সংবাদ

প্রবন্ধ

সমসাময়িক বাংলা কবিতা ও বিশ্বকবিতা


ওবায়েদ আকাশ
ওবায়েদ আকাশ
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

সমসাময়িক বাংলা কবিতা ও বিশ্বকবিতা
ছবিসূত্র : ইন্টারনেট


যুগে যুগে কালে কালে সাহিত্য নিয়ে যখন কথা ওঠে, তখন কোনো না কোনো ভূখণ্ড বা ভাষার সাহিত্য অবহেলিত থাকে। আবার কোনো না কোনো ভাষার সাহিত্য কারণে-অকারণে অধিক মূল্য পায়। কিন্তু মহৎ সাহিত্য চিরন্তন। 

দেখা গেছে হাজার বছর পেরিয়েও কোনো কোনো সাহিত্য পুনর্মূল্যায়িত হয়েছে। তবে যিনি তার স্রষ্টা, তাঁর সারল্য, কমিটমেন্ট এবং সাবলীলতা কিংবা অকপটতাই এর প্রধান কারণ। কারণ সত্য ও স্পষ্ট উচ্চারণকে শৈল্পিক চূড়ান্তে তুলে ধরাকে এখনো অবধি অস্বীকার করা যায় নি। যে কারণে এমন সব অটল লেখকের সাহিত্য কখনো বৃথা সৃষ্টি নয়। তা কখনো না কখনো আলো ছড়াবেই। তবে কালের দুষ্টপাকও তাকে ঘূর্ণিস্রোতে মেলাবার পাঁয়তারা কম করে না। তবু থেমে থাকে না সৃষ্টি। ভেঙে পড়ে না সাহিত্যের প্রকৃত রসাস্বাদন।  

সমাপ্ত চাঁদের মতো, স্থির
অথচ স্বর্গীয়
গতির দ্যোতনা যাকে ধীরে এনে দেয়
আমাদের জানালায়, ঝাউবনে, পার্কের বেঞ্চিতে;
এবং সুদূর—
যারা কাঁদে, ঝগড়া করে, ক্লান্ত হয়,
কুঁজো পিঠে সস্তার বাজারে ফেরে,
কিংবা যারা প্রাসাদের
সচিত্র গলিতে জমে ষড়যন্ত্রে—
তাদের করুণা, ঘৃণা, প্রলোভনে অবিচল— দূর,
দূরতম নীলিমায়— যেন
ইতিহাস বেলেল্লা মিছিল ছাড়া কিছু নয়,
চুন-কালি-সঙের মুখোশ ছাড়া কিছু নয়—
শুধু
ধ্রুব
অদহন দীপ্তির উদ্ভাসে
উদাসীন, স্বাধীন, অফেন
দেবতারা এখনো আছেন।
                [বুদ্ধদেব বসু, ‘মরচে-পড়া পেরেকের গান’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘হ্যেল্ডার্লিন’ কবিতার অংশ]

এত বিধ্বংসী হাওয়া, এত যে সস্তা জনপ্রিয়তার দৌড়, এত যে ক্লান্তি, ঝগড়া, ষড়যন্ত্র— সব কিছুর বিপরীতে ‘অদহন দীপ্তির উদ্ভাসে’ স্বাধীনতা আর স্থিরতার ডানায় ভর করে এখনো সমুজ্জ্বল আমাদের মহৎ সাহিত্য আর সাহিত্যিকগণ। ধ্রুব আমাদের কবিতা। জাজ্বল্য একটা নতুন প্রকাশনার ব্যাকুলতা। ব্যাকুলতা লেখকের, তাঁর প্রিয়তর লেখাটি সারা বছরে কিছু প্রচার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের জন্য। চাঞ্চল্য কবিতার। চাঞ্চল্য শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতার, অঙ্গীকার বিশুদ্ধতার। অভীপ্সা সৌন্দর্য নির্মাণ-বিনির্মাণের। তাকে কারো সঙ্গে তুলনা করা বা বাছবিচারের দায়িত্ব কালে কালে সময়ের ঘাড়ে বর্তায়। আমরা যে যতই উচ্চবাচ্য করি না কেন, প্রকৃতিদত্ত বিদ্যুতোজ্জ্বল দাঁতগুলো আড়াল করে কপালের উদার জমিনে দুশ্চিন্তা কিংবা গম্ভীরতার রেখা টেনে বলি না কেন, এই হচ্ছে আমাদের অনুসরণীয় সাহিত্যের রূপচিহ্ন; কিংবা এই হচ্ছে আমাদের সাহিত্যের শাশ্বত যাত্রাপথ— প্রকৃতপক্ষে এমন দাবি তুলবার অধিকার যিনি স্বেচ্ছায় সংরক্ষণ করেন, তিনিও মূলত সময়ের অংশ ছাড়া কিছু নন। 

কবিরা সময়ের সন্তান, সময় থেকে পাওয়া রসদ নিয়ে বিস্তৃত হয় তাদের কবিতার ভুবন। এরই ভেতর থেকে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন চিরসময়ের অংশ। চণ্ডীদাস, কালিদাস, বঙ্কিম, মাইকেল, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দরা আমাদের চিরদিনের স্বজন। আবার আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে চিরদিনের কিংবা ক্ষণকালের সখ্য গড়ে তুলতে প্রস্তুত হচ্ছেন আগামী দিনের কবি-লেখকগণ। আবার শেক্সপিয়র, গ্যেটে, ইয়েটস, এলিঅট, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, র‌্যাঁবো, বোদলেয়ার, লোরকা, এলুয়ার, পাজ, হিনি, ট্রান্সট্রোমার, দারবিশ, আদোনিস প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষার চিরকালীন আত্মীয় এখন।   

যুগে যুগে কালে কালে পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায় মহৎ সাহিত্য রচিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক-ভূরাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষাগত কারণে অসংখ্য ভাষার মহৎ সাহিত্যের আজও আমরা যেমন কিছুই জানি না; তেমনই কিছু কিছু অনুন্নত গৌণ সাহিত্য নিয়েও ঘরে বাইরে, চায়ের টেবিলে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে উচ্ছ্বাসের কমতি নাই। 

পৃথিবীতে বাংলা নামে একটি ভাষা আছে— একথা সর্ববিদিত হলেও, একমাত্র ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এ ভাষায় যে অজস্র উৎকৃষ্ট কবিতা বা সাহিত্য রচিত হতে পারে; একথা অন্য বিশ্ব জানে না। জানে না যে কখনো কখনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস-গল্পখানি এই বাংলা ভাষায়ই রচিত হয়েছে। এমনকি জানে না মাইকেল-জীবনানন্দের মতো এত গভীর ও সর্বোপ্লাবি কবিদ্বয় এই বাংলা ভাষায়ই ধারণ করেছিলেন তাঁদের অসামান্য সাহিত্য ভাণ্ডার। যতটুকুওবা কখনো সখনো বিশ্বপরিমণ্ডলে আলোচনায় উচ্চারিত হয়েছেন; তা সৈকতপারের ক্ষুদ্রাতি বালুকণা ছাড়া বেশি নয়। কিন্তু ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ— এ-জাতীয় কিছু প্রভাবশালী ভাষার প্রসারতার কারণে এসব ভাষায় রচিত কত অলেখার ভেতরও আমরা প্রকৃত লেখার স্বাদ আস্বাদন করে নিতে চাই। মনে মনে ধারণা করি, এসব ভাষায় যা-ই রচিত হচ্ছে, সবই মহার্ঘ রচনা।

বাংলায় অনেক বড় পণ্ডিত, কবি, লেখক, অনুবাদক-গবেষক থাকার ফলেও শুধুমাত্র প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দৈন্যের কারণে বাংলার সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা যায় নি; কিন্তু তাদের ধর্মীয় মৌলবাদিতার মতো গোঁড়ামি, দুর্নীতির মতো অপসংস্কৃতিকে ঠিকই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। 

এমনকি আমাদের মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সোনালি ফসলের ঘ্রাণও কেন বিশ্বপাঠককুলকে মোহিত করতে প্রসারের ব্যবস্থা করা হয়নি; ভেবে অবাক হওয়ার মতোই বিষয়ই বটে। এমন স্বর্ণালি শস্য ফলেছে এই আধুনিক এবং আধুনিক-উত্তর কালেও; কিন্তু অজস্র দুর্ভেদ্য প্রাচীর পেরিয়ে, অগণিত অজুহাত তুলে কোনোভাবেই তাকে বিশ্বের সমৃদ্ধ সাহিত্য পাঠের তালিকায় তুলে ধরা যাচ্ছে না। প্রতিবন্ধক কখনো ভাষা আবার কখনো অর্থনীতি। আর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা যে আমাদের সীমাবদ্ধ মানসিকতা কিংবা সদিচ্ছার— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যায়।

আমাদের সমসামিয়ক বাংলা কবিতা ঐ একই তিমিরে হাবুডুবু খেলেও আমরা কিন্তু বিশ্বকবিতার রসাস্বাদন থেকে পিছিয়ে নেই। বাঙালি পাঠক এ ব্যাপারে কখনোই পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘দেবে আর নেবে, মিলিবে মিলাবে’ এই উক্তি আর কোনোদিন সত্যে প্রমাণিত হয়নি। শুধু দিয়ে গেছি, আর দিয়েই যাচ্ছি, নিতে পারছি না কিছুই। আমরা প্রভাবশালী ভাষার সাহিত্য পাঠ করে আপ্লুত হচ্ছি; তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তারই অনুসরণ-অনুকরণে বাংলায় সাহিত্য রচনা করছি। কিন্তু আমাদের সাহিত্যও যে তাদের পাঠের প্রয়োজন থাকতে পারে, আমাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-দেশ-মানুষকে তাদের ভেতরেও উপস্থাপন জরুরি— বাঙালি মানসে তা আজও যেন উপলব্ধিতে এলো না। সক্ষমতা এলো না আমাদের সাহিত্যকে তাদের ভাষায় অনুবাদ করে তাদের পাঠ তালিকায় তুলে ধরার। কিন্তু প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে আমরা ঠিকই তাদের সাহিত্যকে অনুবাদ করে নিজের পাণ্ডিত্যকে জানান দেবার জন্য তুলে দিচ্ছি বাংলা ভাষার পাঠককুলে। বিদেশি কবিতা পাঠের জন্য আমাদের কসরতের অন্ত নেই। যেহেতু সে সহজলভ্য একটি পথে উঠে এসেছে দু’তিনটি সহজলভ্য ভাষার মাধ্যমে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাঙালি হয়ে জন্ম নেয়াটা যেমন আমাদের এক ধরনের অপরাধ, তারও চেয়ে বড় অপরাধ বাংলায় কবিতা রচনা? কারণ বাংলা কবিতা আজও পর্যন্ত পৃথিবীর মুখ দেখেনি। কোনো দিন দেখবে হয়তো; সেই আশাতেই আজও বাঙালির ঘরে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য কবি-লেখক-সাহিত্যিক। কিংবা কোনোদিন দেখবেই না— জন্ম নিচ্ছে সেই অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়েও। শুধু ভাবতে ভাল লাগে যে আমাদের কবিতাও বিশ্ব কবিতার অংশ। কিন্তু আমাদের কবিতা অন্য বিশ্বের পাঠকের পাঠ্য কিনা সে প্রশ্নের উত্তর আজও ধোঁয়ায় মোড়ানো তমসা। 

প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য নয়, আমরা সারা বিশ্বের কবি-লেখক-শিল্পী সবাই একই বিশ্বের, একই গ্রামের বাসিন্দা। আমাদের মধ্যে দেশ-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-ধনী-দরিদ্র যেন কোনো প্রাচীর বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে না পারে, সে-লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এগুতে হবে। মানি আর না মানি তবু বিনিময় হবে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা ভাবনারও। আর গ্রহণ করবো যেটা উত্তম সেটাই। 

ভাবি, সেই দিন আরও কত দূর, যেদিন আমরাও ভালো-মন্দ বাছবিচারের সীমায় দাঁড়িয়ে কূলে ভেড়াতে সক্ষম হবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই কাব্যভাণ্ডারে সমৃদ্ধ ভেলাখানি? তবু না হয় একদিন আমরা পৌঁছে যেতে পারি; তবু না হয় সে সুদিন এসে অচিরেই কড়া নাড়বে আমাদের অলস দরজায়; কিন্তু ততদিনে আমাদের বিশ্বকবিতা-বিশ্বসাহিত্য আরও কত কতভাবে, আরও কত কতবার নতুন জীবন নতুন সম্ভাবনাকে ঘেঁটে-ফুঁড়ে নতুন নতুন ইতিহাসের পাতায় মুদ্রিত হবে, তা কি আমরা ভাবনায় নিয়ে আছি? নিশ্চয় ভাবি, সন্তানের ভবিষ্যতের মতো প্রতিদিনই শিল্প-সাহিত্যের স্রষ্টারা মনের অগোচরে হলেও তাদের শ্রমসাধ্য সৃষ্টির পরিণতি কিংবা আগামী নিয়ে ভেবে থাকেন। কিন্তু তার শেষটা কেউ কোনোদিন খুঁজে পেয়েছেন— এমনটা এখনো শুনিনি। আশার তরী ভেসে চলেছে আমাদের অনিশ্চিত যাত্রায়। যেমন আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেসে চলেছে ক্রমশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, রাজনৈতিক দলের রোষানলের ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর দিয়ে; তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত জীবন অনিশ্চিত সুন্দর আগামীর ভঙ্গুর পথের যাত্রীই ধরে নিতে পারি। নির্বিশেষ সবকিছুর উর্ধে দেশপ্রেমকেন্দ্রিক দেশসাশন, শুভচিন্তাতাড়িত মহৎপরিকল্পনা, ব্যক্তি কিংবা দলের চেয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কিংবা দেশের প্রকৃত সম্মান রক্ষার্থে পরিচালিত সুসাশন ব্যতীত যে শিল্প-সাহিত্য কখনো আগামীর শৃঙ্খল ভাঙতে পারে না; এখনো হয়তো তা আমাদের বোধোদয়ে আসেনি। সিংহভাগ মেধাবি কবি-লেখক-সাহিত্যিকের সুযোগ বুঝে শাসকশ্রেণির পদলেহন এবং ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ায় এ প্রতিবন্ধকতার দেয়াল সমুখ থেকে সরানো যাচ্ছে না। কিংবা কবি-লেখক-শিল্পীদের সত্যিকারের শিল্পের জন্য জীবনোৎসর্গের মানসিকতা ভঙ্গুর হয়ে পড়ায় আজ আমাদের লেখকগণ ব্যক্তিগৌরব, ব্যক্তিখ্যাতি অর্জনেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে কবিতা বা শিল্পের খ্যাতিই যে কবি বা শিল্পীকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিতে পারে— খুব নিবিড়ভাবে তা এখন ভাববার সময়। এখনই সময় কিংবা অনেকটাই দেরি করে ফেলেছি আমরা সেই পথ অনুসরণে— যে পথ একদিন বেছে নিয়েছিল আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার সম্মিলিত লেখক সমাজ; এবং প্রভাবিত করেছিল শাসকের স্থবিরচিন্তাকেও। আজ আর ইউরোপ কিংবা আমেরিকা-ইংল্যান্ডের হাতে সাহিত্যের নেতৃত্ব কল্পনা করা যাচ্ছে না; তা এখন জুড়ে বসেছে আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার উর্বর ভূমি। কিছুটা মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যও এখন অনেক বেশি আত্মপরিচয় অনুসন্ধানী। এখনই সময় সম্মিলিত লেখক সমাজের সেই মহতী উদ্যোগে আমাদেরও ঝাঁপিয়ে পড়া। এখনই সময় এ রাষ্ট্রের সেই গ্রাহ্যনীয় ইন্দ্রিয়ে এ আহ্বান পৌঁছে দেয়া। অন্যথা আমাদের স্বসৃষ্ট সমাধীতে পতিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

আরো যে লজ্জার বিষয়টি আমাদের একটুও ভাবিত করে না, সেটি হলো আমাদের শিল্পের নিজস্ব কোনো আইডেন্টিটি না থাকা। এখনো আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্যকর্ম বা শিল্পকর্ম বহির্বিশ্বে পরিচিত হয় ‘ভারতীয়’ হিসেবে। তাকে ‘বাংলাদেশি’ করে তোলার ব্যাপারে আমাদের অন্ধত্ব নিজেরাই আয়নায় দেখে থাকি। দেশভাগের এই আট দশকেও এই নির্লজ্জতা আমাদের কোনো চিন্তানায়ক থেকে খ্যাতিমান সাহিত্যিক পর্যন্ত কাউকে নাড়া দিতে পারেনি। অথচ লক্ষ লক্ষ বীরের তাজা রক্ত, মা-বোনের সম্মান খোয়ানোর বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি। এই বাংলাদেশই বরীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ বানিয়েছে, এই বাংলার প্রকৃতি-ঐতিহ্য স্বভাবই গড়ে তুলেছে বাংলা ভাষার সেরা সব কবি-লেখক-শিল্পীকে। এত অর্জন এত আত্মত্যাগের পরও কেন আমরা ক্রমশ অন্ধকার সুড়ঙ্গতলে হারিয়ে যাচ্ছি— বড় বেদনার স্বরে সেই জিজ্ঞাসা আজ বাজে মর্মমূলে। কিন্তু সমাধানের উপায় বুঝি সুদূর থেকে সুদূরেই চলে যাবে, যদি সকলে মিলে দেশের স্বার্থে দেশকে ভালো না বাসি। যদি সকলে মিলে শিল্পের চূড়ান্ত জিজ্ঞাসায় যথার্থ উত্তর দিতে না পারি এবং তাকে টেনে নিয়ে যেতে না পারি সর্বোচ্চ সীমায়। তবু এত নেতি এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা সেই আশায় বুক বেঁধেছি যে, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকা, কোরিয়া, চায়নার মতো এই বাংলার কবিরা একদিন তাদের নির্জনতম কবি জীবনানন্দের স্বরে মাথা উঁচু করে শোনাবে বিশ্বচরাচরে— 

“কেহ যাহা জানে নাই— কোনো এক বাণী—
আমি বহে আনি;
...
আমার পায়ের শব্দ শোনো—
নতুন এ— আর সব হারানো— পুরনো।”   

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সমসাময়িক বাংলা কবিতা ও বিশ্বকবিতা

প্রকাশের তারিখ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


যুগে যুগে কালে কালে সাহিত্য নিয়ে যখন কথা ওঠে, তখন কোনো না কোনো ভূখণ্ড বা ভাষার সাহিত্য অবহেলিত থাকে। আবার কোনো না কোনো ভাষার সাহিত্য কারণে-অকারণে অধিক মূল্য পায়। কিন্তু মহৎ সাহিত্য চিরন্তন। 

দেখা গেছে হাজার বছর পেরিয়েও কোনো কোনো সাহিত্য পুনর্মূল্যায়িত হয়েছে। তবে যিনি তার স্রষ্টা, তাঁর সারল্য, কমিটমেন্ট এবং সাবলীলতা কিংবা অকপটতাই এর প্রধান কারণ। কারণ সত্য ও স্পষ্ট উচ্চারণকে শৈল্পিক চূড়ান্তে তুলে ধরাকে এখনো অবধি অস্বীকার করা যায় নি। যে কারণে এমন সব অটল লেখকের সাহিত্য কখনো বৃথা সৃষ্টি নয়। তা কখনো না কখনো আলো ছড়াবেই। তবে কালের দুষ্টপাকও তাকে ঘূর্ণিস্রোতে মেলাবার পাঁয়তারা কম করে না। তবু থেমে থাকে না সৃষ্টি। ভেঙে পড়ে না সাহিত্যের প্রকৃত রসাস্বাদন।  

সমাপ্ত চাঁদের মতো, স্থির
অথচ স্বর্গীয়
গতির দ্যোতনা যাকে ধীরে এনে দেয়
আমাদের জানালায়, ঝাউবনে, পার্কের বেঞ্চিতে;
এবং সুদূর—
যারা কাঁদে, ঝগড়া করে, ক্লান্ত হয়,
কুঁজো পিঠে সস্তার বাজারে ফেরে,
কিংবা যারা প্রাসাদের
সচিত্র গলিতে জমে ষড়যন্ত্রে—
তাদের করুণা, ঘৃণা, প্রলোভনে অবিচল— দূর,
দূরতম নীলিমায়— যেন
ইতিহাস বেলেল্লা মিছিল ছাড়া কিছু নয়,
চুন-কালি-সঙের মুখোশ ছাড়া কিছু নয়—
শুধু
ধ্রুব
অদহন দীপ্তির উদ্ভাসে
উদাসীন, স্বাধীন, অফেন
দেবতারা এখনো আছেন।
                [বুদ্ধদেব বসু, ‘মরচে-পড়া পেরেকের গান’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘হ্যেল্ডার্লিন’ কবিতার অংশ]

এত বিধ্বংসী হাওয়া, এত যে সস্তা জনপ্রিয়তার দৌড়, এত যে ক্লান্তি, ঝগড়া, ষড়যন্ত্র— সব কিছুর বিপরীতে ‘অদহন দীপ্তির উদ্ভাসে’ স্বাধীনতা আর স্থিরতার ডানায় ভর করে এখনো সমুজ্জ্বল আমাদের মহৎ সাহিত্য আর সাহিত্যিকগণ। ধ্রুব আমাদের কবিতা। জাজ্বল্য একটা নতুন প্রকাশনার ব্যাকুলতা। ব্যাকুলতা লেখকের, তাঁর প্রিয়তর লেখাটি সারা বছরে কিছু প্রচার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের জন্য। চাঞ্চল্য কবিতার। চাঞ্চল্য শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতার, অঙ্গীকার বিশুদ্ধতার। অভীপ্সা সৌন্দর্য নির্মাণ-বিনির্মাণের। তাকে কারো সঙ্গে তুলনা করা বা বাছবিচারের দায়িত্ব কালে কালে সময়ের ঘাড়ে বর্তায়। আমরা যে যতই উচ্চবাচ্য করি না কেন, প্রকৃতিদত্ত বিদ্যুতোজ্জ্বল দাঁতগুলো আড়াল করে কপালের উদার জমিনে দুশ্চিন্তা কিংবা গম্ভীরতার রেখা টেনে বলি না কেন, এই হচ্ছে আমাদের অনুসরণীয় সাহিত্যের রূপচিহ্ন; কিংবা এই হচ্ছে আমাদের সাহিত্যের শাশ্বত যাত্রাপথ— প্রকৃতপক্ষে এমন দাবি তুলবার অধিকার যিনি স্বেচ্ছায় সংরক্ষণ করেন, তিনিও মূলত সময়ের অংশ ছাড়া কিছু নন। 

কবিরা সময়ের সন্তান, সময় থেকে পাওয়া রসদ নিয়ে বিস্তৃত হয় তাদের কবিতার ভুবন। এরই ভেতর থেকে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন চিরসময়ের অংশ। চণ্ডীদাস, কালিদাস, বঙ্কিম, মাইকেল, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দরা আমাদের চিরদিনের স্বজন। আবার আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে চিরদিনের কিংবা ক্ষণকালের সখ্য গড়ে তুলতে প্রস্তুত হচ্ছেন আগামী দিনের কবি-লেখকগণ। আবার শেক্সপিয়র, গ্যেটে, ইয়েটস, এলিঅট, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, র‌্যাঁবো, বোদলেয়ার, লোরকা, এলুয়ার, পাজ, হিনি, ট্রান্সট্রোমার, দারবিশ, আদোনিস প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষার চিরকালীন আত্মীয় এখন।   

যুগে যুগে কালে কালে পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায় মহৎ সাহিত্য রচিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক-ভূরাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষাগত কারণে অসংখ্য ভাষার মহৎ সাহিত্যের আজও আমরা যেমন কিছুই জানি না; তেমনই কিছু কিছু অনুন্নত গৌণ সাহিত্য নিয়েও ঘরে বাইরে, চায়ের টেবিলে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে উচ্ছ্বাসের কমতি নাই। 

পৃথিবীতে বাংলা নামে একটি ভাষা আছে— একথা সর্ববিদিত হলেও, একমাত্র ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এ ভাষায় যে অজস্র উৎকৃষ্ট কবিতা বা সাহিত্য রচিত হতে পারে; একথা অন্য বিশ্ব জানে না। জানে না যে কখনো কখনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস-গল্পখানি এই বাংলা ভাষায়ই রচিত হয়েছে। এমনকি জানে না মাইকেল-জীবনানন্দের মতো এত গভীর ও সর্বোপ্লাবি কবিদ্বয় এই বাংলা ভাষায়ই ধারণ করেছিলেন তাঁদের অসামান্য সাহিত্য ভাণ্ডার। যতটুকুওবা কখনো সখনো বিশ্বপরিমণ্ডলে আলোচনায় উচ্চারিত হয়েছেন; তা সৈকতপারের ক্ষুদ্রাতি বালুকণা ছাড়া বেশি নয়। কিন্তু ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ— এ-জাতীয় কিছু প্রভাবশালী ভাষার প্রসারতার কারণে এসব ভাষায় রচিত কত অলেখার ভেতরও আমরা প্রকৃত লেখার স্বাদ আস্বাদন করে নিতে চাই। মনে মনে ধারণা করি, এসব ভাষায় যা-ই রচিত হচ্ছে, সবই মহার্ঘ রচনা।

বাংলায় অনেক বড় পণ্ডিত, কবি, লেখক, অনুবাদক-গবেষক থাকার ফলেও শুধুমাত্র প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দৈন্যের কারণে বাংলার সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা যায় নি; কিন্তু তাদের ধর্মীয় মৌলবাদিতার মতো গোঁড়ামি, দুর্নীতির মতো অপসংস্কৃতিকে ঠিকই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। 

এমনকি আমাদের মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সোনালি ফসলের ঘ্রাণও কেন বিশ্বপাঠককুলকে মোহিত করতে প্রসারের ব্যবস্থা করা হয়নি; ভেবে অবাক হওয়ার মতোই বিষয়ই বটে। এমন স্বর্ণালি শস্য ফলেছে এই আধুনিক এবং আধুনিক-উত্তর কালেও; কিন্তু অজস্র দুর্ভেদ্য প্রাচীর পেরিয়ে, অগণিত অজুহাত তুলে কোনোভাবেই তাকে বিশ্বের সমৃদ্ধ সাহিত্য পাঠের তালিকায় তুলে ধরা যাচ্ছে না। প্রতিবন্ধক কখনো ভাষা আবার কখনো অর্থনীতি। আর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা যে আমাদের সীমাবদ্ধ মানসিকতা কিংবা সদিচ্ছার— তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যায়।

আমাদের সমসামিয়ক বাংলা কবিতা ঐ একই তিমিরে হাবুডুবু খেলেও আমরা কিন্তু বিশ্বকবিতার রসাস্বাদন থেকে পিছিয়ে নেই। বাঙালি পাঠক এ ব্যাপারে কখনোই পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘দেবে আর নেবে, মিলিবে মিলাবে’ এই উক্তি আর কোনোদিন সত্যে প্রমাণিত হয়নি। শুধু দিয়ে গেছি, আর দিয়েই যাচ্ছি, নিতে পারছি না কিছুই। আমরা প্রভাবশালী ভাষার সাহিত্য পাঠ করে আপ্লুত হচ্ছি; তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তারই অনুসরণ-অনুকরণে বাংলায় সাহিত্য রচনা করছি। কিন্তু আমাদের সাহিত্যও যে তাদের পাঠের প্রয়োজন থাকতে পারে, আমাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-দেশ-মানুষকে তাদের ভেতরেও উপস্থাপন জরুরি— বাঙালি মানসে তা আজও যেন উপলব্ধিতে এলো না। সক্ষমতা এলো না আমাদের সাহিত্যকে তাদের ভাষায় অনুবাদ করে তাদের পাঠ তালিকায় তুলে ধরার। কিন্তু প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে আমরা ঠিকই তাদের সাহিত্যকে অনুবাদ করে নিজের পাণ্ডিত্যকে জানান দেবার জন্য তুলে দিচ্ছি বাংলা ভাষার পাঠককুলে। বিদেশি কবিতা পাঠের জন্য আমাদের কসরতের অন্ত নেই। যেহেতু সে সহজলভ্য একটি পথে উঠে এসেছে দু’তিনটি সহজলভ্য ভাষার মাধ্যমে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাঙালি হয়ে জন্ম নেয়াটা যেমন আমাদের এক ধরনের অপরাধ, তারও চেয়ে বড় অপরাধ বাংলায় কবিতা রচনা? কারণ বাংলা কবিতা আজও পর্যন্ত পৃথিবীর মুখ দেখেনি। কোনো দিন দেখবে হয়তো; সেই আশাতেই আজও বাঙালির ঘরে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য কবি-লেখক-সাহিত্যিক। কিংবা কোনোদিন দেখবেই না— জন্ম নিচ্ছে সেই অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়েও। শুধু ভাবতে ভাল লাগে যে আমাদের কবিতাও বিশ্ব কবিতার অংশ। কিন্তু আমাদের কবিতা অন্য বিশ্বের পাঠকের পাঠ্য কিনা সে প্রশ্নের উত্তর আজও ধোঁয়ায় মোড়ানো তমসা। 

প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য নয়, আমরা সারা বিশ্বের কবি-লেখক-শিল্পী সবাই একই বিশ্বের, একই গ্রামের বাসিন্দা। আমাদের মধ্যে দেশ-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-ধনী-দরিদ্র যেন কোনো প্রাচীর বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে না পারে, সে-লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এগুতে হবে। মানি আর না মানি তবু বিনিময় হবে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা ভাবনারও। আর গ্রহণ করবো যেটা উত্তম সেটাই। 

ভাবি, সেই দিন আরও কত দূর, যেদিন আমরাও ভালো-মন্দ বাছবিচারের সীমায় দাঁড়িয়ে কূলে ভেড়াতে সক্ষম হবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই কাব্যভাণ্ডারে সমৃদ্ধ ভেলাখানি? তবু না হয় একদিন আমরা পৌঁছে যেতে পারি; তবু না হয় সে সুদিন এসে অচিরেই কড়া নাড়বে আমাদের অলস দরজায়; কিন্তু ততদিনে আমাদের বিশ্বকবিতা-বিশ্বসাহিত্য আরও কত কতভাবে, আরও কত কতবার নতুন জীবন নতুন সম্ভাবনাকে ঘেঁটে-ফুঁড়ে নতুন নতুন ইতিহাসের পাতায় মুদ্রিত হবে, তা কি আমরা ভাবনায় নিয়ে আছি? নিশ্চয় ভাবি, সন্তানের ভবিষ্যতের মতো প্রতিদিনই শিল্প-সাহিত্যের স্রষ্টারা মনের অগোচরে হলেও তাদের শ্রমসাধ্য সৃষ্টির পরিণতি কিংবা আগামী নিয়ে ভেবে থাকেন। কিন্তু তার শেষটা কেউ কোনোদিন খুঁজে পেয়েছেন— এমনটা এখনো শুনিনি। আশার তরী ভেসে চলেছে আমাদের অনিশ্চিত যাত্রায়। যেমন আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেসে চলেছে ক্রমশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, রাজনৈতিক দলের রোষানলের ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর দিয়ে; তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত জীবন অনিশ্চিত সুন্দর আগামীর ভঙ্গুর পথের যাত্রীই ধরে নিতে পারি। নির্বিশেষ সবকিছুর উর্ধে দেশপ্রেমকেন্দ্রিক দেশসাশন, শুভচিন্তাতাড়িত মহৎপরিকল্পনা, ব্যক্তি কিংবা দলের চেয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কিংবা দেশের প্রকৃত সম্মান রক্ষার্থে পরিচালিত সুসাশন ব্যতীত যে শিল্প-সাহিত্য কখনো আগামীর শৃঙ্খল ভাঙতে পারে না; এখনো হয়তো তা আমাদের বোধোদয়ে আসেনি। সিংহভাগ মেধাবি কবি-লেখক-সাহিত্যিকের সুযোগ বুঝে শাসকশ্রেণির পদলেহন এবং ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ায় এ প্রতিবন্ধকতার দেয়াল সমুখ থেকে সরানো যাচ্ছে না। কিংবা কবি-লেখক-শিল্পীদের সত্যিকারের শিল্পের জন্য জীবনোৎসর্গের মানসিকতা ভঙ্গুর হয়ে পড়ায় আজ আমাদের লেখকগণ ব্যক্তিগৌরব, ব্যক্তিখ্যাতি অর্জনেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে কবিতা বা শিল্পের খ্যাতিই যে কবি বা শিল্পীকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিতে পারে— খুব নিবিড়ভাবে তা এখন ভাববার সময়। এখনই সময় কিংবা অনেকটাই দেরি করে ফেলেছি আমরা সেই পথ অনুসরণে— যে পথ একদিন বেছে নিয়েছিল আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার সম্মিলিত লেখক সমাজ; এবং প্রভাবিত করেছিল শাসকের স্থবিরচিন্তাকেও। আজ আর ইউরোপ কিংবা আমেরিকা-ইংল্যান্ডের হাতে সাহিত্যের নেতৃত্ব কল্পনা করা যাচ্ছে না; তা এখন জুড়ে বসেছে আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার উর্বর ভূমি। কিছুটা মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যও এখন অনেক বেশি আত্মপরিচয় অনুসন্ধানী। এখনই সময় সম্মিলিত লেখক সমাজের সেই মহতী উদ্যোগে আমাদেরও ঝাঁপিয়ে পড়া। এখনই সময় এ রাষ্ট্রের সেই গ্রাহ্যনীয় ইন্দ্রিয়ে এ আহ্বান পৌঁছে দেয়া। অন্যথা আমাদের স্বসৃষ্ট সমাধীতে পতিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

আরো যে লজ্জার বিষয়টি আমাদের একটুও ভাবিত করে না, সেটি হলো আমাদের শিল্পের নিজস্ব কোনো আইডেন্টিটি না থাকা। এখনো আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্যকর্ম বা শিল্পকর্ম বহির্বিশ্বে পরিচিত হয় ‘ভারতীয়’ হিসেবে। তাকে ‘বাংলাদেশি’ করে তোলার ব্যাপারে আমাদের অন্ধত্ব নিজেরাই আয়নায় দেখে থাকি। দেশভাগের এই আট দশকেও এই নির্লজ্জতা আমাদের কোনো চিন্তানায়ক থেকে খ্যাতিমান সাহিত্যিক পর্যন্ত কাউকে নাড়া দিতে পারেনি। অথচ লক্ষ লক্ষ বীরের তাজা রক্ত, মা-বোনের সম্মান খোয়ানোর বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি। এই বাংলাদেশই বরীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ বানিয়েছে, এই বাংলার প্রকৃতি-ঐতিহ্য স্বভাবই গড়ে তুলেছে বাংলা ভাষার সেরা সব কবি-লেখক-শিল্পীকে। এত অর্জন এত আত্মত্যাগের পরও কেন আমরা ক্রমশ অন্ধকার সুড়ঙ্গতলে হারিয়ে যাচ্ছি— বড় বেদনার স্বরে সেই জিজ্ঞাসা আজ বাজে মর্মমূলে। কিন্তু সমাধানের উপায় বুঝি সুদূর থেকে সুদূরেই চলে যাবে, যদি সকলে মিলে দেশের স্বার্থে দেশকে ভালো না বাসি। যদি সকলে মিলে শিল্পের চূড়ান্ত জিজ্ঞাসায় যথার্থ উত্তর দিতে না পারি এবং তাকে টেনে নিয়ে যেতে না পারি সর্বোচ্চ সীমায়। তবু এত নেতি এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা সেই আশায় বুক বেঁধেছি যে, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকা, কোরিয়া, চায়নার মতো এই বাংলার কবিরা একদিন তাদের নির্জনতম কবি জীবনানন্দের স্বরে মাথা উঁচু করে শোনাবে বিশ্বচরাচরে— 

“কেহ যাহা জানে নাই— কোনো এক বাণী—
আমি বহে আনি;
...
আমার পায়ের শব্দ শোনো—
নতুন এ— আর সব হারানো— পুরনো।”   



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত