সার্ত্রের ‘অস্তিত্ববাদ’, জয়েসের ‘চেতনাপ্রবাহ’, হেমিংওয়ের ‘আইসবার্গ’, বেকেটের ‘কিমিতিবাদ’-এর প্রভাব বিশ্বসাহিত্যে প্রবল| তাঁদের লেখা, তাঁদের তত্ত্ব আমাদের সাহিত্যকে আরো ঋদ্ধ করেছে| তবে আমার বিবেচনায়, কাফকা সম্ভবত একমাত্র লেখক যিনি নিজেই একটি মতবাদ| লেখকের নিজের নামেই একটি সাহিত্যবাদ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিরল ঘটনা কাফকার ক্ষেত্রেই ঘটেছে| ‘কাফকায়েস্ক’ বলে যে মতবাদ আজ বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত তা কাফকার রচনারশৈলী ও গঠন থেকেই নেয়া| আর কোনো লেখকের নামেই এমন একক একটি মতবাদ গড়ে ওঠেনি|
স্বভাবতই ‘কাফকায়েস্ক’ বুঝতে পারলে আমরা কাফকা ও তাঁর লেখাকে সহজেই অনুধাবন করতে পারবো| ম্যারিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি মতে, কাফকায়েস্ক হলো কাফকার লেখার গুণ বা বৈশিষ্ট্য| বিশেষত দুঃস্বপ্নের মতো জটিল, উদ্ভট কিংবা যুক্তিহীন এক জগতই হলো কাফকায়েস্ক|
বিষয়টিকে কাফকার জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝতে সুবিধা হবে| প্রথমতই কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে কাফায়েস্কের ব্যাখা করা যেতে পারে| এ উপন্যাসে দেখি, কেউ হয়তো জোসেফ কে-এর সম্পর্কে মিথ্যাচার করেছে বা কোনো ষড়যন্ত্র করেছে| তাকে গ্রেফতার করা হলো| সে জানে সে কখনোই কোনো অন্যায় করেনি, কিন্তু এক সকালে তাকে গ্রেফতার করা হলো| কোনো কারণ ছাড়াই বন্দী হওয়া নায়ক জোসেফ কে এমনকি সে অর্থে কোনো বিচারও পায় না| অদ্ভুত অচেনা এক আদালত, সেটা আদালত কিনা তাতেও সন্দেহ আছে সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো| এক অহেতুক জটিল, দীর্ঘ ও হতাশাকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় জোসেফ কে| অথচ এই জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও বিষাদ এসেছে নেহাতই অর্থহীন, উদ্ভট উপায়ে|
‘কাফাকায়েস্ক’ আসলে এই সীমাহীন উদ্ভট, জটিল ও হতাশাজনক পরিস্থিতিরই নাম| তথাকথিত আধুনিক আমলাতন্ত্রের অর্থহীন দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে এই কাফায়েস্কের মিল আছে| বেদনার ব্যাপার হলো, আপাত এই জটিল, উদ্ভট, যুক্তিহীন বিষয়কে অপ্রাসঙ্গিক বা সাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা যায় না| বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব প্রবল| ধরুন, আপনি হাসপাতালে গেলেন, সেখানে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ভুল চিকিৎসা এবং জীবন-মৃত্যুর এক জটিল চক্রে আপনি ও আপনার পরিবার আটকে গেলো উদ্ভটভাবে— এটিই হতে পারে কাফকায়েস্ক ভঙ্গির একটি গল্প| কিংবা ধরুন, পথে বা পার্কে হাঁটছেন, ˆবকালিক ভ্রমণে, এমন সময় কে বা কারা বিনা কারণেই আপনাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো, আপনি জানতেও পারলেন না, কেন আপনাকে নিয়ে এক উদ্ভট টানাহেঁচড়া শুরু হলো, অথচ আপনি তাতে ভুগছেন— এই হলো ‘কাফকায়েস্ক’| এখন আপনিই ভেবে দেখুন, আজকের দিনে কাফকায়েস্ক কতোটুকু জরুরি|
আপাতভাবে ‘কাফকায়েস্ক’ একটি তত্ত্ব বা সাহিত্যিক মতবাদে সীমাবদ্ধ মনে হতে পারে, কিন্তু আদতে লক্ষ্য করুন, আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনও কি প্রায়শই ভয়াবহ ট্র্যাজিকভাবে জটিল-বিষণ্ন-দীর্ঘ হয়ে ওঠে না?
এই যে আমি লিখছি, মানে সারা জীবন লিখতে চাই, কেবল লিখে যেতে চাই, কিন্তু লেখার জন্য যে পরিবেশ তা পাই না, বরং একজন লেখক বা শিল্পীকে বাজারে যেতে হয়, চাল-পেঁয়াজের দর কষাকষি করতে হয়, ভুল বিদ্যুৎ বিল, দশটা-পাঁচটার অফিস ইত্যাদির চক্রে আটকে থাকতে হয়| এই অহেতুক চক্রে আটকে যাচ্ছি আমরা এবং কাফকার নায়কও| কাফকার ‘মেটামরফসিস’ নামের বিশ্বখ্যাত বড় গল্পে আমরা দেখি, এক সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম ভেঙে দেখে সে বিরাট একটা পোকা হয়ে গেছে| কিন্তু তার মাথা থেকে অফিস-চাকরির চিন্তা যায়নি| আদতে আমরাও কি পোকার জীবন বেছে নিতে বাধ্য হইনি? কর্পোরেট কর্মী এই যে জীবনভর টাই বাঁধছে, ফাইল ঘাঁটছে, মিটিং করছে এবং দিনের পর দিন করেই যাচ্ছে— অর্থহীন এক পুনরাবৃত্তি— সে-ও কি এক ‘কাফকায়েস্ক’ নয়? সেলিনা হোসেন যখন সমুদ্রবর্তী নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে উপন্যাস লেখেন তার নামকরণ করেন ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ তখন পোকামাকড়ের মতো জীবন ধারণ করা মানুষগুলোর সঙ্গে কি আমরা সংযোগ খুঁজে পাই না?
কাফকার কেরানি হওয়ার প্রভাব কি তাঁর জীবনে ও সাহিত্যে পড়েনি? কাফকার বহু গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্রই অফিসের কাজে ব্যতিব্যস্ত| ‘পসাইডন’ নামের অণুগল্পটির কথাই ধরা যাক| যে পসাইডন গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী একজন সমুদ্র দেবতা| ঢেউয়ের সাথে তার ঘোড়া ছুটে বেড়ায়| সেই পসাইডন কাফকার গল্পে এসে দেখা যায় সমুদ্রের পানির হিসাব মাপতেই ব্যস্ত| এমনকি সমুদ্র দেখার সুযোগ বা ইচ্ছাও আর তার থাকে না| এই গল্পের বিষাদ আর উদ্ভট পরিপ্রেক্ষিতের আড়ালে প্রহসনটা এই রয়ে যায় যে, এমনকি একজন দেবতাও আধুনিক কালে এসে দাপ্তরিক কাজ থেকে মুক্তি পায় না| তাকে অন্য কাজ দিলেও সে গ্রহণ করতে পারে না, কেননা সে মনে করে অন্য কেউ তার কাজটি করতে পারবে না| পসাইডন তার নিজের অহম অথবা ভ্রান্তির খাঁচাতেই বন্দী, যেমন আমরাও| আমাদেরও সৃষ্টিশীল জীবন আটকা পড়ে থাকে দাপ্তরিক কিংবা কেরানি গোছের কোনো কাজেই| এই অর্থহীন কেরানি জীবন কাফকা ভুগেছেন| মনে রাখতে হবে, তার ‘জোসেফ কে’ চরিত্রটিও কিন্তু একটি ব্যাংকের প্রধান কেরানি|
কাফকার আরেকটি উপন্যাস ‘দ্য ক্যাসল’-এর নায়কের নামও ‘কে’| এই ‘কে’ হয়তো কাফকার নামেরই আদ্যাক্ষর| এই কে চরিত্রটি একটি গ্রামে আসে এবং গ্রামের অভিজাত ‘গ্রাফ’-এর দুর্গে প্রবেশ করতে চায়| কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিকতার বাধা সে পেরুতে পারে না| এখানে কে একজন ভূমি জরিপকারী| সে দাবি করে দুর্গের কর্তাব্যক্তির আদেশেই সে এখানে এসেছে| কিন্তু দুর্গের কর্মকর্তা, মেয়র প্রমুখের আমলাতান্ত্রিক দুর্গে সে আটকা পড়ে যায়|
তবে এই দীর্ঘ আটকে পড়া, এই বন্দী জীবন কেবল রাষ্ট্র বা সমাজ সৃষ্ট নয়| কখনো প্রচলিত আইন, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ফাঁদে ব্যক্তি যেমন আটকে যায়, তেমনি ব্যক্তি নিজেও তার নিজের তৈরি নিয়মের নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়ে| সর্বোপরি ব্যক্তির সঙ্গে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা ও তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে শুরু হয় অসীম সংঘাত| যেই সংঘাত ক্রমশ উদ্ভট, দীর্ঘতর আর হতাশাজনক পরিবেশের সৃষ্টি করে|
পুরাণকে বারবার নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন কাফকা| প্রমিথিউস গল্পে প্রমিথিউসের বন্দিত্বের চারটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে| ‘নয়া উকিল’ গল্পে দেখি আলক্সান্ডার দ্য গ্রেটের বিশ্ব জয়ের সঙ্গী ঘোড়া বিউসেফ্যালাস বর্তমান যুগে এসে ড. বিউসেফ্যালাস হয়ে গেছে| সে নেহাতই একজন উকিল যে ‘যুদ্ধের কলরব থেকে মুক্ত ও দূরে, সে কেবল বই পড়ে আর প্রাচীন মোটা মোটা পুঁথির পাতা উল্টে যায়|’
‘প্রহরী’ গল্পে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রহরীকে পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটাই অবিরল| এই পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তাঁর বহু গল্পেই দেখা যায়| ‘প্রস্থান’ গল্পের ভৃত্য যেন প্রভুর আদেশ বুঝতে পারছে না| প্রভু বেরুতে চাইলে ভৃত্য জানতে চায় সে কোথায় যাবে| প্রভু জানায়, সে এর বাইরে যেতে চায়, এটাই তার একমাত্র গন্তব্য|
কাফকার প্রায় সকল গল্পের সকল নায়কই কোনো একটা চক্র থেকে বের হতে চায়| কোথায় যাবে, কেন যাবে, তারচেয়েও বড় কথা এখান থেকে যেতে হবে, বেরুতে হবে| ‘ইসাবেলা’ গল্পেও দেখা যায় সুন্দরী নারী ঘোড়া ইসাবেলা জগতটাকে দেখতে চায়| প্রভুর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে সে বেরিয়ে আসে| সে বলে, ‘আস্তাবলে কারো কোনো কাজে না-লেগে খামাখা দাঁড়িয়ে না-থেকে আমি বরং এখন দুনিয়াটাও দেখতে চাই, মানে যতোক্ষণ পারি, যতোক্ষণ এটা করার মতো শক্তি আমার আছে’| এই ঘোড়াটির মতো আমরাও হয়তো আটকে পড়েছি, আমরাও হয়তো ভাবি এই ‘খামাখা’ থেকে বেরিয়ে যেতে| অন্য কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে|
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে গন্তব্যে পৌঁছা হয়ে ওঠে না| ‘একটি সাধারণ বিভ্রান্তি’ গল্পে দেখা যাচ্ছে জনৈক ক. দেখা করতে চায় খ.-এর সঙ্গে| সে চ. স্থানে গেলে খ চলে চলে আসে তার এখানে| ক. আর খ. এর দেখা হয় না| একদম কাছে আসলেও দেখা হয় না| ‘সম্রাটের কাছ থেকে একটি বার্তা’ গল্পেও দেখি সম্রাট অতি দক্ষ একজন বার্তাবাহককে বিশেষ একজনের কাছে একটি বার্তা দিয়ে পাঠান| কিন্তু বার্তাবাহক অসীম বাধা ঠেলে আসতে থাকে, আসতেই থাকে| শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না| এ যেন ‘দ্য ক্যাসল’ উপন্যাসের কে-এর মতোই আরেক চরিত্র|
কাফকার গল্প-উপন্যাসে মানুষ ও পশুর একটা তুলনামূলক সম্পর্ক বরাবরই পাই| গ্রেগর সামসার পোকা হয়ে ওঠার মতো তাঁর লেখাতে আবার প্রাণিরাও মানুষ হয়ে ওঠে, মানুষেরা প্রাণি| একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, কাফকার অনেক গল্পের মানুষেরা পশুর মতো আবার পশুরাও মানুষের মতো| ‘ইসাবেলা’ নামের ঘোড়াকে সুন্দরী নারীই মনে হয়| ‘শঙ্কর’ গল্পের কথক পারিবারিক সূত্রে একটি উদ্ভট শঙ্কর প্রাণি পেয়েছে| এই প্রাণিটি আংশিক ভেড়া ও আংশিক বেড়াল, সে আবার কখনোবা কুকুরও হতে চায়| ‘একজন পারিবারিক মানুষের যত্নাত্তি’ গল্পে ওড্রাডেক নামের একটি কাল্পনিক প্রাণির দেখা পাই| উদ্ভট আকৃতির উদ্দেশ্যবিহীন এই প্রাণিটিও টিকে থাকবে দীর্ঘকাল সেই ভাবনাই গল্পকারকে পীড়িত করে ভীষণভাবে|
কাফকা আইনের ছাত্রই শুধু ছিলেন না, কর্মজীবনের শুরুতে আইনের একজন করণিক হিসাবে আদালতে কাজও করেছেন| কিন্তু প্রচলিত আইনের উপর তাঁর যে খুব আস্থা ছিলো তা বলা যায় না| তাঁর একাধিক গল্পেই আইনের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা উঠে এসেছে| ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাস ছাড়াও ‘নয়া উকিল’ ‘উকিলগণ’, ‘আমাদের আইন-কানুনের সমস্যা’ ইত্যাদি গল্পে আইনের এইসব দিক তিনি তুলে ধরেছেন|
কাফকা স্বয়ং ভীষণভাবে ফ্রয়েড দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন| তাঁর গল্পে যে ধাঁধাময় জগত সেটা বুঝতে গেলে ফ্রয়েডীয় মনোবীক্ষণ বোঝা অতি জরুরি| তিনি তাঁর প্রতীকগুলো ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই তুলে ধরেছেন| আমরা কাফকার জীবনী থেকেই জানি, তিনি তাঁর বাবাকে ভীষণ ভয় পেতেন, এক ধরনের রহস্যময় আতঙ্ক থেকেই পিতার সঙ্গে তাঁর শত্রুতাই ছিলো| বাবা তাঁর সাহিত্যচর্চাকেও গ্রহণ করেনি| অন্যদিকে মাকেও কাফকা একদা অভিযোগ করেছিলেন যে, তাঁরা তাঁর ভাল চান না| কাফকার বিশ্বাস ছিলো, অভিভাবকরা তাঁর প্রতি আরেকটু সদয় ও সংবেদনশীল হলে সে হয়তো অন্য রকম হতে পারতো| বাবা-মা’র সাথে তাঁর এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিহ্ন ‘মেটামরফসিস’সহ একাধিক রচনাতেই দেখতে পাই| বাবাকে লেখা এক চিঠিতে কাফকা বলেছিলেন, ‘আমার লেখা আপনাকে নিয়েই| সেই সব লেখায় আমি কেবল আমার বেদনাকেই তুলে ধরেছি যা দীর্ঘশ্বাস হয়ে আপনার বুকে বাজেনি|’
অন্যদিকে কাফকার সাহিত্য মার্ক্সসীয় দৃষ্টিতেও বিবেচনা করা যায়| তিনি নিজেও ব্যক্তি জীবনে বুর্জোয়া শাসন দ্বারা নিপীড়িত বোধ করেছেন| তাঁর একাধিক গল্পের নায়কেরা লড়াই করেছেন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে| এটা বলার অপেক্ষা রাখে না কাফকার মতো সংবেদনশীল ও সচেতন লেখক নিশ্চয়ই ক্রম-বর্ধনশীল নাৎসিবাদকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন| ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসে জোসেফ কে’র লড়াইটা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধেও ব্যাখ্যা করা যায়| এই তথ্যও মনে রাখা দরকার যে, কাফকার তিন বোন নাৎসিদের নির্যাতন ক্যাম্পেই মারা গেছেন|
কাফকার লেখাগুলো তাঁর জীবিতকালে তেমন কারো নজরে পড়েনি| তাঁর অধিকাংশ লেখাও অসমাপ্ত| তিনি বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে লিখেছিলেন, ‘প্রিয়তম ম্যাক্স, আমার শেষ অনুরোধ : যা কিছু আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি... দিনলিপির আকারে, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র (আমার ও অন্যদের), স্কেচসমূহ এবং এই সবই না-পড়েই পুড়িয়ে ফেলো।’ ইতিহাস জানে ব্রড বন্ধুর এ অনুরোধ রাখেনি বলেই আজ আমরা কাফকাকে নিয়ে আলোচনা করতে পারছি| বরং কাফকার যাবতীয় লেখালেখি প্রকাশে ব্রড একজন দক্ষ সম্পাদকের ভূমিকা রেখেছিলেন| বিশ্বসাহিত্য নিরঙ্কুশভাবে ব্রডের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করতে পারে|
মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাফকা| মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই বন্ধুকে বলেছিলেন, তাঁর সব লেখা যেন ধ্বংস করে দেয়া হয়| ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘আমেরিকা’-এর মতো অসমাপ্ত সব উপন্যাস দিয়েই কাফকা আজ বিশ্ব সাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন| একজন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মিলান কুন্ডেরা থেকে হারুকি মুরাকামি পর্যন্ত বহু খ্যাত লেখকরা আজ কাফকার প্রভাবের কথা সাগ্রহে, সকৃতজ্ঞে স্বীকার করেন| কাফকাকে নিয়ে আজও টিকটক, ইন্সটাগ্রাম আর ফেসবুক রিল ও ইউটিউব শটসে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কনটেন্ট| বিশ্বায়ন আর ডিজিটালাইজেশনের এই ব্যস্ত দুনিয়াতেও কাফকার প্রভাব কোনোভাবেই কম নয়| এর অন্যতম কারণ কাফকা মানুষের জীবনাভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন| কাফকা এবং কাফকায়েস্কের জগতেই বাস করছি আজকের আমরা| যদিও কাফকা জন্মেছেন প্রাগে, লিখেছেন চেক এবং তারচেয়েও বেশি করে জার্মান ভাষায়, জাতে ছিলেন ইহুদি, পেশায় কেরানি ও আইনজীবী তবুও তাঁর লেখায় বরাবর উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথা| এমন সব মানুষ যাদের নামটাও সুনির্দিষ্ট নয়, পদবি নেই| কারো নাম এ, কারো নাম কে, কারো নাম দেবতার থেকে ধার নেয়া, কারো নাম ঘোড়ার থেকে ধার নেয়া| আর জায়গাগুলো ঠিক প্রাগ নয়, জার্মানিও নয়| অনির্দিষ্ট জায়গা, অনির্দিষ্ট মানুষ, কিন্তু তারা আপনার আমার মতোই সাধারণ| আমাদের মতোই টানা, একঘেয়ে, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংকট, ভয়, বিচ্ছন্নতা আর দীর্ঘসূত্রতার এক জীবন তাদের| এই অর্থহীন, দীর্ঘ, কখনো অবাস্তব, উদ্ভট, অথচ আবশ্যিক ‘কাফকায়েস্ক’ জীবনের ভেতরেই আমাদের বসবাস| কাফকার ‘কাফকায়েস্ক’-এর প্রভাব তাই সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে, কমেনি|
যথাবিহিত ভিন্ন পথে হাঁটার কারণে কাফকাকেও কম অবহেলা সইতে হয়নি| তবে নিজের ধর্মমতের কারণেই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে| কাফকার অন্যতম অপরাধ ইহুদি হওয়া| ইহুদি হওয়ার কারণেই জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পরও কাফকা ও তাঁর লেখাকে বহু বাধা পার হতে হয়েছে| অনেক সাহিত্য সমালোচকও কাফকাকে ইহুদি লেখক হিসাবেই দেখতে পছন্দ করেন| আমি বলবো এটা ছিলো একটা আন্তর্জাতিক মৌলবাদ| লেখক, সে কাফকা বা অন্য যে কেউ, সে সদাই ˆবশ্বিক| কোনো জাত, পাত, গোষ্ঠীর জন্য নয়, বড় লেখক তাঁর লেখার গভীরে সদাই মানব জাতি আর মহাবিশ্বের কথাই বলেন| নিঃসন্দেহে কাফকা তাঁর ব্যতিক্রম নন| যে কাফকা নাৎসিতাড়িত, যে কাফকা একদা নিজের লেখা পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন, যে কাফকা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন, সে কাফকা আজ অমর| বিষয়, ভঙ্গি আর ভাষার সুসমন্বয়ে কাফকা সারা বিশ্বেই আজ অনুকরণীয় লেখক| সার্ত্র, ক্যামু, বেকেট, বোর্হেস— কম বেশি আধুনিককালের সব দিকপালরাই কাফকা দ্বারা প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত|
সমকালের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করি, কাফকা পাঠ তাই অতি জরুরি| কিন্তু পুনরায় মনে রাখা প্রয়োজন, গড়গড় করে পড়ে ফেলার মতো লেখক কাফকা নন| কাফকার গল্প অনুধাবন করা ততোটা সহজ নয়| কেননা, প্রচলিত রীতির গল্প বলাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন| তাঁর বাক্য গঠন, চরিত্র নির্মাণ, গল্পের বিষয়— সব কিছুই যেমন তীব্র প্রথাবিরোধী, তেমনি প্রতিবাদী এবং অবশ্যই দুরূহ| কিন্তু এই দুরূহময়তা কেবল সাহিত্যের বাহাদুরির অস্ত্র নয়| যে সংকটময়, জটিল সময় আর জীবন তিনি যাপন করেছেন তারই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর লেখালেখিতেই|
আপতভাবে তাঁর গল্পগুলো দুর্বোধ্য, কোথাওবা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়| কাফকার গল্প চকিত দর্শনের দিকে টেনে নিয়ে যায়| ধর্ম, চরিত্র, আচরণ নিয়ে ঘোট পাকায়| সরল করে মিষ্টি গল্প লেখেননি তিনি| কাজেই তাঁর গল্পের ভেতরে ঢুকতে হলে বেশ সাধনা করতে হয়| তাঁর গল্প বুঝতে গেলে কিয়ের্কেগার্ডের দর্শন যেমন বোঝা লাগে, তেমনি বুঝতে হয় বাইবেলীয় ভাষা, পুরাণ, লোকগাথা, ধর্ম-দর্শন| তিনি ধাঁধা’র মতোই কঠিন করে রেখেছেন নিজের গল্প ভুবন| কিন্তু এই কঠিনেরও রয়েছে মায়া| কাফকা যেন দুর্গম অচেনা দ্বীপ, দুর্গম কিন্তু মায়াবী আকর্ষণে টানে| সেই টানেই পাঠক এগিয়ে যায় কাফকার রহস্য জগতে|
সব কিছু মিলিয়ে যে তীব্র দোলাচল, টানাপোড়েনের ডিজিটাল জীবন আমরা বেছে নিয়েছি সেখানে আমরাও ক্রমশ গ্রেগর সামসার মতো পোকার জীবনের দিকেই আগাচ্ছি| আমরা ক্রমশ জীবজন্তুর মতোই আচরণ করতে শুরু করেছি| এই সব বিবেচনায় কাফকা একটি আয়নার নাম| যে আয়নায় আমরা নিজেদের জটিল জীবনকেও দেখতে পাবো হয়তোবা| সেই আশাতেই কাফকা পাঠ আমাদের জন্য জরুরি বিবেচ্য|
আরেকটি সংযোগের কথা বলে এই লেখাটি শেষ করা যায়| সেটি হলো, আজকের তরুণ প্রজন্ম| আজকের বৈশ্বিক রাজনীতি, এমনকি আমার বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, তরুণরাই তো সবচেয়ে প্রতিবাদী| তরুণরাই সবসময় কর্তৃপক্ষ তথা কথিত শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে বা সংঘর্ষে জড়ায়| আর এই সংঘর্ষ অবশ্যই অসম, ক্ষেত্র বিশেষে অসম্ভব একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে দেয়| এই বিচ্ছিন্নতা থেকে অর্থহীন, একঘেয়ে ‘কাফকায়েস্ক’-এর পূর্ণজন্ম হয়, বারবার| যিশুর পুনরুত্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত কিছু বলার সময় হয়তো আসেনি, কিন্তু আমরা বলতে পারি, কাফকা এবং তার ‘কাফকায়েস্ক’-এর পুনরুত্থান ঘটেছে, ঘটছে চলমান দিন-রাত্তিরে|

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
সার্ত্রের ‘অস্তিত্ববাদ’, জয়েসের ‘চেতনাপ্রবাহ’, হেমিংওয়ের ‘আইসবার্গ’, বেকেটের ‘কিমিতিবাদ’-এর প্রভাব বিশ্বসাহিত্যে প্রবল| তাঁদের লেখা, তাঁদের তত্ত্ব আমাদের সাহিত্যকে আরো ঋদ্ধ করেছে| তবে আমার বিবেচনায়, কাফকা সম্ভবত একমাত্র লেখক যিনি নিজেই একটি মতবাদ| লেখকের নিজের নামেই একটি সাহিত্যবাদ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিরল ঘটনা কাফকার ক্ষেত্রেই ঘটেছে| ‘কাফকায়েস্ক’ বলে যে মতবাদ আজ বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত তা কাফকার রচনারশৈলী ও গঠন থেকেই নেয়া| আর কোনো লেখকের নামেই এমন একক একটি মতবাদ গড়ে ওঠেনি|
স্বভাবতই ‘কাফকায়েস্ক’ বুঝতে পারলে আমরা কাফকা ও তাঁর লেখাকে সহজেই অনুধাবন করতে পারবো| ম্যারিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি মতে, কাফকায়েস্ক হলো কাফকার লেখার গুণ বা বৈশিষ্ট্য| বিশেষত দুঃস্বপ্নের মতো জটিল, উদ্ভট কিংবা যুক্তিহীন এক জগতই হলো কাফকায়েস্ক|
বিষয়টিকে কাফকার জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝতে সুবিধা হবে| প্রথমতই কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে কাফায়েস্কের ব্যাখা করা যেতে পারে| এ উপন্যাসে দেখি, কেউ হয়তো জোসেফ কে-এর সম্পর্কে মিথ্যাচার করেছে বা কোনো ষড়যন্ত্র করেছে| তাকে গ্রেফতার করা হলো| সে জানে সে কখনোই কোনো অন্যায় করেনি, কিন্তু এক সকালে তাকে গ্রেফতার করা হলো| কোনো কারণ ছাড়াই বন্দী হওয়া নায়ক জোসেফ কে এমনকি সে অর্থে কোনো বিচারও পায় না| অদ্ভুত অচেনা এক আদালত, সেটা আদালত কিনা তাতেও সন্দেহ আছে সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো| এক অহেতুক জটিল, দীর্ঘ ও হতাশাকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় জোসেফ কে| অথচ এই জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও বিষাদ এসেছে নেহাতই অর্থহীন, উদ্ভট উপায়ে|
‘কাফাকায়েস্ক’ আসলে এই সীমাহীন উদ্ভট, জটিল ও হতাশাজনক পরিস্থিতিরই নাম| তথাকথিত আধুনিক আমলাতন্ত্রের অর্থহীন দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে এই কাফায়েস্কের মিল আছে| বেদনার ব্যাপার হলো, আপাত এই জটিল, উদ্ভট, যুক্তিহীন বিষয়কে অপ্রাসঙ্গিক বা সাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা যায় না| বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব প্রবল| ধরুন, আপনি হাসপাতালে গেলেন, সেখানে এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ভুল চিকিৎসা এবং জীবন-মৃত্যুর এক জটিল চক্রে আপনি ও আপনার পরিবার আটকে গেলো উদ্ভটভাবে— এটিই হতে পারে কাফকায়েস্ক ভঙ্গির একটি গল্প| কিংবা ধরুন, পথে বা পার্কে হাঁটছেন, ˆবকালিক ভ্রমণে, এমন সময় কে বা কারা বিনা কারণেই আপনাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো, আপনি জানতেও পারলেন না, কেন আপনাকে নিয়ে এক উদ্ভট টানাহেঁচড়া শুরু হলো, অথচ আপনি তাতে ভুগছেন— এই হলো ‘কাফকায়েস্ক’| এখন আপনিই ভেবে দেখুন, আজকের দিনে কাফকায়েস্ক কতোটুকু জরুরি|
আপাতভাবে ‘কাফকায়েস্ক’ একটি তত্ত্ব বা সাহিত্যিক মতবাদে সীমাবদ্ধ মনে হতে পারে, কিন্তু আদতে লক্ষ্য করুন, আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনও কি প্রায়শই ভয়াবহ ট্র্যাজিকভাবে জটিল-বিষণ্ন-দীর্ঘ হয়ে ওঠে না?
এই যে আমি লিখছি, মানে সারা জীবন লিখতে চাই, কেবল লিখে যেতে চাই, কিন্তু লেখার জন্য যে পরিবেশ তা পাই না, বরং একজন লেখক বা শিল্পীকে বাজারে যেতে হয়, চাল-পেঁয়াজের দর কষাকষি করতে হয়, ভুল বিদ্যুৎ বিল, দশটা-পাঁচটার অফিস ইত্যাদির চক্রে আটকে থাকতে হয়| এই অহেতুক চক্রে আটকে যাচ্ছি আমরা এবং কাফকার নায়কও| কাফকার ‘মেটামরফসিস’ নামের বিশ্বখ্যাত বড় গল্পে আমরা দেখি, এক সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম ভেঙে দেখে সে বিরাট একটা পোকা হয়ে গেছে| কিন্তু তার মাথা থেকে অফিস-চাকরির চিন্তা যায়নি| আদতে আমরাও কি পোকার জীবন বেছে নিতে বাধ্য হইনি? কর্পোরেট কর্মী এই যে জীবনভর টাই বাঁধছে, ফাইল ঘাঁটছে, মিটিং করছে এবং দিনের পর দিন করেই যাচ্ছে— অর্থহীন এক পুনরাবৃত্তি— সে-ও কি এক ‘কাফকায়েস্ক’ নয়? সেলিনা হোসেন যখন সমুদ্রবর্তী নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে উপন্যাস লেখেন তার নামকরণ করেন ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ তখন পোকামাকড়ের মতো জীবন ধারণ করা মানুষগুলোর সঙ্গে কি আমরা সংযোগ খুঁজে পাই না?
কাফকার কেরানি হওয়ার প্রভাব কি তাঁর জীবনে ও সাহিত্যে পড়েনি? কাফকার বহু গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্রই অফিসের কাজে ব্যতিব্যস্ত| ‘পসাইডন’ নামের অণুগল্পটির কথাই ধরা যাক| যে পসাইডন গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী একজন সমুদ্র দেবতা| ঢেউয়ের সাথে তার ঘোড়া ছুটে বেড়ায়| সেই পসাইডন কাফকার গল্পে এসে দেখা যায় সমুদ্রের পানির হিসাব মাপতেই ব্যস্ত| এমনকি সমুদ্র দেখার সুযোগ বা ইচ্ছাও আর তার থাকে না| এই গল্পের বিষাদ আর উদ্ভট পরিপ্রেক্ষিতের আড়ালে প্রহসনটা এই রয়ে যায় যে, এমনকি একজন দেবতাও আধুনিক কালে এসে দাপ্তরিক কাজ থেকে মুক্তি পায় না| তাকে অন্য কাজ দিলেও সে গ্রহণ করতে পারে না, কেননা সে মনে করে অন্য কেউ তার কাজটি করতে পারবে না| পসাইডন তার নিজের অহম অথবা ভ্রান্তির খাঁচাতেই বন্দী, যেমন আমরাও| আমাদেরও সৃষ্টিশীল জীবন আটকা পড়ে থাকে দাপ্তরিক কিংবা কেরানি গোছের কোনো কাজেই| এই অর্থহীন কেরানি জীবন কাফকা ভুগেছেন| মনে রাখতে হবে, তার ‘জোসেফ কে’ চরিত্রটিও কিন্তু একটি ব্যাংকের প্রধান কেরানি|
কাফকার আরেকটি উপন্যাস ‘দ্য ক্যাসল’-এর নায়কের নামও ‘কে’| এই ‘কে’ হয়তো কাফকার নামেরই আদ্যাক্ষর| এই কে চরিত্রটি একটি গ্রামে আসে এবং গ্রামের অভিজাত ‘গ্রাফ’-এর দুর্গে প্রবেশ করতে চায়| কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিকতার বাধা সে পেরুতে পারে না| এখানে কে একজন ভূমি জরিপকারী| সে দাবি করে দুর্গের কর্তাব্যক্তির আদেশেই সে এখানে এসেছে| কিন্তু দুর্গের কর্মকর্তা, মেয়র প্রমুখের আমলাতান্ত্রিক দুর্গে সে আটকা পড়ে যায়|
তবে এই দীর্ঘ আটকে পড়া, এই বন্দী জীবন কেবল রাষ্ট্র বা সমাজ সৃষ্ট নয়| কখনো প্রচলিত আইন, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ফাঁদে ব্যক্তি যেমন আটকে যায়, তেমনি ব্যক্তি নিজেও তার নিজের তৈরি নিয়মের নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়ে| সর্বোপরি ব্যক্তির সঙ্গে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা ও তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে শুরু হয় অসীম সংঘাত| যেই সংঘাত ক্রমশ উদ্ভট, দীর্ঘতর আর হতাশাজনক পরিবেশের সৃষ্টি করে|
পুরাণকে বারবার নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন কাফকা| প্রমিথিউস গল্পে প্রমিথিউসের বন্দিত্বের চারটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে| ‘নয়া উকিল’ গল্পে দেখি আলক্সান্ডার দ্য গ্রেটের বিশ্ব জয়ের সঙ্গী ঘোড়া বিউসেফ্যালাস বর্তমান যুগে এসে ড. বিউসেফ্যালাস হয়ে গেছে| সে নেহাতই একজন উকিল যে ‘যুদ্ধের কলরব থেকে মুক্ত ও দূরে, সে কেবল বই পড়ে আর প্রাচীন মোটা মোটা পুঁথির পাতা উল্টে যায়|’
‘প্রহরী’ গল্পে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রহরীকে পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টাটাই অবিরল| এই পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তাঁর বহু গল্পেই দেখা যায়| ‘প্রস্থান’ গল্পের ভৃত্য যেন প্রভুর আদেশ বুঝতে পারছে না| প্রভু বেরুতে চাইলে ভৃত্য জানতে চায় সে কোথায় যাবে| প্রভু জানায়, সে এর বাইরে যেতে চায়, এটাই তার একমাত্র গন্তব্য|
কাফকার প্রায় সকল গল্পের সকল নায়কই কোনো একটা চক্র থেকে বের হতে চায়| কোথায় যাবে, কেন যাবে, তারচেয়েও বড় কথা এখান থেকে যেতে হবে, বেরুতে হবে| ‘ইসাবেলা’ গল্পেও দেখা যায় সুন্দরী নারী ঘোড়া ইসাবেলা জগতটাকে দেখতে চায়| প্রভুর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে সে বেরিয়ে আসে| সে বলে, ‘আস্তাবলে কারো কোনো কাজে না-লেগে খামাখা দাঁড়িয়ে না-থেকে আমি বরং এখন দুনিয়াটাও দেখতে চাই, মানে যতোক্ষণ পারি, যতোক্ষণ এটা করার মতো শক্তি আমার আছে’| এই ঘোড়াটির মতো আমরাও হয়তো আটকে পড়েছি, আমরাও হয়তো ভাবি এই ‘খামাখা’ থেকে বেরিয়ে যেতে| অন্য কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে|
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে গন্তব্যে পৌঁছা হয়ে ওঠে না| ‘একটি সাধারণ বিভ্রান্তি’ গল্পে দেখা যাচ্ছে জনৈক ক. দেখা করতে চায় খ.-এর সঙ্গে| সে চ. স্থানে গেলে খ চলে চলে আসে তার এখানে| ক. আর খ. এর দেখা হয় না| একদম কাছে আসলেও দেখা হয় না| ‘সম্রাটের কাছ থেকে একটি বার্তা’ গল্পেও দেখি সম্রাট অতি দক্ষ একজন বার্তাবাহককে বিশেষ একজনের কাছে একটি বার্তা দিয়ে পাঠান| কিন্তু বার্তাবাহক অসীম বাধা ঠেলে আসতে থাকে, আসতেই থাকে| শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না| এ যেন ‘দ্য ক্যাসল’ উপন্যাসের কে-এর মতোই আরেক চরিত্র|
কাফকার গল্প-উপন্যাসে মানুষ ও পশুর একটা তুলনামূলক সম্পর্ক বরাবরই পাই| গ্রেগর সামসার পোকা হয়ে ওঠার মতো তাঁর লেখাতে আবার প্রাণিরাও মানুষ হয়ে ওঠে, মানুষেরা প্রাণি| একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, কাফকার অনেক গল্পের মানুষেরা পশুর মতো আবার পশুরাও মানুষের মতো| ‘ইসাবেলা’ নামের ঘোড়াকে সুন্দরী নারীই মনে হয়| ‘শঙ্কর’ গল্পের কথক পারিবারিক সূত্রে একটি উদ্ভট শঙ্কর প্রাণি পেয়েছে| এই প্রাণিটি আংশিক ভেড়া ও আংশিক বেড়াল, সে আবার কখনোবা কুকুরও হতে চায়| ‘একজন পারিবারিক মানুষের যত্নাত্তি’ গল্পে ওড্রাডেক নামের একটি কাল্পনিক প্রাণির দেখা পাই| উদ্ভট আকৃতির উদ্দেশ্যবিহীন এই প্রাণিটিও টিকে থাকবে দীর্ঘকাল সেই ভাবনাই গল্পকারকে পীড়িত করে ভীষণভাবে|
কাফকা আইনের ছাত্রই শুধু ছিলেন না, কর্মজীবনের শুরুতে আইনের একজন করণিক হিসাবে আদালতে কাজও করেছেন| কিন্তু প্রচলিত আইনের উপর তাঁর যে খুব আস্থা ছিলো তা বলা যায় না| তাঁর একাধিক গল্পেই আইনের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা উঠে এসেছে| ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাস ছাড়াও ‘নয়া উকিল’ ‘উকিলগণ’, ‘আমাদের আইন-কানুনের সমস্যা’ ইত্যাদি গল্পে আইনের এইসব দিক তিনি তুলে ধরেছেন|
কাফকা স্বয়ং ভীষণভাবে ফ্রয়েড দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন| তাঁর গল্পে যে ধাঁধাময় জগত সেটা বুঝতে গেলে ফ্রয়েডীয় মনোবীক্ষণ বোঝা অতি জরুরি| তিনি তাঁর প্রতীকগুলো ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই তুলে ধরেছেন| আমরা কাফকার জীবনী থেকেই জানি, তিনি তাঁর বাবাকে ভীষণ ভয় পেতেন, এক ধরনের রহস্যময় আতঙ্ক থেকেই পিতার সঙ্গে তাঁর শত্রুতাই ছিলো| বাবা তাঁর সাহিত্যচর্চাকেও গ্রহণ করেনি| অন্যদিকে মাকেও কাফকা একদা অভিযোগ করেছিলেন যে, তাঁরা তাঁর ভাল চান না| কাফকার বিশ্বাস ছিলো, অভিভাবকরা তাঁর প্রতি আরেকটু সদয় ও সংবেদনশীল হলে সে হয়তো অন্য রকম হতে পারতো| বাবা-মা’র সাথে তাঁর এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিহ্ন ‘মেটামরফসিস’সহ একাধিক রচনাতেই দেখতে পাই| বাবাকে লেখা এক চিঠিতে কাফকা বলেছিলেন, ‘আমার লেখা আপনাকে নিয়েই| সেই সব লেখায় আমি কেবল আমার বেদনাকেই তুলে ধরেছি যা দীর্ঘশ্বাস হয়ে আপনার বুকে বাজেনি|’
অন্যদিকে কাফকার সাহিত্য মার্ক্সসীয় দৃষ্টিতেও বিবেচনা করা যায়| তিনি নিজেও ব্যক্তি জীবনে বুর্জোয়া শাসন দ্বারা নিপীড়িত বোধ করেছেন| তাঁর একাধিক গল্পের নায়কেরা লড়াই করেছেন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে| এটা বলার অপেক্ষা রাখে না কাফকার মতো সংবেদনশীল ও সচেতন লেখক নিশ্চয়ই ক্রম-বর্ধনশীল নাৎসিবাদকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন| ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসে জোসেফ কে’র লড়াইটা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধেও ব্যাখ্যা করা যায়| এই তথ্যও মনে রাখা দরকার যে, কাফকার তিন বোন নাৎসিদের নির্যাতন ক্যাম্পেই মারা গেছেন|
কাফকার লেখাগুলো তাঁর জীবিতকালে তেমন কারো নজরে পড়েনি| তাঁর অধিকাংশ লেখাও অসমাপ্ত| তিনি বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে লিখেছিলেন, ‘প্রিয়তম ম্যাক্স, আমার শেষ অনুরোধ : যা কিছু আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি... দিনলিপির আকারে, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র (আমার ও অন্যদের), স্কেচসমূহ এবং এই সবই না-পড়েই পুড়িয়ে ফেলো।’ ইতিহাস জানে ব্রড বন্ধুর এ অনুরোধ রাখেনি বলেই আজ আমরা কাফকাকে নিয়ে আলোচনা করতে পারছি| বরং কাফকার যাবতীয় লেখালেখি প্রকাশে ব্রড একজন দক্ষ সম্পাদকের ভূমিকা রেখেছিলেন| বিশ্বসাহিত্য নিরঙ্কুশভাবে ব্রডের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করতে পারে|
মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাফকা| মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই বন্ধুকে বলেছিলেন, তাঁর সব লেখা যেন ধ্বংস করে দেয়া হয়| ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘আমেরিকা’-এর মতো অসমাপ্ত সব উপন্যাস দিয়েই কাফকা আজ বিশ্ব সাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন| একজন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মিলান কুন্ডেরা থেকে হারুকি মুরাকামি পর্যন্ত বহু খ্যাত লেখকরা আজ কাফকার প্রভাবের কথা সাগ্রহে, সকৃতজ্ঞে স্বীকার করেন| কাফকাকে নিয়ে আজও টিকটক, ইন্সটাগ্রাম আর ফেসবুক রিল ও ইউটিউব শটসে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কনটেন্ট| বিশ্বায়ন আর ডিজিটালাইজেশনের এই ব্যস্ত দুনিয়াতেও কাফকার প্রভাব কোনোভাবেই কম নয়| এর অন্যতম কারণ কাফকা মানুষের জীবনাভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন| কাফকা এবং কাফকায়েস্কের জগতেই বাস করছি আজকের আমরা| যদিও কাফকা জন্মেছেন প্রাগে, লিখেছেন চেক এবং তারচেয়েও বেশি করে জার্মান ভাষায়, জাতে ছিলেন ইহুদি, পেশায় কেরানি ও আইনজীবী তবুও তাঁর লেখায় বরাবর উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথা| এমন সব মানুষ যাদের নামটাও সুনির্দিষ্ট নয়, পদবি নেই| কারো নাম এ, কারো নাম কে, কারো নাম দেবতার থেকে ধার নেয়া, কারো নাম ঘোড়ার থেকে ধার নেয়া| আর জায়গাগুলো ঠিক প্রাগ নয়, জার্মানিও নয়| অনির্দিষ্ট জায়গা, অনির্দিষ্ট মানুষ, কিন্তু তারা আপনার আমার মতোই সাধারণ| আমাদের মতোই টানা, একঘেয়ে, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংকট, ভয়, বিচ্ছন্নতা আর দীর্ঘসূত্রতার এক জীবন তাদের| এই অর্থহীন, দীর্ঘ, কখনো অবাস্তব, উদ্ভট, অথচ আবশ্যিক ‘কাফকায়েস্ক’ জীবনের ভেতরেই আমাদের বসবাস| কাফকার ‘কাফকায়েস্ক’-এর প্রভাব তাই সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে, কমেনি|
যথাবিহিত ভিন্ন পথে হাঁটার কারণে কাফকাকেও কম অবহেলা সইতে হয়নি| তবে নিজের ধর্মমতের কারণেই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে| কাফকার অন্যতম অপরাধ ইহুদি হওয়া| ইহুদি হওয়ার কারণেই জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পরও কাফকা ও তাঁর লেখাকে বহু বাধা পার হতে হয়েছে| অনেক সাহিত্য সমালোচকও কাফকাকে ইহুদি লেখক হিসাবেই দেখতে পছন্দ করেন| আমি বলবো এটা ছিলো একটা আন্তর্জাতিক মৌলবাদ| লেখক, সে কাফকা বা অন্য যে কেউ, সে সদাই ˆবশ্বিক| কোনো জাত, পাত, গোষ্ঠীর জন্য নয়, বড় লেখক তাঁর লেখার গভীরে সদাই মানব জাতি আর মহাবিশ্বের কথাই বলেন| নিঃসন্দেহে কাফকা তাঁর ব্যতিক্রম নন| যে কাফকা নাৎসিতাড়িত, যে কাফকা একদা নিজের লেখা পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন, যে কাফকা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন, সে কাফকা আজ অমর| বিষয়, ভঙ্গি আর ভাষার সুসমন্বয়ে কাফকা সারা বিশ্বেই আজ অনুকরণীয় লেখক| সার্ত্র, ক্যামু, বেকেট, বোর্হেস— কম বেশি আধুনিককালের সব দিকপালরাই কাফকা দ্বারা প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত|
সমকালের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করি, কাফকা পাঠ তাই অতি জরুরি| কিন্তু পুনরায় মনে রাখা প্রয়োজন, গড়গড় করে পড়ে ফেলার মতো লেখক কাফকা নন| কাফকার গল্প অনুধাবন করা ততোটা সহজ নয়| কেননা, প্রচলিত রীতির গল্প বলাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন| তাঁর বাক্য গঠন, চরিত্র নির্মাণ, গল্পের বিষয়— সব কিছুই যেমন তীব্র প্রথাবিরোধী, তেমনি প্রতিবাদী এবং অবশ্যই দুরূহ| কিন্তু এই দুরূহময়তা কেবল সাহিত্যের বাহাদুরির অস্ত্র নয়| যে সংকটময়, জটিল সময় আর জীবন তিনি যাপন করেছেন তারই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর লেখালেখিতেই|
আপতভাবে তাঁর গল্পগুলো দুর্বোধ্য, কোথাওবা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়| কাফকার গল্প চকিত দর্শনের দিকে টেনে নিয়ে যায়| ধর্ম, চরিত্র, আচরণ নিয়ে ঘোট পাকায়| সরল করে মিষ্টি গল্প লেখেননি তিনি| কাজেই তাঁর গল্পের ভেতরে ঢুকতে হলে বেশ সাধনা করতে হয়| তাঁর গল্প বুঝতে গেলে কিয়ের্কেগার্ডের দর্শন যেমন বোঝা লাগে, তেমনি বুঝতে হয় বাইবেলীয় ভাষা, পুরাণ, লোকগাথা, ধর্ম-দর্শন| তিনি ধাঁধা’র মতোই কঠিন করে রেখেছেন নিজের গল্প ভুবন| কিন্তু এই কঠিনেরও রয়েছে মায়া| কাফকা যেন দুর্গম অচেনা দ্বীপ, দুর্গম কিন্তু মায়াবী আকর্ষণে টানে| সেই টানেই পাঠক এগিয়ে যায় কাফকার রহস্য জগতে|
সব কিছু মিলিয়ে যে তীব্র দোলাচল, টানাপোড়েনের ডিজিটাল জীবন আমরা বেছে নিয়েছি সেখানে আমরাও ক্রমশ গ্রেগর সামসার মতো পোকার জীবনের দিকেই আগাচ্ছি| আমরা ক্রমশ জীবজন্তুর মতোই আচরণ করতে শুরু করেছি| এই সব বিবেচনায় কাফকা একটি আয়নার নাম| যে আয়নায় আমরা নিজেদের জটিল জীবনকেও দেখতে পাবো হয়তোবা| সেই আশাতেই কাফকা পাঠ আমাদের জন্য জরুরি বিবেচ্য|
আরেকটি সংযোগের কথা বলে এই লেখাটি শেষ করা যায়| সেটি হলো, আজকের তরুণ প্রজন্ম| আজকের বৈশ্বিক রাজনীতি, এমনকি আমার বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, তরুণরাই তো সবচেয়ে প্রতিবাদী| তরুণরাই সবসময় কর্তৃপক্ষ তথা কথিত শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে বা সংঘর্ষে জড়ায়| আর এই সংঘর্ষ অবশ্যই অসম, ক্ষেত্র বিশেষে অসম্ভব একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে দেয়| এই বিচ্ছিন্নতা থেকে অর্থহীন, একঘেয়ে ‘কাফকায়েস্ক’-এর পূর্ণজন্ম হয়, বারবার| যিশুর পুনরুত্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত কিছু বলার সময় হয়তো আসেনি, কিন্তু আমরা বলতে পারি, কাফকা এবং তার ‘কাফকায়েস্ক’-এর পুনরুত্থান ঘটেছে, ঘটছে চলমান দিন-রাত্তিরে|

আপনার মতামত লিখুন