সংবাদ

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড করার ঘোষণা ট্রাম্পের, আদৌ কি তা সম্ভব?


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড করার ঘোষণা ট্রাম্পের, আদৌ কি তা সম্ভব?
ছবি : সংগৃহীত

ইরানকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরও একটি অস্বাভাবিক হুমকি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি “খুব শিগগিরই” হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস যে জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়, সেই বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে, তখনই তিনি এ মন্তব্য করলেন।

ট্রাম্পের এই হুমকিকে ইরান ‘অর্থহীন’ বলে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এদিকে, গত জুনে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ রোববার শেষ হচ্ছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার মতো চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ইরান জলপথটির চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

কে আগে পিছু হটে–এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে, যদিও ট্রাম্প বলেছেন ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা “দাবা খেলার মতো”, চলমান যুদ্ধজুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক বক্তব্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে বহুবার তিনি ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন, আবার শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন।

তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হরমুজ প্রণালীকে নিজেদের ভূখণ্ড বানাতে পারে? আর এর অর্থই বা কী?

ট্রাম্প কী বলেছেন?

নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “ইরানকে পরাজিত করার পর, যে দেশটি খুব খারাপভাবে পরাজিত হচ্ছে, খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।”

নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন যে হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড। তিনি বলেন, “মূলত, সেটাই তো।”

তিনি বলেন, “আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজই পার হতে পারবে না।”

ইরান অবশ্য দাবি করে আসছে, জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির পরও কিছু জাহাজ প্রণালীটি দিয়ে চলাচল করেছে বলে সামুদ্রিক নৌ চলাচলের তথ্য থেকে জানা যায়।

ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক কিম্বারলি হ্যালকেট বলেন, “ট্রাম্প যখন হাসতে হাসতে কথাটি বলেছেন, তখন এটা স্পষ্ট যে তিনিও নিজে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে নিচ্ছেন না।”

তিনি বলেন, “এগুলো ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে পছন্দ করেন তা হলো প্রতিপক্ষকে উত্ত্যক্ত করা, আর এ ক্ষেত্রে সেটি ইরান।”

“তবে যে বিষয়টি উল্লেখ করা জরুরি, তা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিষয়টি থেকে সরে আসছেন না, সেটি হলো হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে এবং সেটি অব্যাহত আছে।”

ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?

ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান ক্ষুব্ধ ভাষায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপরাধী ও বুদ্ধিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদিও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “টুইট করে, বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে, কোনো আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী ভাষণ দিয়ে হরমুজ প্রণালী দখল করা যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে; এই প্রণালী কেবল ইরানের নির্দেশেই বন্ধ ও খোলা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেবেন এবং কল্পনাপ্রসূত বিভ্রম থেকে বেরিয়ে না আসবেন, ততক্ষণ ইরান অবরোধ কার্যকর করতে থাকবে।”

এদিকে, প্রণালীটির সামুদ্রিক চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর অন্য একমাত্র উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে দেওয়া মন্তব্যে বলেছেন, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে আলোচনা “শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।”

তবে জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটনকে জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

চলমান যুদ্ধ নিয়ে ইরানের নতুন অবস্থান হলো–জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের এসব ছাড় চাইছে। অথচ মূলত যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবেই এসব বিষয় আগে দাবি করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের দাবি কি আদৌ বাস্তবসম্মত?

প্রথমত, শুধু একতরফা কোনো প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব এক দেশ থেকে অন্য দেশের হাতে চলে যায় না।

এর আগে ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন সেনা পাঠিয়ে সেটি দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। এর জবাবে তেহরান বলেছিল, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস তাদের জন্য “ট্রিগারে আঙুল রেখে” অপেক্ষা করবে। এর আগে ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলেরও হুমকি দিয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসনের সহযোগী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রুস ফেইন বলেছেন, ট্রাম্পের এককভাবে কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই।

তিনি বলেন, “লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই বা পানামা খাল সংযুক্ত করা কিংবা স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধের শেষে পুয়ের্তো রিকো বা ফিলিপাইন অধিগ্রহণের মতো ভূখণ্ড সংযুক্ত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী সিনেটে অনুমোদিত একটি চুক্তি বা আইন প্রয়োজন।”

ফেইনের মতে, ট্রাম্প যদি ভূখণ্ড সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেন, তাহলে তা “জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আগ্রাসী যুদ্ধের অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হবে।

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী ডিন নাটালি ক্লেইন বলেন, “আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ট্রাম্পের দাবির বাস্তবসম্মত হওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে যে তারা প্রণালীটির ওপর দখলদার শক্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে–সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছিল, তার সঙ্গে তুলনীয়।”

“কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর, অথবা অন্তত দেশটির উপকূলীয় এলাকাগুলোর ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও তার রিপাবলিকান সহকর্মীরা কংগ্রেসে নিজেদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। রয়টার্স/ ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের অস্ত্রভাণ্ডারে গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে এবং বর্তমানে প্রতি গ্যালনের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি–যা মার্কিন নাগরিকদের জন্য বড় একটি ইস্যু।

গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বাড়তে থাকা পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে–এটি ঠেকানো এখন দ্বিতীয় অগ্রাধিকার।

ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগে বাধ্য করা, যাতে তারা আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রকে কোণঠাসা করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যার মধ্যে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনক্লস (UNCLOS) রয়েছে, পুরো হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানেরও অবাধ সার্বভৌমত্ব নেই। বরং নিজেদের সীমান্তসংলগ্ন কিছু উপকূলীয় এলাকার ওপরই তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে।

ইউএনক্লস উপকূলীয় রাষ্ট্রের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে। তবে সেই আঞ্চলিক জলসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল বা ২২ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একই সঙ্গে এতে বলা হয়েছে, জাহাজ চলাচলের অধিকার “বাধাগ্রস্ত করা যাবে না”।

হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত এবং এর দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমানের উপকূল। প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা সেখানে পরস্পরের ওপর পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–কোনো দেশই ইউএনক্লস অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালীসংক্রান্ত এই কনভেনশনের নিয়মগুলো ব্যাপকভাবে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে বিবেচিত হয়।

কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প সাধারণত এ ধরনের বক্তব্য মূলত মার্কিন জনগণ, বিশেষ করে তার সমর্থকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করেই দেন।

তিনি বলেন, বিষয়টি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ট্রাম্প মার্কিন রিয়েলিটি টেলিভিশন সংস্কৃতির ফসল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি একজন “শোম্যান”।

মাসগ্রেভ সতর্ক করে বলেন, “এই ব্যক্তি বড় বড় কথা বলেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, কিন্তু তাঁর কথাগুলো আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়।”

তিনি বলেন, বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করা বাস্তব ও আইনগত–উভয় দিক থেকেই অসম্ভব। তবে এসব বক্তব্য থেকে এটুকু স্পষ্ট হয় যে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সরে আসতে এবং কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত নন।

\

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬


হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড করার ঘোষণা ট্রাম্পের, আদৌ কি তা সম্ভব?

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইরানকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরও একটি অস্বাভাবিক হুমকি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি “খুব শিগগিরই” হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস যে জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়, সেই বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে, তখনই তিনি এ মন্তব্য করলেন।

ট্রাম্পের এই হুমকিকে ইরান ‘অর্থহীন’ বলে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এদিকে, গত জুনে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ রোববার শেষ হচ্ছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার মতো চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে ইরান জলপথটির চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

কে আগে পিছু হটে–এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে, যদিও ট্রাম্প বলেছেন ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা “দাবা খেলার মতো”, চলমান যুদ্ধজুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক বক্তব্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে বহুবার তিনি ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন, আবার শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন।

তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হরমুজ প্রণালীকে নিজেদের ভূখণ্ড বানাতে পারে? আর এর অর্থই বা কী?

ট্রাম্প কী বলেছেন?

নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “ইরানকে পরাজিত করার পর, যে দেশটি খুব খারাপভাবে পরাজিত হচ্ছে, খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।”

নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন যে হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড। তিনি বলেন, “মূলত, সেটাই তো।”

তিনি বলেন, “আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজই পার হতে পারবে না।”

ইরান অবশ্য দাবি করে আসছে, জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির পরও কিছু জাহাজ প্রণালীটি দিয়ে চলাচল করেছে বলে সামুদ্রিক নৌ চলাচলের তথ্য থেকে জানা যায়।

ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক কিম্বারলি হ্যালকেট বলেন, “ট্রাম্প যখন হাসতে হাসতে কথাটি বলেছেন, তখন এটা স্পষ্ট যে তিনিও নিজে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে নিচ্ছেন না।”

তিনি বলেন, “এগুলো ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে পছন্দ করেন তা হলো প্রতিপক্ষকে উত্ত্যক্ত করা, আর এ ক্ষেত্রে সেটি ইরান।”

“তবে যে বিষয়টি উল্লেখ করা জরুরি, তা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিষয়টি থেকে সরে আসছেন না, সেটি হলো হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে এবং সেটি অব্যাহত আছে।”

ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?

ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান ক্ষুব্ধ ভাষায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপরাধী ও বুদ্ধিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদিও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “টুইট করে, বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে, কোনো আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী ভাষণ দিয়ে হরমুজ প্রণালী দখল করা যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে; এই প্রণালী কেবল ইরানের নির্দেশেই বন্ধ ও খোলা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেবেন এবং কল্পনাপ্রসূত বিভ্রম থেকে বেরিয়ে না আসবেন, ততক্ষণ ইরান অবরোধ কার্যকর করতে থাকবে।”

এদিকে, প্রণালীটির সামুদ্রিক চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর অন্য একমাত্র উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে দেওয়া মন্তব্যে বলেছেন, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে আলোচনা “শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।”

তবে জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটনকে জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

চলমান যুদ্ধ নিয়ে ইরানের নতুন অবস্থান হলো–জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের এসব ছাড় চাইছে। অথচ মূলত যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবেই এসব বিষয় আগে দাবি করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের দাবি কি আদৌ বাস্তবসম্মত?

প্রথমত, শুধু একতরফা কোনো প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব এক দেশ থেকে অন্য দেশের হাতে চলে যায় না।

এর আগে ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন সেনা পাঠিয়ে সেটি দখলের হুমকি দিয়েছিলেন। এর জবাবে তেহরান বলেছিল, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস তাদের জন্য “ট্রিগারে আঙুল রেখে” অপেক্ষা করবে। এর আগে ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলেরও হুমকি দিয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসনের সহযোগী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রুস ফেইন বলেছেন, ট্রাম্পের এককভাবে কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই।

তিনি বলেন, “লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই বা পানামা খাল সংযুক্ত করা কিংবা স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধের শেষে পুয়ের্তো রিকো বা ফিলিপাইন অধিগ্রহণের মতো ভূখণ্ড সংযুক্ত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী সিনেটে অনুমোদিত একটি চুক্তি বা আইন প্রয়োজন।”

ফেইনের মতে, ট্রাম্প যদি ভূখণ্ড সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেন, তাহলে তা “জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আগ্রাসী যুদ্ধের অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হবে।

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী ডিন নাটালি ক্লেইন বলেন, “আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ট্রাম্পের দাবির বাস্তবসম্মত হওয়ার একমাত্র উপায় হতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে যে তারা প্রণালীটির ওপর দখলদার শক্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে–সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেছিল, তার সঙ্গে তুলনীয়।”

“কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর, অথবা অন্তত দেশটির উপকূলীয় এলাকাগুলোর ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও তার রিপাবলিকান সহকর্মীরা কংগ্রেসে নিজেদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। রয়টার্স/ ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের অস্ত্রভাণ্ডারে গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরও রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে এবং বর্তমানে প্রতি গ্যালনের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি–যা মার্কিন নাগরিকদের জন্য বড় একটি ইস্যু।

গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বাড়তে থাকা পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে–এটি ঠেকানো এখন দ্বিতীয় অগ্রাধিকার।

ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগে বাধ্য করা, যাতে তারা আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রকে কোণঠাসা করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যার মধ্যে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনক্লস (UNCLOS) রয়েছে, পুরো হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানেরও অবাধ সার্বভৌমত্ব নেই। বরং নিজেদের সীমান্তসংলগ্ন কিছু উপকূলীয় এলাকার ওপরই তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে।

ইউএনক্লস উপকূলীয় রাষ্ট্রের আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে। তবে সেই আঞ্চলিক জলসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল বা ২২ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একই সঙ্গে এতে বলা হয়েছে, জাহাজ চলাচলের অধিকার “বাধাগ্রস্ত করা যাবে না”।

হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত এবং এর দুই পাশে রয়েছে ইরান ও ওমানের উপকূল। প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার। ফলে দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল করে আঞ্চলিক জলসীমা সেখানে পরস্পরের ওপর পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–কোনো দেশই ইউএনক্লস অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালীসংক্রান্ত এই কনভেনশনের নিয়মগুলো ব্যাপকভাবে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে বিবেচিত হয়।

কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প সাধারণত এ ধরনের বক্তব্য মূলত মার্কিন জনগণ, বিশেষ করে তার সমর্থকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করেই দেন।

তিনি বলেন, বিষয়টি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ট্রাম্প মার্কিন রিয়েলিটি টেলিভিশন সংস্কৃতির ফসল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি একজন “শোম্যান”।

মাসগ্রেভ সতর্ক করে বলেন, “এই ব্যক্তি বড় বড় কথা বলেন। কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে, কিন্তু তাঁর কথাগুলো আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়।”

তিনি বলেন, বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করা বাস্তব ও আইনগত–উভয় দিক থেকেই অসম্ভব। তবে এসব বক্তব্য থেকে এটুকু স্পষ্ট হয় যে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সরে আসতে এবং কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত নন।

\


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত