সংবাদ

উন্নত সমাজে আলোকিত মানুষ কারা, বাংলাদেশে কেমন


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ এএম

উন্নত সমাজে আলোকিত মানুষ কারা, বাংলাদেশে কেমন
ক্ষমতাই মর্যাদার উৎস এমনটা বলা যাবে না।

পদ, ক্ষমতা ও পরিচিতি দিয়ে মর্যাদা, নাকি জ্ঞান, সততা ও অবদান দিয়ে—দুই সমাজের মানদণ্ড কি এক?

দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলার ফেসবুক পেজে ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। তালিকায় জীবিত ব্যক্তিদের নাম রাখা হয়েছে। চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের নামই ওপরের দিকে বেশি। ঘটনাটি নিছক একটি স্থানীয় তালিকা তৈরির বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে এটি বাংলাদেশের সমাজে মর্যাদা নির্ধারণের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা কাকে আলোকিত মানুষ বলি? যার হাতে ক্ষমতা বেশি, নাকি যার অবদান বেশি?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই পেশার সামাজিক মর্যাদা পৃথিবীর সব দেশে এক নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্মান অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা জিনিস। একজন মন্ত্রী বা আমলা অত্যন্ত ক্ষমতাবান হতে পারেন, কিন্তু সে কারণে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ হয়ে যান না।

কে বেশি সম্মানিত হবেন তার মাপকাঠি কী?

কেন বেশি সম্মানিত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাভিত্তিক আস্থার জরিপে একটি বিষয় বেশ ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়—মানুষ সাধারণত তাদের বেশি বিশ্বাস করে, যাদের কাজ সরাসরি মানুষের জীবন, জ্ঞান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্ববিখ্যাত বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আইপসোস-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল ট্রাস্টওয়ার্দিনেস ইনডেক্স-এ ৩২টি দেশের মানুষের মতামত নিয়ে দেখা যায়, গড়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসকদের, ৫৬ শতাংশ বিজ্ঞানীদের এবং ৫৪ শতাংশ শিক্ষককে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বিশ্লেষণ, জনমত জরিপ ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ-এর ২০২৫ সালের জরিপেও নার্সরা ৭৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পেশার শীর্ষে ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৬১ শতাংশ, চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থা পেয়েছেন। বিপরীতে লবিস্ট, কংগ্রেস সদস্য ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের অবস্থান ছিল অনেক নিচে। অর্থাৎ উন্নত সমাজে একজন মানুষের মর্যাদা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় তিনি মানুষের জন্য কী করছেন—তার ভিত্তিতে।

ক্ষমতা না মর্যাদা?

ক্ষমতা আছে, তবে অন্ধ সম্মান নেই

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা এবং সেই প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তিকে অন্ধভাবে সম্মান করা এক বিষয় নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ৩০টি দেশের ট্রাস্ট সার্ভে-তে ২০২৩ সালে জাতীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ আস্থা ছিল গড়ে ৩৯ শতাংশ মানুষের। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকেরা সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেনে নিলেও সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখান না। বরং সরকারের কাজ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিকের কথা শোনার ক্ষমতার ওপর আস্থা নির্ভর করে।

নরওয়ের মতো উচ্চ-আস্থার দেশেও জাতীয় সরকারের চেয়ে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বেশি। সেখানে জাতীয় সিভিল সার্ভিসের ওপর উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ আস্থা ছিল ৫৪ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে তা ছিল ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পদ সম্মানের কারণ হতে পারে, কিন্তু সম্মানের একমাত্র উৎস নয়।

বাংলাদেশে চিত্র কেন ভিন্ন

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় পদ এখনো সামাজিক মর্যাদার অন্যতম শক্তিশালী উৎস। বিশেষ করে সচিব, ডিসি, ইউএনও, পুলিশ কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় একজন ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।

এর পেছনে ইতিহাস আছে। উপমহাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এমন একটি সংস্কৃতি পেয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন রাষ্ট্রের ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতিনিধি। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হলেও সেই সামাজিক মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলায়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পদটি মানুষকে মর্যাদা দেয়; মানুষটি তার কাজ দিয়ে পদকে মর্যাদা দেন—এমন ধারণা এখনও দুর্বল।

বাংলাদেশে কে সম্মানি তা বিবেচনার মাপকাঠি একেবারে ভিন্ন

বাংলাদেশের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক লাখের বেশি মানুষের জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। ৬৬ শতাংশ বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তারা ‘শাসকের মতো’ আচরণ করেন। ৯৬ শতাংশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কথা বলেছেন।

এখানে তৈরি হয় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সামাজিকভাবে অত্যন্ত মর্যাদাবান মনে করা হতে পারে, অথচ একই সঙ্গে সেই প্রশাসনের ওপর মানুষের অসন্তোষও প্রবল হতে পারে। দেশে রাজনীতিকদের সামাজিক প্রভাব আরও বেশি। মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে প্রশাসন, ব্যবসা, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো—সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার বড় উৎস হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখতে হবে ক্ষমতা ও আস্থা এক নয়।

একজন নেতা অত্যন্ত প্রভাবশালী হতে পারেন; মানুষ তার কাছে যেতে চাইতে পারে; তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইতে পারে; তার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মানুষ তার নৈতিকতা, সততা বা সিদ্ধান্তকে সমানভাবে বিশ্বাস করে। এখানেই ‘ক্ষমতাবান’ ও ‘আলোকিত’ শব্দ দুটির পার্থক্য।

তাহলে প্রশ্ন আসছে শিক্ষক, গবেষক, লেখক বা সাংবাদিকের অবস্থান কোথায়? একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়তো কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা রাখেন না। কিন্তু তিনি কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও চিন্তা বদলে দিতে পারেন। একজন গবেষক হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন। কিন্তু তার গবেষণা কৃষি, চিকিৎসা, জলবায়ু বা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

ক্ষমতা কখনই সম্মানের উৎস নয়

একজন লেখক কোনো সরকারি পদে নেই। কিন্তু তার একটি বই কয়েক প্রজন্মের মানুষের চিন্তার জগৎ পাল্টে দিতে পারে। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার একটি প্রতিবেদন দুর্নীতি উন্মোচন, নীতি পরিবর্তন কিংবা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।তাহলে তাদের ‘আলোকিত’ বলা হবে না কেন?

সমস্যাটি এখানেই—বাংলাদেশে দৃশ্যমান ক্ষমতার মূল্য অনেক সময় অদৃশ্য অবদানের চেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে বলা যায়, ‘কৃতি’, ‘ক্ষমতাবান’ আর ‘আলোকিত’—তিনটি কিন্তু এক নয়।একজন বিসিএস কর্মকর্তা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চপদে পৌঁছেছেন—এটি অবশ্যই কৃতিত্ব। একজন সচিব রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন—এটিও সত্য। 

কিন্তু একজন কবি, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী বা উদ্যোক্তার কৃতিত্বও একইভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাই, ‘আলোকিত সন্তান’ বললে পেশা নয়, অবদানই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি।

কেউ কত বড় পদে আছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তিনি কী সৃষ্টি করেছেন, কত মানুষের জীবন বদলেছেন, জ্ঞান বা সংস্কৃতিতে কী যোগ করেছেন, সমাজকে কতটা এগিয়ে নিয়েছেন এবং তার কাজ তার অনুপস্থিতির পরও কতদিন মানুষের উপকারে থাকবে।

কোনো উপজেলার ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা বেশি থাকতেই পারেন। তাদের অনেকেই নিঃসন্দেহে যোগ্য এবং সম্মানের দাবিদার। কিন্তু যদি তালিকাটি সত্যিই ‘আলোকিত সন্তান’-এর তালিকা হয়, তাহলে সেখানে প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ ও সমাজকর্মীদেরও সমানভাবে খোঁজা দরকার।

কারণ একটি জনপদের আলো শুধু তার প্রশাসনিক ভবন থেকে আসে না; আসে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে, হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে, গবেষণাগার থেকে, সংবাদকক্ষ থেকে, মঞ্চ থেকে, মাঠ থেকে, লেখকের টেবিল থেকেও। শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ কাকে সম্মান করে, তা সেই সমাজের মূল্যবোধের পরিচয় দেয়।

ক্ষমতাবান সব সময়ই মর্যাদান নাও হতে পারেন

ক্ষমতাবানকে সম্মান করা সহজ; কিন্তু যিনি ক্ষমতাহীন হয়েও সমাজকে আলোকিত করেন, তাকে চিনে নেওয়াই একটি পরিণত সমাজের পরীক্ষা। হয়তো আমাদেরও একদিন ‘বড় মানুষ’ বলতে শুধু বড় কর্মকর্তা বা বড় রাজনীতিককে বোঝানো বন্ধ করতে হবে। বলতে হবে—বড় তিনি, যার বড় অবদান।

সেই দিন ‘আলোকিত সন্তান’ তালিকাও বদলে যাবে। সেখানে পদমর্যাদার পাশে জায়গা করে নেবে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সততা, মানবিকতা ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কাজ। আর তখন একটি উপজেলার তালিকা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করবে না—বহন করবে সেই সমাজের সত্যিকারের আলোর মানচিত্র।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬


উন্নত সমাজে আলোকিত মানুষ কারা, বাংলাদেশে কেমন

প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পদ, ক্ষমতা ও পরিচিতি দিয়ে মর্যাদা, নাকি জ্ঞান, সততা ও অবদান দিয়ে—দুই সমাজের মানদণ্ড কি এক?

দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলার ফেসবুক পেজে ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। তালিকায় জীবিত ব্যক্তিদের নাম রাখা হয়েছে। চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের নামই ওপরের দিকে বেশি। ঘটনাটি নিছক একটি স্থানীয় তালিকা তৈরির বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে এটি বাংলাদেশের সমাজে মর্যাদা নির্ধারণের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা কাকে আলোকিত মানুষ বলি? যার হাতে ক্ষমতা বেশি, নাকি যার অবদান বেশি?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই পেশার সামাজিক মর্যাদা পৃথিবীর সব দেশে এক নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্মান অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা জিনিস। একজন মন্ত্রী বা আমলা অত্যন্ত ক্ষমতাবান হতে পারেন, কিন্তু সে কারণে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ হয়ে যান না।

কে বেশি সম্মানিত হবেন তার মাপকাঠি কী?

কেন বেশি সম্মানিত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাভিত্তিক আস্থার জরিপে একটি বিষয় বেশ ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়—মানুষ সাধারণত তাদের বেশি বিশ্বাস করে, যাদের কাজ সরাসরি মানুষের জীবন, জ্ঞান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্ববিখ্যাত বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আইপসোস-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল ট্রাস্টওয়ার্দিনেস ইনডেক্স-এ ৩২টি দেশের মানুষের মতামত নিয়ে দেখা যায়, গড়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসকদের, ৫৬ শতাংশ বিজ্ঞানীদের এবং ৫৪ শতাংশ শিক্ষককে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বিশ্লেষণ, জনমত জরিপ ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ-এর ২০২৫ সালের জরিপেও নার্সরা ৭৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পেশার শীর্ষে ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৬১ শতাংশ, চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থা পেয়েছেন। বিপরীতে লবিস্ট, কংগ্রেস সদস্য ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের অবস্থান ছিল অনেক নিচে। অর্থাৎ উন্নত সমাজে একজন মানুষের মর্যাদা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় তিনি মানুষের জন্য কী করছেন—তার ভিত্তিতে।

ক্ষমতা না মর্যাদা?

ক্ষমতা আছে, তবে অন্ধ সম্মান নেই

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা এবং সেই প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তিকে অন্ধভাবে সম্মান করা এক বিষয় নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ৩০টি দেশের ট্রাস্ট সার্ভে-তে ২০২৩ সালে জাতীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ আস্থা ছিল গড়ে ৩৯ শতাংশ মানুষের। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকেরা সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেনে নিলেও সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখান না। বরং সরকারের কাজ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিকের কথা শোনার ক্ষমতার ওপর আস্থা নির্ভর করে।

নরওয়ের মতো উচ্চ-আস্থার দেশেও জাতীয় সরকারের চেয়ে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বেশি। সেখানে জাতীয় সিভিল সার্ভিসের ওপর উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ আস্থা ছিল ৫৪ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে তা ছিল ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পদ সম্মানের কারণ হতে পারে, কিন্তু সম্মানের একমাত্র উৎস নয়।

বাংলাদেশে চিত্র কেন ভিন্ন

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় পদ এখনো সামাজিক মর্যাদার অন্যতম শক্তিশালী উৎস। বিশেষ করে সচিব, ডিসি, ইউএনও, পুলিশ কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় একজন ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।

এর পেছনে ইতিহাস আছে। উপমহাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এমন একটি সংস্কৃতি পেয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন রাষ্ট্রের ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতিনিধি। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হলেও সেই সামাজিক মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলায়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পদটি মানুষকে মর্যাদা দেয়; মানুষটি তার কাজ দিয়ে পদকে মর্যাদা দেন—এমন ধারণা এখনও দুর্বল।

বাংলাদেশে কে সম্মানি তা বিবেচনার মাপকাঠি একেবারে ভিন্ন

বাংলাদেশের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক লাখের বেশি মানুষের জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন প্রশাসন সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। ৬৬ শতাংশ বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তারা ‘শাসকের মতো’ আচরণ করেন। ৯৬ শতাংশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির কথা বলেছেন।

এখানে তৈরি হয় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সামাজিকভাবে অত্যন্ত মর্যাদাবান মনে করা হতে পারে, অথচ একই সঙ্গে সেই প্রশাসনের ওপর মানুষের অসন্তোষও প্রবল হতে পারে। দেশে রাজনীতিকদের সামাজিক প্রভাব আরও বেশি। মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে প্রশাসন, ব্যবসা, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো—সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার বড় উৎস হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখতে হবে ক্ষমতা ও আস্থা এক নয়।

একজন নেতা অত্যন্ত প্রভাবশালী হতে পারেন; মানুষ তার কাছে যেতে চাইতে পারে; তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইতে পারে; তার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মানুষ তার নৈতিকতা, সততা বা সিদ্ধান্তকে সমানভাবে বিশ্বাস করে। এখানেই ‘ক্ষমতাবান’ ও ‘আলোকিত’ শব্দ দুটির পার্থক্য।

তাহলে প্রশ্ন আসছে শিক্ষক, গবেষক, লেখক বা সাংবাদিকের অবস্থান কোথায়? একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়তো কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা রাখেন না। কিন্তু তিনি কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও চিন্তা বদলে দিতে পারেন। একজন গবেষক হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন। কিন্তু তার গবেষণা কৃষি, চিকিৎসা, জলবায়ু বা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

ক্ষমতা কখনই সম্মানের উৎস নয়

একজন লেখক কোনো সরকারি পদে নেই। কিন্তু তার একটি বই কয়েক প্রজন্মের মানুষের চিন্তার জগৎ পাল্টে দিতে পারে। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার একটি প্রতিবেদন দুর্নীতি উন্মোচন, নীতি পরিবর্তন কিংবা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।তাহলে তাদের ‘আলোকিত’ বলা হবে না কেন?

সমস্যাটি এখানেই—বাংলাদেশে দৃশ্যমান ক্ষমতার মূল্য অনেক সময় অদৃশ্য অবদানের চেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে বলা যায়, ‘কৃতি’, ‘ক্ষমতাবান’ আর ‘আলোকিত’—তিনটি কিন্তু এক নয়।একজন বিসিএস কর্মকর্তা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চপদে পৌঁছেছেন—এটি অবশ্যই কৃতিত্ব। একজন সচিব রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন—এটিও সত্য। 

কিন্তু একজন কবি, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী বা উদ্যোক্তার কৃতিত্বও একইভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাই, ‘আলোকিত সন্তান’ বললে পেশা নয়, অবদানই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি।

কেউ কত বড় পদে আছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তিনি কী সৃষ্টি করেছেন, কত মানুষের জীবন বদলেছেন, জ্ঞান বা সংস্কৃতিতে কী যোগ করেছেন, সমাজকে কতটা এগিয়ে নিয়েছেন এবং তার কাজ তার অনুপস্থিতির পরও কতদিন মানুষের উপকারে থাকবে।

কোনো উপজেলার ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা বেশি থাকতেই পারেন। তাদের অনেকেই নিঃসন্দেহে যোগ্য এবং সম্মানের দাবিদার। কিন্তু যদি তালিকাটি সত্যিই ‘আলোকিত সন্তান’-এর তালিকা হয়, তাহলে সেখানে প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ ও সমাজকর্মীদেরও সমানভাবে খোঁজা দরকার।

কারণ একটি জনপদের আলো শুধু তার প্রশাসনিক ভবন থেকে আসে না; আসে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে, হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে, গবেষণাগার থেকে, সংবাদকক্ষ থেকে, মঞ্চ থেকে, মাঠ থেকে, লেখকের টেবিল থেকেও। শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ কাকে সম্মান করে, তা সেই সমাজের মূল্যবোধের পরিচয় দেয়।

ক্ষমতাবান সব সময়ই মর্যাদান নাও হতে পারেন

ক্ষমতাবানকে সম্মান করা সহজ; কিন্তু যিনি ক্ষমতাহীন হয়েও সমাজকে আলোকিত করেন, তাকে চিনে নেওয়াই একটি পরিণত সমাজের পরীক্ষা। হয়তো আমাদেরও একদিন ‘বড় মানুষ’ বলতে শুধু বড় কর্মকর্তা বা বড় রাজনীতিককে বোঝানো বন্ধ করতে হবে। বলতে হবে—বড় তিনি, যার বড় অবদান।

সেই দিন ‘আলোকিত সন্তান’ তালিকাও বদলে যাবে। সেখানে পদমর্যাদার পাশে জায়গা করে নেবে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সততা, মানবিকতা ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কাজ। আর তখন একটি উপজেলার তালিকা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করবে না—বহন করবে সেই সমাজের সত্যিকারের আলোর মানচিত্র।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত