সংবাদ

রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই গুরুত্বপূর্ণ


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই গুরুত্বপূর্ণ

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল, মনে হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ ঋণের অবশিষ্ট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ দেবে না। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করা হয়। মোট ঋণ ৫.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে ২.৩ বিলিয়ন, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় না করায় বাধ্য হয়ে বিএনপি সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে; মাত্র দেড় মাসেই বিএনপি সরকার ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ২০২৬ সনের দেড় মাস ইউনূস সরকারের, বাকি দেড় মাস বিএনপি সরকারের- এই তিন মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণ হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারি সময়ে শুল্ক ও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা; ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুটোই কম হয়েছে, তাই রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রাজত্বে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে গুরুত্ব সহকারে অবহিত করেছিলেন। ব্যাপকহারে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণের কারণেও আওয়ামী লীগ সরকার তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের আমলে ঋণ গ্রহণের আনুপাতিক মাত্রা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়েও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। অথচ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে কোন একক অর্থবছরেই সরকারের গৃহীত ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ছিল না। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, অন্তর্বর্তী সরকার এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে খরচ করল কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দেশ চালানো হয়েছে ঋণের টাকা দিয়ে, অথচ দেশের এমন করুণদশার মধ্যেও মোহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। সম্ভবত জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য পরিশোধে জন্য বিএনপি সরকার ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২-১০৪ ডলার; কিন্তু ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলার, তখন কিন্তু তেল নিয়ে এত বিশৃঙ্খলা ˆতরি হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য ছিল বর্ধিত রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সনের নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপকতায় প্রবাসীরাও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তুষ্ট ছিল না, তাই অধিকাংশ প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অর্থ প্রেরণে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুণ্ডির অবৈধ পথ বেছে নেয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না আসায় রিজার্ভ কমতে থাকে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে পুনরায় অর্থ প্রেরণ শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অধিক পরিমাণে অর্থ প্রেরণের আরেকটি কারণ ডলারের সঙ্গে টাকার অধিকতর অবমূল্যায়ন। উপরন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার খরচও কমে যায়, রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকা সত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের মব কালচারের কারণে দেশ ছিল অস্থিতিশীল এবং অর্থনীতি ছিল চরম অবহেলিত। মবকে সরকার তাদের প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করায় ছাত্রদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও তাদের দাবি নিয়ে মিছিল-মিটিং করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় দেশে বিনিয়োগ হয়নি, বিনিয়োগ না হওয়ায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যায়; অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় হাজার হাজার লোক কর্মহীন ও বেকার হয়ে যায়। ইউনূস অর্থনীতির ছাত্র, তারপরও তিনি দেশের অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি।

আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেই দেশের নামকরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে কমিশন গঠন করলো, তারা ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জানান দিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি আর অর্থ পাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুর্নীতি হলে অর্থ পাচার হবেই। কিন্তু ওই সকল জাঁদরেল অর্থনীতিবিদেরা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব পেলেন কোথায় ? ঘুষ, দুর্নীতির লেনদেন হয় গোপনে, সেই অর্থ পাচার হয় কৌশলে, সরকারের অজান্তে। এখনো অর্থ পাচার হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে, এর রোধ করা যেমন কঠিন, হিসাব করাও কঠিন। ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েস করে ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচার করছে, দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরের টাকা তাদের বিদেশ-একাউন্টে ঘুষদাতাই জমা করে দিচ্ছে। এছাড়াও চিকিৎসার নিমিত্তে অর্থ পাচার হয়, বিদেশে ছাত্র-ছাত্রীর পড়ার খরচের জন্য অর্থ পাচার হয়, বিদেশ ভ্রমণে অর্থ পাচার হয়। অন্য দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরাও তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। পাচার করা অর্থ প্রেরত আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি, এর জন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করা হয়েছে। প্রথমদিকে অধ্যাপক ইউনূসের গুছিয়ে কথা বলার চাণক্য কৌশল জনগণকে বিমোহিত করেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে জনগণ বুঝতে পারলো সব অর্থহীন বাগাড়ম্বর।

ইউনূস সরকার মব সৃষ্টি ব্যতীত আর কিছুই করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিচালনাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হয়েছিল। সারা পৃথিবীর শতাধিক নামকরা ব্যক্তির তরফ থেকে মোহাম্মদ ইউনূসকে মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই সম্ভবত ইউনূসের প্রতিহিংসা এত তীব্র ছিল যে, প্রধান উপদেষ্টা হয়েও তিনি গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের লোকদের ধরার জন্য মবকে উষ্কে দিয়েছিলেন। তার চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ আমলের কথিত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের ধরা হলে জনগণ খুশি হতো, জনগণ খুশি হতো যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হতো। তারা কাজের কাজ কিছুই করেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে অধিক হারে খরচের অভিযোগ ওঠেছিল; বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয় তার সঙ্গে তুলনা করে অধিক খরচের চিত্রও আঁকা হয়েছিল; কিন্তু জনগণ হতাশ, কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের আমলে সম্পন্ন কাজে যে পরিমাণ খরচ করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার বাকি অংশ শেষ করতে আনুপাতিক হিসেবে খরচ আরও বেশি করেছে, কোন কোন প্রকল্পে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বাড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দুর্নীতি অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দ্বারা চাপা দেওয়া হয়েছে। একই কাজে বেশি খরচ করার জন্য এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ˆতরি হয়েছে।

রামু-কক্সবাজার রেল সংযোগ এবং কক্সবাজারের রাস্তায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের প্রায়োরিটি নেই মর্মে আওয়ামী লীগ আমলেও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু বাকি সবগুলো মেঘা প্রকল্প অপরিহার্য হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি তেল আনার জন্য ভারত থেকে যে পাইপলাইন আওয়ামী লীগ আমলে বসানো হয়েছিল তার অপরিহার্যতা বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে।

জ্বালানি তেলের সরবরাহ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব এখন বিপ্লবী আনু মুহাম্মদও সম্ভবত অবনত চিত্তে স্বীকার করবেন। অন্তর্বর্তী সরকার অকর্মক ও বিদ্বেষী না হলে আওয়ামী লীগ আমলে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্পটি বিএনপির জন্য এই মুহুর্তে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিত। গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ থেকে পাইপের সহায়তায় তেল খালাস করে কয়েক মাসের মজুত গড়ে তোলার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সনে, কিন্তু ইউনূস সরকার তা চালু করেনি। চীনের যে কোম্পানির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের মাধ্যমে চুক্তি মোতাবেক চালু করা হলে তা ২০২৪ সনেই চালু করা সম্ভব ছিল, যথা সময়ে চালু হলে বিএনপির আমলে তেলের ক্রাইসিস এত তীব্র হতো না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে তেল আনার ব্যবস্থাও আওয়ামী লীগ সরকার করে গেছে, যা উদ্বোধন হয় ২০২৫ সনে। একইভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি কেন চালু হচ্ছে না তাও অজ্ঞাত।

ঘুষ-দুর্নীতি একটুও কমেনি। তারপরও পেছনে তাকানোর সময় নেই, বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে দলমত নির্বিশেষে সবার শিল্পকারখানা চালু করার ব্যবস্থা নিতে হবে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। এছাড়াও রাজস্ব প্রশাসনে বিরাজমান ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মনোযোগী হতে হবে বিএনপি সরকারকে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আয়োজিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল, মনে হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ ঋণের অবশিষ্ট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ দেবে না। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করা হয়। মোট ঋণ ৫.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে ২.৩ বিলিয়ন, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় না করায় বাধ্য হয়ে বিএনপি সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে; মাত্র দেড় মাসেই বিএনপি সরকার ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ২০২৬ সনের দেড় মাস ইউনূস সরকারের, বাকি দেড় মাস বিএনপি সরকারের- এই তিন মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণ হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই ফেব্রুয়ারি সময়ে শুল্ক ও কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা; ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুটোই কম হয়েছে, তাই রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রাজত্বে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে গুরুত্ব সহকারে অবহিত করেছিলেন। ব্যাপকহারে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণের কারণেও আওয়ামী লীগ সরকার তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, তখন অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের আমলে ঋণ গ্রহণের আনুপাতিক মাত্রা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়েও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। অথচ বিগত ১৫ বছরের মধ্যে কোন একক অর্থবছরেই সরকারের গৃহীত ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ছিল না। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, অন্তর্বর্তী সরকার এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে খরচ করল কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দেশ চালানো হয়েছে ঋণের টাকা দিয়ে, অথচ দেশের এমন করুণদশার মধ্যেও মোহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। সম্ভবত জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য পরিশোধে জন্য বিএনপি সরকার ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২-১০৪ ডলার; কিন্তু ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলার, তখন কিন্তু তেল নিয়ে এত বিশৃঙ্খলা ˆতরি হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য ছিল বর্ধিত রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। এছাড়াও ২০১৮ সনের নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপকতায় প্রবাসীরাও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তুষ্ট ছিল না, তাই অধিকাংশ প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অর্থ প্রেরণে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুণ্ডির অবৈধ পথ বেছে নেয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না আসায় রিজার্ভ কমতে থাকে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে পুনরায় অর্থ প্রেরণ শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অধিক পরিমাণে অর্থ প্রেরণের আরেকটি কারণ ডলারের সঙ্গে টাকার অধিকতর অবমূল্যায়ন। উপরন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার খরচও কমে যায়, রিজার্ভে হাত দিতে হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকা সত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের মব কালচারের কারণে দেশ ছিল অস্থিতিশীল এবং অর্থনীতি ছিল চরম অবহেলিত। মবকে সরকার তাদের প্রেসার গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করায় ছাত্রদের পাশাপাশি পেশাজীবীরাও তাদের দাবি নিয়ে মিছিল-মিটিং করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় দেশে বিনিয়োগ হয়নি, বিনিয়োগ না হওয়ায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ হয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যায়; অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় হাজার হাজার লোক কর্মহীন ও বেকার হয়ে যায়। ইউনূস অর্থনীতির ছাত্র, তারপরও তিনি দেশের অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি।

আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ধরার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেই দেশের নামকরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে কমিশন গঠন করলো, তারা ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জানান দিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি আর অর্থ পাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুর্নীতি হলে অর্থ পাচার হবেই। কিন্তু ওই সকল জাঁদরেল অর্থনীতিবিদেরা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের হিসাব পেলেন কোথায় ? ঘুষ, দুর্নীতির লেনদেন হয় গোপনে, সেই অর্থ পাচার হয় কৌশলে, সরকারের অজান্তে। এখনো অর্থ পাচার হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে, এর রোধ করা যেমন কঠিন, হিসাব করাও কঠিন। ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েস করে ব্যবসায়ীরা অর্থ পাচার করছে, দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরের টাকা তাদের বিদেশ-একাউন্টে ঘুষদাতাই জমা করে দিচ্ছে। এছাড়াও চিকিৎসার নিমিত্তে অর্থ পাচার হয়, বিদেশে ছাত্র-ছাত্রীর পড়ার খরচের জন্য অর্থ পাচার হয়, বিদেশ ভ্রমণে অর্থ পাচার হয়। অন্য দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরাও তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি বিক্রি করে অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। পাচার করা অর্থ প্রেরত আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি, এর জন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করা হয়েছে। প্রথমদিকে অধ্যাপক ইউনূসের গুছিয়ে কথা বলার চাণক্য কৌশল জনগণকে বিমোহিত করেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে জনগণ বুঝতে পারলো সব অর্থহীন বাগাড়ম্বর।

ইউনূস সরকার মব সৃষ্টি ব্যতীত আর কিছুই করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিচালনাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হয়েছিল। সারা পৃথিবীর শতাধিক নামকরা ব্যক্তির তরফ থেকে মোহাম্মদ ইউনূসকে মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই সম্ভবত ইউনূসের প্রতিহিংসা এত তীব্র ছিল যে, প্রধান উপদেষ্টা হয়েও তিনি গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের লোকদের ধরার জন্য মবকে উষ্কে দিয়েছিলেন। তার চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ আমলের কথিত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের ধরা হলে জনগণ খুশি হতো, জনগণ খুশি হতো যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হতো। তারা কাজের কাজ কিছুই করেনি, বরং অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে অধিক হারে খরচের অভিযোগ ওঠেছিল; বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয় তার সঙ্গে তুলনা করে অধিক খরচের চিত্রও আঁকা হয়েছিল; কিন্তু জনগণ হতাশ, কারণ আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের আমলে সম্পন্ন কাজে যে পরিমাণ খরচ করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার বাকি অংশ শেষ করতে আনুপাতিক হিসেবে খরচ আরও বেশি করেছে, কোন কোন প্রকল্পে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বাড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দুর্নীতি অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড দ্বারা চাপা দেওয়া হয়েছে। একই কাজে বেশি খরচ করার জন্য এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ˆতরি হয়েছে।

রামু-কক্সবাজার রেল সংযোগ এবং কক্সবাজারের রাস্তায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের প্রায়োরিটি নেই মর্মে আওয়ামী লীগ আমলেও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু বাকি সবগুলো মেঘা প্রকল্প অপরিহার্য হিসেবে এখন বিবেচিত হচ্ছে। জ্বালানি তেল আনার জন্য ভারত থেকে যে পাইপলাইন আওয়ামী লীগ আমলে বসানো হয়েছিল তার অপরিহার্যতা বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে।

জ্বালানি তেলের সরবরাহ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব এখন বিপ্লবী আনু মুহাম্মদও সম্ভবত অবনত চিত্তে স্বীকার করবেন। অন্তর্বর্তী সরকার অকর্মক ও বিদ্বেষী না হলে আওয়ামী লীগ আমলে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্পটি বিএনপির জন্য এই মুহুর্তে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিত। গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ থেকে পাইপের সহায়তায় তেল খালাস করে কয়েক মাসের মজুত গড়ে তোলার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৪ সনে, কিন্তু ইউনূস সরকার তা চালু করেনি। চীনের যে কোম্পানির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের মাধ্যমে চুক্তি মোতাবেক চালু করা হলে তা ২০২৪ সনেই চালু করা সম্ভব ছিল, যথা সময়ে চালু হলে বিএনপির আমলে তেলের ক্রাইসিস এত তীব্র হতো না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে তেল আনার ব্যবস্থাও আওয়ামী লীগ সরকার করে গেছে, যা উদ্বোধন হয় ২০২৫ সনে। একইভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি কেন চালু হচ্ছে না তাও অজ্ঞাত।

ঘুষ-দুর্নীতি একটুও কমেনি। তারপরও পেছনে তাকানোর সময় নেই, বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে দলমত নির্বিশেষে সবার শিল্পকারখানা চালু করার ব্যবস্থা নিতে হবে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। এছাড়াও রাজস্ব প্রশাসনে বিরাজমান ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও মনোযোগী হতে হবে বিএনপি সরকারকে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত