সংবাদ

সরকারি কর্মচারীর সামাজিক দায় ও প্রচেষ্টা


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ এএম

সরকারি কর্মচারীর সামাজিক দায় ও প্রচেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ এমএসএস শেষ করে শিক্ষা গবেষণার কাজে যুক্ত হয়েছিলাম আই ই আর নামক ইনস্টিটিউটে। একবছর পরে একটা ডিপ্লোমা ডিগ্রিও হাতে আসে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিতে। সেটা আশির দশকের শেষ দিককার সময়। দেশে নানান রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে লিখিত পরীক্ষা থেকে চাকরিতে যোগদান অবধি দেড়বছরের বেশি সময় লেগে যায়। সেটি অপ্রত্যাশিত হলেও তখন তা-ই হয়েছিল। 

বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসনে চাকরি করেছি মোট ৩২ বছর। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। এখন অবসরের বিরামহীন ক্লান্তিতে হিসাবের খেরোখাতায় চোখ মেলে ধরেছি। ভাবছি, কী পেলাম না-পেলাম তা নিয়ে দুঃখবোধ করে ফল হবে না। বরঞ্চ হেমন্ত মুখার্জির গানটা শুনি, 'যা কিছু পেয়েছি কাছে তাই সঞ্চয়, যা কিছু পেলাম নাকো সে আমার নয়'। সরকারের চাকরিতে যোগদান এবং অবসরের ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য গড়মিল সবসময়ই থাকে। যেমন, একই দিনে যোগ দিলেও অবসর প্রস্তুতি ছুটি (পিআরএল) শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন দিনে। এটা মূলত কর্মচারীর এসএসসি পরীক্ষা অথবা প্রমাণক জন্ম তারিখে ধরে নির্ধারিত হয়। সে হিসেবে আমার সহকর্মী বন্ধুদের কেউ কেউ আমার চেয়ে বছরদেড়েক বেশি সময় চাকরি করেছে। আবার মুষ্টিমেয় দু-চারজন আমার পূর্বে অবসরে গিয়েছেন। আমার অবসর হয় ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান থেকে। ব্যাচে বয়সের হিসাবেও আমি ছিলাম মধ্যম। ব্যাচমেটদের মাঝে এক অদ্ভুত রকমের মিডিওকার বলতে যা বোঝায় আমি তা-ই ছিলাম। একেবারে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাবে আমার মধ্যম মানের ক্যারিয়ারে চোখ রাখলে। আমার একাডেমিক রেজাল্ট ছিল মধ্যম, কোথাও খারাপ নেই তবে খুব ভালোও নেই। আমার দৈহিক উচ্চতা গড়পড়তা, আমাকে খুব খাটো বলেনা তবে লম্বা নই। গায়ের রঙও উজ্জ্বল নয় তবে শ্যামলা নই। অফিসার হিসেবেও প্রথম সারির দাবি না করলেও কখনো কোথাও নিম্নমানের ছিলাম না। বলা যায়, অনেক দুঃখ জাগানিয়া অতীত ও আনন্দ-বেদনার জনাকীর্ণ পথের পথিক হয়ে চাকরির তিনটা দশক কুশলেই পার করেছি। যাপিত জীবনপথের বাঁকে বাঁকে অসংখ্য প্রিয়জন হারানোর অব্যক্ত কষ্ট যেন বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের বাসা বেঁধে আছে। তাকে কোনো ক্রমেই সরানো যাচ্ছে না, বরং সে আরও গাঢ় স্থান করে নিজের আসন পেতে বসেছে। 

 ২.

আমার চাকরি জীবনের শুরুর দিক থেকেই নিজ পরিবার, নিকট আত্মীয়-স্বজন এমনকি দূরের স্বজনদের প্রতিও কখনো মুখ ফিরিয়ে রাখি নি। সীমিত পরিসর, অতি নগন্য অবস্থান থেকে আর্থিক না হলেও অনেকের কর্মের সুযোগ এনে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। নিজের অস্বচ্ছল সাদামাটা জীবন জীবিকার মধ্যে থেকে আর্থিক সাহায্য করা খুব বেশি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আত্মীয়ের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এমন দুর্বলতা আমার একার নয়, এ যেন বাঙালি মধ্যবিত্তের রক্তের ভেতরে সুপ্ত হয়ে থাকা এক অমোঘ বাসনা। সে হিসেবে ৩৩ বছরে শতাধিক নিম্নবিত্ত, গরীব অসহায় মানুষের কর্মসংস্হানে সরাসরি সহায়তা করেছি। আজ এরা পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ বেঁচেবর্তে আছেন। কেউ আমাকে স্মরণ করুক না করুক, স্বীকার যাক, না-যাক তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকি পরবর্তীতে অকৃতজ্ঞতার মানসে বিরুদ্ধাচারণকারীদের নিয়েও কিছু বলার নেই। তারা এক সময় অনুশোচনা করবে। চাকরির প্রথম পাঁচ বছরের সময়ে গ্রামে পল্লী বিদ্যুতায়নের সংযোগ পেতে এক অসাধ্য সাধন করি। আমাদের বাড়িসহ এক বা একাধিক পাড়াকে মাঝখানে  বাদ দিয়ে বিদ্যুতায়ন হওয়ার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে বঞ্চিত এলাকাকে সঙ্গে নিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ সরবরাহ করার ব্যবস্হা করি। 

৩.

আমার এলাকার প্রথম পাঠশালা, প্রথম হাই স্কুল, চাতল বাগহাটার প্রতি দুর্বলতা সহজাত এবং চিরকালের। দেশের যেখানেই গিয়েছি প্রথম প্রেমের মতন সর্বদা হৃদয়মন্দির মাঝে রেখে দিয়েছি সেই প্রথম বিদ্যায়তনকে। নস্টালজিয়ায় একাধিকবার লিখেছি 'আমার ইস্কুল' আমার সময়কে নিয়ে। স্কুলের দু'চারজন পেশাদার শিক্ষককে আমার একাধিক গল্পের নায়ক করেছি। চাকরির কালে সেই স্কুলের জন্যে সরকারের কাছে নিজেই আবেদন করি এবং তদ্বির করে একটা সুরম্য বহুতল ভবন করিয়ে দিয়েছি। সরকারের অনুদান নিয়ে একটা দৃষ্টিনন্দন তোরণ করিয়েছি। আধুনিক মানের টয়লেট করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিয়েছি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এন্ড কলেজের এমপিও ভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উচ্চ পর্যায়ে সুপারিশসহ একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি। এমনকি আমার একই উপজেলায় অবস্থিত, ১৯১২ সালে স্হাপিত ঐতিহ্যবাহী আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের বালিকাদের জন্যে পৃথক শৌচাগার করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অনুদান প্রদান করেছি। উল্লেখ্য যে, চল্লিশের দশকের মাঝামাঝিতে আমার বাবা সেই জর্জ ইনস্টিটিউটের নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। 

৪.

বাংলাদেশ সচিবালয়ে চাকরি করার সুবাদে নিজের গ্রামের রাস্তা-ঘাট মেরামতের জন্যে নীরবে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছি। সচিব পদে উপনীত হওয়ার অনেক পূর্ব থেকেই স্হানীয় নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিজেকে জড়িত করি। প্রচারণা করার পক্ষে থাকা জরুরি নয়। ১৯৯৬ সালে সরকারের স্হানীয় সরকার বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব হই। মানিকখালী বাজার হতে হযরত মেহচানশাহ মাজার পর্যন্ত রাস্তাটি প্রথম পাকা করার উদ্যোগ নিই এবং এলজিইডি'র তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হস্তক্ষেপ সম্পন্ন করি। ফলে এখন যেকোনো যানবাহন মাজার অবধি পৌঁছাতে পারে। আগে এমন সুযোগ ছিল না।

 সরকারের স্বাস্থ্য সচিবের দায়িত্ব পালনকালে করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী'র অকাল মৃত্যু হয়। যা তখন দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। কিছু দিন পরে গ্রামের বাড়ির পাশে পৈত্রিক জমি সরকারের বরাবর রেজিষ্ট্রিমূলে হস্তান্তর পূর্বক স্ত্রী'র নামে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক স্হাপন করি। ক্লিনিকটি নির্মান করতে গিয়ে নিজের জীবনই বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এলাকার এমপি এবং নিজ গ্রামের তথা উপজেলার কতিপয় ভাড়াটে দুষ্কৃতকারী, অবিবেচক, অমানুষ কর্তৃক দিবালোকে সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হই। তবু পিছপা হয়ে হাল ছাড়ি নি আমি, সামনে এগিয়ে যাই। পরিসংখ্যানে জানা যায়, ক্লিনিক চালু হওয়ার পর গত পাঁচবছর যাবৎ সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯০-১০০ জন স্হানীয় গরীব, হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষ বিনামূল্যে ওষুধ সেবা নিয়ে চলেছেন। 

৫.

আমি তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শুনলাম, মানিকখালী বাজারে অবস্থিত পুরানো ইউনিয়ন পরিষদের জমিটা স্হানীয় অসাধু চক্র দখলের চক্রান্ত করছে। জমিটা ওয়াকফ বা খাস খতিয়ানভূক্ত হতে পারে। তৎকালীন জেলাপ্রশাসক কিশোরগঞ্জ এবং ইউএনও কটিয়াদি'র মাধ্যমে একটি প্রস্তাব মন্ত্রনালয়ে প্রেরণের ব্যবস্হা করি। উল্লেখ্য যে, সেই পঞ্চাশের দশক থেকে সেখানে চান্দপুর ইউনিয়ন বোর্ড/পরিষদের কার্যক্রম চলমান ছিল। কয়েকবছর আগে বাজারের একটু দূরবর্তী স্হানে সরকারিভাবে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মিত হওয়ায় জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তখন আমার স্বাক্ষরিত ডি,ও, লেটার ভূমি মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে একই স্থানে ইউনিয়ন তহসীল অফিস অনুমোদন করিয়ে দিই। বর্তমানে সেখানে তহসীল অফিসের ভবন হয়েছে এবং জায়গাটি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্হায়ীভাবে বেঁচে গেছে। বলাবাহুল্য, জেলা প্রশাসক পদে মাঠ প্রশাসনে চাকরির সুবাদে অবৈধ দখলদার শ্রেণির কাছ থেকে সরকারের খাস জমি উদ্ধার কাজে আমি বরাবরই সফল এবং প্রশংসিত হয়েছিলাম। ভূমি মন্ত্রনালয় থেকে সনদপত্রও লাভ করেছিলাম। 

৬. 

২০২০ সাল। সরকারের সচিব হিসেবে কিছুদিন কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখার সুযোগ হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে একদিন কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে কটিয়াদির স্হানীয় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অকাল প্রয়াত আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দীন আমার পথ আগলে দাঁড়ান, আমাকে জোর করে কটিয়াদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং এর জন্যে কিছু একটা করতে বলেন। আমাকে দুর্বল করার নিমিত্ত, তিনি অতীতে এই হাসপাতালে আমার পরিবারের অসংখ্য লোকজনের চিকিৎসা নেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তার আগ্রহে সেদিন আমি তাৎক্ষণিক পরিদর্শন করতে যাই। ঢাকায় ফিরে এসে স্বাস্থ্য মন্ত্রী'র সঙ্গে কথা বলি। কটিয়াদি হেলথ কমপ্লেক্স উন্নীতকরণের বিষয়ে আলোচনা করি। তিনি বললেন, "উপজেলা পর্যায়ে ১০০ বেড আর হবে না। জনবল সংকট হেতু এ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। বললাম,  'অন্তত আরেকটা অনুমোদন করে দিন স্যার, আমার চাকরি বেশিদিন নেই। সচিব হিসেবে জন্মস্থানে সামান্য একটি স্মৃতিস্মারক থাক'। তিনি মৌন থাকলেন, তবে এটা অসম্মতি নয়। এভাবেই ৩৪ কোটি টাকার নির্মান ব্যয় অনুমোদন হলো। এবং এইচ,ই,ডি'র প্রধান প্রকৌশলীকে ডেকে এনে দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে ১০০ বেডের বর্তমান দৃষ্টিনন্দন ও আলোকিত এই কমপ্লেক্স করা হলো। তবে আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দিন তা দেখে যেতে পারেননি। এর আগেই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমার প্রচেষ্টায় অনুমোদিত প্রতিটি কাজেই স্হানীয় দুর্বৃত্তরা কমবেশি চাঁদাবাজি করেছে, ঠিকাদারের ওপর জুলুম করেছে, যা পরবর্তীতে জেনেছিলাম।

৭. 

দীর্ঘ চাকরির ইতি টেনে অবসরের অব্যবহিত পরে আরও একটা ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক কাজে হাত দিই। গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকের সংলগ্নে একই বাউন্ডারিতে একটি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ করার সিদ্ধান্ত নিই। সম্পূর্ণ স্ব উদ্যোগ ও স্বঅর্থে পৈত্রিক জমিতে প্রয়াত মা-বাবার নামে একটা কলেজ হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই 'আয়েশা-ছিদ্দিক মহিলা কলেজ' নামকরণ করে সরকারের কাছে আবেদন করি এবং অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে কলেজের স্বীকৃতি, পাঠদান অনুমোদন, ইন, কোডসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করি। কলেজটি চালু করতে ও ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি নিয়ে অপরিমেয় শ্রম ও নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রথম দু'বছর পর্যাপ্ত ছাত্রী না পেয়ে সরকারের কাছে পুনঃ সহশিক্ষার অনুমতি নিই। স্হানীয় বহুবিধ বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতার দেয়াল ডিঙিয়ে কলেজটি এখন সুশিক্ষার আলো বিকিরণের পথে একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের জন্য বিশেষ সুযোগসহ উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য করা তথা আমার জন্মদাতা ধার্মিক ও পরহেজগার মা-বাবাকে কালের ধুলোয় কিছুকাল বাঁচিয়ে রাখার মানসেই এমন সমাজহিতৈষী কর্মে নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। একইসাথে অনাগত কাল ধরে আমার কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের জ্ঞান পিপাসায় হাতের কাছে এক গ্লাস শীতল জলের মতন স্বস্তির পরশ নিয়ে দাঁড়াবে, এমন একটা বিচিত্র পুস্তকে সাজানো নান্দনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্টায় কাজ করছি। 

বাস্তবতা হলেও সত্য যে, এখন এক অসহনীয় অবসর জীবন নিয়ে আমি বেঁচে আছি। অসীম শূন্যতা আর একাকীত্বের সঙ্গে আমার নিত্য বসবাস। নিঃসঙ্গতাকে জয় করে চলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তথাপি অজস্র ভাবনার ভেতরে আমাকে সারাক্ষণ জেগে থাকতে হচ্ছে। জেগে থাকা মানে স্বপ্নের ঘোরে বেঁচে থাকার প্রহরগোনা। নশ্বর এ পৃথিবীতে সবাই কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যেতে চায়। পার্থিব ধন-সম্পদ, সুযোগ্য উত্তরাধিকার, খ্যাতি, যশ অনেক কিছু। কিন্তু পরার্থে, পরজনে কিছু রেখে যাওয়া সহজ কাজ নয়। মানুষ অনেক কিছু পারে না, আবার যা পারে তা নিয়ে সন্তোষ্ট থাকতেও পারে না। এটা মানুষের জন্মগত ও সহজাত দুর্বলতা। তথাপি আমি নিজেকে অকৃতি, অধম জেনেও নিরন্তর সৃষ্টিশীল কিছু করার মোহে বেঁচে থাকি।  

[লেখক: সাবেক সচিব, গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


সরকারি কর্মচারীর সামাজিক দায় ও প্রচেষ্টা

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ এমএসএস শেষ করে শিক্ষা গবেষণার কাজে যুক্ত হয়েছিলাম আই ই আর নামক ইনস্টিটিউটে। একবছর পরে একটা ডিপ্লোমা ডিগ্রিও হাতে আসে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিতে। সেটা আশির দশকের শেষ দিককার সময়। দেশে নানান রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে লিখিত পরীক্ষা থেকে চাকরিতে যোগদান অবধি দেড়বছরের বেশি সময় লেগে যায়। সেটি অপ্রত্যাশিত হলেও তখন তা-ই হয়েছিল। 

বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসনে চাকরি করেছি মোট ৩২ বছর। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। এখন অবসরের বিরামহীন ক্লান্তিতে হিসাবের খেরোখাতায় চোখ মেলে ধরেছি। ভাবছি, কী পেলাম না-পেলাম তা নিয়ে দুঃখবোধ করে ফল হবে না। বরঞ্চ হেমন্ত মুখার্জির গানটা শুনি, 'যা কিছু পেয়েছি কাছে তাই সঞ্চয়, যা কিছু পেলাম নাকো সে আমার নয়'। সরকারের চাকরিতে যোগদান এবং অবসরের ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য গড়মিল সবসময়ই থাকে। যেমন, একই দিনে যোগ দিলেও অবসর প্রস্তুতি ছুটি (পিআরএল) শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন দিনে। এটা মূলত কর্মচারীর এসএসসি পরীক্ষা অথবা প্রমাণক জন্ম তারিখে ধরে নির্ধারিত হয়। সে হিসেবে আমার সহকর্মী বন্ধুদের কেউ কেউ আমার চেয়ে বছরদেড়েক বেশি সময় চাকরি করেছে। আবার মুষ্টিমেয় দু-চারজন আমার পূর্বে অবসরে গিয়েছেন। আমার অবসর হয় ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান থেকে। ব্যাচে বয়সের হিসাবেও আমি ছিলাম মধ্যম। ব্যাচমেটদের মাঝে এক অদ্ভুত রকমের মিডিওকার বলতে যা বোঝায় আমি তা-ই ছিলাম। একেবারে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাবে আমার মধ্যম মানের ক্যারিয়ারে চোখ রাখলে। আমার একাডেমিক রেজাল্ট ছিল মধ্যম, কোথাও খারাপ নেই তবে খুব ভালোও নেই। আমার দৈহিক উচ্চতা গড়পড়তা, আমাকে খুব খাটো বলেনা তবে লম্বা নই। গায়ের রঙও উজ্জ্বল নয় তবে শ্যামলা নই। অফিসার হিসেবেও প্রথম সারির দাবি না করলেও কখনো কোথাও নিম্নমানের ছিলাম না। বলা যায়, অনেক দুঃখ জাগানিয়া অতীত ও আনন্দ-বেদনার জনাকীর্ণ পথের পথিক হয়ে চাকরির তিনটা দশক কুশলেই পার করেছি। যাপিত জীবনপথের বাঁকে বাঁকে অসংখ্য প্রিয়জন হারানোর অব্যক্ত কষ্ট যেন বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের বাসা বেঁধে আছে। তাকে কোনো ক্রমেই সরানো যাচ্ছে না, বরং সে আরও গাঢ় স্থান করে নিজের আসন পেতে বসেছে। 

 ২.

আমার চাকরি জীবনের শুরুর দিক থেকেই নিজ পরিবার, নিকট আত্মীয়-স্বজন এমনকি দূরের স্বজনদের প্রতিও কখনো মুখ ফিরিয়ে রাখি নি। সীমিত পরিসর, অতি নগন্য অবস্থান থেকে আর্থিক না হলেও অনেকের কর্মের সুযোগ এনে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। নিজের অস্বচ্ছল সাদামাটা জীবন জীবিকার মধ্যে থেকে আর্থিক সাহায্য করা খুব বেশি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আত্মীয়ের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এমন দুর্বলতা আমার একার নয়, এ যেন বাঙালি মধ্যবিত্তের রক্তের ভেতরে সুপ্ত হয়ে থাকা এক অমোঘ বাসনা। সে হিসেবে ৩৩ বছরে শতাধিক নিম্নবিত্ত, গরীব অসহায় মানুষের কর্মসংস্হানে সরাসরি সহায়তা করেছি। আজ এরা পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ বেঁচেবর্তে আছেন। কেউ আমাকে স্মরণ করুক না করুক, স্বীকার যাক, না-যাক তাতে কিছু যায় আসে না। এমনকি পরবর্তীতে অকৃতজ্ঞতার মানসে বিরুদ্ধাচারণকারীদের নিয়েও কিছু বলার নেই। তারা এক সময় অনুশোচনা করবে। চাকরির প্রথম পাঁচ বছরের সময়ে গ্রামে পল্লী বিদ্যুতায়নের সংযোগ পেতে এক অসাধ্য সাধন করি। আমাদের বাড়িসহ এক বা একাধিক পাড়াকে মাঝখানে  বাদ দিয়ে বিদ্যুতায়ন হওয়ার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে বঞ্চিত এলাকাকে সঙ্গে নিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ সরবরাহ করার ব্যবস্হা করি। 

৩.

আমার এলাকার প্রথম পাঠশালা, প্রথম হাই স্কুল, চাতল বাগহাটার প্রতি দুর্বলতা সহজাত এবং চিরকালের। দেশের যেখানেই গিয়েছি প্রথম প্রেমের মতন সর্বদা হৃদয়মন্দির মাঝে রেখে দিয়েছি সেই প্রথম বিদ্যায়তনকে। নস্টালজিয়ায় একাধিকবার লিখেছি 'আমার ইস্কুল' আমার সময়কে নিয়ে। স্কুলের দু'চারজন পেশাদার শিক্ষককে আমার একাধিক গল্পের নায়ক করেছি। চাকরির কালে সেই স্কুলের জন্যে সরকারের কাছে নিজেই আবেদন করি এবং তদ্বির করে একটা সুরম্য বহুতল ভবন করিয়ে দিয়েছি। সরকারের অনুদান নিয়ে একটা দৃষ্টিনন্দন তোরণ করিয়েছি। আধুনিক মানের টয়লেট করার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিয়েছি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল এন্ড কলেজের এমপিও ভুক্তির জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উচ্চ পর্যায়ে সুপারিশসহ একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছি। এমনকি আমার একই উপজেলায় অবস্থিত, ১৯১২ সালে স্হাপিত ঐতিহ্যবাহী আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের বালিকাদের জন্যে পৃথক শৌচাগার করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অনুদান প্রদান করেছি। উল্লেখ্য যে, চল্লিশের দশকের মাঝামাঝিতে আমার বাবা সেই জর্জ ইনস্টিটিউটের নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। 

৪.

বাংলাদেশ সচিবালয়ে চাকরি করার সুবাদে নিজের গ্রামের রাস্তা-ঘাট মেরামতের জন্যে নীরবে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছি। সচিব পদে উপনীত হওয়ার অনেক পূর্ব থেকেই স্হানীয় নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিজেকে জড়িত করি। প্রচারণা করার পক্ষে থাকা জরুরি নয়। ১৯৯৬ সালে সরকারের স্হানীয় সরকার বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব হই। মানিকখালী বাজার হতে হযরত মেহচানশাহ মাজার পর্যন্ত রাস্তাটি প্রথম পাকা করার উদ্যোগ নিই এবং এলজিইডি'র তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের হস্তক্ষেপ সম্পন্ন করি। ফলে এখন যেকোনো যানবাহন মাজার অবধি পৌঁছাতে পারে। আগে এমন সুযোগ ছিল না।

 সরকারের স্বাস্থ্য সচিবের দায়িত্ব পালনকালে করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী'র অকাল মৃত্যু হয়। যা তখন দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। কিছু দিন পরে গ্রামের বাড়ির পাশে পৈত্রিক জমি সরকারের বরাবর রেজিষ্ট্রিমূলে হস্তান্তর পূর্বক স্ত্রী'র নামে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক স্হাপন করি। ক্লিনিকটি নির্মান করতে গিয়ে নিজের জীবনই বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এলাকার এমপি এবং নিজ গ্রামের তথা উপজেলার কতিপয় ভাড়াটে দুষ্কৃতকারী, অবিবেচক, অমানুষ কর্তৃক দিবালোকে সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হই। তবু পিছপা হয়ে হাল ছাড়ি নি আমি, সামনে এগিয়ে যাই। পরিসংখ্যানে জানা যায়, ক্লিনিক চালু হওয়ার পর গত পাঁচবছর যাবৎ সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯০-১০০ জন স্হানীয় গরীব, হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষ বিনামূল্যে ওষুধ সেবা নিয়ে চলেছেন। 

৫.

আমি তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে শুনলাম, মানিকখালী বাজারে অবস্থিত পুরানো ইউনিয়ন পরিষদের জমিটা স্হানীয় অসাধু চক্র দখলের চক্রান্ত করছে। জমিটা ওয়াকফ বা খাস খতিয়ানভূক্ত হতে পারে। তৎকালীন জেলাপ্রশাসক কিশোরগঞ্জ এবং ইউএনও কটিয়াদি'র মাধ্যমে একটি প্রস্তাব মন্ত্রনালয়ে প্রেরণের ব্যবস্হা করি। উল্লেখ্য যে, সেই পঞ্চাশের দশক থেকে সেখানে চান্দপুর ইউনিয়ন বোর্ড/পরিষদের কার্যক্রম চলমান ছিল। কয়েকবছর আগে বাজারের একটু দূরবর্তী স্হানে সরকারিভাবে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মিত হওয়ায় জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তখন আমার স্বাক্ষরিত ডি,ও, লেটার ভূমি মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে একই স্থানে ইউনিয়ন তহসীল অফিস অনুমোদন করিয়ে দিই। বর্তমানে সেখানে তহসীল অফিসের ভবন হয়েছে এবং জায়গাটি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে স্হায়ীভাবে বেঁচে গেছে। বলাবাহুল্য, জেলা প্রশাসক পদে মাঠ প্রশাসনে চাকরির সুবাদে অবৈধ দখলদার শ্রেণির কাছ থেকে সরকারের খাস জমি উদ্ধার কাজে আমি বরাবরই সফল এবং প্রশংসিত হয়েছিলাম। ভূমি মন্ত্রনালয় থেকে সনদপত্রও লাভ করেছিলাম। 

৬. 

২০২০ সাল। সরকারের সচিব হিসেবে কিছুদিন কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখার সুযোগ হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে একদিন কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে কটিয়াদির স্হানীয় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অকাল প্রয়াত আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দীন আমার পথ আগলে দাঁড়ান, আমাকে জোর করে কটিয়াদি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং এর জন্যে কিছু একটা করতে বলেন। আমাকে দুর্বল করার নিমিত্ত, তিনি অতীতে এই হাসপাতালে আমার পরিবারের অসংখ্য লোকজনের চিকিৎসা নেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তার আগ্রহে সেদিন আমি তাৎক্ষণিক পরিদর্শন করতে যাই। ঢাকায় ফিরে এসে স্বাস্থ্য মন্ত্রী'র সঙ্গে কথা বলি। কটিয়াদি হেলথ কমপ্লেক্স উন্নীতকরণের বিষয়ে আলোচনা করি। তিনি বললেন, "উপজেলা পর্যায়ে ১০০ বেড আর হবে না। জনবল সংকট হেতু এ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। বললাম,  'অন্তত আরেকটা অনুমোদন করে দিন স্যার, আমার চাকরি বেশিদিন নেই। সচিব হিসেবে জন্মস্থানে সামান্য একটি স্মৃতিস্মারক থাক'। তিনি মৌন থাকলেন, তবে এটা অসম্মতি নয়। এভাবেই ৩৪ কোটি টাকার নির্মান ব্যয় অনুমোদন হলো। এবং এইচ,ই,ডি'র প্রধান প্রকৌশলীকে ডেকে এনে দ্রুততম সময়ের ব্যবধানে ১০০ বেডের বর্তমান দৃষ্টিনন্দন ও আলোকিত এই কমপ্লেক্স করা হলো। তবে আব্দুল ওয়াহাব আইনুদ্দিন তা দেখে যেতে পারেননি। এর আগেই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমার প্রচেষ্টায় অনুমোদিত প্রতিটি কাজেই স্হানীয় দুর্বৃত্তরা কমবেশি চাঁদাবাজি করেছে, ঠিকাদারের ওপর জুলুম করেছে, যা পরবর্তীতে জেনেছিলাম।

৭. 

দীর্ঘ চাকরির ইতি টেনে অবসরের অব্যবহিত পরে আরও একটা ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক কাজে হাত দিই। গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকের সংলগ্নে একই বাউন্ডারিতে একটি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ করার সিদ্ধান্ত নিই। সম্পূর্ণ স্ব উদ্যোগ ও স্বঅর্থে পৈত্রিক জমিতে প্রয়াত মা-বাবার নামে একটা কলেজ হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই 'আয়েশা-ছিদ্দিক মহিলা কলেজ' নামকরণ করে সরকারের কাছে আবেদন করি এবং অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে কলেজের স্বীকৃতি, পাঠদান অনুমোদন, ইন, কোডসহ আনুসাঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করি। কলেজটি চালু করতে ও ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি নিয়ে অপরিমেয় শ্রম ও নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। প্রথম দু'বছর পর্যাপ্ত ছাত্রী না পেয়ে সরকারের কাছে পুনঃ সহশিক্ষার অনুমতি নিই। স্হানীয় বহুবিধ বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতার দেয়াল ডিঙিয়ে কলেজটি এখন সুশিক্ষার আলো বিকিরণের পথে একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের জন্য বিশেষ সুযোগসহ উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য করা তথা আমার জন্মদাতা ধার্মিক ও পরহেজগার মা-বাবাকে কালের ধুলোয় কিছুকাল বাঁচিয়ে রাখার মানসেই এমন সমাজহিতৈষী কর্মে নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। একইসাথে অনাগত কাল ধরে আমার কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের জ্ঞান পিপাসায় হাতের কাছে এক গ্লাস শীতল জলের মতন স্বস্তির পরশ নিয়ে দাঁড়াবে, এমন একটা বিচিত্র পুস্তকে সাজানো নান্দনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্টায় কাজ করছি। 

বাস্তবতা হলেও সত্য যে, এখন এক অসহনীয় অবসর জীবন নিয়ে আমি বেঁচে আছি। অসীম শূন্যতা আর একাকীত্বের সঙ্গে আমার নিত্য বসবাস। নিঃসঙ্গতাকে জয় করে চলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তথাপি অজস্র ভাবনার ভেতরে আমাকে সারাক্ষণ জেগে থাকতে হচ্ছে। জেগে থাকা মানে স্বপ্নের ঘোরে বেঁচে থাকার প্রহরগোনা। নশ্বর এ পৃথিবীতে সবাই কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যেতে চায়। পার্থিব ধন-সম্পদ, সুযোগ্য উত্তরাধিকার, খ্যাতি, যশ অনেক কিছু। কিন্তু পরার্থে, পরজনে কিছু রেখে যাওয়া সহজ কাজ নয়। মানুষ অনেক কিছু পারে না, আবার যা পারে তা নিয়ে সন্তোষ্ট থাকতেও পারে না। এটা মানুষের জন্মগত ও সহজাত দুর্বলতা। তথাপি আমি নিজেকে অকৃতি, অধম জেনেও নিরন্তর সৃষ্টিশীল কিছু করার মোহে বেঁচে থাকি।  

[লেখক: সাবেক সচিব, গল্পকার]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত