‘নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ (ওয়েস্ট টু এনার্জি)’ প্রকল্পকে বাংলাদেশের ‘অন্যতম ব্যয়বহুল ও পরিবেশবিধ্বংসী’ বিদ্যুৎ প্রকল্প আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এর সাথে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংগঠনগুলো বলছে, ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সৌরবিদ্যুতের ‘আড়াই গুণ দাম’ পড়বে এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
শনিবার (৪ জুলাই) ঢাকার বাংলামোটররে একটি রোস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। ২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সিএমইসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির সাড়ে চার বছর পরও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
অধিগ্রহণ
প্রকল্পের জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ২০ একরের পাশাপাশি স্থানীয়দের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ মালিক জমি দিতে রাজি না হলেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে জমি দখল করে সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। আদালতে মামলা চলাকালেই জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় অনেক ভূমি-মালিক জমি হারিয়েও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুনর্বাসনের তালিকায় রাখা হয়েছে মাত্র ৪০ জনকে।
বিদ্যুতের মূল্য
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতায় (পিএলএফ) চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে সরকার প্রতি ইউনিট ২১.৭৮ সেন্ট দরে (২৬.৭৯ টাকা) দরে বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে পিএলএফ ২০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিতে হবে কমপক্ষে ৭৫ টাকা। এর ফলে বছরে নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের উপর পড়বে।
অর্থায়ন
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। অর্থাৎ প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, “এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত যেখান থেকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারতো।”
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১,২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১,২৩০ কোটি টাকা) ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন (১,৯৩১ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করছে। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১,৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে তা কখনওই উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে ‘প্রশ্ন তৈরি করেছে’।
বর্জ্য উৎপাদন
এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয় তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬,১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি কর্পোরেশনে আরো বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এ প্রকল্প।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে কী পরিমাণ বায়ু দূষণ হবে, কার্বন কতটুকু নির্গমন হবে এ সংক্রান্ত তথ্যও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি বলেও এ সময় অভিযোগ তোলা হয়।
বায়ুদূষণ
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯.৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১.১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে। দিল্লির বর্জ্যবিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদুষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্বন নির্গমন
বলা হচ্ছে যে, এ প্রকল্পের ফলে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদুষণ কমবে। কিন্তু, অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন। বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১.৩ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন নির্গমন হয় যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভূক্তভোগী হবে ঢাকার নগরবাসী এবং বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দিবে।
বেলা’র নীতি সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোনোর কথা বলছে, তখন এমন একটি ব্যয়বহুল ও দূষণকারী প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এআইআইবি ও এনডিবির উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করা।”
মতামত ‘নেওয়া হয়নি’
এআইআইবি’র পরিবেশগত ও সামাজিক নীতি (ইএসএফ) অনুসারে প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত গ্রহণ করতে হবে। এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুসারে স্থানীয় শতাধিক মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন যে তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেয়া হয়নি। এছাড়া যাদের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে মতামত জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তাও করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকরের প্রকল্প অনুমোদনের পর।
এআইআইবি’র পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শুধুমাত্র সিএমইসি’র স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদন করার প্রস্তাব দিয়েছে।
হাসান মেহেদী এবং এনজিও ফোরাম অন এডিবি’র নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান জোর দিয়ে বলেন, “একটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মানদণ্ড শিথিল করার উদ্যোগ আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।”
সংগঠনগুলোর দাবি
১. বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পের মেয়াদ, জাতীয় অর্থনীতি ও ঢাকা মহানগরীর উপর প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে হবে। ২. ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য বাছাই করে শিল্পখাতে পুনর্ব্যবহার ও জৈবসার তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে যাতে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমে যায় এবং ভূমির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনা যায়।
৩. পৌরবর্জ্য কমানোর জন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল গড়ে তুলতে হবে। ৪. বর্জ্য-সংগ্রহকারীদের জীবিকা হারানোর কারণে তাদেরকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে হবে।
৫. বিক্রি করতে অনিচ্ছুক জমির মালিকদের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে, এবং যেসব ভূমি-মালিক জমি দিয়েছেন, তাদেরকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬. ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পে এআইআইবি ও এনডিবি’র ঋণ বাতিল করতে হবে এবং
৭. বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই প্রকল্পটি বাতিল করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন, জৈবসার উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
‘নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ (ওয়েস্ট টু এনার্জি)’ প্রকল্পকে বাংলাদেশের ‘অন্যতম ব্যয়বহুল ও পরিবেশবিধ্বংসী’ বিদ্যুৎ প্রকল্প আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এর সাথে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংগঠনগুলো বলছে, ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সৌরবিদ্যুতের ‘আড়াই গুণ দাম’ পড়বে এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
শনিবার (৪ জুলাই) ঢাকার বাংলামোটররে একটি রোস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। ২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও সিএমইসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির সাড়ে চার বছর পরও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
অধিগ্রহণ
প্রকল্পের জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ২০ একরের পাশাপাশি স্থানীয়দের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ মালিক জমি দিতে রাজি না হলেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে জমি দখল করে সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। আদালতে মামলা চলাকালেই জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় অনেক ভূমি-মালিক জমি হারিয়েও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুনর্বাসনের তালিকায় রাখা হয়েছে মাত্র ৪০ জনকে।
বিদ্যুতের মূল্য
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতায় (পিএলএফ) চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে সরকার প্রতি ইউনিট ২১.৭৮ সেন্ট দরে (২৬.৭৯ টাকা) দরে বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে পিএলএফ ২০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিতে হবে কমপক্ষে ৭৫ টাকা। এর ফলে বছরে নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের উপর পড়বে।
অর্থায়ন
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। অর্থাৎ প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, “এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত যেখান থেকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারতো।”
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১,২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১,২৩০ কোটি টাকা) ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন (১,৯৩১ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করছে। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১,৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে তা কখনওই উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে ‘প্রশ্ন তৈরি করেছে’।
বর্জ্য উৎপাদন
এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয় তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬,১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি কর্পোরেশনে আরো বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এ প্রকল্প।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে কী পরিমাণ বায়ু দূষণ হবে, কার্বন কতটুকু নির্গমন হবে এ সংক্রান্ত তথ্যও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়নি বলেও এ সময় অভিযোগ তোলা হয়।
বায়ুদূষণ
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯.৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১.১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে। দিল্লির বর্জ্যবিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদুষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্বন নির্গমন
বলা হচ্ছে যে, এ প্রকল্পের ফলে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদুষণ কমবে। কিন্তু, অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন। বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১.৩ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন নির্গমন হয় যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভূক্তভোগী হবে ঢাকার নগরবাসী এবং বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দিবে।
বেলা’র নীতি সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোনোর কথা বলছে, তখন এমন একটি ব্যয়বহুল ও দূষণকারী প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এআইআইবি ও এনডিবির উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করা।”
মতামত ‘নেওয়া হয়নি’
এআইআইবি’র পরিবেশগত ও সামাজিক নীতি (ইএসএফ) অনুসারে প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত গ্রহণ করতে হবে। এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুসারে স্থানীয় শতাধিক মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ বলেছেন যে তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেয়া হয়নি। এছাড়া যাদের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে মতামত জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তাও করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকরের প্রকল্প অনুমোদনের পর।
এআইআইবি’র পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শুধুমাত্র সিএমইসি’র স্বার্থে রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদন করার প্রস্তাব দিয়েছে।
হাসান মেহেদী এবং এনজিও ফোরাম অন এডিবি’র নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান জোর দিয়ে বলেন, “একটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার মানদণ্ড শিথিল করার উদ্যোগ আইনের শাসন ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।”
সংগঠনগুলোর দাবি
১. বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পের মেয়াদ, জাতীয় অর্থনীতি ও ঢাকা মহানগরীর উপর প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে হবে। ২. ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য বাছাই করে শিল্পখাতে পুনর্ব্যবহার ও জৈবসার তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে যাতে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমে যায় এবং ভূমির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনা যায়।
৩. পৌরবর্জ্য কমানোর জন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল গড়ে তুলতে হবে। ৪. বর্জ্য-সংগ্রহকারীদের জীবিকা হারানোর কারণে তাদেরকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতে হবে।
৫. বিক্রি করতে অনিচ্ছুক জমির মালিকদের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে, এবং যেসব ভূমি-মালিক জমি দিয়েছেন, তাদেরকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬. ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পে এআইআইবি ও এনডিবি’র ঋণ বাতিল করতে হবে এবং
৭. বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই প্রকল্পটি বাতিল করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন, জৈবসার উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

আপনার মতামত লিখুন