সংবাদ

আর্কাইভ দেখুন

সৌদির ৪ অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার রেড অ্যালার্ট

সৌদির ৪ অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার রেড অ্যালার্ট

সৌদি আরবের চারটি অঞ্চলে তীব্র বজ্রপাত, ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে দেশটির জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র (এনসিএম)। একই সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় শিলাবৃষ্টি, শক্তিশালী দমকা হাওয়া এবং ধূলিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।   রোববার আবহাওয়া কর্তৃপক্ষের বরাত এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ।এনসিএমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জিজান, আসির, আল-বাহা ও মক্কা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এসব অঞ্চলে বৃষ্টির সঙ্গে শিলাবৃষ্টি ও প্রবল দমকা হাওয়া বয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও ধূলিঝড় ও বালুঝড়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।   ভারী বর্ষণের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া জিজান, আসির, আল-বাহা ও মক্কার কিছু অংশ এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সড়কগুলোতে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।   এদিকে, প্রতিকূল আবহাওয়ার পাশাপাশি সৌদির বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, দাম্মামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। মক্কায় ৩৯ ডিগ্রি এবং রিয়াদ ও বুরাইদাহতে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকতে পারে। এছাড়া মদিনায় ৩৭ ডিগ্রি, জেদ্দা ও জিজানে ৩৬ ডিগ্রি, হায়েলে ৩৩ ডিগ্রি, আরার, সাকাকা ও নাজরানে ৩২ ডিগ্রি এবং তাবুকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকতে পারে।  / 


তেল আবিব থেকে ওঠা ফ্লাইটে বোমাতঙ্ক

তেল আবিব থেকে ওঠা ফ্লাইটে বোমাতঙ্ক

ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাগামী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি দেওয়ার পর সেটি বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় জরুরি অবতরণ করেছে। উড়োজাহাজে থাকা ৬ জন ক্রু ও ৫১ জন যাত্রীকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়েছে।রোববার (১৮ অক্টোবর) ঘটনাটি ঘটে বলে নিশ্চিত করেছে বুলগেরিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়। খবর আল জাজিরার।বুলগেরিয়ার কতৃপক্ষ জানায়, অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইনসের ‘ওএস৮২’ ফ্লাইটটি তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে রোমানিয়া সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছালে ক্রুরা বোমা হামলার হুমকি বার্তা পান। পরিস্থিতি বিবেচনায় উড়োজাহাজটি বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ার দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিমানবাহিনীর একটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান উড়োজাহাজটিকে পাহারা দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সোফিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সহায়তা করে।উড়োজাহাজটির জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের নিরাপদে বের করে এনে পুরো বিমানে তল্লাশি চালায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ তদন্ত দল। যাত্রীদের সুবিধার্থে দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিমানসংস্থাটি।প্রযুক্তিভিত্তিক আকাশপথ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ার’ ও ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর তথ্যানুযায়ী, উড়োজাহাজটি রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে দক্ষিণ দিকে মোড় নেয় এবং জরুরি অবস্থার নির্ধারিত সংকেত ‘৭৭০০’ প্রচার করতে শুরু করে। পরবর্তীতে উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪৩ মিনিটে সোফিয়ার ভাসিল লেভস্কি বিমানবন্দরে নিরাপদে স্পর্শ করে।/ 


সরকারি কর্মচারীর সামাজিক দায় ও প্রচেষ্টা

সরকারি কর্মচারীর সামাজিক দায় ও প্রচেষ্টা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ এমএসএস শেষ করে শিক্ষা গবেষণার কাজে যুক্ত হয়েছিলাম আই ই আর নামক ইনস্টিটিউটে। একবছর পরে একটা ডিপ্লোমা ডিগ্রিও হাতে আসে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিতে। সেটা আশির দশকের শেষ দিককার সময়। দেশে নানান রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে লিখিত পরীক্ষা থেকে চাকরিতে যোগদান অবধি দেড়বছরের বেশি সময় লেগে যায়। সেটি অপ্রত্যাশিত হলেও তখন তা-ই হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসনে চাকরি করেছি মোট ৩২ বছর। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। এখন অবসরের বিরামহীন ক্লান্তিতে হিসাবের খেরোখাতায় চোখ মেলে ধরেছি। ভাবছি, কী পেলাম না-পেলাম তা নিয়ে দুঃখবোধ করে ফল হবে না। বরঞ্চ হেমন্ত মুখার্জির গানটা শুনি, 'যা কিছু পেয়েছি কাছে তাই সঞ্চয়, যা কিছু পেলাম নাকো সে আমার নয়'। সরকারের চাকরিতে যোগদান এবং অবসরের ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য গড়মিল সবসময়ই থাকে। যেমন, একই দিনে যোগ দিলেও অবসর প্রস্তুতি ছুটি (পিআরএল) শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন দিনে। এটা মূলত কর্মচারীর এসএসসি পরীক্ষা অথবা প্রমাণক জন্ম তারিখে ধরে নির্ধারিত হয়। সে হিসেবে আমার সহকর্মী বন্ধুদের কেউ কেউ আমার চেয়ে বছরদেড়েক বেশি সময় চাকরি করেছে। আবার মুষ্টিমেয় দু-চারজন আমার পূর্বে অবসরে গিয়েছেন। আমার অবসর হয় ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান থেকে। ব্যাচে বয়সের হিসাবেও আমি ছিলাম মধ্যম। ব্যাচমেটদের মাঝে এক অদ্ভুত রকমের মিডিওকার বলতে যা বোঝায় আমি তা-ই ছিলাম। একেবারে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাবে আমার মধ্যম মানের ক্যারিয়ারে চোখ রাখলে। আমার একাডেমিক রেজাল্ট ছিল মধ্যম, কোথাও খারাপ নেই তবে খুব ভালোও নেই। আমার দৈহিক উচ্চতা গড়পড়তা, আমাকে খুব খাটো বলেনা তবে লম্বা নই। গায়ের রঙও উজ্জ্বল নয় তবে শ্যামলা নই। অফিসার হিসেবেও প্রথম সারির দাবি না করলেও কখনো কোথাও নিম্নমানের ছিলাম না। বলা যায়, অনেক দুঃখ জাগানিয়া অতীত ও আনন্দ-বেদনার জনাকীর্ণ পথের পথিক হয়ে চাকরির তিনটা দশক কুশলেই পার করেছি। যাপিত জীবনপথের বাঁকে বাঁকে অসংখ্য প্রিয়জন হারানোর অব্যক্ত কষ্ট যেন বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের বাসা বেঁধে আছে। তাকে কোনো ক্রমেই সরানো যাচ্ছে না, বরং সে আরও গাঢ় স্থান করে নিজের আসন পেতে বসেছে।  ২.আমার চাকরি জীবনের শুরুর দিক থেকেই নিজ পরিবার, নিকট আত্মীয়-স্বজন এমনকি দূরের স্বজনদের প্রতিও কখনো মুখ ফিরিয়ে রাখি নি। সীমিত পরিসর, অতি নগন্য অবস্থান থেকে আর্থিক না হলেও অনেকের কর্মের সুযোগ এনে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। নিজের অস্বচ্ছল সাদামাটা জীবন জীবিকার মধ্যে থেকে আর্থিক সাহায্য করা খুব বেশি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আত্মীয়ের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এমন দুর্বলতা আমার একার নয়, এ যেন বাঙালি মধ্যবিত্তের রক্তের ভেতরে সুপ্ত হয়ে থাকা এক অমোঘ বাসনা। সে হিসেবে ৩৩ বছরে শতাধিক নিম্নবিত্ত, গরীব অসহায় মানুষের কর্মসংস্হানে সরাসরি সহায়তা করেছি। আজ এরা পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ বেঁচেবর্তে আছেন। কেউ আমাকে স্মরণ করুক না করুক, স্বীকার যাক, না-যাক তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকি পরবর্তীতে অকৃতজ্ঞতার মানসে বিরুদ্ধাচারণকারীদের নিয়েও কিছু বলার নেই। তারা এক সময় অনুশোচনা করবে। চাকরির প্রথম পাঁচ বছরের সময়ে গ্রামে পল্লী বিদ্যুতায়নের সংযোগ পেতে এক অসাধ্য সাধন করি। আমাদের বাড়িসহ এক বা একাধিক পাড়াকে মাঝখানে  বাদ দিয়ে বিদ্যুতায়ন হওয়ার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে বঞ্চিত এলাকাকে সঙ্গে নিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ সরবরাহ করার ব্যবস্হা করি। ৩.আমার এলাকার প্রথম পাঠশালা, প্রথম হাই স্কুল, চাতল বাগহাটার প্রতি দুর্বলতা সহজাত এবং চিরকালের। দেশের যেখানেই গিয়েছি প্রথম প্রেমের মতন সর্বদা হৃদয়মন্দির মাঝে রেখে দিয়েছি সেই প্রথম বিদ্যায়তনকে। নস্টালজিয়ায় একাধিকবার লিখেছি 'আমার ইস্কুল' আমার সময়কে নিয়ে। স্কুলের দু'চারজন পেশাদার শিক্ষককে আমার একাধিক গল্পের নায়ক করেছি। চাকরির কালে সেই স্কুলের জন্যে সরকারের কাছে নিজেই আবেদন করি এবং তদ্বির করে একটা সুরম্য বহুতল ভবন করিয়ে দিয়েছি। সরকারের অনুদান নিয়ে একটা দৃষ্টিনন্দন তোরণ করিয়েছি। আধুনিক মানের টয়লেট করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিয়েছি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এন্ড কলেজের এমপিও ভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উচ্চ পর্যায়ে সুপারিশসহ একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি। এমনকি আমার একই উপজেলায় অবস্থিত, ১৯১২ সালে স্হাপিত ঐতিহ্যবাহী আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের বালিকাদের জন্যে পৃথক শৌচাগার করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অনুদান প্রদান করেছি। উল্লেখ্য যে, চল্লিশের দশকের মাঝামাঝিতে আমার বাবা সেই জর্জ ইনস্টিটিউটের নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ৪.বাংলাদেশ সচিবালয়ে চাকরি করার সুবাদে নিজের গ্রামের রাস্তা-ঘাট মেরামতের জন্যে নীরবে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছি। সচিব পদে উপনীত হওয়ার অনেক পূর্ব থেকেই স্হানীয় নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিজেকে জড়িত করি। প্রচারণা করার পক্ষে থাকা জরুরি নয়। ১৯৯৬ সালে সরকারের স্হানীয় সরকার বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব হই। মানিকখালী বাজার হতে হযরত মেহচানশাহ মাজার পর্যন্ত রাস্তাটি প্রথম পাকা করার উদ্যোগ নিই এবং এলজিইডি'র তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হস্তক্ষেপ সম্পন্ন করি। ফলে এখন যেকোনো যানবাহন মাজার অবধি পৌঁছাতে পারে। আগে এমন সুযোগ ছিল না। সরকারের স্বাস্থ্য সচিবের দায়িত্ব পালনকালে করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী'র অকাল মৃত্যু হয়। যা তখন দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। কিছু দিন পরে গ্রামের বাড়ির পাশে পৈত্রিক জমি সরকারের বরাবর রেজিষ্ট্রিমূলে হস্তান্তর পূর্বক স্ত্রী'র নামে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক স্হাপন করি। ক্লিনিকটি নির্মান করতে গিয়ে নিজের জীবনই বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এলাকার এমপি এবং নিজ গ্রামের তথা উপজেলার কতিপয় ভাড়াটে দুষ্কৃতকারী, অবিবেচক, অমানুষ কর্তৃক দিবালোকে সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হই। তবু পিছপা হয়ে হাল ছাড়ি নি আমি, সামনে এগিয়ে যাই। পরিসংখ্যানে জানা যায়, ক্লিনিক চালু হওয়ার পর গত পাঁচবছর যাবৎ সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯০-১০০ জন স্হানীয় গরীব, হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষ বিনামূল্যে ওষুধ সেবা নিয়ে চলেছেন। ৫.আমি তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শুনলাম, মানিকখালী বাজারে অবস্থিত পুরানো ইউনিয়ন পরিষদের জমিটা স্হানীয় অসাধু চক্র দখলের চক্রান্ত করছে। জমিটা ওয়াকফ বা খাস খতিয়ানভূক্ত হতে পারে। তৎকালীন জেলাপ্রশাসক কিশোরগঞ্জ এবং ইউএনও কটিয়াদি'র মাধ্যমে একটি প্রস্তাব মন্ত্রনালয়ে প্রেরণের ব্যবস্হা করি। উল্লেখ্য যে, সেই পঞ্চাশের দশক থেকে সেখানে চান্দপুর ইউনিয়ন বোর্ড/পরিষদের কার্যক্রম চলমান ছিল। কয়েকবছর আগে বাজারের একটু দূরবর্তী স্হানে সরকারিভাবে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মিত হওয়ায় জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তখন আমার স্বাক্ষরিত ডি,ও, লেটার ভূমি মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে একই স্থানে ইউনিয়ন তহসীল অফিস অনুমোদন করিয়ে দিই। বর্তমানে সেখানে তহসীল অফিসের ভবন হয়েছে এবং জায়গাটি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্হায়ীভাবে বেঁচে গেছে। বলাবাহুল্য, জেলা প্রশাসক পদে মাঠ প্রশাসনে চাকরির সুবাদে অবৈধ দখলদার শ্রেণির কাছ থেকে সরকারের খাস জমি উদ্ধার কাজে আমি বরাবরই সফল এবং প্রশংসিত হয়েছিলাম। ভূমি মন্ত্রনালয় থেকে সনদপত্রও লাভ করেছিলাম। ৬. ২০২০ সাল। সরকারের সচিব হিসেবে কিছুদিন কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখার সুযোগ হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে একদিন কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে কটিয়াদির স্হানীয় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অকাল প্রয়াত আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দীন আমার পথ আগলে দাঁড়ান, আমাকে জোর করে কটিয়াদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং এর জন্যে কিছু একটা করতে বলেন। আমাকে দুর্বল করার নিমিত্ত, তিনি অতীতে এই হাসপাতালে আমার পরিবারের অসংখ্য লোকজনের চিকিৎসা নেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তার আগ্রহে সেদিন আমি তাৎক্ষণিক পরিদর্শন করতে যাই। ঢাকায় ফিরে এসে স্বাস্থ্য মন্ত্রী'র সঙ্গে কথা বলি। কটিয়াদি হেলথ কমপ্লেক্স উন্নীতকরণের বিষয়ে আলোচনা করি। তিনি বললেন, "উপজেলা পর্যায়ে ১০০ বেড আর হবে না। জনবল সংকট হেতু এ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। বললাম,  'অন্তত আরেকটা অনুমোদন করে দিন স্যার, আমার চাকরি বেশিদিন নেই। সচিব হিসেবে জন্মস্থানে সামান্য একটি স্মৃতিস্মারক থাক'। তিনি মৌন থাকলেন, তবে এটা অসম্মতি নয়। এভাবেই ৩৪ কোটি টাকার নির্মান ব্যয় অনুমোদন হলো। এবং এইচ,ই,ডি'র প্রধান প্রকৌশলীকে ডেকে এনে দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে ১০০ বেডের বর্তমান দৃষ্টিনন্দন ও আলোকিত এই কমপ্লেক্স করা হলো। তবে আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দিন তা দেখে যেতে পারেননি। এর আগেই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমার প্রচেষ্টায় অনুমোদিত প্রতিটি কাজেই স্হানীয় দুর্বৃত্তরা কমবেশি চাঁদাবাজি করেছে, ঠিকাদারের ওপর জুলুম করেছে, যা পরবর্তীতে জেনেছিলাম।৭. দীর্ঘ চাকরির ইতি টেনে অবসরের অব্যবহিত পরে আরও একটা ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক কাজে হাত দিই। গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকের সংলগ্নে একই বাউন্ডারিতে একটি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ করার সিদ্ধান্ত নিই। সম্পূর্ণ স্ব উদ্যোগ ও স্বঅর্থে পৈত্রিক জমিতে প্রয়াত মা-বাবার নামে একটা কলেজ হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই 'আয়েশা-ছিদ্দিক মহিলা কলেজ' নামকরণ করে সরকারের কাছে আবেদন করি এবং অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে কলেজের স্বীকৃতি, পাঠদান অনুমোদন, ইন, কোডসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করি। কলেজটি চালু করতে ও ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি নিয়ে অপরিমেয় শ্রম ও নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রথম দু'বছর পর্যাপ্ত ছাত্রী না পেয়ে সরকারের কাছে পুনঃ সহশিক্ষার অনুমতি নিই। স্হানীয় বহুবিধ বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতার দেয়াল ডিঙিয়ে কলেজটি এখন সুশিক্ষার আলো বিকিরণের পথে একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের জন্য বিশেষ সুযোগসহ উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য করা তথা আমার জন্মদাতা ধার্মিক ও পরহেজগার মা-বাবাকে কালের ধুলোয় কিছুকাল বাঁচিয়ে রাখার মানসেই এমন সমাজহিতৈষী কর্মে নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। একইসাথে অনাগত কাল ধরে আমার কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের জ্ঞান পিপাসায় হাতের কাছে এক গ্লাস শীতল জলের মতন স্বস্তির পরশ নিয়ে দাঁড়াবে, এমন একটা বিচিত্র পুস্তকে সাজানো নান্দনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্টায় কাজ করছি। বাস্তবতা হলেও সত্য যে, এখন এক অসহনীয় অবসর জীবন নিয়ে আমি বেঁচে আছি। অসীম শূন্যতা আর একাকীত্বের সঙ্গে আমার নিত্য বসবাস। নিঃসঙ্গতাকে জয় করে চলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তথাপি অজস্র ভাবনার ভেতরে আমাকে সারাক্ষণ জেগে থাকতে হচ্ছে। জেগে থাকা মানে স্বপ্নের ঘোরে বেঁচে থাকার প্রহরগোনা। নশ্বর এ পৃথিবীতে সবাই কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যেতে চায়। পার্থিব ধন-সম্পদ, সুযোগ্য উত্তরাধিকার, খ্যাতি, যশ অনেক কিছু। কিন্তু পরার্থে, পরজনে কিছু রেখে যাওয়া সহজ কাজ নয়। মানুষ অনেক কিছু পারে না, আবার যা পারে তা নিয়ে সন্তোষ্ট থাকতেও পারে না। এটা মানুষের জন্মগত ও সহজাত দুর্বলতা। তথাপি আমি নিজেকে অকৃতি, অধম জেনেও নিরন্তর সৃষ্টিশীল কিছু করার মোহে বেঁচে থাকি।  [লেখক: সাবেক সচিব, গল্পকার]


হতাশার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ইউনাইটেড

হতাশার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ইউনাইটেড

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে হতাশার বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। লিডস ইউনাইটেডের মাঠে ১–১ গোলে ড্র করে আরও একটি অস্বস্তিকর ম্যাচ পার করল রেড ডেভিলসরা। অন্যদিকে, নিজেদের সেরা ছন্দে না থাকলেও ননি মাদুয়েকের শেষ মুহূর্তের গোলে নটিংহ্যাম ফরেস্টকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে স্বস্তির জয় তুলে নিয়েছে মিকেল আরতেতার আর্সেনাল।রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতের এই ফলাফলে চাপে থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ মাইকেল ক্যারিকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল। ৭ ম্যাচে মাত্র ৭ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার ১৩তম স্থানে রয়েছে তারা। বিপরীতে, কষ্টের এই জয়ে টেবিলের শীর্ষস্থানধারী ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধান তিনে নামিয়ে এনেছে গানাররা। ৭ ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে সিটি, আর সমান ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে আর্সেনাল।চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আগের ৯ ম্যাচে মাত্র দুটিতে জয়ের দেখা পাওয়া ইউনাইটেড এদিন জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছিল। প্রথমার্ধের ৩৫ মিনিটে ব্রায়ান এমবিউমোর দুর্দান্ত গোলে এগিয়েও গিয়েছিল তারা। তবে বিরতির পর ৫১ মিনিটে ডমিনিক ক্যালভার্ট-লুইনের গোলে সমতা ফেরায় স্বাগতিক লিডস। এরপর ম্যাচের বাকি সময়ে জয়সূচক গোলের দেখা পেতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনলেও কাঙ্ক্ষিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি ক্যারিকের শিষ্যরা।এদিকে, দিনের অন্য ম্যাচে নটিংহ্যাম ফরেস্টের মাঠে বেশ ঘাম ঝরাতে হয়েছে আর্সেনালকে। পুরো ম্যাচে নিজেদের সহজাত ছন্দে দেখা যায়নি তাদের। তবে ৮০ মিনিটে ননি মাদুয়েকের জাদুকরী গোলটি গানারদের ১–০ ব্যবধানের কঠিন জয় নিশ্চিত করে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রাইটনের কাছে হারের পর এটি তাদের টানা তৃতীয় জয়। গতবারের লিগ চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের সেরা খেলা উপহার দিতে না পারলেও ঠিকই কাঙ্ক্ষিত তিন পয়েন্ট তুলে নিয়ে শীর্ষ লড়াই জমিয়ে তুলেছে।/ 


এমবাপ্পের জোড়া গোলে সেভিয়াকে ওড়াল রিয়াল

এমবাপ্পের জোড়া গোলে সেভিয়াকে ওড়াল রিয়াল

কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল এবং আরদা গুলার ও ইয়ান দিয়োমান্দের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সেভিয়াকে ৪–১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পাওয়া এই জয়ে লা লিগার পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষের দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান আরও কমিয়ে আনল লস ব্লাঙ্কোসরা।আন্তর্জাতিক বিরতির পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি রিয়ালের টানা তৃতীয় জয়। ২১ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে কার্লো আনচেলত্তির দল। এক পয়েন্ট এগিয়ে দুইয়ে রয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। আগামী রোববার মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার মুখোমুখি হওয়ার আগে এই বড় জয় রিয়াল শিবিরকে দারুণ আত্মবিশ্বাস জোগাবে।নিষেধাজ্ঞার কারণে দলের অন্যতম ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ছাড়াই মাঠে নেমেছিল রিয়াল। তবে আক্রমণভাগে তার অভাব বুঝতে দেননি সতীর্থরা। তুর্কি মিডফিল্ডার আরদা গুলারের সৃজনশীলতায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্বাগতিকরা। ম্যাচের প্রথমার্ধেই গুলারের গোলে এগিয়ে যায় রিয়াল। এরপর ৩৭ মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চূর্ণ করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে।দ্বিতীয়ার্ধে সেভিয়া ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালালেও রিয়ালের জমাট রক্ষণ ও কাউন্টার অ্যাটাক তাদের সেই সুযোগ দেয়নি। ম্যাচের ৬০ মিনিটে ডি-বক্সে এমবাপ্পে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় রিয়াল। স্পট কিক থেকে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোল করেন এমবাপ্পে। শেষ দিকে সেভিয়া একটি গোল শোধ করলেও, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ইয়ান দিয়োমান্দে দুর্দান্ত এক গোল করে রিয়ালের ৪–১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত করেন।এদিকে, চোট কাটিয়ে দীর্ঘ দিন পর মাঠে ফেরা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার এদের মিলিতাও ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে নেমে সমর্থকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পান।/ 


খাদ্যনিরাপত্তায় উৎপাদনের পাশাপাশি চাই পুষ্টি ও সুরক্ষা

খাদ্যনিরাপত্তায় উৎপাদনের পাশাপাশি চাই পুষ্টি ও সুরক্ষা

খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত, মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ও কর্মক্ষম জীবনের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা বলতে কেবল মানুষের পেট ভরানোর মতো খাবারের জোগান নিশ্চিত করাকে বোঝায় না। খাদ্য হতে হবে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পুষ্টিকর। সেই সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এমন হতে হবে, যাতে আয়, শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত না হন। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তা একই সঙ্গে কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপ্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে সাফল্য, মাছ, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষিপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ও জটিল সংকটও দেখা দিয়েছে। খাদ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, কৃষিজমির সংকোচন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ, পুষ্টিহীনতা, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।ফলে আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, প্রত্যেক মানুষ কি সারা বছর সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছেন? কৃষক কি তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন? ভোক্তা কি খাবারের প্রকৃত গুণমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারছেন? আর রাষ্ট্র কি খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে পারছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে খাদ্যনিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা: খাদ্য থাকা আর খাদ্য পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যজাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—এফএওর স্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রাখেন। এ ধারণার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ রয়েছে—খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্য, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার ও পুষ্টিমান এবং সময়ের সঙ্গে খাদ্যপ্রাপ্তির স্থিতিশীলতা।খাদ্যের প্রাপ্যতা বলতে বোঝায় দেশে উৎপাদন, আমদানি ও মজুতের মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান থাকা। কিন্তু বাজারে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষ তা কিনতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাদ্যের দাম যদি পরিবারের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বাজারে পণ্য থাকা সত্ত্বেও সেই পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আবার খাবার পাওয়া গেলেও তা দূষিত, ভেজালযুক্ত কিংবা পুষ্টিগতভাবে অপর্যাপ্ত হলে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না।এখানে স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার স্বাভাবিক সময়ে খাবার কিনতে পারলেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বেকারত্ব, অসুস্থতা কিংবা দ্রব্যমূল্যের আকস্মিক বৃদ্ধির সময় খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা তাই এক দিনের বা এক মৌসুমের অর্জন নয়; এটি সারা বছর ধরে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার বিষয়।খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা বা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। খাদ্যনিরাপত্তা মূলত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা বোঝায়; অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য বলতে এমন খাদ্য বোঝায়, যা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত খাবার থাকলেও তা নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতাবিশ্বে কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলেও ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর The State of Food Security and Nutrition in the World 2024 প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে প্রায় ৭৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের ক্ষুধার্ত থাকার হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রায় ২৮০ কোটির বেশি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকার বিষয়টিও উঠে আসে।এই সংকটের পেছনে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি দায়ী নয়। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত, দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যবাজারের অস্থিরতা এর সঙ্গে জড়িত। কোথাও খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু সংঘাতের কারণে তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; কোথাও খাদ্য আছে, কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা নেই; আবার কোথাও পুষ্টিকর খাবারের তুলনায় সস্তা ও নিম্নমানের খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং আয়বৈষম্য খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতা তৈরি করে। একজন সচ্ছল মানুষের জন্য যে খাদ্যতালিকা সহজলভ্য, একজন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য তা অনেক সময় নাগালের বাইরে থাকে।বিশেষত চালের ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, দুধ, ডিম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সীমিত উপস্থিতি এবং পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের বড় অংশ মৌলিক খাদ্যে ব্যয় হওয়ার কারণে পুষ্টিনিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে মানুষের পুষ্টিগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি।উৎপাদনে সাফল্য, তবু কেন খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ?বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চফলনশীল জাত, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবহার, কৃষি গবেষণা এবং কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফলে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাছ, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।তবে কৃষি উৎপাদনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ নয়। কৃষিজমি কমে যাওয়া, জমির খণ্ডিত মালিকানা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচের পানির প্রাপ্যতা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কৃষকের আয় ও উৎপাদনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের ঘাটতি এবং বাজার তদারকির দুর্বলতা এই ব্যবধান বাড়াতে পারে।কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, ভোক্তার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পৌঁছাতে না পারলে খাদ্যপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়। তাই কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে ন্যায্য ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজারদর ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক সমবায়, উৎপাদক সংগঠন, কৃষিপণ্যের স্থানীয় বাজার এবং সরাসরি বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তন: খাদ্যনিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি হুমকিবাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তুলছে। লবণাক্ত জমিতে প্রচলিত ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে; আবার পানির সংকট, দুর্যোগে ফসলহানি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাড়তি ঝুঁকিতে ফেলে।হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ধানের ফসল নষ্ট করতে পারে। চরাঞ্চলে নদীভাঙন মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি কেড়ে নেয়। উত্তরাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদন এবং সেচের ব্যয় বাড়াতে পারে। দুর্যোগের ক্ষতি শুধু মাঠের ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্য পরিবহন, বাজার, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবারের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এখন আর ঐচ্ছিক কোনো কর্মসূচি নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যাসহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; কৃষক যেন প্রয়োজনীয় বীজ, প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বাজারসুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। খাদ্যব্যবস্থাকে শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল রাখলে পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ডাল, তেলবীজ, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ: নীরব জনস্বাস্থ্যঝুঁকিখাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো খাদ্যদূষণ ও ভেজাল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিক্রয় ও রান্না—প্রতিটি পর্যায়ে অসতর্কতা, অনিয়ম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের কারণে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।রাসায়নিক দূষণ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, অননুমোদিত রং, অনুপযুক্ত সংরক্ষণকারী পদার্থ এবং জীবাণুজনিত দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, নিরাপদ পানির অভাব, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাদ্য সংরক্ষণ না করাও খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হন এবং প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিসংখ্যান নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে।বাংলাদেশে খাদ্যবাজারের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। কোনো পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়; দূষণের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে পণ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।তবে খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে প্রচারিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোন পণ্য, কোন এলাকা, কোন সময় এবং কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে—এসব তথ্য ছাড়া একটি নমুনার ফলাফলকে পুরো দেশের খাদ্যবাজারের চিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষণব্যবস্থাই জনআস্থা বাড়ানোর ভিত্তি।খাদ্য নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু বিক্রেতার নয়। কৃষক, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহনকারী, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তা—সবার দায়িত্ব রয়েছে। তবে দায়িত্বের এই বণ্টন যেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আইনগত দায়কে দুর্বল না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা: পেট ভরলেই সুস্থতা আসে নাএকটি দেশের খাদ্যব্যবস্থা সফল কি না, তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে কি না, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কি না, নারীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন কি না এবং দরিদ্র পরিবারগুলো স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে কি না—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে শিশুদের খর্বাকৃতি, রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি এবং খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যের ঘাটতি দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। বিশেষত গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, শিশু, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন—গর্ভধারণ থেকে দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত—শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই মাতৃপুষ্টি, বুকের দুধ খাওয়ানো, বয়স অনুযায়ী পরিপূরক খাবার, টিকাদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যে ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। স্কুলের খাদ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রম এবং পুষ্টিশিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে হবে।এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি: দরিদ্র পরিবারকে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুষ্টিনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। খাবার কেনার সামর্থ্য, বাজারে প্রাপ্যতা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে পুষ্টিশিক্ষার সুফল সীমিত থেকে যায়।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার: খাদ্যাভ্যাসের নতুন সংকটবাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার। বিস্কুট, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার নগর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ত জীবন, সহজে বহনযোগ্য খাবারের চাহিদা, বিজ্ঞাপন এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস এই প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অস্বাস্থ্যকর বলা ঠিক নয়। দুধ পাস্তুরিত করা, খাবার হিমায়িত করা কিংবা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন কিছু পণ্যের ব্যাপক গ্রহণ, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি বা ক্যালরি রয়েছে এবং যেগুলো পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের জায়গা দখল করতে পারে।অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে দ্য বিএমজেতে প্রকাশিত একটি ছাতাগবেষণায় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশি সংস্পর্শের সঙ্গে একাধিক প্রতিকূল স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা উচিত নয়। খাদ্যের উপাদান, গ্রহণের পরিমাণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।তবু অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়; অতিরিক্ত মুক্ত চিনি দাঁতের ক্ষয়, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত; আর সম্পৃক্ত চর্বির অতিরিক্ত গ্রহণ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অসংক্রামক রোগ মোট মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী। তাই এসব রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যপরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।খাবারের প্যাকেটে সতর্কবার্তা: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগখাদ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে একজন সাধারণ ভোক্তার পক্ষে কি সহজে বোঝা সম্ভব যে পণ্যটিতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি কিংবা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে? প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য কি সবাই বুঝতে পারেন? আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও মোড়কের আড়ালে পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি অস্পষ্ট থাকলে ভোক্তার সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল—খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে পুষ্টিগত তথ্য বা সতর্কবার্তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা।বাংলাদেশে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ১৫ অক্টোবর গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এফওপিএল চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। এই তথ্যের মূল তাৎপর্য হলো, এসব পণ্যের বিস্তার ব্যাপক। তবে গবেষণার নমুনা, তথ্য সংগ্রহের সময়, খাবারের সংজ্ঞা ও গ্রহণের পরিমাণ যাচাই না করে এ থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের উদ্দেশ্য হলো ভোক্তাকে সহজে বোঝানো, কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে কি না। দেশভেদে এর নকশা আলাদা হতে পারে। কোথাও কালো অষ্টভুজাকৃতির চিহ্ন, কোথাও স্পষ্ট লিখিত সতর্কবার্তা কিংবা অন্য দৃশ্যমান নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্থানীয় ভোক্তার বোধগম্যতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনা করে।এফওপিএলের একটি বড় সুবিধা হলো, এটি পুষ্টিতথ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় সময় ও জটিলতা কমাতে পারে। একজন ভোক্তা একাধিক পণ্যের মধ্যে তুলনা করার সময় দ্রুত বুঝতে পারবেন, কোন পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বেশি। এর ফলে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন সহজ হতে পারে।আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো খাদ্যশিল্পের পণ্য সংস্কারে প্রণোদনা সৃষ্টি। অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত পণ্যে সতর্কবার্তা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক হলে উৎপাদকরা পণ্যের উপাদান পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ফলে লেবেলিং শুধু ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনের উপায় নয়; এটি খাদ্যপণ্যের পুষ্টিগত মান উন্নত করারও একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার।তবে লেবেলিং একাই অসংক্রামক রোগের সমাধান নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সতর্কবার্তার দৃশ্যমানতা, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, সঠিক পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত নজরদারি এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।বাধ্যতামূলক লেবেলিং কেন প্রয়োজন?স্বেচ্ছামূলক লেবেলিং ব্যবস্থায় সব উৎপাদক একই নিয়ম অনুসরণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান স্পষ্ট ও সহজবোধ্য তথ্য দিতে পারে, অন্য প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দৃশ্যমান কিংবা বিভ্রান্তিকর চিহ্ন ব্যবহার করতে পারে। এতে ভোক্তার পক্ষে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে তুলনা করা কঠিন হয়।এ ছাড়া যেসব পণ্যে সতর্কবার্তা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেগুলোর উৎপাদক স্বেচ্ছায় সেই সতর্কবার্তা দিতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রযোজ্য পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন নিয়ম থাকা প্রয়োজন।ছোট প্যাকেটের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। প্যাকেট ছোট হওয়ায় নকশাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি তাতে কমে যায় না। সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার পরিবর্তে পাঠযোগ্যতা ও দৃশ্যমানতা বজায় রেখে উপযোগী নকশা নির্ধারণ করা যেতে পারে।প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে খাদ্যশিল্পের বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্যাকেজিং পরিবর্তন, পুষ্টিগত পরীক্ষা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সংশোধনে ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতির সময় ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই বিবেচনা যেন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে কিংবা অনির্দিষ্টকালের বিলম্বের কারণ না হয়।বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যথাযথ আইনি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জনস্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে যুক্তিযুক্ত পথ।আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাচিলি ২০১৬ সালে নির্দিষ্ট পুষ্টিগত সীমা অতিক্রম করা প্যাকেটজাত খাবারে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা চালু করে। একই সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ধরনের বিপণন এবং স্কুলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরবর্তী গবেষণায় পণ্য নির্বাচন, খাদ্যপণ্যের গঠন পরিবর্তন এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।মেক্সিকো, পেরু এবং লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশও প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল চালু করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট নকশা, নির্ধারিত পুষ্টিগত সীমা, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন।তবে অন্য দেশের নীতি হুবহু বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ করা উচিত নয়। দেশের খাদ্যবাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকের সক্ষমতা, ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্য বিবেচনা করে উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় প্রমাণের ভিত্তিতে নীতিমালা উন্নত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩; ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯; বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু আইন প্রণয়ন আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন, নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, অপরাধের দ্রুত নিষ্পত্তি, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি এবং ভোক্তার অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে আইনের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।নিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকায় তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়—প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও অনিয়ম শনাক্ত হলে কোন প্রতিষ্ঠান তদন্ত করবে, কে নমুনা পরীক্ষা করবে, কে ব্যবস্থা নেবে এবং কীভাবে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি।খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। ছোট বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বড় উৎপাদক বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম যেন উপেক্ষিত না থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ অপরিহার্য।খাদ্য অপচয় রোধ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নখাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা। ফসল তোলার পর যথাযথ সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ঘাটতির কারণে অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ।খাদ্য অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো নয়; উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি, পানি, জ্বালানি, শ্রম ও অন্যান্য সম্পদের অপচয়ও কমানো। উৎপাদিত খাদ্যের বড় অংশ নষ্ট হলে নতুন করে উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবেশের ক্ষতিও বৃদ্ধি পায়।এ জন্য কৃষিপণ্যের সংগ্রহকেন্দ্র, আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহনব্যবস্থা এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এসব সুবিধা সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য উন্নত করা এবং খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।পরিবার ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও খাবার অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া, অবশিষ্ট নিরাপদ খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া নাগরিক দায়িত্বের অংশ।খাদ্যনিরাপত্তায় নাগরিক, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাখাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের হলেও নাগরিক সচেতনতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাকে খাদ্যের মেয়াদ, উপাদান, সংরক্ষণবিধি এবং প্রযোজ্য মানচিহ্ন যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণও খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্র বা উৎপাদকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একজন ভোক্তার পক্ষে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক উপাদান বা জীবাণু নিজে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ অপরিহার্য।বিদ্যালয় ও কলেজে খাদ্য ও পুষ্টিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের সুষম খাদ্য, নিরাপদ পানি, খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং প্যাকেটের পুষ্টিতথ্য বোঝার বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের আশপাশে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ প্রয়োজন।গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খাদ্যে ভেজাল বা বাজারদরের অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা নয়; খাদ্যনীতির অগ্রগতি, আইনের প্রয়োগ, গবেষণার ফলাফল এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে কোনো গবেষণার পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে তার উৎস, নমুনা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। অতিরঞ্জিত বা যাচাইহীন তথ্য জনসচেতনতার পরিবর্তে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষত এফওপিএল প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ আলোচনা, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই যা করা প্রয়োজনবাংলাদেশে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।প্রথমত, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সাশ্রয়ী খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সরবরাহব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরাসরি বিপণনের সুযোগ বাড়াতে হবে।তৃতীয়ত, খাদ্যদূষণ প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকীকরণ, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং অপরাধের কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্ত করার জন্য ট্রেসেবিলিটি বা অনুসরণযোগ্যতা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।চতুর্থত, প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বির জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সীমা, স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অভিন্ন নকশা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদককে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হলেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য যেন দুর্বল না হয়।পঞ্চমত, পুষ্টিনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। দরিদ্র পরিবার, শিশু, গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, স্কুলের খাদ্য কর্মসূচি এবং মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।ষষ্ঠত, খাদ্য অপচয় কমিয়ে সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আধুনিক গুদাম, হিমাগার, শীতল পরিবহন এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো সহজ হবে।সপ্তমত, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, মূল্য, পুষ্টি, খাদ্যদূষণ এবং অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ ও প্রকাশ করা প্রয়োজন। গবেষণার তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করতে হবে এবং গৃহীত কর্মসূচির ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।অষ্টমত, খাদ্যব্যবস্থার সব পর্যায়ে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎখাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে খাদ্যের নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, ক্রয়ক্ষমতা ও ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।একটি দেশের খাদ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টন ধান উৎপাদিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হবে, কৃষক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না; নিম্ন আয়ের পরিবার পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না; শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না; খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে কি না; এবং ভোক্তা খাদ্যের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন কি না।বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকারকে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে হলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও প্রচারণার বাইরে গিয়ে কার্যকর নীতি, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পুষ্টিশিক্ষা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং প্যাকেটজাত খাবারের বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেলিংয়ের মতো উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।খাদ্যনিরাপত্তা কোনো এক দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্যব্যবস্থা মানুষের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করছে, কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে না এবং উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি বজায় থাকছে।আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ক্ষুধার কারণে বঞ্চিত হবেন না, অর্থের অভাবে পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাকবেন না এবং অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হবেন না। খাদ্য হবে সহজলভ্য, পুষ্টিকর ও নিরাপদ; কৃষক পাবেন ন্যায্য মূল্য; ভোক্তা পাবেন সঠিক তথ্য; আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক খাদ্যব্যবস্থা।নিরাপদ খাদ্য মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সুস্থ জীবন, পুষ্টিকর খাদ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রতিদিনের জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]


প্রতিটি শিশুর বিকাশে চাই সমান সুযোগ

প্রতিটি শিশুর বিকাশে চাই সমান সুযোগ

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কথাটি সমাজে বহুল প্রচলিত হলেও এর তাৎপর্য অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ অর্থাৎ, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তারাই একদিন পরিবার, সমাজ ও দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।তাই দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শিশুদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে প্রতিটি শিশুর মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটবে। সমাজে ফুটে উঠবে শত ফুল।শিশুরা জন্মগতভাবে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত নয়। তারা নিজ নিজ পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই নানা মূল্যবোধ শেখে। শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলার সুযোগ, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষা, খেলাধুলা, খেলার উপকরণ ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত কার্যক্রম যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের উদ্যোগও অব্যাহত রাখতে হবে।শিশুদের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও মায়েদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এর বাইরে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ এক লাখের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে লেখকের উল্লেখিত তথ্যে জানা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের সামাজিক দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ এবং সুস্থ জাতি গঠনে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।বিশেষ করে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অনগ্রসর ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এসব পরিবারের অনেক মা-বাবার পক্ষে সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সন্তানরা শিক্ষা, পুষ্টি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; এ ধরনের ব্যবস্থা বৈষম্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা চালু করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ ও জুতা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। এতে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো সম্ভব হবে।দুঃখজনকভাবে, অনেক শ্রমজীবী, দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের মা-বাবা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেন। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে তাঁদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে খাদ্যসহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা যেতে পারে, যাতে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে পরিবারের জীবিকা নির্বাহে বাড়তি সংকট তৈরি না হয়। এ ধরনের সহায়তা শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করার প্রবণতা কমাতে এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। শরীর সুস্থ না থাকলে মনও ভালো থাকে না; অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। শিক্ষার্থীদের জীবনে শুধু সম্পদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই সুখী হওয়া যায় না। সুস্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কারাতে প্রশিক্ষণ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার দক্ষতা বাড়তে পারে।আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলিত ও বঞ্চিত পরিবারের শিশুদের দিয়ে টয়লেট, বাথরুম, নালা পরিষ্কার কিংবা ঝাড়ু দেওয়ার মতো কাজ করানো হয়। এ ধরনের আচরণ শিশুদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে এবং পেশা সম্পর্কে বৈষম্যমূলক ধারণা জন্ম দিতে পারে। শিশুদের কোনো কাজকে ছোট করে দেখা শেখানো উচিত নয়; বরং সব পেশার প্রতি সম্মান, পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব এবং শ্রমের মর্যাদা শেখাতে হবে। একই সঙ্গে কোনো শিশুকে তার সামাজিক পরিচয়ের কারণে অপমানজনক বা বৈষম্যমূলক কাজে বাধ্য করা যাবে না। শিশুদের এমন পরিবেশে বড় করতে হবে, যেখানে তারা আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে।শিশুদের সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের ময়লা-আবর্জনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে দূরে রাখা মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষের দৃষ্টান্ত রয়েছে, যাঁরা দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা জয় করে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন এবং জীবনের একপর্যায়ে রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন। ড. বি. আর. আম্বেদকর দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আব্রাহাম লিংকন সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। জগজীবন রামও দলিত পরিবারে জন্ম নিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হন। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রতিকূলতা থাকলেও সুযোগ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।কোনো শিশু ভবিষ্যতে কী হবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তাই প্রত্যেক শিশুর যত্ন নিতে হবে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা ব্যবহার করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। শিশুর সামাজিক পরিচয়, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা কিংবা জন্মপরিস্থিতি যেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দেয়। আসুন, প্রতিটি শিশুর পাশে দাঁড়াই, তার অধিকার নিশ্চিত করি এবং তার মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশে সহায়তা করি। তাহলেই সমাজে ফুটবে শত ফুল।[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]


আজ দুপুরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানাবেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

আজ দুপুরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানাবেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন ইশরাক হোসেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন তিনি।সোমবার সকালে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পাতায় এক বার্তার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ।’এর আগে একটি অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা কেন্দ্র করে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। জাতীয় টেলিভিশনেও এ খবর প্রচারিত হলেও শুরুতেই সেটিকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ইশরাক। তবে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের পথেই হাঁটার ইঙ্গিত দিলেন তিনি।বার্তায় ইশরাক লেখেন, ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন দলীয় কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূলই আমার মূল লক্ষ্য!’সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচকদের উদ্দেশ্যে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে যারা উল্লাস করছেন, আশা করি ভবিষ্যতে দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলেও তারা একইভাবে এগিয়ে আসবেন।


কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা

কুমারী পূজায় নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার বন্দনা

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস এবং ঢাকের বাদ্য—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে অনন্য আনন্দের আবহ সৃষ্টি করে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সামাজিক বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব।হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পরাজিত করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অশুভের ওপর শুভের, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের এবং অসত্যের ওপর সত্যের বিজয়ের প্রতীক। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। এসব আরাধনার মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, সাহস ও মঙ্গল কামনা করা হয়।বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস বহু পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে জমিদার ও অভিজাত পরিবারে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। এর ফলে দুর্গাপূজা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা পালন করেন।শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে দুলতে থাকা কাশফুল আর ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ—প্রকৃতি যখন এমন অপরূপ সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্য। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলোর মালা। মা দুর্গার আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে যেন নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়। দুর্গাপূজা তাই কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির চিরচেনা আবেগ, ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব প্রকাশ। দেবীর আগমন যেন অন্ধকারের মধ্যে আলোর বার্তা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় এবং মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার।দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ মিলনোৎসব। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বাড়িয়ে তোলে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দে অংশ নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেয়। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির এই চর্চা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীর পূজা এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বেদনাও অনুভূত হয়। দেবীকে বিদায় জানিয়ে মানুষ আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষায় থাকে।দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ। শিল্পীরা মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমা নির্মাণ করেন। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, চিত্রকলা, আলোকসজ্জা ও লোকশিল্পের নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়। অনেক পূজামণ্ডপে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সমকালীন বিভিন্ন বিষয় শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। ফলে দুর্গাপূজা একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে শিল্প ও সৃজনশীলতারও বড় ক্ষেত্র।দুর্গাপূজাকে ঘিরে সামাজিক মিলনও বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা, নতুন পোশাক পরা, মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও পরস্পরের উৎসবে অংশ নেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এই বন্ধন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।কুমারী পূজা: দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার হলো কুমারী পূজা। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে, কুমারী কন্যার মধ্যে দেবী দুর্গার মাতৃশক্তি ও পবিত্রতার প্রতীকী প্রকাশ দেখা হয়। সাধারণত অল্পবয়সী একটি কন্যাশিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানো হয়। এরপর তাকে দেবীরূপে সম্মান জানিয়ে পূজা করা হয়। ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য নিবেদন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় এবং আশীর্বাদ কামনা করা হয়।কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মাতৃশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। একটি শিশুকন্যার মধ্যে দেবীত্বের প্রতীক কল্পনা করার মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি সম্মান জানানোর বার্তা তুলে ধরা হয়। দুর্গাপূজার বৃহত্তর চেতনার সঙ্গেও এই আচার গভীরভাবে যুক্ত। অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় যেমন দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা, তেমনি নারীশক্তির মর্যাদা স্বীকার করাও এর তাৎপর্যপূর্ণ দিক।কুমারী পূজায় একটি ছোট মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তাকে নতুন পোশাক ও ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়। এরপর ফুল, চন্দন ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। এই আচার স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দেওয়া সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নারী কেবল মমতা ও স্নেহের প্রতীক নন; তিনি শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনারও প্রতীক। তাই কুমারী পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার বৃহত্তর বার্তাও বহন করে।তবে কুমারী পূজার প্রতীকী তাৎপর্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন বাস্তব জীবনেও নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা যায়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমান অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পূজার মঞ্চে কন্যাশিশুকে দেবীরূপে সম্মান জানানো আর দৈনন্দিন জীবনে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা—এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, বৈষম্য ও অবহেলা দূর করার মধ্য দিয়েই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে।দুর্গাপূজার সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য ও সংগীতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আগমনি ও বিজয়ার গান, কবিতা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দুর্গোৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। পূজাকে কেন্দ্র করে বহু শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।দুর্গাপূজার আনন্দ কয়েক দিনের হলেও এর আবেদন মানুষের মনে থেকে যায় দীর্ঘ সময়। বিজয়ার বিষণ্ন বিদায়ের মুহূর্তে যখন প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যায়, তখন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আবার এসো মা।’ এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের প্রত্যাশা। দুর্গাপূজা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অশুভকে পরাজিত করতে এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও ভালোবাসাকে জীবনের পথনির্দেশক করতে শেখায়। তাই বাঙালির দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রাণের উৎসব, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি মিশে আছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান।মা দুর্গার আগমন আমাদের মনে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, আর তাঁর বিদায় রেখে যাক নতুন দিনের আশার আলো। অশুভ ও বিভেদ দূরে সরিয়ে মানবিকতা, সহনশীলতা ও ঐক্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রেরণা জোগাক এই উৎসব। দুর্গাপূজার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু প্রতিমা, আলোকসজ্জা কিংবা উৎসবের আনন্দে নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের বন্ধনেও। বিজয়ার বিদায়বেলায় আমাদের প্রত্যাশা হোক—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতার বন্ধন সবার। এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যই বাঙালির দুর্গাপূজাকে করে তুলুক আরও সুন্দর, অর্থবহ ও চিরন্তন।উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে রাখতে হবে। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট কমাতে সহযোগিতা করা এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উৎসব যেন সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। আর কুমারী পূজা নারীশক্তি ও মাতৃমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি তাৎপর্যপূর্ণ আচার। এই পূজার শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনেও ধারণ করতে হবে—নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অশুভকে পরিহার করে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল চেতনা সার্থক হতে পারে। এই চেতনাই বাঙালির দুর্গাপূজাকে যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে রাখবে।[লেখক: ভিজিটিং প্রফেসর, ডেন্টাল সার্জারি বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল]


পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

পর্যটনকেন্দ্রে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে একটি রিসোর্টে আগুন লেগে মারা গেছেন ১০ জন। কয়েকজন আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। এই মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা নিহতদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় দগ্ধ ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।এই অগ্নিকাণ্ড পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রিসোর্টের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। কাঠের তৈরি রিসোর্ট হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ওপরের কক্ষের অতিথিরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেননি। কয়েকজনকে জীবন বাঁচাতে বেলকনি থেকে লাফ দিতে হয়েছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, শুধু আরামদায়ক আবাসন তৈরি করলেই চলে না। অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।পর্যটন এলাকায় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে কাঠের তৈরি স্থাপনায় আগুনের ঝুঁকি বেশি। সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, বিকল্প নির্গমনপথ, জরুরি সতর্কসংকেত ও প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা দরকার। রান্নাঘর ও বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তাও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত যেন শুধু প্রতিবেদন তৈরিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সেখানে অগ্নিনিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকলে তার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। সেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাই শুধু দুর্ঘটনাকবলিত রিসোর্ট নয়, দেশের সব পর্যটনকেন্দ্রের আবাসিক স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। যখন যেখানে প্রয়োজন সেখানে আইন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষায় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না।


চলনবিল রক্ষায় পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি

চলনবিল রক্ষায় পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি

একসময় বর্ষা পেরিয়েও চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি থাকত। এখন আশ্বিন মাসেই অনেক জায়গা পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কমে যাচ্ছে মাছ, বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। শুধু ভূ-উপরিস্থ পানি নয়, চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থাও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিলের মাত্র ১ শতাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা খুব বেশি। এই চিত্র ভবিষ্যতের পানিসংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলনবিলের এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বৃষ্টিপাত কমেছে। পদ্মা ও যমুনার পানিপ্রবাহেও পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, বোরো ধান চাষে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে। নাটোরে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে সেচযন্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ ছাড়া কাদামাটির স্তর বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশে বাধা দেয়।এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষি ও পরিবেশ উভয় ক্ষেত্রেই সংকট বাড়তে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে সেচের খরচ বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কৃষকের উৎপাদন ও আয়। শুকনো মৌসুমে জলাভূমি ও নদীতে পানি কমে গেলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসও সংকুচিত হবে। তাই চলনবিলের সংকটকে শুধু পানির অভাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জীববৈচিত্র‍্য ও মানুষের জীবিকার সঙ্গেও যুক্ত।এ অবস্থা মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদী, খাল ও জলাধারের পানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। খাল ও জলপথের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং জলাভূমি দখল ও ভরাট বন্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।চলনবিল শুধু কৃষির সম্পদ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাধার। এর পানি ও জীববৈচিত্র‍্য রক্ষা করা জরুরি। এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।


আমেরিকাকে কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

আমেরিকাকে কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কোনো সামরিক অভিযানে নামলে ওয়াশিংটন ও মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের ‘বিপুল ক্ষয়ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আমেরিকানদের ইরানের ওপর হামলা করার সাহস হওয়ার কথা নয়; তবে ভুলবশত আক্রমণ চালানো হলে তার ভয়াবহ পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকেই ভোগ করতে হবে।রোববার (১৮ অক্টোবর) ইরানের পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার পরপরই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন মেহরদাদ আখলাঘি।সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্টের আসন থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর আখলাঘি বলেন, ‘ইরানের সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন–তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর সাহস পাবে না। আর যদি তারা সেই দুঃসাহস দেখায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলকেই চরম মাশুল গুনতে হবে।’এর আগে ইরানের আইনপ্রণেতারা নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর রসদ ব্যবস্থাপনা প্রধান হিসেবে আখলাঘির নিয়োগ অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২৭৭টি ভোটের মধ্যে ২৩৭টি ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হওয়ার দীর্ঘ আট মাস পর এ পদে স্থলাভিষিক্ত হলেন আখলাঘি।সামরিক পোশাকি পদমর্যাদা না থাকলেও দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন মেহরদাদ আখলাঘি। বিশেষ করে ২০১৩ সাল থেকে তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘ইরানিয়ান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন’-এর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার অভিযোগে ২০০৭ সালে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।/ 


দেশ গড়ার সংগ্রামে ধর্ম নয়, নাগরিক পরিচয়ই মুখ্য: প্রধানমন্ত্রী

দেশ গড়ার সংগ্রামে ধর্ম নয়, নাগরিক পরিচয়ই মুখ্য: প্রধানমন্ত্রী

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন কিংবা সর্বশেষে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান–প্রতিটি সংগ্রামেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী দিনে বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামেও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক পরিচয়কেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মহাখালী ও গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মণ্ডপ পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন তার সঙ্গে ছিলেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে আমরা দেশকে স্বাধীন করেছিলাম। সেদিন কিন্তু আমরা বিচার করিনি কে কোন ধর্মের মানুষ। দলমত-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে সবাই মিলে এই স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন।’স্বাধীনতার পরও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দেশের আপামর জনতার সম্পৃক্ততার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও আমরা ধর্ম বা জাত বিচার করিনি। একইভাবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা আর কোনো বিভাজন দেখব না; আমাদের একমাত্র পরিচয় হবে–আমরা বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক।’তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ভূখণ্ডের ওপর দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে এই ভাতৃত্ববোধ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে মহাখালী রক্ষাকালী মন্দিরের পূজামণ্ডপে যান এবং পরে বনানীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সেখানে উপস্থিত ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।/