সংবাদ

দুর্গাপূজার আদি পীঠভূমি চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম!


সংগ্রাম দত্ত, মৌলভীবাজার
সংগ্রাম দত্ত, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫১ এএম

দুর্গাপূজার আদি পীঠভূমি চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম!
ছবি : সংবাদ

শরতের আকাশে মেঘের খেলা আর বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ নিয়ে প্রতিবছর ধরণীতে আসে রূপময়ী উৎসব দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শক্তি, কল্যাণ ও মিলন-সম্প্রীতির এই মহোৎসব কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের অন্যতম প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে - মর্ত্যলোকে প্রথম কোথায় হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা? পৌরাণিক আখ্যান এবং সনাতন ধর্মের বহু অনুসারীর বিশ্বাস, এই আদি আরাধনার স্থানটি আর কোথাও নয়, আমাদের বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ ও মেধস মুনির আশ্রম। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য এবং আধ্যাত্মিক আবহ ঘিরে এই ঐতিহাসিক তীর্থস্থান বহু বছর ধরে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

পৌরাণিক পটভূমি ও প্রথম মৃন্ময়ী প্রতিমার কথা

পৌরাণিক ধর্মীয় মহাকাব্য ‘দেবী মাহাত্ম্য’ বা চণ্ডীর বর্ণনানুসারে, প্রাচীনকালে রাজ্যহারা অসহায় রাজা সুরথ এবং আত্মীয়দের দ্বারা প্রতারিত বৈশ্য সমাধি মনের অশান্তি ও জীবনের চরম সংকটে আশ্রয় নিয়েছিলেন অরণ্যবেষ্টিত পরম সাধক ঋষি মেধসের আশ্রমে। মোহ ও মায়ায় আচ্ছন্ন দুই পথহারা মানুষকে ঋষি মেধস দেবী মহামায়ার মহিমা, অসুরবিনের কাহিনি এবং শক্তির অপৌরুষেয় রূপ সম্পর্কে অবহিত করেন। ঋষির মহামূল্যবান পরামর্শেই রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি চণ্ডীতীর্থের নির্জন পরিবেশে প্রথম মৃন্ময়ী দশভূজা দুর্গা প্রতিমা গড়ে দেবীর তপস্যা শুরু করেন। তাদের ভক্তি ও আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা তাদের হারানো রাজ্য ও আত্মজ্ঞান ফিরিয়ে দেন। সেই আখ্যানই পরবর্তীকালে বাসন্তী ও শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনাবিন্দু বলে লোকালয়ে বিশ্বাস প্রচলিত হয়। যদিও প্রথাগত ইতিহাসের দিক থেকে এর সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলেনি, তবুও কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রে অবস্থান করছে এই পরম ধাম।

১৯০০ সালে পুনঃআবিষ্কার ও শতবর্ষের রূপান্তর

কালের পরিক্রমায় ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের দরুন ঋষি মেধসের এই আশ্রম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে বরিশাল থেকে আসা প্রখ্যাত পন্ডিত ও সাধক শ্রীমৎ বেদানন্দ স্বামী (চন্দ্রশেখর) প্রাচীন তান্ত্রিক পুঁথিপত্র ও যোগবলের সহায়তায় চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথধাম থেকে পথ চিনে বোয়ালখালীর ঘন বনাকীর্ণ করলডেঙ্গা পাহাড়ে পৌঁছান। স্থানীয় অন্নদাচরণ সর্ববিদ্যাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় এই পুণ্যভূমি পুনর্গঠন ও প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, মিয়ানমারের উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যসহ তৎকালীন খ্যাতনামা মানুষের সহযোগিতায় এখানে চণ্ডী মন্দির, পিতলের দশভূজা প্রতিমা, শিব ও কালী মন্দির নির্মিত হয়। তবে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার ও দুষ্কৃতকারীদের তাণ্ডবে মূল পিতলের মূর্তিটি লুট হয় এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে স্থানীয় সমাজসেবকদের উদ্যোগে পাথরের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পুনরায় পূজার অচিরে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা হয়।

বর্তমান বাস্তবতা, ভূমিসংকট ও পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদ

বর্তমানে বহুমাত্রিক ধর্মীয় স্থাপনায় সাজানো চণ্ডীতীর্থ মেধস আশ্রমে পৌঁছাতে ১৪০টির বেশি সিঁড়ি পার হতে হয়। এখানে রয়েছে মূল চণ্ডী মন্দির, স্বামী বেদানন্দের সমাধিসৌধ, কামাখ্যা মন্দির, তারা কালী মন্দির, সীতা মন্দির এবং সুবিশাল ‘মানস সরোবর’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ধর্মীয় আবহ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করলেও বর্তমানে আশ্রমটি বড় ধরনের ভূমি সংকটের মুখোমুখি। প্রায় ৬৮ দশমিক ১৯ একর দেবোত্তর সম্পত্তির মধ্যে অভিযোগ অনুযায়ী প্রায় ৫৫ একর জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই দখলদারিত্ব আশ্রমের স্বাভাবিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাঁধা। এছাড়া প্রাচীন নথি সংরক্ষণ, পাহাড়ের ঢাল ও প্রাকৃতিক বনভূমি রক্ষা করা এবং আগত ভক্তদের নিরাপত্তা বিধান সুনিশ্চিত করা এখন সময়ের বড় দাবি।

চট্টগ্রামের করলডেঙ্গা পাহাড়ের মেধস মুনির আশ্রম কেবল ইতিহাস কিংবা পৌরাণিক আখ্যানের একটি পাতা নয়; এটি বিশ্বাসের উত্তরাধিকার, বাংলার ইতিহাস অন্বেষণের চারণভূমি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের স্মারক। ইতিহাস ও বিশ্বাসের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে, অবৈধ দখল থেকে জমি উদ্ধার করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে এই আদি তীর্থভূমিকে রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের পবিত্র দায়িত্ব।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬


দুর্গাপূজার আদি পীঠভূমি চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম!

প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শরতের আকাশে মেঘের খেলা আর বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ নিয়ে প্রতিবছর ধরণীতে আসে রূপময়ী উৎসব দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শক্তি, কল্যাণ ও মিলন-সম্প্রীতির এই মহোৎসব কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের অন্যতম প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে - মর্ত্যলোকে প্রথম কোথায় হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা? পৌরাণিক আখ্যান এবং সনাতন ধর্মের বহু অনুসারীর বিশ্বাস, এই আদি আরাধনার স্থানটি আর কোথাও নয়, আমাদের বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ ও মেধস মুনির আশ্রম। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য এবং আধ্যাত্মিক আবহ ঘিরে এই ঐতিহাসিক তীর্থস্থান বহু বছর ধরে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

পৌরাণিক পটভূমি ও প্রথম মৃন্ময়ী প্রতিমার কথা

পৌরাণিক ধর্মীয় মহাকাব্য ‘দেবী মাহাত্ম্য’ বা চণ্ডীর বর্ণনানুসারে, প্রাচীনকালে রাজ্যহারা অসহায় রাজা সুরথ এবং আত্মীয়দের দ্বারা প্রতারিত বৈশ্য সমাধি মনের অশান্তি ও জীবনের চরম সংকটে আশ্রয় নিয়েছিলেন অরণ্যবেষ্টিত পরম সাধক ঋষি মেধসের আশ্রমে। মোহ ও মায়ায় আচ্ছন্ন দুই পথহারা মানুষকে ঋষি মেধস দেবী মহামায়ার মহিমা, অসুরবিনের কাহিনি এবং শক্তির অপৌরুষেয় রূপ সম্পর্কে অবহিত করেন। ঋষির মহামূল্যবান পরামর্শেই রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি চণ্ডীতীর্থের নির্জন পরিবেশে প্রথম মৃন্ময়ী দশভূজা দুর্গা প্রতিমা গড়ে দেবীর তপস্যা শুরু করেন। তাদের ভক্তি ও আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা তাদের হারানো রাজ্য ও আত্মজ্ঞান ফিরিয়ে দেন। সেই আখ্যানই পরবর্তীকালে বাসন্তী ও শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনাবিন্দু বলে লোকালয়ে বিশ্বাস প্রচলিত হয়। যদিও প্রথাগত ইতিহাসের দিক থেকে এর সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলেনি, তবুও কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রে অবস্থান করছে এই পরম ধাম।

১৯০০ সালে পুনঃআবিষ্কার ও শতবর্ষের রূপান্তর

কালের পরিক্রমায় ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের দরুন ঋষি মেধসের এই আশ্রম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে বরিশাল থেকে আসা প্রখ্যাত পন্ডিত ও সাধক শ্রীমৎ বেদানন্দ স্বামী (চন্দ্রশেখর) প্রাচীন তান্ত্রিক পুঁথিপত্র ও যোগবলের সহায়তায় চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথধাম থেকে পথ চিনে বোয়ালখালীর ঘন বনাকীর্ণ করলডেঙ্গা পাহাড়ে পৌঁছান। স্থানীয় অন্নদাচরণ সর্ববিদ্যাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় এই পুণ্যভূমি পুনর্গঠন ও প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, মিয়ানমারের উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যসহ তৎকালীন খ্যাতনামা মানুষের সহযোগিতায় এখানে চণ্ডী মন্দির, পিতলের দশভূজা প্রতিমা, শিব ও কালী মন্দির নির্মিত হয়। তবে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকহানাদার ও দুষ্কৃতকারীদের তাণ্ডবে মূল পিতলের মূর্তিটি লুট হয় এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে স্থানীয় সমাজসেবকদের উদ্যোগে পাথরের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পুনরায় পূজার অচিরে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা হয়।

বর্তমান বাস্তবতা, ভূমিসংকট ও পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদ

বর্তমানে বহুমাত্রিক ধর্মীয় স্থাপনায় সাজানো চণ্ডীতীর্থ মেধস আশ্রমে পৌঁছাতে ১৪০টির বেশি সিঁড়ি পার হতে হয়। এখানে রয়েছে মূল চণ্ডী মন্দির, স্বামী বেদানন্দের সমাধিসৌধ, কামাখ্যা মন্দির, তারা কালী মন্দির, সীতা মন্দির এবং সুবিশাল ‘মানস সরোবর’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ধর্মীয় আবহ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করলেও বর্তমানে আশ্রমটি বড় ধরনের ভূমি সংকটের মুখোমুখি। প্রায় ৬৮ দশমিক ১৯ একর দেবোত্তর সম্পত্তির মধ্যে অভিযোগ অনুযায়ী প্রায় ৫৫ একর জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই দখলদারিত্ব আশ্রমের স্বাভাবিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় বাঁধা। এছাড়া প্রাচীন নথি সংরক্ষণ, পাহাড়ের ঢাল ও প্রাকৃতিক বনভূমি রক্ষা করা এবং আগত ভক্তদের নিরাপত্তা বিধান সুনিশ্চিত করা এখন সময়ের বড় দাবি।

চট্টগ্রামের করলডেঙ্গা পাহাড়ের মেধস মুনির আশ্রম কেবল ইতিহাস কিংবা পৌরাণিক আখ্যানের একটি পাতা নয়; এটি বিশ্বাসের উত্তরাধিকার, বাংলার ইতিহাস অন্বেষণের চারণভূমি এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের স্মারক। ইতিহাস ও বিশ্বাসের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে, অবৈধ দখল থেকে জমি উদ্ধার করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে এই আদি তীর্থভূমিকে রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের পবিত্র দায়িত্ব।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত