এদেশটা যেন মাজার আর বাজারের দেশ। রাজধানীতে, শহরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র মাজার বিরাজমান। যেখানে জনবসতি, গণযোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা আছে সেখানেই প্রথমে চুনের দরগাহ পরে সময়ের পরিবর্তনে পূর্ণাঙ্গ মাজারে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মাজারকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলো নিভৃতে ছড়ানো হয়। যা ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করার মোক্ষম হাতিয়ার। তখনই মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আগরবাতি, মোমবাতি আর আতরের গন্ধ পেয়ে আসতে শুরু করে। কালক্রমে মাজারটি জমজমাট, লোকারণ্য হতে থাকে এবং নিত্য আয় রোজগারের এক নির্ভেজাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এ কথা সত্য যে, পীর-ফকির, আউল-বাউল, বারো আউলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ। স্মরণাতীত কাল থেকে এখানকার মাটি পীর-পয়গম্বরদের পদধূলিতে পবিত্র হয়েছে। বাংলার ৬০ জন দরবেশ ও আউলিয়ার নাম সর্বজন স্বীকৃত। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের মানসে তারা অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে এদের রয়েছে যুদ্ধবিগ্রহের বিচিত্র গৌরবগাথা তথা কিংবদন্তি। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রা.) ছিলেন এদের অন্যতম প্রধান।
২.
এদেশে মাজারের সংখ্যা কত? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কোনগুলো মাজার আবার কোনটা মাজার নয় এ নিয়েও মতবিরোধ আছে, বিতর্ক আছে। কৃত্রিমভাবে চোখের সামনে রাতারাতি গড়ে উঠা সব মাজারকে মাজার বলা যায় না।
তবুও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে দেশে ২০ হাজার ৭০টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১,৫৮৮টি এবং চট্টগ্রামে ২,৫৭৭টি। সবচেয়ে বেশি মাজার চট্টগ্রামে। তবে বড় প্রসিদ্ধ মাজারের সংখ্যা বলা হয়েছে ৯৫০টি। মোটামুটি দেশের ৬৪ জেলাতেই মাজার আছে। নেই কেবল পার্বত্য বান্দরবান এবং রাঙামাটিতে। দেশব্যাপী দিন দিন মাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আর্থিক লেনদেনের হেরফের নিয়ে। সারাদেশের কয়টা মাজার সরকারি নীতিমালার আওতায় বা ওয়াকফ আইনের ভেতরে পরিচালিত হচ্ছে তার সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। যতদুর জানা যায়, বহুল আলোচিত মাজারগুলো যেমন, বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রা.) এর মাজার, রাজশাহীর শাহ মখদুম (র.) মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, খরমপুরের গেছু দরাজের মাজার ইত্যাদি। এর বাইরে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সসহ কতিপয় মাজার শরীফের ওপর জেলা প্রশাসন বা সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক মাজার আর্থিক হিসাব নিকাশের বাইরে আছে। মাজারের আয়-ব্যয়, দান-খয়রাত নিয়ে স্থানীয় জনগণ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে আছে। বলা যায়, যুগযুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে বা পরম্পরায় একই গোষ্ঠী বা বংশের হাতে দানের অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নিয়ে সামাজিক দ্বন্দ্বের শেষ নেই। বর্তমানে সারাদেশে শতাধিক মাজারের কার্যক্রমের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানা যায়।
৩.
দেশের ছোট বড় মাজারগুলোর ওপর দখল ও আধিপত্য নিয়ে রীতিমতো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার চলছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসীন হয়, সঙ্গে সঙ্গে সে দলের স্থানীয় পদধারীরা এর কর্মকর্তা বনে যায়। তখন চর দখলের মত সবকিছুর হাত বদল হয়ে যায়। আজকাল গ্রামীণ জনপদে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি যেমন পরিবর্তন হয়ে যায় তেমনি মাজারও এর বাইরে থাকছে না। আয়ের কথা বা আর্থিক লেনদেন বিবেচনায় আনা হলে স্কুল বা কলেজের চেয়ে এসব মাজারের হিসাব নিকাশে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ধরা যাক গ্রামের মাজারগুলোতে কমিটি কর্তৃক একটা ছোট্ট পাঞ্জাখানা মসজিদ, সঙ্গে একটা অজুখানা তৈরি করে দিয়ে বছর তিনেক সাচ্ছন্দ্যে চলা যায়। সাথে দুয়েকজনকে রেখে ভাগাভাগি করে দিব্যি কয়েকবছর পার করা যায়। এতে কারও কিচ্ছু বলার নেই, কমিটি উন্নয়ন কাজ করে চলেছে। এতে স্কুল কলেজের মতন বিল ভাউচার দাখিল করে পাশ করার ঝামেলা থাকে না। সারাদিন ধরে মানতকারী বিশ্বাসীদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেল তাই লাভ। দেখা যায়, একজন মানতকারী ব্যক্তি গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁসমুরগি যা-ই কিছু মানত করলেন এটা নিমিষেই উধাও। আবার মাজারের মুখচেনা দালালরা বছরের পর বছর এগুলো কম দামে ক্রয় কওে বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে।
এসময়ে যে কোনো একটা মাজার কমিটির সভাপতি হওয়া মানে খুবই লোভনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই এদেশে যদি দুই হাজার মাজার থাকে তাহলে অন্তত দুই হাজার ব্যক্তিকেও একটা করে পদ দেয়া যায়। এবং তা নিয়ে সে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে পারে।
৪.
আরেকটা বিষয় হলো, দেশের প্রতিটা মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে ছোটখাটো একেকটা বাজার। সঙ্গে মুদির দোকান এবং একাধিক চা স্টল। মোমবাতি, চুন, পান, বিড়ি সিগারেট, মধ্যরাত অবধি আড্ডা। যদিও মাজারে মানতকারীরা অতি সাধারণ, তারা সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। কিন্তু ধর্মকর্ম, বিশ্বাস বা সংস্কার কুসংস্কারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা যেখানে নিজের সন্তানের জন্যে নুন্যতম আমিষ বা প্রোটিনের যোগান দিতে পারে না, সেখানে মানত করা ঘরের বড় মোরগটা সযত্নে নিয়ে যায় বাবার মাজারে। মোরগটা কিন্তু দিয়ে আসে মাজারের জনৈক সিন্ডিকেট সদস্যের হাতে। আর ফিরে আসার পূর্বে সে অবনতমস্তকে এবং কায়মনোবাক্যে অশ্রুসজল হয়ে বলে আসে, তার সন্তানটি যেন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে বা চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে যায় ইত্যাদি। কী বিচিত্র এই দৃশ্য।
সময় এসেছে গ্রামীণ জনপদেও শতশত মাজারকে অবিলম্বে সরকারের তত্ত্বাবধানে এনে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় পরিচালনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এতে জনমনে জমে থাকা দীর্ঘ অসন্তোষ ও সংশয় যেমন দূরীভূত হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতিরও সবিশেষ উন্নতি হবে। বলাবাহুল্য, মাজারগুলোর বেশির ভাগই সরকারের ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। এগুলো ধর্ম মন্ত্রনালয়ের রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে। তারা মতোয়ালি নিয়োগ দিয়ে তা করতে পারে, আবার ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাৎসরিক খোলা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে পারে। এতে করে সরকারের রাজস্ব যেমন বৃদ্ধি পাবে একইসঙ্গে মাজারে মানতকারীরাও অধিকতর আস্থাশীল হবে। বর্তমান সরকারকে বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে, প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে এতদসংক্রান্ত আইন পাশ করিয়ে এর ভবিষ্যতকে জনগণ বান্ধব করতে হবে। মাজারের সার্বিক পবিত্রতাও রক্ষা করতে হবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: গল্পকার]

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
এদেশটা যেন মাজার আর বাজারের দেশ। রাজধানীতে, শহরে, গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় সর্বত্র মাজার বিরাজমান। যেখানে জনবসতি, গণযোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা আছে সেখানেই প্রথমে চুনের দরগাহ পরে সময়ের পরিবর্তনে পূর্ণাঙ্গ মাজারে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মাজারকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলো নিভৃতে ছড়ানো হয়। যা ধর্মভীরু মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করার মোক্ষম হাতিয়ার। তখনই মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আগরবাতি, মোমবাতি আর আতরের গন্ধ পেয়ে আসতে শুরু করে। কালক্রমে মাজারটি জমজমাট, লোকারণ্য হতে থাকে এবং নিত্য আয় রোজগারের এক নির্ভেজাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এ কথা সত্য যে, পীর-ফকির, আউল-বাউল, বারো আউলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ। স্মরণাতীত কাল থেকে এখানকার মাটি পীর-পয়গম্বরদের পদধূলিতে পবিত্র হয়েছে। বাংলার ৬০ জন দরবেশ ও আউলিয়ার নাম সর্বজন স্বীকৃত। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের মানসে তারা অপরিমেয় ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছিলেন। পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে এদের রয়েছে যুদ্ধবিগ্রহের বিচিত্র গৌরবগাথা তথা কিংবদন্তি। সিলেটের হজরত শাহজালাল (রা.) ছিলেন এদের অন্যতম প্রধান।
২.
এদেশে মাজারের সংখ্যা কত? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কোনগুলো মাজার আবার কোনটা মাজার নয় এ নিয়েও মতবিরোধ আছে, বিতর্ক আছে। কৃত্রিমভাবে চোখের সামনে রাতারাতি গড়ে উঠা সব মাজারকে মাজার বলা যায় না।
তবুও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে দেশে ২০ হাজার ৭০টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১,৫৮৮টি এবং চট্টগ্রামে ২,৫৭৭টি। সবচেয়ে বেশি মাজার চট্টগ্রামে। তবে বড় প্রসিদ্ধ মাজারের সংখ্যা বলা হয়েছে ৯৫০টি। মোটামুটি দেশের ৬৪ জেলাতেই মাজার আছে। নেই কেবল পার্বত্য বান্দরবান এবং রাঙামাটিতে। দেশব্যাপী দিন দিন মাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই। সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আর্থিক লেনদেনের হেরফের নিয়ে। সারাদেশের কয়টা মাজার সরকারি নীতিমালার আওতায় বা ওয়াকফ আইনের ভেতরে পরিচালিত হচ্ছে তার সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। যতদুর জানা যায়, বহুল আলোচিত মাজারগুলো যেমন, বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রা.) এর মাজার, রাজশাহীর শাহ মখদুম (র.) মাজার, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, খরমপুরের গেছু দরাজের মাজার ইত্যাদি। এর বাইরে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সসহ কতিপয় মাজার শরীফের ওপর জেলা প্রশাসন বা সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক মাজার আর্থিক হিসাব নিকাশের বাইরে আছে। মাজারের আয়-ব্যয়, দান-খয়রাত নিয়ে স্থানীয় জনগণ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে আছে। বলা যায়, যুগযুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে বা পরম্পরায় একই গোষ্ঠী বা বংশের হাতে দানের অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নিয়ে সামাজিক দ্বন্দ্বের শেষ নেই। বর্তমানে সারাদেশে শতাধিক মাজারের কার্যক্রমের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও জানা যায়।
৩.
দেশের ছোট বড় মাজারগুলোর ওপর দখল ও আধিপত্য নিয়ে রীতিমতো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার চলছে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসীন হয়, সঙ্গে সঙ্গে সে দলের স্থানীয় পদধারীরা এর কর্মকর্তা বনে যায়। তখন চর দখলের মত সবকিছুর হাত বদল হয়ে যায়। আজকাল গ্রামীণ জনপদে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি যেমন পরিবর্তন হয়ে যায় তেমনি মাজারও এর বাইরে থাকছে না। আয়ের কথা বা আর্থিক লেনদেন বিবেচনায় আনা হলে স্কুল বা কলেজের চেয়ে এসব মাজারের হিসাব নিকাশে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। ধরা যাক গ্রামের মাজারগুলোতে কমিটি কর্তৃক একটা ছোট্ট পাঞ্জাখানা মসজিদ, সঙ্গে একটা অজুখানা তৈরি করে দিয়ে বছর তিনেক সাচ্ছন্দ্যে চলা যায়। সাথে দুয়েকজনকে রেখে ভাগাভাগি করে দিব্যি কয়েকবছর পার করা যায়। এতে কারও কিচ্ছু বলার নেই, কমিটি উন্নয়ন কাজ করে চলেছে। এতে স্কুল কলেজের মতন বিল ভাউচার দাখিল করে পাশ করার ঝামেলা থাকে না। সারাদিন ধরে মানতকারী বিশ্বাসীদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেল তাই লাভ। দেখা যায়, একজন মানতকারী ব্যক্তি গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁসমুরগি যা-ই কিছু মানত করলেন এটা নিমিষেই উধাও। আবার মাজারের মুখচেনা দালালরা বছরের পর বছর এগুলো কম দামে ক্রয় কওে বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে।
এসময়ে যে কোনো একটা মাজার কমিটির সভাপতি হওয়া মানে খুবই লোভনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই এদেশে যদি দুই হাজার মাজার থাকে তাহলে অন্তত দুই হাজার ব্যক্তিকেও একটা করে পদ দেয়া যায়। এবং তা নিয়ে সে সুখে শান্তিতে দিনযাপন করতে পারে।
৪.
আরেকটা বিষয় হলো, দেশের প্রতিটা মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে ছোটখাটো একেকটা বাজার। সঙ্গে মুদির দোকান এবং একাধিক চা স্টল। মোমবাতি, চুন, পান, বিড়ি সিগারেট, মধ্যরাত অবধি আড্ডা। যদিও মাজারে মানতকারীরা অতি সাধারণ, তারা সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। কিন্তু ধর্মকর্ম, বিশ্বাস বা সংস্কার কুসংস্কারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা যেখানে নিজের সন্তানের জন্যে নুন্যতম আমিষ বা প্রোটিনের যোগান দিতে পারে না, সেখানে মানত করা ঘরের বড় মোরগটা সযত্নে নিয়ে যায় বাবার মাজারে। মোরগটা কিন্তু দিয়ে আসে মাজারের জনৈক সিন্ডিকেট সদস্যের হাতে। আর ফিরে আসার পূর্বে সে অবনতমস্তকে এবং কায়মনোবাক্যে অশ্রুসজল হয়ে বলে আসে, তার সন্তানটি যেন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে বা চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে যায় ইত্যাদি। কী বিচিত্র এই দৃশ্য।
সময় এসেছে গ্রামীণ জনপদেও শতশত মাজারকে অবিলম্বে সরকারের তত্ত্বাবধানে এনে এর আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় পরিচালনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এতে জনমনে জমে থাকা দীর্ঘ অসন্তোষ ও সংশয় যেমন দূরীভূত হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতিরও সবিশেষ উন্নতি হবে। বলাবাহুল্য, মাজারগুলোর বেশির ভাগই সরকারের ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। এগুলো ধর্ম মন্ত্রনালয়ের রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে। তারা মতোয়ালি নিয়োগ দিয়ে তা করতে পারে, আবার ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাৎসরিক খোলা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে পারে। এতে করে সরকারের রাজস্ব যেমন বৃদ্ধি পাবে একইসঙ্গে মাজারে মানতকারীরাও অধিকতর আস্থাশীল হবে। বর্তমান সরকারকে বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে, প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে এতদসংক্রান্ত আইন পাশ করিয়ে এর ভবিষ্যতকে জনগণ বান্ধব করতে হবে। মাজারের সার্বিক পবিত্রতাও রক্ষা করতে হবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন