দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চালিকাশক্তি। যিনি শত ঝড়-ঝাপটার মাঝেও দলের পতাকা শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন। তবে সেই পথ চলা মসৃণ ছিল না মোটেই। কণ্টকাকীর্ণ সেই পথ পেরিয়ে আসতে তাকে দিতে হয়েছে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ।
১৯৭২ সালের এক শান্ত সকাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ঢাকা কলেজের অর্থনীতির ক্লাসরুম। চক আর ডাস্টার হাতে জটিল সব অর্থনৈতিক তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন তরুণ প্রভাষক মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে সদ্যই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে শুরু করেছিলেন এই মহৎ পেশা। এরপর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন বিদ্যাপীঠের হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন জ্ঞানের আলো।
১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি, ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন দারুণ সক্রিয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে প্রথমবার কারাবরণ তার রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি শক্তপোক্ত করে দিয়েছিল।১৯৭৯ সালে সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
তবে চাকরির সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর সরকারি আমলার আরামদায়ক জীবন কি শান্ত রাখতে পেরেছিল দেশের জন্য ব্যাকুল এই মনকে? ১৯৮৬ সাল। তিনি এক অবাক করা সিদ্ধান্ত নিলেন। চিরদিনের জন্য ইস্তফা দিলেন সরকারি চাকরি থেকে! পা রাখলেন ধুলোবালি আর কণ্টকাকীর্ণ রাজপথের অনিশ্চিত রাজনীতিতে।
ক্ষমতার অংশীদার হওয়া নয়, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামই ছিল তার একমাত্র ব্রত। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের পর দেশের রাজনৈতিক আকাশে নেমে আসে এক চরম দুঃসময়। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হলেন। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাসনে গেলেন।দলের অস্তিত্ব যখন বিলীন হওয়ার মুখে, ঠিক তখনই দলের প্রধান কাণ্ডারি ও ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও ২০১৬ সালে দলের অষ্টম মহাসচিবের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন।
বিগত দেড় দশক ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের প্রতিটি দিন ছিল মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর গল্প। তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় ১১০টিরও বেশি মামলা। তবে তিনি ছিলেন ইস্পাতকঠিন। পাঁচবারের বেশি কারাবরণ করেছেন। কারাগারে কাটিয়েছেন ৩৫০টিরও বেশি দিন। প্রতি মাসে তাকে ডজন খানেক মামলায় আদালতের বারান্দায় হাজির হতে হয়েছে। বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতা ও হৃদযন্ত্রের ব্লক নিয়ে প্রতিনিয়ত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তবে কখনো ভেঙে পড়েননি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। দলের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ত্যাগ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
রাজপথের অগ্নিপরীক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামে মির্জা ফখরুলের অন্তরালের শক্তি ও প্রেরণা ছিল তার পরিবার। বিশেষত স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিদুষী নারী স্বামীর এই দীর্ঘ সংগ্রামে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। স্বামীর বারবার কারাবরণ আর কঠিন সংকটে তিনি নিজে বীমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দুই কন্যাকে সামলে রেখেছেন। বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা অস্ট্রেলিয়ার নামকরা চিকিৎসা বিজ্ঞানী। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকায় শিক্ষকতা করছেন।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর তিনি শপথ নিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে।
কিন্তু নিয়তি তাকে নিয়ে গেছে অন্য ঠিকানায়। গেল ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। শাসনতান্ত্রিক নিয়ম ও নৈতিকতা অনুসরণ করে গেল ১৩ আগস্ট তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদসহ সব দলীয় ও রাষ্ট্রীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সর্বশেষ ১৯ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দেন সদ্য সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।বক্তব্যে দেওয়ার সময় বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবেগঘন কণ্ঠে নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান।এ সময় প্রধানমন্ত্রীকেও আবেগাপ্লুত দেখা যায়।
অশ্রু, রক্ত, ত্যাগ আর সীমাহীন সাহসিকতার কণ্টকাকীর্ণ রাজপথ পেরিয়ে ক্লাসরুমের অর্থনীতির শিক্ষকের নতুন ঠিকানা এখন বঙ্গভবন।

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চালিকাশক্তি। যিনি শত ঝড়-ঝাপটার মাঝেও দলের পতাকা শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন। তবে সেই পথ চলা মসৃণ ছিল না মোটেই। কণ্টকাকীর্ণ সেই পথ পেরিয়ে আসতে তাকে দিতে হয়েছে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ।
১৯৭২ সালের এক শান্ত সকাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ঢাকা কলেজের অর্থনীতির ক্লাসরুম। চক আর ডাস্টার হাতে জটিল সব অর্থনৈতিক তত্ত্ব শিক্ষার্থীদের সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন তরুণ প্রভাষক মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে সদ্যই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে শুরু করেছিলেন এই মহৎ পেশা। এরপর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন বিদ্যাপীঠের হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন জ্ঞানের আলো।
১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি, ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন দারুণ সক্রিয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে প্রথমবার কারাবরণ তার রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি শক্তপোক্ত করে দিয়েছিল।১৯৭৯ সালে সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
তবে চাকরির সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর সরকারি আমলার আরামদায়ক জীবন কি শান্ত রাখতে পেরেছিল দেশের জন্য ব্যাকুল এই মনকে? ১৯৮৬ সাল। তিনি এক অবাক করা সিদ্ধান্ত নিলেন। চিরদিনের জন্য ইস্তফা দিলেন সরকারি চাকরি থেকে! পা রাখলেন ধুলোবালি আর কণ্টকাকীর্ণ রাজপথের অনিশ্চিত রাজনীতিতে।
ক্ষমতার অংশীদার হওয়া নয়, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামই ছিল তার একমাত্র ব্রত। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের পর দেশের রাজনৈতিক আকাশে নেমে আসে এক চরম দুঃসময়। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হলেন। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাসনে গেলেন।দলের অস্তিত্ব যখন বিলীন হওয়ার মুখে, ঠিক তখনই দলের প্রধান কাণ্ডারি ও ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও ২০১৬ সালে দলের অষ্টম মহাসচিবের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন।
বিগত দেড় দশক ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের প্রতিটি দিন ছিল মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর গল্প। তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় ১১০টিরও বেশি মামলা। তবে তিনি ছিলেন ইস্পাতকঠিন। পাঁচবারের বেশি কারাবরণ করেছেন। কারাগারে কাটিয়েছেন ৩৫০টিরও বেশি দিন। প্রতি মাসে তাকে ডজন খানেক মামলায় আদালতের বারান্দায় হাজির হতে হয়েছে। বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতা ও হৃদযন্ত্রের ব্লক নিয়ে প্রতিনিয়ত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তবে কখনো ভেঙে পড়েননি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। দলের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ত্যাগ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
রাজপথের অগ্নিপরীক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামে মির্জা ফখরুলের অন্তরালের শক্তি ও প্রেরণা ছিল তার পরিবার। বিশেষত স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিদুষী নারী স্বামীর এই দীর্ঘ সংগ্রামে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। স্বামীর বারবার কারাবরণ আর কঠিন সংকটে তিনি নিজে বীমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দুই কন্যাকে সামলে রেখেছেন। বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা অস্ট্রেলিয়ার নামকরা চিকিৎসা বিজ্ঞানী। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকায় শিক্ষকতা করছেন।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর তিনি শপথ নিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে।
কিন্তু নিয়তি তাকে নিয়ে গেছে অন্য ঠিকানায়। গেল ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। শাসনতান্ত্রিক নিয়ম ও নৈতিকতা অনুসরণ করে গেল ১৩ আগস্ট তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদসহ সব দলীয় ও রাষ্ট্রীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সর্বশেষ ১৯ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দেন সদ্য সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।বক্তব্যে দেওয়ার সময় বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবেগঘন কণ্ঠে নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান।এ সময় প্রধানমন্ত্রীকেও আবেগাপ্লুত দেখা যায়।
অশ্রু, রক্ত, ত্যাগ আর সীমাহীন সাহসিকতার কণ্টকাকীর্ণ রাজপথ পেরিয়ে ক্লাসরুমের অর্থনীতির শিক্ষকের নতুন ঠিকানা এখন বঙ্গভবন।

আপনার মতামত লিখুন