মোহে তারা বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির খপ্পরে পড়েছে এবং তাদেরসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আজ সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ নীতি এবং তাবৎ দুনিয়াকে তাদের কব্জায় নেয়ার জন্য সভ্যতাকে ধ্বংসের যে হুমকি, সে বিষয়ে সংসদের প্রধান দল ও বিরোধী দল উভয়ই নিশ্চুপ। যাদের যুদ্ধোন্মাদনার জেরে তেল বিশ্বে আজ এই ঘোর সঙ্কট সেই আগ্রাসী আমেরিকার সঙ্গেই ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক। ইউনূস বিদায়ের পূর্ব মুহুর্তে দেশকে মার্কিনী স্বার্থের সাথে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে যে দেশবিরোধী গোপন চুক্তি করে গেলেন সে বিষয়েও তরুণদের দলের নীরবতা চুক্তির প্রতি সম্মতিরই বহিঃপ্রকাশ। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সরকারী দল ও বিরোধী দলের প্রধানের সম্মতি নিয়েই তো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলা দলগুলোর কাছে মার্কিনী স্বার্থ ফার্স্ট হিসাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে!
আমাদের দুর্ভাগ্য আন্দোলনের উত্তাপে গড়ে ওঠা তরুণদের দলটি উত্তাপ ঠান্ডা হতে না হতেই পুরনো কাঠামোর মধ্যে মিলিয়ে গেলো। শুরু থেকেই ভোগ, বিলাস, গাড়ি, বাড়ির প্রতি আকর্ষণ। যে কোনো ইস্যুতে ওয়েস্টিন, ইন্টার কন্টিনেন্টাল, প্যানপ্যাসিফিক ছাড়া তাদের চলে না। আবার মাত্র দুই বছর আগের ছাত্র সমন্বয়ক তার এখনও নিজের গাড়ি নাই দেখে খুবই লজ্জাবোধ করেন। এনসিপির সেই লজ্জিত ক্যাপ্টেন পার্লামেন্টে ফ্লোর নিয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি দাবি করলেন। মূহূর্ত দেরি না করে জামাত আমীর তাকে সমর্থন করে বললেন, ছোটদের আবদারে সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। সংসদ সদস্যরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়ার কারণ কী, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এনসিপিরই প্রাক্তন নেত্রী তাসনিম জারা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন এমপিরা সংসদে গেছেন জনগণের সমস্যার সমাধান করতে, নিজেদের জন্য নয়। জামায়াত প্রধান সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি সুবিধা নেবেন না বলে জনগণের কাছে অংগীকার করে, দু’মাসের মধ্যেই তা ভুলে গিয়ে কৌশলে সে সুবিধা নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন এবং এজন্য পার্লামেন্টে এনসিপিকে ব্যবহার করছেন। এনসিপির ক্যাপ্টেন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাতে মনে হয় যে, সরকারি চাকরি এবং এমপি’র পার্থক্য তিনি বুঝেন না। একইভাবে সব উপজেলা কার্যালয়ে এমপিদের জন্য কক্ষ বরাদ্দের নিয়ম করে স্থানীয় সরকারকেও তাদের কব্জায় নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এনসিপির ঐ ক্যাপ্টেন এমপি তো নির্বাচনের পরদিন থেকেই স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সকল দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। ভোগ বিলাস এবং অন্যায্য ক্ষমতা ও কতৃত্ব বৃদ্ধিতে তারা মরীয়া। সংস্কার, সনদ এগুলো মুখোশ মাত্র।
দল বড় করতে এনসিপি বিভিন্ন স্থানে দল বদলে বহুমুখী প্রতিভাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, তাদেরকে দলে পূনর্বাসিত করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দাঁড় করাতে। কখনো আওয়ামী লীগ কখনও বিএনপি — চট্টগ্রামের এমন একজন প্রাক্তন মেয়রের বিষয় তো প্রকাশ্যেই চলে এসেছে। পুরান ঢাকার মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকারকে এনসিপি দলে নিয়েছে। ইতোপূর্বে ছাত্র শিবিরের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতাও যোগ দিয়েছেন। অতীতে কে কোন দল করেছে তা মূখ্য নয় এ কথা বলে নাহিদ ইসলাম ‘ফ্যাসিবাদী ছাত্র লীগ, আওয়ামী লীগ’-এর নেতাকর্মী যাদের নামে জুলাই হত্যা মামলা বা অভিযোগ নেই এবং নিজ দলে যারা বঞ্চিত তাদের এনসিপিতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ মামলা থাকলেও এনসিপিতে যোগ দিলে যোগ দেয়ার আগে থানা ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেবে, আবার এখন পর্যন্ত খুনের মামলার আসামি নয় কিন্তু এনসিপি যদি তাকে দলে চায়, যোগ না দিলে মব সৃষ্টি করে খুনের মামলা দিয়ে দেয়া হবে। অতীতে সামরিক শাসকেরা দল গঠনের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি ইস্যু’ সামনে রেখে এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। এখন জুলাই আন্দোলনের সিপাহসালাররা ‘খুনের মামলা পদ্ধতিতে’ দল গোছাতে ও রাজনীতির সংস্কার করতে চাইছেন! অবশ্য তাদের অনেকেই যেমন সার্জিস, হাসনাত বা শিবিরের সাদিক কায়েমরাও এক সময় কিন্তু গুপ্ত হোক আর সুপ্ত হোক ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ছিলেন। তাই ভিন্ন ‘দোসর’ দের দলে নিতে অসুবিধা কোথায়!
কথায় কথায় ফ্যাসিবাদ উচ্চারণ করা তরুণ নেতৃত্ব প্রকৃত ফ্যাসিবাদ কি তা উপলব্ধি করতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকেই মনে করেন ফ্যাসিবাদ। জুলাই আন্দোলনকে বা জুলাই হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করেন মুক্তিযুদ্ধের সাথে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এনসিপির বর্তমান জোট সঙ্গী জামায়াত ইসলামের বাহিনীসমূহের নৃশংসতা ও বর্বরতা নাৎসী হত্যাযজ্ঞকেও হার মানায়। হলোকাস্ট নামে অভিহিত নাৎসী হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহতা ছিল গ্যাস চেম্বার, যেখানে জাইক্লন বি নামক বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে একসঙ্গে শ্বাসরোধ করে মারা হতো। জনসমক্ষের বাইরে অবস্থিত গ্যাস চেম্বারে এ সব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো । আর বাংলাদেশে ১৯৭১-এর বড়ো বড়ো সব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্য জনসম্মুখে। পাকিস্তান সরকারের নথি অনুযায়ী শুধু মাত্র ২৫ মার্চ এক রাতেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সারা দেশে লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলসহ গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পিলখানা ও রাজারবাগে গণহত্যা, ঐ রাতেই দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সংখ্যালঘু হত্যা, ২৬ মার্চ ঢাকার শংকরিপারা ও রমনা কালী মন্দিরে গণহত্যা, ২৭ মার্চ সূত্রাপুর, জিঞ্জিরা ও বুড়িগঙ্গা নদী বক্ষে গণহত্যা, এমনিভাবে নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিন ও তার দোসরদের কতৃক দিনাজপুরের বারিহাট, ঠাকুরগাঁওয়ের জাঠিভাঙ্গা, পঞ্চগড়ের ঢাপঢুপ জয়পুরহাটের কড়ই কাদিপুর, রংপুরের কালীগঞ্জ, পটিয়া-চট্টগ্রামের মুজাফফরাবাদ, নাটোরের গোপালপুর,পাবনা জেলার বাগবাটি, সাতবাড়িয়া ও ডেমরা, ঢাকা জেলার বাড়িয়া, বরিশালের কেটনার বিল, ফরিপুরের সেনদিয়া, খুলনার ডাক্রা, ফরিদপুর পালংয়ের মধ্য পাড়া, বরিশালের ভিমনালি, কুমিল্লার বাখরাবাদ, সিলেটের বুরুঙ্গা, বরগুনা সদর, সিলেটের কৃষ্ণপুর ও আদিত্যপুর, হবিগঞ্জের মাকালকান্দি, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা কুড়িগ্রামের হাতিয়া, সৈয়দপুরের গোলাহাট উল্লেখযোগ্য গণহত্যার সব স্থান। এসব গণহত্যার স্থানে কোথাও শত শত কোথাও হাজারে হাজারে বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। যার সিংহভাগই ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন তরুণ ও যুবক। এর বাইরেও একই স্থানে নিহতের সংখ্যা ১শ’র কম এরকম আরও শত শত গণহত্যার এবং গণকবরের স্থান রয়েছে যা উল্লেখ করা হলো না। তবে উপরের তালিকায় যেটি বলা হয়নি সেটি হলো চুকনগর গণহত্যার কথা। সেখানে একদিনে দশ হাজার উদ্বাস্তুকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের সবথেকে বড় গনহত্যা তো বটেই, ক্ষুদ্র একটি স্থানে একত্রে একদিনে এত মানুষ হত্যার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
আর হত্যার বিভৎসতা যে কত রকম ছিল। সৈয়দপুরের গোলাহাটে ট্রেন থেকে নামিয়ে হানাদার বাহিনী গুলি করে এবং রাজাকাররা রাম দা দিয়ে গলায় কোপ দিয়ে দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে মোট ৪৪৮ জন নারী-পুরুষ শিশুকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন সন্দেহে রাজাকাররা তরুণদের এবং জাতীয়তাবাদীদের ধরে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে আসলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঈমানদার মুসলমান হওয়ার জন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে জামাত করে নামাজ পড়তে নির্দেশ দেয়। আর সেজদার সময়ে ব্রাশ ফায়ার করে সবাইকে হত্যা করে। তরুণদের দিয়ে গণকবর খুঁড়িয়ে তাদের দিয়ে মৃতদেহসমূহ সেখানে ফেলে এমন সময়ে গুলি করে যেন ঐ তরুণদের দেহ গণকবরেই পড়ে। আবার কখনও কখনও কোনো তরুণকে ধরে এনে তাকে নারকেল গাছ থেকে ডাব পাড়তে বলে। গাছে উঠে কয়েকটি ডাব নিচে ফেলার পর পাক সেনার গুলিতে তরুণটিও ডাবের মতো ঢপ করে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশ জুড়ে অসংখ্য বধ্যভূমি, গণকবর এবং হত্যা করার সব নির্মম পদ্ধতি আর বন্দী দেশে লাখো নারী ধর্ষণের কাহিনীই বলে দেয় ফ্যাসিবাদী নির্মমতা কি জিনিস। ‘হারুন আংকেলের’ ভাতের হোটেলে দুই চার দিন বন্দী থেকে ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এমনকি জুলাই ’৩৬ দেখেও ধারণা করা কঠিন আসল ফ্যাসিবাদ কী।
বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির রাজনৈতিক সহযোগী হওয়ায় অতীতকে তারা ঢেকে রাখতে চান। তারা নিজেদের নিকট-রাজনৈতিক অতীত জুলাই ’২৪ দিয়ে ঢেকে রাখছেন। আবার লাখো লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধে অগনিত মানুষের বীরত্বগাথা, স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ও তা পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবিস্মরণীয় ভূমিকা, বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষ জামায়াত ইসলাম, রাজাকার-আলবদরদের গণহত্যার সহযোগী ভূমিকা — সেসব ইতিহাসকেও তারা ঢেকে রাখতে চায় ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান দিয়ে। সংস্কার আর জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে তারা ব্যবহার করছেন বর্তমানের ক্ষমতা, বিলাসিতা আর উগ্রতাকে আলিংগন করে। আবার ভবিষ্যতটাও তারা দেখছেন নিছক ক্ষমতার চশমা দিয়ে। এখন দলীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিতে পারেন “আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু”!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী সদ্য প্রয়াত আশা ভোঁসলে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ওয়াক্ত’- এ কণ্ঠ দিয়েছিলেন ‘আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু’ গানটিতে। এ গানে বারতা এটাই যে, তুমি আগে কী হয়েছে জানো না, পরে কী হবে, তাও জানো না। বর্তমান মুহুর্তটাই শুধু উপভোগ কর। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে আমাদের দেশের তরুণদের উদ্দেশে এ বার্তাই দিয়েছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দলও তাই দিশাহীন। বর্তমানের ক্ষমতা ও ভোগবিলাসিতা নিয়েই তারা মত্ত ছিলেন ও আছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়টা উপভোগ করেই ধারণা করছেন কিস্তি মাত!
তারা ইতিহাস পড়েছেন এবং অনেকের থেকে বেশিই পড়েছেন। শুধু পড়াশোনাই নয়, তাদের অনেকের বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক ‘কুশলতা’ অনেকক্ষেত্রে ঈর্ষনীয়! তাদের অনেকেই ছাত্রলীগে জায়গা করে নেয়ার জন্য, ‘বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি’ দেয়ার মতো কুশলী ছিলেন। আবার সাধারণ তরুণদের মাঝে তাদের বিচরণ থাকায় তারা বুঝেছিলেন বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম ইতিহাস নিয়ে শেখ হাসিনা দিবানিশি যে এক তরফা রেকর্ড বাজিয়ে চলছিলেন এবং ইতিহাসকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাতে করে দেশবাসী বিশেষত তরুণ প্রজন্ম বিরক্তই ছিল। এটাও, তারা বুঝেছিলেন ঐ ইতিহাস তো বটেই এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না।
বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ। স্বাধীনতাপরবর্তী প্রজন্ম বিশেষত ’৭৫ পরবর্তী যে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে স্বাভাবিক পন্থায় পরিচিত হতে পারেনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পরিবর্তন হয়েছে। ১৬-৫৫ বছর বয়স্ক মানুষ মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। অর্থাৎ ৯ কোটির কম-বেশি। আর ১৬-৪০ বছরের মধ্যে রয়েছে ৮ কোটির কিছু বেশি মানুষ। দেশের রাজনীতি অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে এই মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০% হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের সকল শাসক গোষ্ঠীই ক্ষমতা আঁকড়ে রেখে ক্ষমতার স্বাদ তরুণদের একটা অংশে বিতরণ করে তাদের নিজ রাজনৈতিক প্রভাবে রাখতে চেয়েছে। এমনকি সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন কোটার অপব্যবহার পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু তরুণ সমাজের মনোজগতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলসমূহ এমনকি সব থেকে অগ্রসর চিন্তার দাবিদার বামপন্থীরাও সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। প্রকৃতি তো শূন্যতা পছন্দ করে না। তাই শূন্যতা পূরণ হয়েছে আশা ভোঁসলের গানের কথায় — ‘জো ভি হ্যায়, বাস ইয়াহি এক পাল হ্যায়’ অর্থাৎ জীবন কেবল এই বর্তমান মুহূর্তেই বিদ্যমান, বর্তমানই সবকিছু। এই ধরনের চিন্তাধারায়— সব থেকে বড় ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। কিন্তু জাতি, দেশ, সভ্যতা শুধু বর্তমানকে নিয়ে নয়। দেশের প্রকৃত জন্ম ইতিহাস তা যত অতীতেরই হোক বর্তমানকে তো তা জানতে হবে, জানাতে হয়ও বটে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের ব্যর্থতার এ পরিণতি আমাদের দীর্ঘ সময় যাবত বইতে হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক কবি হুমায়ূন আজাদের একটা বহুল প্রচারিত উক্তি হলো— সত্য একবার বলতে হয়, বারবার বললে তা মিথ্যা মনে হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অনেকটা সে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে যে কোন ইস্যুতে সকাল-বিকেল আওয়ামী লীগ নেতাদের সবার বক্তৃতার শুরু হচ্ছে, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক, যার জন্ম না হলে ... ইত্যাদি। এবং ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করে শোক প্রকাশ, স্মৃতি তর্পন করার পরে দলীয় নেত্রীর বন্দনা — ৫/১০ মিনিট চলে এভাবে। তারপরে স্বল্প কথায় যে ইস্যু নিয়ে সভা হোক না কেনো প্রতিপক্ষ দলকে টেনে এনে তাদের সম্পর্কে কিছু উপহাসমূলক কথাবার্তা বলে এবং কিছু উন্নয়ন কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিয়ে সভা শেষ। একটি রাজনৈতিক দলের যে নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রচার এবং তার ভিত্তিতে কর্মী সমর্থকদেরসহ মানুষকে সে রাজনীতির ভিত্তিতে সমবেত করার কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি। একটা সময়ে এসে ‘স্বাধীনতা আর উন্নয়ন’-এর জপ ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না।
সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা দিবস পালনে আর বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ হয়ে উঠলেন। নিজের দু-একটি অভিজ্ঞতা বলি। ২০২৪- এর ১৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারী বেসরকারি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জুলাই মাসের প্রথম দিকে ঐ সব প্রতিষ্ঠানের সিইওদের এক সভা ডেকে যথাযথ মর্যাদার সাথে জাতীয় শোকদিবস পালনের কর্মসূচিসমূহ অবগত করেন এবং সব প্রতিষ্ঠানকে তা পালনের নির্দেশ দেন। সভায় বক্তব্য রাখতে যেয়ে একটি কোম্পানির অপেক্ষাকৃত তরুণ তুর্কি সিইও অতি উৎসাহী ভংগীতে বলেন, নির্দেশিত কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি তার কোম্পানি ঐ দিন গরু জবাই করে গরিব মানুষকে খাওয়াবে। গরু জবাই দেয়ার জন্য ঐ সিইওকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর পরই ‘জুলাই বিপ্লব’ এর সাফল্য উপলক্ষে তিনি গরু জবাই দিয়ে শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। মুজিব শতবর্ষ পালনের সময় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক প্রশাসক হিসেবে যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বক্তৃতায় তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের সব কর্মচারীর উদ্দেশে বললেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী সবাইকে মুখস্থ করতে হবে এবং তিনি ঐ বিষয়ে যে কোনো সময় যে কারো পরীক্ষা নেবেন। সেই প্রশাসক মহোদয় এখন আবার বিএনপি আমলে তদবির করছেন ঐ নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য। তার যুক্তি তার সহোদর বিএনপি করতেন এবং আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভাইয়ের কারণে এখন ঐ ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ কে পুরস্কৃত করতে হবে। এর চেয়ে আরও অনেক মজার ঘটনা হয়তো পাঠকদের জানা আছে। এভাবে অসংখ্য দিবস পালনের নামে এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেওয়ার জন্য স্তুতি করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে কার্যত অসম্মানই করা হতো।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকবে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম সে সরকারের রুটিন ওয়ার্ক। এসব নিয়ে অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরও আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে হালকা করে ফেলে। অবশ্য পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা খুবই সাহসী এবং প্রশংসিত ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব মোড়লদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়েছিলেন। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখায় তার ইতিবাচক কাজগুলোও সৈ্বরাচারী এবং কতৃত্ববাদী আচরণের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। আর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যে ৮০% তরুণদের কথা বলছিলাম তাদের কাছে প্রধান বিষয় হচ্ছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য পারিশ্রমিক, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন বা সুশাসন। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ধারণা করেছিলেন তরুণ নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল হয়তোবা এসব এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় অগ্রসর হবে। কিন্তু কিছু স্ট্যান্টবাজি ছাড়া এবং দ্রুত, অতিদ্রুত ক্ষমতার হিস্যা পাওয়ার মোহে তারাও প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই আছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ক্ষমতার মোহে তারা বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির খপ্পরে পড়েছে এবং তাদেরসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আজ সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ নীতি এবং তাবৎ দুনিয়াকে তাদের কব্জায় নেয়ার জন্য সভ্যতাকে ধ্বংসের যে হুমকি, সে বিষয়ে সংসদের প্রধান দল ও বিরোধী দল উভয়ই নিশ্চুপ। যাদের যুদ্ধোন্মাদনার জেরে তেল বিশ্বে আজ এই ঘোর সঙ্কট সেই আগ্রাসী আমেরিকার সঙ্গেই ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক। ইউনূস বিদায়ের পূর্ব মুহুর্তে দেশকে মার্কিনী স্বার্থের সাথে আষ্টে পৃষ্ঠে বেঁধে যে দেশবিরোধী গোপন চুক্তি করে গেলেন সে বিষয়েও তরুণদের দলের নীরবতা চুক্তির প্রতি সম্মতিরই বহিঃপ্রকাশ। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সরকারী দল ও বিরোধী দলের প্রধানের সম্মতি নিয়েই তো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলা দলগুলোর কাছে মার্কিনী স্বার্থ ফার্স্ট হিসাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে!
আমাদের দুর্ভাগ্য আন্দোলনের উত্তাপে গড়ে ওঠা তরুণদের দলটি উত্তাপ ঠান্ডা হতে না হতেই পুরনো কাঠামোর মধ্যে মিলিয়ে গেলো। শুরু থেকেই ভোগ, বিলাস, গাড়ি, বাড়ির প্রতি আকর্ষণ। যে কোনো ইস্যুতে ওয়েস্টিন, ইন্টার কন্টিনেন্টাল, প্যানপ্যাসিফিক ছাড়া তাদের চলে না। আবার মাত্র দুই বছর আগের ছাত্র সমন্বয়ক তার এখনও নিজের গাড়ি নাই দেখে খুবই লজ্জাবোধ করেন। এনসিপির সেই লজ্জিত ক্যাপ্টেন পার্লামেন্টে ফ্লোর নিয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি দাবি করলেন। মূহূর্ত দেরি না করে জামাত আমীর তাকে সমর্থন করে বললেন, ছোটদের আবদারে সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। সংসদ সদস্যরা যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের ভাতা পাওয়ার পরও এমন চাওয়ার কারণ কী, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এনসিপিরই প্রাক্তন নেত্রী তাসনিম জারা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন এমপিরা সংসদে গেছেন জনগণের সমস্যার সমাধান করতে, নিজেদের জন্য নয়। জামায়াত প্রধান সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি সুবিধা নেবেন না বলে জনগণের কাছে অংগীকার করে, দু’মাসের মধ্যেই তা ভুলে গিয়ে কৌশলে সে সুবিধা নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন এবং এজন্য পার্লামেন্টে এনসিপিকে ব্যবহার করছেন। এনসিপির ক্যাপ্টেন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাতে মনে হয় যে, সরকারি চাকরি এবং এমপি’র পার্থক্য তিনি বুঝেন না। একইভাবে সব উপজেলা কার্যালয়ে এমপিদের জন্য কক্ষ বরাদ্দের নিয়ম করে স্থানীয় সরকারকেও তাদের কব্জায় নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এনসিপির ঐ ক্যাপ্টেন এমপি তো নির্বাচনের পরদিন থেকেই স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সকল দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। ভোগ বিলাস এবং অন্যায্য ক্ষমতা ও কতৃত্ব বৃদ্ধিতে তারা মরীয়া। সংস্কার, সনদ এগুলো মুখোশ মাত্র।
দল বড় করতে এনসিপি বিভিন্ন স্থানে দল বদলে বহুমুখী প্রতিভাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, তাদেরকে দলে পূনর্বাসিত করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দাঁড় করাতে। কখনো আওয়ামী লীগ কখনও বিএনপি — চট্টগ্রামের এমন একজন প্রাক্তন মেয়রের বিষয় তো প্রকাশ্যেই চলে এসেছে। পুরান ঢাকার মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকারকে এনসিপি দলে নিয়েছে। ইতোপূর্বে ছাত্র শিবিরের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতাও যোগ দিয়েছেন। অতীতে কে কোন দল করেছে তা মূখ্য নয় এ কথা বলে নাহিদ ইসলাম ‘ফ্যাসিবাদী ছাত্র লীগ, আওয়ামী লীগ’-এর নেতাকর্মী যাদের নামে জুলাই হত্যা মামলা বা অভিযোগ নেই এবং নিজ দলে যারা বঞ্চিত তাদের এনসিপিতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ মামলা থাকলেও এনসিপিতে যোগ দিলে যোগ দেয়ার আগে থানা ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেবে, আবার এখন পর্যন্ত খুনের মামলার আসামি নয় কিন্তু এনসিপি যদি তাকে দলে চায়, যোগ না দিলে মব সৃষ্টি করে খুনের মামলা দিয়ে দেয়া হবে। অতীতে সামরিক শাসকেরা দল গঠনের ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি ইস্যু’ সামনে রেখে এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। এখন জুলাই আন্দোলনের সিপাহসালাররা ‘খুনের মামলা পদ্ধতিতে’ দল গোছাতে ও রাজনীতির সংস্কার করতে চাইছেন! অবশ্য তাদের অনেকেই যেমন সার্জিস, হাসনাত বা শিবিরের সাদিক কায়েমরাও এক সময় কিন্তু গুপ্ত হোক আর সুপ্ত হোক ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ছিলেন। তাই ভিন্ন ‘দোসর’ দের দলে নিতে অসুবিধা কোথায়!
কথায় কথায় ফ্যাসিবাদ উচ্চারণ করা তরুণ নেতৃত্ব প্রকৃত ফ্যাসিবাদ কি তা উপলব্ধি করতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকেই মনে করেন ফ্যাসিবাদ। জুলাই আন্দোলনকে বা জুলাই হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করেন মুক্তিযুদ্ধের সাথে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এনসিপির বর্তমান জোট সঙ্গী জামায়াত ইসলামের বাহিনীসমূহের নৃশংসতা ও বর্বরতা নাৎসী হত্যাযজ্ঞকেও হার মানায়। হলোকাস্ট নামে অভিহিত নাৎসী হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহতা ছিল গ্যাস চেম্বার, যেখানে জাইক্লন বি নামক বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষকে একসঙ্গে শ্বাসরোধ করে মারা হতো। জনসমক্ষের বাইরে অবস্থিত গ্যাস চেম্বারে এ সব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো । আর বাংলাদেশে ১৯৭১-এর বড়ো বড়ো সব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্য জনসম্মুখে। পাকিস্তান সরকারের নথি অনুযায়ী শুধু মাত্র ২৫ মার্চ এক রাতেই ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সারা দেশে লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে জগন্নাথ হলসহ গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পিলখানা ও রাজারবাগে গণহত্যা, ঐ রাতেই দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সংখ্যালঘু হত্যা, ২৬ মার্চ ঢাকার শংকরিপারা ও রমনা কালী মন্দিরে গণহত্যা, ২৭ মার্চ সূত্রাপুর, জিঞ্জিরা ও বুড়িগঙ্গা নদী বক্ষে গণহত্যা, এমনিভাবে নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিন ও তার দোসরদের কতৃক দিনাজপুরের বারিহাট, ঠাকুরগাঁওয়ের জাঠিভাঙ্গা, পঞ্চগড়ের ঢাপঢুপ জয়পুরহাটের কড়ই কাদিপুর, রংপুরের কালীগঞ্জ, পটিয়া-চট্টগ্রামের মুজাফফরাবাদ, নাটোরের গোপালপুর,পাবনা জেলার বাগবাটি, সাতবাড়িয়া ও ডেমরা, ঢাকা জেলার বাড়িয়া, বরিশালের কেটনার বিল, ফরিপুরের সেনদিয়া, খুলনার ডাক্রা, ফরিদপুর পালংয়ের মধ্য পাড়া, বরিশালের ভিমনালি, কুমিল্লার বাখরাবাদ, সিলেটের বুরুঙ্গা, বরগুনা সদর, সিলেটের কৃষ্ণপুর ও আদিত্যপুর, হবিগঞ্জের মাকালকান্দি, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা কুড়িগ্রামের হাতিয়া, সৈয়দপুরের গোলাহাট উল্লেখযোগ্য গণহত্যার সব স্থান। এসব গণহত্যার স্থানে কোথাও শত শত কোথাও হাজারে হাজারে বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। যার সিংহভাগই ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন তরুণ ও যুবক। এর বাইরেও একই স্থানে নিহতের সংখ্যা ১শ’র কম এরকম আরও শত শত গণহত্যার এবং গণকবরের স্থান রয়েছে যা উল্লেখ করা হলো না। তবে উপরের তালিকায় যেটি বলা হয়নি সেটি হলো চুকনগর গণহত্যার কথা। সেখানে একদিনে দশ হাজার উদ্বাস্তুকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের সবথেকে বড় গনহত্যা তো বটেই, ক্ষুদ্র একটি স্থানে একত্রে একদিনে এত মানুষ হত্যার উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
আর হত্যার বিভৎসতা যে কত রকম ছিল। সৈয়দপুরের গোলাহাটে ট্রেন থেকে নামিয়ে হানাদার বাহিনী গুলি করে এবং রাজাকাররা রাম দা দিয়ে গলায় কোপ দিয়ে দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে মোট ৪৪৮ জন নারী-পুরুষ শিশুকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে এমন সন্দেহে রাজাকাররা তরুণদের এবং জাতীয়তাবাদীদের ধরে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে আসলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঈমানদার মুসলমান হওয়ার জন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে জামাত করে নামাজ পড়তে নির্দেশ দেয়। আর সেজদার সময়ে ব্রাশ ফায়ার করে সবাইকে হত্যা করে। তরুণদের দিয়ে গণকবর খুঁড়িয়ে তাদের দিয়ে মৃতদেহসমূহ সেখানে ফেলে এমন সময়ে গুলি করে যেন ঐ তরুণদের দেহ গণকবরেই পড়ে। আবার কখনও কখনও কোনো তরুণকে ধরে এনে তাকে নারকেল গাছ থেকে ডাব পাড়তে বলে। গাছে উঠে কয়েকটি ডাব নিচে ফেলার পর পাক সেনার গুলিতে তরুণটিও ডাবের মতো ঢপ করে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশ জুড়ে অসংখ্য বধ্যভূমি, গণকবর এবং হত্যা করার সব নির্মম পদ্ধতি আর বন্দী দেশে লাখো নারী ধর্ষণের কাহিনীই বলে দেয় ফ্যাসিবাদী নির্মমতা কি জিনিস। ‘হারুন আংকেলের’ ভাতের হোটেলে দুই চার দিন বন্দী থেকে ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এমনকি জুলাই ’৩৬ দেখেও ধারণা করা কঠিন আসল ফ্যাসিবাদ কী।
বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির রাজনৈতিক সহযোগী হওয়ায় অতীতকে তারা ঢেকে রাখতে চান। তারা নিজেদের নিকট-রাজনৈতিক অতীত জুলাই ’২৪ দিয়ে ঢেকে রাখছেন। আবার লাখো লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধে অগনিত মানুষের বীরত্বগাথা, স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ও তা পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবিস্মরণীয় ভূমিকা, বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষ জামায়াত ইসলাম, রাজাকার-আলবদরদের গণহত্যার সহযোগী ভূমিকা — সেসব ইতিহাসকেও তারা ঢেকে রাখতে চায় ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান দিয়ে। সংস্কার আর জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে তারা ব্যবহার করছেন বর্তমানের ক্ষমতা, বিলাসিতা আর উগ্রতাকে আলিংগন করে। আবার ভবিষ্যতটাও তারা দেখছেন নিছক ক্ষমতার চশমা দিয়ে। এখন দলীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিতে পারেন “আগে ভি জানে না তু, পিছে ভি জানে না তু”!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন