মহাবিশ্বের দূর কোনো গ্যালাক্সি থেকে আসা ভিনগ্রহের প্রাণী বা 'এলিয়েন' কেমন হতে পারে–বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখকেরা যখন এই ভাবনায় বুঁদ হন, ঠিক তখন রূপকথার দুনিয়াকে হার মানানো এক অদ্ভূত প্রাণী নিঃশব্দে রাজত্ব করে চলেছে আমাদের পৃথিবীর মহাসাগরে। আটটি নমনীয় বাহু, নীল রক্ত, তিনটি হৃদপিণ্ড, আর মানুষের বোধশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাগরের তলদেশে টিকে আছে অক্টোপাস।
অক্টোপাস কোনো সাধারণ জলজ প্রাণী নয়। মেরুদণ্ডহীন এই প্রাণীরা পৃথিবীতে বাস করছে প্রায় ৩৩ কোটি (৩৩০ মিলিয়ন) বছরেরও বেশি সময় ধরে–অর্থাৎ ডাইনোসরদের আগমনেরও বহুকাল আগে থেকে! প্রতি বছর ৮ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব অক্টোপাস দিবস’। অসাধারণ এই সামুদ্রিক বাসিন্দার বৈচিত্র্য, বিস্ময়কর ক্ষমতা এবং তাদের সংরক্ষণের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব অক্টোপাস দিবস পালনের ইতিহাসটি বেশ আকর্ষণীয়। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা চ্যারিটি কিন্তু এই দিবসের সূচনা করেনি। ২০০৭ সালে অক্টোপাসপ্রেমী ও গবেষকদের অনলাইন ফোরাম 'টনমো' (TONMO - The Octopus News Magazine Online)-এর সদস্যরা প্রথম এই দিন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। অক্টোপাসের আটটি বাহুর প্রতীক হিসেবে তারা ৮ অক্টোবর তারিখটি বেছে নেন।
পরবর্তীতে এটি আরও বিস্তৃত হয়ে ‘সেফালোপোড অ্যাওয়ারনেস ডেস’ (Cephalopods Awareness Days)-এ রূপ নেয়:
৮ অক্টোবর: অক্টোপাস দিবস (আটটি বাহু)।
৯ অক্টোবর: নটিলাস ও অন্যান্য অপরিচিত সেফালোপোড।
১০ অক্টোবর: ১০টি অঙ্গবিশিষ্ট স্কুইড ও ক্যাটলফিশ।
১১ অক্টোবর: পৌরাণিক ও রূপকথার সেফালোপোড (যেমন: ক্রাকেন)।
পরবর্তীতে সিডনির এক অ্যাকোয়ারিয়ামে ‘অ্যালি’ নামক বন্দী অক্টোপাসের জন্মদিন ও এর প্রতি সম্মান জানিয়ে অক্টোপাস দিবস আরও ব্যাপকভাবে পালিত হতে শুরু করে।
অক্টোপাসের শারীরিক গঠন প্রকৃতিবিদদের কাছে আজও এক অনাবিষ্কৃত কোডের মতো। মানবদেহে যেখানে একটি মাত্র হৃদপিণ্ড এবং কেন্দ্রে একটি মস্তিষ্ক থাকে, সেখানে অক্টোপাসের শরীরে মোট তিনটি হৃদপিণ্ড কাজ করে। দুটি হৃদপিণ্ড ফুলকায় রক্ত পাম্প করে পাঠায় এবং অন্যটি শরীরের বাকি অংশে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এদের রক্তের রঙ লাল নয়, বরং নীল। কারণ এদের রক্তে আয়রনের পরিবর্তে তামা বা কপারনির্ভর ‘হেমোসায়ানিন’ (Hemocyanin) থাকে, যা ঠাণ্ডা ও কম অক্সিজেনের সাগরেও জীবন বাঁচায়।
অক্টোপাসের শরীরে প্রায় ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) নিউরন বা স্নায়ুকোষ থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এর মাত্র ৪ থেকে ৪.৫ কোটি নিউরন থাকে এদের কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কে! বাকি দুই-তৃতীয়াংশ নিউরন ছড়িয়ে থাকে এদের আটটি বাহুতে। ফলে এদের প্রতিটি বাহুর আলাদা 'মিনি-ব্রেইন' বা উপ-মস্তিষ্ক রয়েছে। এই বাহুগুলো স্বাধীনভাবে স্পর্শ, স্বাদ গ্রহণ করা, গন্ধ নেওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কোনো কঠিন কাজের সময় আটটি বাহু আলাদাভাবে চিন্তা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে।
অক্টোপাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর শারীরিক কৌশল হলো চোখের পলকে রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতা। মলাস্কা (Mollusca) পর্বের সেফালোপোডা (Cephalopoda) শ্রেণীর এই প্রাণীটির দেহে কোনো শক্ত কঙ্কাল বা হাড় নেই। ফলে যেকোনো সরু বা কয়েন-আকারের ছিদ্র দিয়ে অনায়াসে নিজেদের শরীর গলিয়ে দিতে পারে এরা।
তবে এদের আসল জাদু লুকিয়ে আছে ত্বকের নিচে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে অক্টোপাস চারপাশের বালি, পাথর বা প্রবালের রঙের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে ফেলে নিজেকে অদৃশ্য করে ফেলে। এদের ত্বকে থাকে বিশেষ এক ধরনের আলোক-সংবেদনশীল কোষ, যাকে বলা হয় ‘ক্রোমাটোফর’ (Chromatophore)। এতে থাকা লাল, হলুদ, বাদামি ও কালো রঞ্জক থলিগুলো স্নায়ুর সংকেতে প্রসারিত বা সংকুচিত হয়ে রঙ বদলে দেয়।
অক্টোপাস শুধু আত্মরক্ষার্থেই ছদ্মবেশ নেয় না; শিকারি প্রাণীকে ভয় দেখাতে কিংবা নিরীহ প্রাণীর রূপ ধরে নতুন শিকার ধরতে এই কৌশল প্রয়োগ করে। যেমন–ব্লু-রিংড অক্টোপাস উজ্জ্বল নীল রিং ফুটিয়ে শত্রুকে বিষের সতর্কবার্তা দেয়। আজ থেকে প্রায় ২,৪০০ বছর আগে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল প্রথম অক্টোপাসের এই রঙ পরিবর্তনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে অক্টোপাসকে ধরা হয় সবচেয়ে বুদ্ধিমান হিসেবে। গবেষণাগারে অক্টোপাস মেধা-ধাঁধার সমাধান করতে পারে, বোতলের কাঁচের জার ভেতর ও বাহির থেকে খুলে ফেলতে পারে এবং গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারে। এরা সমুদ্রের প্লাস্টিক বা নারিকেলের খোলস বর্ম হিসেবে ব্যবহারের মতো ‘টুলস’ বা সরঞ্জাম ব্যবহারে পারদর্শী।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে অক্টোপাসকে রূপক হিসেবে দেখা হয়:
গ্রিক সংস্কৃতিতে : কৌশল ও বুদ্ধিমান শিকারের প্রতীক।
জাপানি লোককথায় (তাকো) : রূপান্তর, নমনীয়তা এবং সৃজনশীলতার প্রতীক।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংস্কৃতিতে : মাটি ও সমুদ্রের সংযোগকারী পবিত্র সত্তা।
আকার, প্রজাতি ও আত্মত্যাগের জীবনচক্র
পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ প্রজাতির অক্টোপাস রয়েছে। এরা আকারে ২ ইঞ্চি (বামন অক্টোপাস) থেকে শুরু করে ৩০ ফুট পর্যন্ত (দৈত্যাকায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অক্টোপাস) হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অক্টোপাসের ওজন ২৭০ কেজি (৬০০ পাউন্ড) পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলেও কিছু প্রজাতির অক্টোপাস দেখা যায়।
এত বুদ্ধিমত্তার পরও এদের আয়ু মাত্র ১ থেকে ৫ বছর (বড় প্রজাতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর)। তবে এই স্বল্পায়ুর মধ্যেই মাতৃ-অক্টোপাসের আত্মত্যাগের করুণ গল্প লুকিয়ে থাকে। ডিম পাড়ার পর মা অক্টোপাস না খেয়ে একটানা ডিম পাহারা দেয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, এক মা অক্টোপাস টানা ৫৩ মাস (প্রায় সাড়ে চার বছর!) না খেয়ে ডিমের দেখভাল করেছিল। বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর চরম ক্লান্তিতে মা অক্টোপাসের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালে 'লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স' ৩০০টিরও বেশি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেয়, যেখানে অক্টোপাসকে সংবেদনশীল (Sentient) প্রাণী হিসেবে স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়। এর ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য সরকার তাদের 'প্রাণী কল্যাণ আইন'-এ অক্টোপাসকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অক্টোপাস ফার্মিং (বাণিজ্যিক চাষাবাদ)।
১. পরিবেশগত ক্ষতি : অক্টোপাস মাংসাশী প্রাণী। ১ কেজি ফার্মের অক্টোপাস তৈরি করতে প্রায় ৩ কেজি বুনো মাছ খাওয়াতে হয়, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের চরম ক্ষতি করে।
২. আইনি নিষেধাজ্ঞা : অক্টোপাস একাকী ও আঞ্চলিক প্রাণী হওয়ায় আবদ্ধ জায়গায় এরা একে অপরকে আক্রমণ করে। এর নির্মমতা বিবেচনা করে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অক্টোপাস চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস বুকে নিয়ে সাগরের গভীর আঁধারে ঘুরে বেড়ানো এই আট বাহুর ছদ্মবেশী জাদুকররা আমাদের শেখায়–প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর হতে পারে। সেই বিস্ময়কে টিকিয়ে রাখা আমাদেরই নৈতিক দায়িত্ব।
\

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
মহাবিশ্বের দূর কোনো গ্যালাক্সি থেকে আসা ভিনগ্রহের প্রাণী বা 'এলিয়েন' কেমন হতে পারে–বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখকেরা যখন এই ভাবনায় বুঁদ হন, ঠিক তখন রূপকথার দুনিয়াকে হার মানানো এক অদ্ভূত প্রাণী নিঃশব্দে রাজত্ব করে চলেছে আমাদের পৃথিবীর মহাসাগরে। আটটি নমনীয় বাহু, নীল রক্ত, তিনটি হৃদপিণ্ড, আর মানুষের বোধশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাগরের তলদেশে টিকে আছে অক্টোপাস।
অক্টোপাস কোনো সাধারণ জলজ প্রাণী নয়। মেরুদণ্ডহীন এই প্রাণীরা পৃথিবীতে বাস করছে প্রায় ৩৩ কোটি (৩৩০ মিলিয়ন) বছরেরও বেশি সময় ধরে–অর্থাৎ ডাইনোসরদের আগমনেরও বহুকাল আগে থেকে! প্রতি বছর ৮ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব অক্টোপাস দিবস’। অসাধারণ এই সামুদ্রিক বাসিন্দার বৈচিত্র্য, বিস্ময়কর ক্ষমতা এবং তাদের সংরক্ষণের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব অক্টোপাস দিবস পালনের ইতিহাসটি বেশ আকর্ষণীয়। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা চ্যারিটি কিন্তু এই দিবসের সূচনা করেনি। ২০০৭ সালে অক্টোপাসপ্রেমী ও গবেষকদের অনলাইন ফোরাম 'টনমো' (TONMO - The Octopus News Magazine Online)-এর সদস্যরা প্রথম এই দিন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। অক্টোপাসের আটটি বাহুর প্রতীক হিসেবে তারা ৮ অক্টোবর তারিখটি বেছে নেন।
পরবর্তীতে এটি আরও বিস্তৃত হয়ে ‘সেফালোপোড অ্যাওয়ারনেস ডেস’ (Cephalopods Awareness Days)-এ রূপ নেয়:
৮ অক্টোবর: অক্টোপাস দিবস (আটটি বাহু)।
৯ অক্টোবর: নটিলাস ও অন্যান্য অপরিচিত সেফালোপোড।
১০ অক্টোবর: ১০টি অঙ্গবিশিষ্ট স্কুইড ও ক্যাটলফিশ।
১১ অক্টোবর: পৌরাণিক ও রূপকথার সেফালোপোড (যেমন: ক্রাকেন)।
পরবর্তীতে সিডনির এক অ্যাকোয়ারিয়ামে ‘অ্যালি’ নামক বন্দী অক্টোপাসের জন্মদিন ও এর প্রতি সম্মান জানিয়ে অক্টোপাস দিবস আরও ব্যাপকভাবে পালিত হতে শুরু করে।
অক্টোপাসের শারীরিক গঠন প্রকৃতিবিদদের কাছে আজও এক অনাবিষ্কৃত কোডের মতো। মানবদেহে যেখানে একটি মাত্র হৃদপিণ্ড এবং কেন্দ্রে একটি মস্তিষ্ক থাকে, সেখানে অক্টোপাসের শরীরে মোট তিনটি হৃদপিণ্ড কাজ করে। দুটি হৃদপিণ্ড ফুলকায় রক্ত পাম্প করে পাঠায় এবং অন্যটি শরীরের বাকি অংশে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এদের রক্তের রঙ লাল নয়, বরং নীল। কারণ এদের রক্তে আয়রনের পরিবর্তে তামা বা কপারনির্ভর ‘হেমোসায়ানিন’ (Hemocyanin) থাকে, যা ঠাণ্ডা ও কম অক্সিজেনের সাগরেও জীবন বাঁচায়।
অক্টোপাসের শরীরে প্রায় ৫০ কোটি (৫০০ মিলিয়ন) নিউরন বা স্নায়ুকোষ থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এর মাত্র ৪ থেকে ৪.৫ কোটি নিউরন থাকে এদের কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কে! বাকি দুই-তৃতীয়াংশ নিউরন ছড়িয়ে থাকে এদের আটটি বাহুতে। ফলে এদের প্রতিটি বাহুর আলাদা 'মিনি-ব্রেইন' বা উপ-মস্তিষ্ক রয়েছে। এই বাহুগুলো স্বাধীনভাবে স্পর্শ, স্বাদ গ্রহণ করা, গন্ধ নেওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কোনো কঠিন কাজের সময় আটটি বাহু আলাদাভাবে চিন্তা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে।
অক্টোপাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর শারীরিক কৌশল হলো চোখের পলকে রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতা। মলাস্কা (Mollusca) পর্বের সেফালোপোডা (Cephalopoda) শ্রেণীর এই প্রাণীটির দেহে কোনো শক্ত কঙ্কাল বা হাড় নেই। ফলে যেকোনো সরু বা কয়েন-আকারের ছিদ্র দিয়ে অনায়াসে নিজেদের শরীর গলিয়ে দিতে পারে এরা।
তবে এদের আসল জাদু লুকিয়ে আছে ত্বকের নিচে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে অক্টোপাস চারপাশের বালি, পাথর বা প্রবালের রঙের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে ফেলে নিজেকে অদৃশ্য করে ফেলে। এদের ত্বকে থাকে বিশেষ এক ধরনের আলোক-সংবেদনশীল কোষ, যাকে বলা হয় ‘ক্রোমাটোফর’ (Chromatophore)। এতে থাকা লাল, হলুদ, বাদামি ও কালো রঞ্জক থলিগুলো স্নায়ুর সংকেতে প্রসারিত বা সংকুচিত হয়ে রঙ বদলে দেয়।
অক্টোপাস শুধু আত্মরক্ষার্থেই ছদ্মবেশ নেয় না; শিকারি প্রাণীকে ভয় দেখাতে কিংবা নিরীহ প্রাণীর রূপ ধরে নতুন শিকার ধরতে এই কৌশল প্রয়োগ করে। যেমন–ব্লু-রিংড অক্টোপাস উজ্জ্বল নীল রিং ফুটিয়ে শত্রুকে বিষের সতর্কবার্তা দেয়। আজ থেকে প্রায় ২,৪০০ বছর আগে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল প্রথম অক্টোপাসের এই রঙ পরিবর্তনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে অক্টোপাসকে ধরা হয় সবচেয়ে বুদ্ধিমান হিসেবে। গবেষণাগারে অক্টোপাস মেধা-ধাঁধার সমাধান করতে পারে, বোতলের কাঁচের জার ভেতর ও বাহির থেকে খুলে ফেলতে পারে এবং গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারে। এরা সমুদ্রের প্লাস্টিক বা নারিকেলের খোলস বর্ম হিসেবে ব্যবহারের মতো ‘টুলস’ বা সরঞ্জাম ব্যবহারে পারদর্শী।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে অক্টোপাসকে রূপক হিসেবে দেখা হয়:
গ্রিক সংস্কৃতিতে : কৌশল ও বুদ্ধিমান শিকারের প্রতীক।
জাপানি লোককথায় (তাকো) : রূপান্তর, নমনীয়তা এবং সৃজনশীলতার প্রতীক।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংস্কৃতিতে : মাটি ও সমুদ্রের সংযোগকারী পবিত্র সত্তা।
আকার, প্রজাতি ও আত্মত্যাগের জীবনচক্র
পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ প্রজাতির অক্টোপাস রয়েছে। এরা আকারে ২ ইঞ্চি (বামন অক্টোপাস) থেকে শুরু করে ৩০ ফুট পর্যন্ত (দৈত্যাকায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অক্টোপাস) হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অক্টোপাসের ওজন ২৭০ কেজি (৬০০ পাউন্ড) পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলেও কিছু প্রজাতির অক্টোপাস দেখা যায়।
এত বুদ্ধিমত্তার পরও এদের আয়ু মাত্র ১ থেকে ৫ বছর (বড় প্রজাতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর)। তবে এই স্বল্পায়ুর মধ্যেই মাতৃ-অক্টোপাসের আত্মত্যাগের করুণ গল্প লুকিয়ে থাকে। ডিম পাড়ার পর মা অক্টোপাস না খেয়ে একটানা ডিম পাহারা দেয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, এক মা অক্টোপাস টানা ৫৩ মাস (প্রায় সাড়ে চার বছর!) না খেয়ে ডিমের দেখভাল করেছিল। বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর চরম ক্লান্তিতে মা অক্টোপাসের মৃত্যু হয়।
২০২১ সালে 'লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স' ৩০০টিরও বেশি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেয়, যেখানে অক্টোপাসকে সংবেদনশীল (Sentient) প্রাণী হিসেবে স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়। এর ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাজ্য সরকার তাদের 'প্রাণী কল্যাণ আইন'-এ অক্টোপাসকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অক্টোপাস ফার্মিং (বাণিজ্যিক চাষাবাদ)।
১. পরিবেশগত ক্ষতি : অক্টোপাস মাংসাশী প্রাণী। ১ কেজি ফার্মের অক্টোপাস তৈরি করতে প্রায় ৩ কেজি বুনো মাছ খাওয়াতে হয়, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের চরম ক্ষতি করে।
২. আইনি নিষেধাজ্ঞা : অক্টোপাস একাকী ও আঞ্চলিক প্রাণী হওয়ায় আবদ্ধ জায়গায় এরা একে অপরকে আক্রমণ করে। এর নির্মমতা বিবেচনা করে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অক্টোপাস চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস বুকে নিয়ে সাগরের গভীর আঁধারে ঘুরে বেড়ানো এই আট বাহুর ছদ্মবেশী জাদুকররা আমাদের শেখায়–প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর হতে পারে। সেই বিস্ময়কে টিকিয়ে রাখা আমাদেরই নৈতিক দায়িত্ব।
\

আপনার মতামত লিখুন