খাদ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক অগ্রগতি, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি–সব মিলিয়ে মানুষের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা বেড়েছে। তবু ক্ষুধা ও অপুষ্টি থেকে মুক্তি মেলেনি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের। একদিকে খাদ্যের অপচয়, অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক মানুষের অনাহার ও অপুষ্টিতে দিন কাটছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, দারিদ্র্য ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে খাদ্যসংকটের সমাধান এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাবারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow.’–বাংলায় যার ভাবার্থ, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। প্রতিপাদ্যটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃষকের অভিজ্ঞতা ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, আজকের পরিকল্পনা ও উদ্যোগই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, টেকসই ও সবার জন্য সহজলভ্য হবে। বিশ্ব খাদ্য দিবস তাই কেবল ক্ষুধার্ত মানুষের কথা স্মরণ করার দিন নয়; ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নতুন করে সামনে আনারও উপলক্ষ।
খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা, শারীরিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত খাবারের বিকল্প নেই। অথচ খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিপ্রযুক্তিতে অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে। কোথাও খাবারের অভাব, কোথাও আবার খাবার কেনার সামর্থ্যের সংকট। এই বৈপরীত্যই বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল আলোচ্য বিষয়।
সমস্যাটি কেবল খাদ্য উৎপাদনের নয়; বরং খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, কারা তা পাচ্ছে এবং কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে পাচ্ছে, তার সঙ্গেও জড়িত। তাই ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা দূর করা, পুষ্টির মান উন্নত করা এবং কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো সংস্থাটির অন্যতম লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে খাদ্যসংকট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে এফএওর সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হচ্ছে।
বর্তমানে দিবসটি শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা ও উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করে এ দিন। দিবসটির তাৎপর্য হলো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের বিষয়।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow.’ –এর মূল বক্তব্য হলো, আজকের উদ্ভাবন ও কার্যকর উদ্যোগ আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তুলতে পারে। উন্নত বীজ, আধুনিক সেচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ডিজিটাল কৃষিসেবা এবং উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে উদ্ভাবন শুধু যন্ত্র বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষকের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান ও প্রচলিত পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে এ বছরের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য। ছবি: এফএও
এফএওর মতে, নতুন সমাধান যেন প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা যদি ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে এর সুফলও সীমিত থেকে যাবে। প্রতিপাদ্যটি তাই নতুন ধারণা উদ্ভাবনের পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগের আহ্বান জানায়।
এফএওর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখেনি। সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং খাদ্য ও উৎপাদন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
খাদ্যসংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র পরিবার, শিশু, নারী এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর। পর্যাপ্ত খাবার না পেলে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, কমতে পারে শেখার ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবারের অভাব কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ক্ষুধা দূর করার উদ্যোগকে দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।
খাদ্যের প্রাপ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতার সংকটে বিশ্বের বহু মানুষ এখনো ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এফএওর ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশে ধান উৎপাদন গড়ের চেয়ে বেশি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে উৎপাদনের সম্ভাবনা ভালো হলেই সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত হয়ে যায় না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকটে পড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বন্যায় জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বাজার তদারকি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষিতে অগ্রগতি সত্ত্বেও খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য ও সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ছবি: আজকের পত্রিকা
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু পর্যাপ্ত খাবারের উপস্থিতি বোঝায় না; নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত পাওয়ার সামর্থ্যও এর অন্তর্ভুক্ত। ভাত মানুষের প্রধান খাদ্য হলেও সুস্বাস্থ্যের জন্য এর পাশাপাশি ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূল প্রয়োজন। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য না থাকলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আমিষের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের পুষ্টির চাহিদা আলাদা। তাই পরিবার পর্যায়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুতের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পুষ্টিকর খাবার যেন শুধু উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য না থাকে, সে জন্য উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের পাশাপাশি সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ জরুরি। ছবি: দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় কমে যায় এবং স্থানীয় বাজারে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরন অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বীজ বপন, সেচ ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণও কঠিন হয়ে ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ, উন্নত নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের কাছে এসব সুবিধা পৌঁছে দিতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি, মাটির উর্বরতা ও পানিসম্পদ রক্ষা করতে হবে, যাতে বর্তমানের খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ভবিষ্যতের উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট না হয়।
বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলে। ছবি: প্রথম আলো
আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও দক্ষ করে তুলতে পারে। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, রোগবালাই শনাক্তকরণ, উন্নত বীজ ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে সেচ দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কৃষকের কাছে আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর ও কৃষি পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণও কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে ক্ষুদ্র কৃষকের সামর্থ্য ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া অনেক কৃষকের পক্ষে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা কঠিন। এফএওর এবারের প্রতিপাদ্য তাই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা ও কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। ছবি: রেডিও রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া
খাদ্য উৎপাদনের পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাত করতে না পারলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে মাছ, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজির মতো পচনশীল পণ্যের জন্য উপযুক্ত সংরক্ষণাগার ও শীতল পরিবহনব্যবস্থা জরুরি। কৃষিপণ্য সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারে পৌঁছানো এবং মধ্যবর্তী ধাপগুলোতে ক্ষতি কমানো গেলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হতে পারেন।
অন্যদিকে, পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার কেনা ও রান্না কমানো দরকার। নিরাপদ ও ভোজ্য উদ্বৃত্ত খাবার যথাযথ ব্যবস্থাপনায় মানুষের কাজে লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। খাদ্যের অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়; কৃষিজমি, পানি, জ্বালানি ও শ্রমের মতো সীমিত সম্পদের ব্যবহারকে আরও কার্যকর করা।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দায়িত্ব হলো কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়াতে সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও বাজার অবকাঠামোর উন্নয়নও প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাদ্যের নিরাপত্তা ও গুণমান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জরুরি।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও সাধারণ ভোক্তারও ভূমিকা রয়েছে। কৃষকেরা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে পারে এবং ভোক্তারা পরিকল্পিত কেনাকাটা ও অপচয় রোধের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে খাদ্যব্যবস্থা আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, কার্যকর বাজারব্যবস্থা এবং খাদ্যের অপচয় রোধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ছবি: ইউএনডিপি
বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল শিক্ষা হলো, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সুফল কৃষক, দরিদ্র পরিবার এবং পুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নত করবে। খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, সাশ্রয়ী মূল্য ও নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিত করা তাই টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’ আমাদের ভবিষ্যতের দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ কৃষিতে বিনিয়োগ, খাদ্যের অপচয় রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি গড়বে। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা নয়; সঠিক নীতি, কার্যকর উদ্যোগ ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তা অর্জনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
/

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬
খাদ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক অগ্রগতি, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি–সব মিলিয়ে মানুষের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা বেড়েছে। তবু ক্ষুধা ও অপুষ্টি থেকে মুক্তি মেলেনি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের। একদিকে খাদ্যের অপচয়, অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক মানুষের অনাহার ও অপুষ্টিতে দিন কাটছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, দারিদ্র্য ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে খাদ্যসংকটের সমাধান এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাবারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow.’–বাংলায় যার ভাবার্থ, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। প্রতিপাদ্যটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃষকের অভিজ্ঞতা ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, আজকের পরিকল্পনা ও উদ্যোগই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের খাদ্যব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, টেকসই ও সবার জন্য সহজলভ্য হবে। বিশ্ব খাদ্য দিবস তাই কেবল ক্ষুধার্ত মানুষের কথা স্মরণ করার দিন নয়; ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নতুন করে সামনে আনারও উপলক্ষ।
খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা, শারীরিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত খাবারের বিকল্প নেই। অথচ খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিপ্রযুক্তিতে অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে। কোথাও খাবারের অভাব, কোথাও আবার খাবার কেনার সামর্থ্যের সংকট। এই বৈপরীত্যই বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল আলোচ্য বিষয়।
সমস্যাটি কেবল খাদ্য উৎপাদনের নয়; বরং খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, কারা তা পাচ্ছে এবং কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে পাচ্ছে, তার সঙ্গেও জড়িত। তাই ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা দূর করা, পুষ্টির মান উন্নত করা এবং কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো সংস্থাটির অন্যতম লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে খাদ্যসংকট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে এফএওর সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হচ্ছে।
বর্তমানে দিবসটি শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা ও উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করে এ দিন। দিবসটির তাৎপর্য হলো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের বিষয়।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow.’ –এর মূল বক্তব্য হলো, আজকের উদ্ভাবন ও কার্যকর উদ্যোগ আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তুলতে পারে। উন্নত বীজ, আধুনিক সেচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ডিজিটাল কৃষিসেবা এবং উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে উদ্ভাবন শুধু যন্ত্র বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষকের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান ও প্রচলিত পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে এ বছরের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য। ছবি: এফএও
এফএওর মতে, নতুন সমাধান যেন প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা যদি ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে এর সুফলও সীমিত থেকে যাবে। প্রতিপাদ্যটি তাই নতুন ধারণা উদ্ভাবনের পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগের আহ্বান জানায়।
এফএওর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখেনি। সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং খাদ্য ও উৎপাদন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
খাদ্যসংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র পরিবার, শিশু, নারী এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর। পর্যাপ্ত খাবার না পেলে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, কমতে পারে শেখার ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবারের অভাব কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ক্ষুধা দূর করার উদ্যোগকে দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।
খাদ্যের প্রাপ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতার সংকটে বিশ্বের বহু মানুষ এখনো ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান, মাছ, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এফএওর ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশে ধান উৎপাদন গড়ের চেয়ে বেশি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে উৎপাদনের সম্ভাবনা ভালো হলেই সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত হয়ে যায় না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকটে পড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বন্যায় জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বাজার তদারকি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষিতে অগ্রগতি সত্ত্বেও খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য ও সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ছবি: আজকের পত্রিকা
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু পর্যাপ্ত খাবারের উপস্থিতি বোঝায় না; নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত পাওয়ার সামর্থ্যও এর অন্তর্ভুক্ত। ভাত মানুষের প্রধান খাদ্য হলেও সুস্বাস্থ্যের জন্য এর পাশাপাশি ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূল প্রয়োজন। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য না থাকলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আমিষের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের পুষ্টির চাহিদা আলাদা। তাই পরিবার পর্যায়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুতের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পুষ্টিকর খাবার যেন শুধু উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য না থাকে, সে জন্য উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের পাশাপাশি সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ জরুরি। ছবি: দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় কমে যায় এবং স্থানীয় বাজারে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরন অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বীজ বপন, সেচ ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণও কঠিন হয়ে ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ, উন্নত নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের কাছে এসব সুবিধা পৌঁছে দিতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি, মাটির উর্বরতা ও পানিসম্পদ রক্ষা করতে হবে, যাতে বর্তমানের খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ভবিষ্যতের উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট না হয়।
বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলে। ছবি: প্রথম আলো
আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও দক্ষ করে তুলতে পারে। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, রোগবালাই শনাক্তকরণ, উন্নত বীজ ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে সেচ দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কৃষকের কাছে আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর ও কৃষি পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণও কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে ক্ষুদ্র কৃষকের সামর্থ্য ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া অনেক কৃষকের পক্ষে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা কঠিন। এফএওর এবারের প্রতিপাদ্য তাই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা ও কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। ছবি: রেডিও রিপাবলিক ইন্দোনেশিয়া
খাদ্য উৎপাদনের পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাত করতে না পারলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে মাছ, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজির মতো পচনশীল পণ্যের জন্য উপযুক্ত সংরক্ষণাগার ও শীতল পরিবহনব্যবস্থা জরুরি। কৃষিপণ্য সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারে পৌঁছানো এবং মধ্যবর্তী ধাপগুলোতে ক্ষতি কমানো গেলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হতে পারেন।
অন্যদিকে, পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার কেনা ও রান্না কমানো দরকার। নিরাপদ ও ভোজ্য উদ্বৃত্ত খাবার যথাযথ ব্যবস্থাপনায় মানুষের কাজে লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। খাদ্যের অপচয় কমানো মানে শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়; কৃষিজমি, পানি, জ্বালানি ও শ্রমের মতো সীমিত সম্পদের ব্যবহারকে আরও কার্যকর করা।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দায়িত্ব হলো কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়াতে সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও বাজার অবকাঠামোর উন্নয়নও প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাদ্যের নিরাপত্তা ও গুণমান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জরুরি।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও সাধারণ ভোক্তারও ভূমিকা রয়েছে। কৃষকেরা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে পারে এবং ভোক্তারা পরিকল্পিত কেনাকাটা ও অপচয় রোধের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে খাদ্যব্যবস্থা আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, কার্যকর বাজারব্যবস্থা এবং খাদ্যের অপচয় রোধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ছবি: ইউএনডিপি
বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল শিক্ষা হলো, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সুফল কৃষক, দরিদ্র পরিবার এবং পুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নত করবে। খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, সাশ্রয়ী মূল্য ও নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিত করা তাই টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’ আমাদের ভবিষ্যতের দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ কৃষিতে বিনিয়োগ, খাদ্যের অপচয় রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি গড়বে। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা নয়; সঠিক নীতি, কার্যকর উদ্যোগ ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তা অর্জনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
/

আপনার মতামত লিখুন