ভোতেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নেপালের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো মানুষ। কেউ খুঁজছেন ভাইকে, কেউ বাবাকে, কেউ স্বামীকে। কেউ ফোনের ওপারে শেষ কথা শুনেছেন, কেউ রেখে এসেছেন শেষ দেখা। কেউ কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়েছেন, কেউ কয়েক দিনের। হাতে আছে শুধু একটি ছবি আর অসীম আশা।
নিজের ছোট ভাই প্রবীণকে শেষবার দেখেছিলেন মঙ্গলবার। রাসুয়ায় কাজের জায়গায় রেখে তিনি ফিরে আসেন কাঠমান্ডুতে। পরদিন সকালে ভোতেকোশীতে বন্যা। ২০ বছর বয়সী প্রবীণ নিখোঁজ। এরপর থেকে রাম বুঢ়া খুঁজছেন। তিনি বলেন, “আমি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ভাইয়ের নাম ডেকেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো টানেলের ভেতর থেকে উত্তর দেবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।”
তাদের বাড়ি জুমলার পাটারাসি গ্রামে। সেখানে অপেক্ষায় আছেন বাবা-মা। প্রবীণ সবেমাত্র দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বড় ভাই তাকে রাসুয়ায় নিয়ে এসেছিলেন কিছু টাকা জমানোর জন্য। রাম বলেন, “আমি ভাবিনি এ দিন আসবে। এখনও ভাবি, হয়তো তাকে কাঠমান্ডুতেই রেখে আসা উচিত ছিল।”
সারিতা চৌধুরী এসেছেন দাঙের তুলসীপুর থেকে। খুঁজছেন তার স্বামী সুনীলকে। তিনি টিমুরের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বন্যার আগের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। সুনীল তখন বলেছিলেন, ‘কাজ খুব কঠিন, নদী-নালা দেখে ভয় লাগে।’ সারিতা তাকে ফিরে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু সুনীল বলেছিলেন, ‘অমাবস্যায় বাড়ি ফিরব। ছেলেমেয়েদের পোশাক কিনে দিও, নিজের চিকিৎসা করাও।’
পরদিন বিকেলে খবর এল- বন্যায় সব ভেসে গেছে। সারিতার ১৬ ও ১০ বছর বয়সী দুটি সন্তান এখন প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা কখন আসবেন?’
পোখরার স্বাস্থ্য বিজ্ঞান একাডেমিতে প্রতিদিন প্রায় হাজারো মানুষ আসছেন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। দালালসিংহের বাসিন্দারা এসেছেন ৪০ সদস্যের একটি দল নিয়ে। মোহন পৌডেল বলেন, “একশোর বেশি মরদেহের ছবি দেখেছি। কারও সঙ্গে মিলছে না।” নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।
ষাটোর্ধ্ব বিরসিমায়া এসেছেন রাউতাহাট থেকে। খুঁজছেন তার ছেলে শের বাহাদুর মাঝিকে। তিনি বলেন, “শুনলাম এখানে মরদেহ আনা হয়েছে, তাই এলাম।” তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ইতিমধ্যেই বিদেশে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন। তিনি বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ খবরই বেশি পাচ্ছি।”
সালয়ান থেকে মেনওয়ালাল বুঢাথোকি ছুটে এসেছেন ছোট ভাই গিরিলালের খবরে। গিরিলাল ফোন করে বলেছিলেন, ‘ভাই, সব হারিয়েছি। বন্যায় গুরুতর আহত হয়েছি, স্ত্রী-সন্তান কারা কোথায়।’ মেনওয়ালাল হাসপাতালে গিয়ে ভাইকে পেলেও তার স্ত্রী সুনিতা ও সন্তান নির্মলা, কেশব ও নিরাজনের খোঁজ এখনো পাচ্ছেন না। তিনি জানতে পেরেছেন, সুনিতার মরদেহ হয়তো রাসুয়ায় পাওয়া গেছে- কিন্তু তা নিশ্চিত নয়।
২৩ বছর বয়সী পুলিশ সদস্য আশীষ গাদারিয়ার ফোন কেটে গিয়েছিল বন্যার সময়। তার স্ত্রী প্রিয়াংকা বলেন, “সকাল সাড়ে আটটায় ফোনে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আর ফোন রিসিভ হয়নি।” আশীষ নেপাল পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র ১৭ মাস আগে। মাইলুং পুলিশ পোস্টে তার প্রথম পোস্টিং ছিল। তাঁর বাবা খেদু বলেন, “ছাগল পালে তাকে বড় করেছি। এখন শুধু প্রার্থনা করি, সে যেন বেঁচে ফিরে আসে।”
নুয়াকোট থেকে নবারাজ লামা খুঁজছেন ছোট ভাই রমেশ্বরকে। দিনের পর দিন ঘুরেছেন নুয়াকোট, চিতওয়ান, গাইন্ডাকট, পোখরা। কোথাও ভাইয়ের কোনো সন্ধান নেই। শেষে বিরামহীন যাত্রায় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি বলেন, “ভাইয়ের বউকে কী বলব? একজন মানুষ খুঁজতে কত জায়গায় ঘুরতে হয়? মরদেহ সব এক জায়গায় রাখা হলে আমাদের মতো পরিবারগুলোর খোঁজা সহজ হতো।” বন্যার আগের দিন তিনি ভাইয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন। রমেশ্বর বলেছিলেন, ‘খেয়ে ঘুমাব।’
পাঁচ দিন। নিঃশ্বাস নেই। লাশও নেই। ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা চলছে।ভোতেকোশীর পানি যেমন গ্রাম-গঞ্জ ভাসিয়ে নিয়েছে, তেমনি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, আশা, ভরসাও ভাসিয়ে নিয়েছে। কেউ ফিরে পাচ্ছেন প্রিয়জনকে, কেউ পাননি এখনো। তবু আশা যায় না। নেপালের শ্মশান, হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন, সোশ্যাল মিডিয়া- সব জায়গায় এখন একই প্রশ্ন- ‘আমার মানুষটা কোথায়?’

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
ভোতেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নেপালের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো মানুষ। কেউ খুঁজছেন ভাইকে, কেউ বাবাকে, কেউ স্বামীকে। কেউ ফোনের ওপারে শেষ কথা শুনেছেন, কেউ রেখে এসেছেন শেষ দেখা। কেউ কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়েছেন, কেউ কয়েক দিনের। হাতে আছে শুধু একটি ছবি আর অসীম আশা।
নিজের ছোট ভাই প্রবীণকে শেষবার দেখেছিলেন মঙ্গলবার। রাসুয়ায় কাজের জায়গায় রেখে তিনি ফিরে আসেন কাঠমান্ডুতে। পরদিন সকালে ভোতেকোশীতে বন্যা। ২০ বছর বয়সী প্রবীণ নিখোঁজ। এরপর থেকে রাম বুঢ়া খুঁজছেন। তিনি বলেন, “আমি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ভাইয়ের নাম ডেকেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো টানেলের ভেতর থেকে উত্তর দেবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।”
তাদের বাড়ি জুমলার পাটারাসি গ্রামে। সেখানে অপেক্ষায় আছেন বাবা-মা। প্রবীণ সবেমাত্র দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বড় ভাই তাকে রাসুয়ায় নিয়ে এসেছিলেন কিছু টাকা জমানোর জন্য। রাম বলেন, “আমি ভাবিনি এ দিন আসবে। এখনও ভাবি, হয়তো তাকে কাঠমান্ডুতেই রেখে আসা উচিত ছিল।”
সারিতা চৌধুরী এসেছেন দাঙের তুলসীপুর থেকে। খুঁজছেন তার স্বামী সুনীলকে। তিনি টিমুরের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বন্যার আগের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। সুনীল তখন বলেছিলেন, ‘কাজ খুব কঠিন, নদী-নালা দেখে ভয় লাগে।’ সারিতা তাকে ফিরে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু সুনীল বলেছিলেন, ‘অমাবস্যায় বাড়ি ফিরব। ছেলেমেয়েদের পোশাক কিনে দিও, নিজের চিকিৎসা করাও।’
পরদিন বিকেলে খবর এল- বন্যায় সব ভেসে গেছে। সারিতার ১৬ ও ১০ বছর বয়সী দুটি সন্তান এখন প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা কখন আসবেন?’
পোখরার স্বাস্থ্য বিজ্ঞান একাডেমিতে প্রতিদিন প্রায় হাজারো মানুষ আসছেন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। দালালসিংহের বাসিন্দারা এসেছেন ৪০ সদস্যের একটি দল নিয়ে। মোহন পৌডেল বলেন, “একশোর বেশি মরদেহের ছবি দেখেছি। কারও সঙ্গে মিলছে না।” নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।
ষাটোর্ধ্ব বিরসিমায়া এসেছেন রাউতাহাট থেকে। খুঁজছেন তার ছেলে শের বাহাদুর মাঝিকে। তিনি বলেন, “শুনলাম এখানে মরদেহ আনা হয়েছে, তাই এলাম।” তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ইতিমধ্যেই বিদেশে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন। তিনি বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ খবরই বেশি পাচ্ছি।”
সালয়ান থেকে মেনওয়ালাল বুঢাথোকি ছুটে এসেছেন ছোট ভাই গিরিলালের খবরে। গিরিলাল ফোন করে বলেছিলেন, ‘ভাই, সব হারিয়েছি। বন্যায় গুরুতর আহত হয়েছি, স্ত্রী-সন্তান কারা কোথায়।’ মেনওয়ালাল হাসপাতালে গিয়ে ভাইকে পেলেও তার স্ত্রী সুনিতা ও সন্তান নির্মলা, কেশব ও নিরাজনের খোঁজ এখনো পাচ্ছেন না। তিনি জানতে পেরেছেন, সুনিতার মরদেহ হয়তো রাসুয়ায় পাওয়া গেছে- কিন্তু তা নিশ্চিত নয়।
২৩ বছর বয়সী পুলিশ সদস্য আশীষ গাদারিয়ার ফোন কেটে গিয়েছিল বন্যার সময়। তার স্ত্রী প্রিয়াংকা বলেন, “সকাল সাড়ে আটটায় ফোনে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আর ফোন রিসিভ হয়নি।” আশীষ নেপাল পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র ১৭ মাস আগে। মাইলুং পুলিশ পোস্টে তার প্রথম পোস্টিং ছিল। তাঁর বাবা খেদু বলেন, “ছাগল পালে তাকে বড় করেছি। এখন শুধু প্রার্থনা করি, সে যেন বেঁচে ফিরে আসে।”
নুয়াকোট থেকে নবারাজ লামা খুঁজছেন ছোট ভাই রমেশ্বরকে। দিনের পর দিন ঘুরেছেন নুয়াকোট, চিতওয়ান, গাইন্ডাকট, পোখরা। কোথাও ভাইয়ের কোনো সন্ধান নেই। শেষে বিরামহীন যাত্রায় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি বলেন, “ভাইয়ের বউকে কী বলব? একজন মানুষ খুঁজতে কত জায়গায় ঘুরতে হয়? মরদেহ সব এক জায়গায় রাখা হলে আমাদের মতো পরিবারগুলোর খোঁজা সহজ হতো।” বন্যার আগের দিন তিনি ভাইয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন। রমেশ্বর বলেছিলেন, ‘খেয়ে ঘুমাব।’
পাঁচ দিন। নিঃশ্বাস নেই। লাশও নেই। ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা চলছে।ভোতেকোশীর পানি যেমন গ্রাম-গঞ্জ ভাসিয়ে নিয়েছে, তেমনি হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, আশা, ভরসাও ভাসিয়ে নিয়েছে। কেউ ফিরে পাচ্ছেন প্রিয়জনকে, কেউ পাননি এখনো। তবু আশা যায় না। নেপালের শ্মশান, হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন, সোশ্যাল মিডিয়া- সব জায়গায় এখন একই প্রশ্ন- ‘আমার মানুষটা কোথায়?’

আপনার মতামত লিখুন