সংবাদ

১৫ দিনে ৫ জাহাজের সংঘর্ষ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ


প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

১৫ দিনে ৫ জাহাজের সংঘর্ষ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ছবি : সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও চ্যানেলে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত পাঁচটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রে প্রবল স্রোত ও বাতাসের গতিবেগ বেড়ে যাওয়ায় মাদার ভেসেল এবং পণ্য খালাসে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলো বিপাকে পড়ছে। বিশেষ করে চ্যানেলের গতিপথ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় ধরনের কোনো হতাহত না হলেও এ নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সাগর উত্তাল থাকা এবং আউটার অ্যাঙ্করেজে (বহির্নোঙর) জায়গার সংকটের কারণে জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষ বাড়ছে। এতে দিন দিন বহির্নোঙরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গত সপ্তাহে ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমটি সি স্পাইক’-এর সঙ্গে গমবাহী জাহাজ ‘এমভি সান শাইন’-এর সংঘর্ষ ঘটে। এতে সি স্পাইকের ইঞ্জিন রুম ফেটে পানি ঢুকে পুরো জাহাজে ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। এর কয়েক দিন পরই প্রবেশমুখে স্টিয়ারিং গিয়ার বিকল হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় ‘সিএনসি ইউরেনাস’। অন্যদিকে, প্রবল স্রোতের টানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্লাগবাহী ‘এমভি আনাসসা’ আছড়ে পড়ে পাশের একটি জাহাজে। বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি বেশ কিছু লাইটার জাহাজের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বঙ্গোপসাগরের এই প্রবেশপথের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বহির্নোঙরে পাশাপাশি নোঙর করা ছিল ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার এমটি সি স্পাইক ও গমবাহী এমভি সান শাইন। সমুদ্র উত্তাল থাকায় দুপুরে এই দুই জাহাজের সংঘর্ষ হয়। সি স্পাইকের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে জেনারেটর ও প্রধান ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। রাতে জরুরি ব্যাটারির মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা হলেও জাহাজটি বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে জাহাজে থাকা ২৪ জন ফিলিপিনো নাবিক অক্ষত আছেন এবং ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কগুলো নিরাপদ থাকায় সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেনি। নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর এই ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে, শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে বহির্নোঙরে প্রবল স্রোতের কারণে ‘এমভি আনাসসা’ জাহাজটি নোঙর করে রাখা ‘এমভি রাহাব জাহান’-কে ধাক্কা দেয়। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ৩ আগস্ট ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশের পাথরের বাঁধে আটকে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, প্রতিটি ঘটনাই আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রবল স্রোত দায়ী।

তবে বন্দর বিশেষজ্ঞ ও মেরিন মাস্টার ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী মনে করেন, বহির্নোঙরে নাব্য সংকট এবং বিদেশি নাবিকদের চ্যানেল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ‘আউটার অ্যাঙ্করেজে জাহাজের তুলনায় জায়গা খুব কম। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেলে জাহাজ নোঙর ছিঁড়ে বা ড্র্যাগ করে অন্যটির ওপর গিয়ে পড়ছে। জায়গার সংকট সমাধান না করলে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।’

নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘শতকরা ৯০ ভাগ জাহাজ দুর্ঘটনাই মানবসৃষ্ট ভুলের (Human Error) কারণে হয়। কর্ণফুলীর মোহনায় পানির স্রোত কেমন তা সবারই জানা। এখানে সঠিক নেভিগেশন ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় না থাকলে বড় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থাকে।’

বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইটার জাহাজগুলোর আধুনিকায়ন এবং দক্ষ মাস্টারদের মাধ্যমে পাইলটিং নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


১৫ দিনে ৫ জাহাজের সংঘর্ষ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও চ্যানেলে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত পাঁচটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রে প্রবল স্রোত ও বাতাসের গতিবেগ বেড়ে যাওয়ায় মাদার ভেসেল এবং পণ্য খালাসে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলো বিপাকে পড়ছে। বিশেষ করে চ্যানেলের গতিপথ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় ধরনের কোনো হতাহত না হলেও এ নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সাগর উত্তাল থাকা এবং আউটার অ্যাঙ্করেজে (বহির্নোঙর) জায়গার সংকটের কারণে জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষ বাড়ছে। এতে দিন দিন বহির্নোঙরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গত সপ্তাহে ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমটি সি স্পাইক’-এর সঙ্গে গমবাহী জাহাজ ‘এমভি সান শাইন’-এর সংঘর্ষ ঘটে। এতে সি স্পাইকের ইঞ্জিন রুম ফেটে পানি ঢুকে পুরো জাহাজে ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। এর কয়েক দিন পরই প্রবেশমুখে স্টিয়ারিং গিয়ার বিকল হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় ‘সিএনসি ইউরেনাস’। অন্যদিকে, প্রবল স্রোতের টানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্লাগবাহী ‘এমভি আনাসসা’ আছড়ে পড়ে পাশের একটি জাহাজে। বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি বেশ কিছু লাইটার জাহাজের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বঙ্গোপসাগরের এই প্রবেশপথের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বহির্নোঙরে পাশাপাশি নোঙর করা ছিল ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার এমটি সি স্পাইক ও গমবাহী এমভি সান শাইন। সমুদ্র উত্তাল থাকায় দুপুরে এই দুই জাহাজের সংঘর্ষ হয়। সি স্পাইকের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে জেনারেটর ও প্রধান ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। রাতে জরুরি ব্যাটারির মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা হলেও জাহাজটি বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে জাহাজে থাকা ২৪ জন ফিলিপিনো নাবিক অক্ষত আছেন এবং ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কগুলো নিরাপদ থাকায় সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেনি। নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর এই ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে, শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে বহির্নোঙরে প্রবল স্রোতের কারণে ‘এমভি আনাসসা’ জাহাজটি নোঙর করে রাখা ‘এমভি রাহাব জাহান’-কে ধাক্কা দেয়। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ৩ আগস্ট ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশের পাথরের বাঁধে আটকে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, প্রতিটি ঘটনাই আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রবল স্রোত দায়ী।

তবে বন্দর বিশেষজ্ঞ ও মেরিন মাস্টার ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী মনে করেন, বহির্নোঙরে নাব্য সংকট এবং বিদেশি নাবিকদের চ্যানেল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ‘আউটার অ্যাঙ্করেজে জাহাজের তুলনায় জায়গা খুব কম। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেলে জাহাজ নোঙর ছিঁড়ে বা ড্র্যাগ করে অন্যটির ওপর গিয়ে পড়ছে। জায়গার সংকট সমাধান না করলে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।’

নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘শতকরা ৯০ ভাগ জাহাজ দুর্ঘটনাই মানবসৃষ্ট ভুলের (Human Error) কারণে হয়। কর্ণফুলীর মোহনায় পানির স্রোত কেমন তা সবারই জানা। এখানে সঠিক নেভিগেশন ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় না থাকলে বড় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থাকে।’

বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইটার জাহাজগুলোর আধুনিকায়ন এবং দক্ষ মাস্টারদের মাধ্যমে পাইলটিং নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত