দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই সাধারণত দুটি পথে পরিচালিত হয়। একটি হলো আইন প্রয়োগ, তদন্ত ও বিচার; অন্যটি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, যার ভিত্তি জনসচেতনতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। প্রথম পথটি অপরিহার্য হলেও দ্বিতীয় পথটি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কারণ দুর্নীতি কেবল আইনের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক আচরণ, যা তখনই বিস্তার লাভ করে যখন সমাজে অনিয়মকে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে কমিটিগুলো কাজ করছে, সেগুলোর কার্যক্রম এবার ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের একটি নতুন পরিসর তৈরি হতে পারে।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং এটি দুদকের বিকল্পও নয়। এই কমিটির সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার, তদন্ত পরিচালনার কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। এর মূল দায়িত্ব হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি, সততা ও নৈতিকতার চর্চা উৎসাহিত করা, নাগরিকদের সরকারি সেবা সম্পর্কে অবহিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা।
দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি হবে সাত সদস্যবিশিষ্ট। সদস্যদের সমাজের সৎ, দায়িত্বশীল ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বেছে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি চাকরিজীবী, ঋণখেলাপি কিংবা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সদস্যপদ থেকে বিরত রাখার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক কাঠামো। তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সদস্য নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।
ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ধরনের কমিটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সরকারি সেবার মুখোমুখি হন স্থানীয় পর্যায়ে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি প্রণোদনা, সরকারি অনুদান, বিভিন্ন ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নানা সেবার সঙ্গে জনগণের প্রতিদিনের সম্পর্ক। এসব ক্ষেত্রেই মাঝেমধ্যে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানেন না কোন সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, কোথায় অভিযোগ করতে হবে বা সরকারি বিধান কী। এই অজ্ঞতা দুর্নীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এখানেই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা, নাগরিক অধিকার বিষয়ে প্রচার, সরকারি সেবার তথ্য সহজভাবে তুলে ধরা এবং স্থানীয়ভাবে সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক চাপ তৈরি হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হয়।
অবশ্য এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, স্থানীয় পর্যায়ের অনেক কমিটি সময়ের সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোথাও নিয়মিত কার্যক্রম হয়নি, কোথাও সদস্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমিটির স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। ফলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।
এই প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের দাবিদার। তার মতে, অতীতের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুন কাঠামো তৈরি করা গেলে উদ্যোগটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে। এই মন্তব্য কেবল একটি পরামর্শ নয়; বরং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি সুফল পেতে পারেন সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা অধিক স্বচ্ছতার পরিবেশে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অনিয়মের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কেও মানুষের সচেতনতা বাড়বে।
তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল কমিটি গঠন করলেই দুর্নীতি কমে যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। সদস্য নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, কার্যক্রম যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা কমিটি যদি স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি সেবার বড় অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের প্রতারণা, তথ্যগোপন, দালালচক্র কিংবা প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিগুলো যদি ডিজিটাল সেবা গ্রহণে নাগরিকদের সহায়তা, তথ্যপ্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজেও সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাদের কার্যক্রম আরও সময়োপযোগী হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রকাশ করা এবং স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী সংগঠন, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করলে এর প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণ দুটিই বাড়বে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণ সেই যৌথ প্রয়াসকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ের এই উদ্যোগ সেই অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে এর সুফল কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সুশাসন, ন্যায়সংগত সেবা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তিকেও আরও সুদৃঢ় করবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সংবাদকর্মী]

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই সাধারণত দুটি পথে পরিচালিত হয়। একটি হলো আইন প্রয়োগ, তদন্ত ও বিচার; অন্যটি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, যার ভিত্তি জনসচেতনতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ। প্রথম পথটি অপরিহার্য হলেও দ্বিতীয় পথটি দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কারণ দুর্নীতি কেবল আইনের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক আচরণ, যা তখনই বিস্তার লাভ করে যখন সমাজে অনিয়মকে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে কমিটিগুলো কাজ করছে, সেগুলোর কার্যক্রম এবার ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক উদ্যোগের একটি নতুন পরিসর তৈরি হতে পারে।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং এটি দুদকের বিকল্পও নয়। এই কমিটির সদস্যদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার, তদন্ত পরিচালনার কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। এর মূল দায়িত্ব হলো জনসচেতনতা সৃষ্টি, সততা ও নৈতিকতার চর্চা উৎসাহিত করা, নাগরিকদের সরকারি সেবা সম্পর্কে অবহিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা।
দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি হবে সাত সদস্যবিশিষ্ট। সদস্যদের সমাজের সৎ, দায়িত্বশীল ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বেছে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি চাকরিজীবী, ঋণখেলাপি কিংবা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সদস্যপদ থেকে বিরত রাখার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক কাঠামো। তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সদস্য নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।
ইউনিয়ন পর্যায়ে এ ধরনের কমিটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সরকারি সেবার মুখোমুখি হন স্থানীয় পর্যায়ে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষি প্রণোদনা, সরকারি অনুদান, বিভিন্ন ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নানা সেবার সঙ্গে জনগণের প্রতিদিনের সম্পর্ক। এসব ক্ষেত্রেই মাঝেমধ্যে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ জানেন না কোন সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, কোথায় অভিযোগ করতে হবে বা সরকারি বিধান কী। এই অজ্ঞতা দুর্নীতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এখানেই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা, নাগরিক অধিকার বিষয়ে প্রচার, সরকারি সেবার তথ্য সহজভাবে তুলে ধরা এবং স্থানীয়ভাবে সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক চাপ তৈরি হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হয়।
অবশ্য এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, স্থানীয় পর্যায়ের অনেক কমিটি সময়ের সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। কোথাও নিয়মিত কার্যক্রম হয়নি, কোথাও সদস্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমিটির স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। ফলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।
এই প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের দাবিদার। তার মতে, অতীতের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুন কাঠামো তৈরি করা গেলে উদ্যোগটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে। এই মন্তব্য কেবল একটি পরামর্শ নয়; বরং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি সুফল পেতে পারেন সাধারণ নাগরিকরা। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা অধিক স্বচ্ছতার পরিবেশে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অনিয়মের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কেও মানুষের সচেতনতা বাড়বে।
তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল কমিটি গঠন করলেই দুর্নীতি কমে যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। সদস্য নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, কার্যক্রম যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা কমিটি যদি স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি সেবার বড় অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের প্রতারণা, তথ্যগোপন, দালালচক্র কিংবা প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিগুলো যদি ডিজিটাল সেবা গ্রহণে নাগরিকদের সহায়তা, তথ্যপ্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজেও সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাদের কার্যক্রম আরও সময়োপযোগী হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রকাশ করা এবং স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী সংগঠন, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করলে এর প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণ দুটিই বাড়বে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্প্রসারণ সেই যৌথ প্রয়াসকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তখনই, যখন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজও অনিয়মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ের এই উদ্যোগ সেই অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে এর সুফল কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সুশাসন, ন্যায়সংগত সেবা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তিকেও আরও সুদৃঢ় করবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সংবাদকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন