হাইকেল হাশমীর কবিতা
শব্দের ঘূর্ণিপাকে
নীরবতাই যেন এক উচ্চারণ—
এক ডুবে যাওয়া হৃদয়ের
এটাই শেষ জ্ঞাপন।
ঠোঁটের মৌনতা
একটি নিঃশব্দ প্রার্থনা,
চোখের ক্ষীণ নড়াচড়া
একান্ত শেষ আরাধনা।
শব্দের ঘূর্ণিতে
নীরবতা সংযমের চরম সীমা।
তারপর তো—
শুধুই নীরবতা...
নেই কোনো ডাক,
নেই কোনো সাড়া।
প্রতীক্ষার ঋতু
আমার অস্তিত্বের মরুপ্রান্তে
একটি শুকনো বৃক্ষ দাঁড়িয়ে একাকী,
পাতাহীন, ফুলহীন, ফলহীন—
লু-হাওয়ার দহনবাতাসে
পুড়ে তার নিঃসঙ্গ দেহ।
অবহেলিত হৃদয়ের গভীরে
জেগে উঠে বিরহের ঋতু,
চোখে জেগে থাকে
অন্তহীন অপেক্ষার ঋতু,
আশার শুকনো পাতা ঝরা
হাহাকার বিলাপের ঋতু,
নাগফণীর বুকে
অকারণে বসন্তের ঋতু।
এই জীবনের মরুপ্রান্ত জুড়ে
শুধুই মরীচিকার বিভ্রমের ঋতু,
বিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিঝড়ের ভিতরে
ধূলিকণার অদৃশ্য বেদনার ঋতু।
এই সময়, এই ক্ষণ, এই মুহূর্ত—
সবই তোমার বিরহের ঋতু,
হে প্রিয়া, এই জীবন এখন
কেবল তোমার প্রতীক্ষার ঋতু!
বিনোদন
সারা রাত জেগে কাটিয়েছি আমি,
শুধু তোমার কথাই ভেবেছি আমি।
মনের কথা কীভাবে বলি—
তোমার স্মৃতির সাথে
তর্কে জড়িয়ে গিয়েছি আমি।
তারপর স্মৃতির বৃক্ষ থেকে
অপ্রাপ্তির ক্ষত কুড়িয়ে এনেছি আমি।
যখন ভোর হয়
মনের কুয়াশায় চাপা পড়ে থাকা
তোমার আকাঙ্ক্ষা, তোমার স্নিগ্ধ রূপ,
রক্তাক্ত ভাবনা আর আহত কল্পনা
ফিরে পায় তার মন ও দেহ—
তারপর ঠোঁটে তিক্ত হাসি সাজিয়ে
আবার বের হয়ে পড়ি রিফু করতে
বেদনার চাদর আর জীর্ণ পোশাক।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি
এটাই প্রাণের একমাত্র বিনোদন।
হতাশা
অধরে গুনগুন করা নীরবতা,
নীরব হৃদয়ের মাঝে শব্দের ঘূর্ণিঝড়,
নিজ সত্তায় লেপ্টে থাকা অপূর্ণতা,
নিজ শিরাকে কেটে দেওয়ার মতো বিষণ্নতা
আর ক্লান্ত দৃষ্টিতে কেবলই অশান্তি—
তোমার ভাবনা গ্রীবার ধমনীর চেয়েও কাছে,
তবে কেন এত অনিচ্ছা?
তবে কেন এত হতাশা?
অন্বেষণ
এখন শুধু তোমার স্মৃতি আমার সঙ্গী
সহযাত্রীরা কবে ছেড়ে চলে গেছে,
গন্তব্য নিজের দিক বদলাতে থাকলো
আর পথগুলো অজানা দিগন্তে হারিয়ে গেছে।
তোমাকে ভাবতে ভাবতে পথে হেঁটে চলেছি
কখন সাহস ফুরিয়ে গেল— টের পাইনি।
তোমার আকাঙ্ক্ষাও
ঝলমলে মরীচিকায় রূপান্তরিত হয়েছে,
আমিও তোমার সন্ধানের বাসনাকে
জীবনের উত্তপ্ত মরুভূমিতে ছেড়ে এসেছি।
শরতের দিনে
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
স্বচ্ছ শরতের আকাশে।
নীলের পর নীল,
যতদূর আমার চোখ যায়।
মনে হয়, আকাশের নীল শামিয়ানা
নিজেকে আরও সরিয়ে নিয়েছে
আরও উঁচু নতুন কোনো উচ্চতায়।
এই ভ্যাপসা দিনগুলোতে,
সূর্যের কাছ থেকে সরাসরি
পৃথিবীর বুকে নেমে আসে তাপ;
আর রাতে,
পৃথিবী তার সঞ্চিত উত্তাপ
ফিরিয়ে দেয় আকাশকে।
আর এরই মাঝে,
আমি, এক অস্থির আত্মা—ভাবি:
কোথায় যাব আমি
একটু ছায়ার খোঁজে?
হয়তো সেই বৃক্ষের নিচে
যার ছায়ার মাঝেও উত্তাপ,
সে তার সকল শীতলতা বিলিয়ে দিয়েছে
শরতের বেদিতে,
অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে,
বসন্ত ফিরে আসবে—কিছু দিনের মধ্যে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের নিচে
ছায়ারা এসে বিশ্রাম করে।
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
নীল আকাশের শেষ প্রান্তে,
খুঁজতে থাকে—
শীতল দিন রাত কোথায় হারিয়ে গেল?
আমি তাদের ডেকে বলি:
ফিরে এসো—
ফিরে এসো এই উত্তপ্ত পৃথিবীর কাছে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের ভেতর দিয়ে
গরম হাওয়া বয়ে যায়,
শিস দিতে দিতে।
চিরসঙ্গী
কেউ কি দরজার কড়া নাড়লো
কে? জিজ্ঞেস করি,
শাঁ শাঁ শব্দ
বাতাস হেসে বলে
এটা তো আমি।
কেউ কানে কানে আমায় বলে গেলো
আমি আছি তোমার সাথে।
আমি বলি কে তুমি?
হেসে বলে কেন আমি নিঃসঙ্গতা
তোমার চিরসঙ্গী!
গন্তব্য
তুমি কি জানো
আমরা দুটি আলাদা সত্তা
একত্রে— আমরা একটি বিশ্বাস
পড়ে আছি একে অন্যের পাশে
হয়ে সমান্তরাল রেখা।
নিঃশব্দ ভাষা
ভাবনার নৃত্যরত অদৃশ্য মুদ্রা
আঁকছে মনের আকাশে কতো কবিতা।
দুটি সত্তা
বয়ে চলে নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত হয়ে
গন্তব্য তাদের ওই একটা।
ভালো আছি
জীবনের কিছু স্বপ্ন আছে
কিছু অমূল্য রত্ন আছে
হ্যাঁ, ওই স্বপ্নে আমি আছি
হ্যাঁ, ওই স্বপ্নে তুমি আছো
আমার দীর্ঘশ্বাস আছে
তোমার মিথ্যা আশ্বাস আছে
মিলনের শুভ্র আশা আছে
বিরহের ধুধু নিরাশা আছে
তোমার জন্য ভালোবাসা আছে
আর না পাওয়ার হতাশা আছে
তোমার মধুর হাসি আছে
আমার চাপা কান্না আছে
না বলা কতো কথা আছে
না বোঝা সব ভাষা আছে
দিনের উত্তপ্ত প্রতীক্ষা আছে
রাতের ব্যাকুল ব্যথা আছে
তুমি আমার ভাবনায় আছো
স্বপ্ন হয়ে ঘুমের মাঝে আছো
তুমি আছো, আমি আছি
কিন্তু কতো দূরে দূরে আছি
এই সব নিয়ে বেঁচে আছি
আমি তো বেশ ভালো আছি।
চোখ আমার, স্বপ্ন তোমার
দুটি চোখ তো আমার!
চোখে স্বপ্ন
সেটা কেন তোমার?
না
না
যেও না,
বলেছো বার বার
সত্যি বলেছো?
না।
পাথর
পাথরের যুগ আবার ফিরে এসেছে
মন পাথর
দৃষ্টি পাথর
আবেগ পাথর
প্রেম, ভালোবাসা পাথর।
এই পাথরের শহরে
আমরা সবাই পাথর
সবই ভিন্ন ধরনের পাথর
ভিন্ন আকারের পাথর।
এখন অপেক্ষা একজন ভাস্করের
সে একদিন আসবে
এই সব পাথর কেটে
গড়বে আবার মানবতার মূর্তি
ওই দিনের অপেক্ষায়
আমাদের চোখ হয়েছে পাথর!
শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন
শব্দের ভাণ্ডার শূন্য
কণ্ঠ জানি না কোন ভয়ে রুদ্ধ
ধবধবে সাদা কাগজের পাতায়
ধ্বনি নেয় না অক্ষরের রূপ।
লেখা হয় না কোন কবিতা
লেখা হয় না কোন গল্প
মস্তিষ্কের ঘন অন্ধকার গলিতে শব্দ সব দিশেহারা।
শব্দগুলো সব নির্বাসিত
অক্ষরগুলো সব দ্বীপান্তরিত
কল্পনা সব বিতাড়িত
চিন্তা সব বহিষ্কৃত
মনের পৃথিবী একেবারে আবেগশূন্য।
এমন শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশে
প্রিয়তমা তোমার অনুরোধ
আমি যেনো লিখি কবিতা তোমার জন্য।
তুমি করেছো আবেদন
আমি বুনি আবার নতুন গান।
তোমার নিবেদন
গল্পে বুনি স্বপ্নের জাল।
তোমার কথা মেনে নিলাম কিন্তু
এনে দাও আমায় অনন্তচিন্তা করার অধিকার।
সমতল জীবন
জীবনের
উঁচুনিচু পথ
যদি সমতল হয়ে যায়
তবে
ইসিজি’র সোজা দাগের মতো
জীবন
থমকে দাঁড়ায়!
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
হাইকেল হাশমী একজন বাংলাদেশি কবি, ছোটগল্পকার ও অনুবাদক। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের ঢাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং ইতালির মিলানের বোকোনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ব্যাংকিং খাতে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘকাল। হাইকেল বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখালেখি করেন। বাংলায় তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ এবং ছয়টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। রয়েছে তার ইংরেজি কাব্যগ্রন্থও। তাঁর অনূদিত কাজের মধ্যে রয়েছে উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি লেখা থেকে বাংলায় অনুবাদ এবং এর বিপরীত রূপ। তাঁর সাহিত্যকর্ম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। তিনি বিখ্যাত প্রগতিশীল উর্দু কবি নওশাদ নূরীর একমাত্র পুত্র।

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হাইকেল হাশমীর কবিতা
শব্দের ঘূর্ণিপাকে
নীরবতাই যেন এক উচ্চারণ—
এক ডুবে যাওয়া হৃদয়ের
এটাই শেষ জ্ঞাপন।
ঠোঁটের মৌনতা
একটি নিঃশব্দ প্রার্থনা,
চোখের ক্ষীণ নড়াচড়া
একান্ত শেষ আরাধনা।
শব্দের ঘূর্ণিতে
নীরবতা সংযমের চরম সীমা।
তারপর তো—
শুধুই নীরবতা...
নেই কোনো ডাক,
নেই কোনো সাড়া।
প্রতীক্ষার ঋতু
আমার অস্তিত্বের মরুপ্রান্তে
একটি শুকনো বৃক্ষ দাঁড়িয়ে একাকী,
পাতাহীন, ফুলহীন, ফলহীন—
লু-হাওয়ার দহনবাতাসে
পুড়ে তার নিঃসঙ্গ দেহ।
অবহেলিত হৃদয়ের গভীরে
জেগে উঠে বিরহের ঋতু,
চোখে জেগে থাকে
অন্তহীন অপেক্ষার ঋতু,
আশার শুকনো পাতা ঝরা
হাহাকার বিলাপের ঋতু,
নাগফণীর বুকে
অকারণে বসন্তের ঋতু।
এই জীবনের মরুপ্রান্ত জুড়ে
শুধুই মরীচিকার বিভ্রমের ঋতু,
বিক্ষুব্ধ ঘূর্ণিঝড়ের ভিতরে
ধূলিকণার অদৃশ্য বেদনার ঋতু।
এই সময়, এই ক্ষণ, এই মুহূর্ত—
সবই তোমার বিরহের ঋতু,
হে প্রিয়া, এই জীবন এখন
কেবল তোমার প্রতীক্ষার ঋতু!
বিনোদন
সারা রাত জেগে কাটিয়েছি আমি,
শুধু তোমার কথাই ভেবেছি আমি।
মনের কথা কীভাবে বলি—
তোমার স্মৃতির সাথে
তর্কে জড়িয়ে গিয়েছি আমি।
তারপর স্মৃতির বৃক্ষ থেকে
অপ্রাপ্তির ক্ষত কুড়িয়ে এনেছি আমি।
যখন ভোর হয়
মনের কুয়াশায় চাপা পড়ে থাকা
তোমার আকাঙ্ক্ষা, তোমার স্নিগ্ধ রূপ,
রক্তাক্ত ভাবনা আর আহত কল্পনা
ফিরে পায় তার মন ও দেহ—
তারপর ঠোঁটে তিক্ত হাসি সাজিয়ে
আবার বের হয়ে পড়ি রিফু করতে
বেদনার চাদর আর জীর্ণ পোশাক।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি
এটাই প্রাণের একমাত্র বিনোদন।
হতাশা
অধরে গুনগুন করা নীরবতা,
নীরব হৃদয়ের মাঝে শব্দের ঘূর্ণিঝড়,
নিজ সত্তায় লেপ্টে থাকা অপূর্ণতা,
নিজ শিরাকে কেটে দেওয়ার মতো বিষণ্নতা
আর ক্লান্ত দৃষ্টিতে কেবলই অশান্তি—
তোমার ভাবনা গ্রীবার ধমনীর চেয়েও কাছে,
তবে কেন এত অনিচ্ছা?
তবে কেন এত হতাশা?
অন্বেষণ
এখন শুধু তোমার স্মৃতি আমার সঙ্গী
সহযাত্রীরা কবে ছেড়ে চলে গেছে,
গন্তব্য নিজের দিক বদলাতে থাকলো
আর পথগুলো অজানা দিগন্তে হারিয়ে গেছে।
তোমাকে ভাবতে ভাবতে পথে হেঁটে চলেছি
কখন সাহস ফুরিয়ে গেল— টের পাইনি।
তোমার আকাঙ্ক্ষাও
ঝলমলে মরীচিকায় রূপান্তরিত হয়েছে,
আমিও তোমার সন্ধানের বাসনাকে
জীবনের উত্তপ্ত মরুভূমিতে ছেড়ে এসেছি।
শরতের দিনে
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
স্বচ্ছ শরতের আকাশে।
নীলের পর নীল,
যতদূর আমার চোখ যায়।
মনে হয়, আকাশের নীল শামিয়ানা
নিজেকে আরও সরিয়ে নিয়েছে
আরও উঁচু নতুন কোনো উচ্চতায়।
এই ভ্যাপসা দিনগুলোতে,
সূর্যের কাছ থেকে সরাসরি
পৃথিবীর বুকে নেমে আসে তাপ;
আর রাতে,
পৃথিবী তার সঞ্চিত উত্তাপ
ফিরিয়ে দেয় আকাশকে।
আর এরই মাঝে,
আমি, এক অস্থির আত্মা—ভাবি:
কোথায় যাব আমি
একটু ছায়ার খোঁজে?
হয়তো সেই বৃক্ষের নিচে
যার ছায়ার মাঝেও উত্তাপ,
সে তার সকল শীতলতা বিলিয়ে দিয়েছে
শরতের বেদিতে,
অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে,
বসন্ত ফিরে আসবে—কিছু দিনের মধ্যে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের নিচে
ছায়ারা এসে বিশ্রাম করে।
আমার ভাবনাগুলো উড়ে বেড়ায়
নীল আকাশের শেষ প্রান্তে,
খুঁজতে থাকে—
শীতল দিন রাত কোথায় হারিয়ে গেল?
আমি তাদের ডেকে বলি:
ফিরে এসো—
ফিরে এসো এই উত্তপ্ত পৃথিবীর কাছে।
এদিকে,
তুষার-সাদা কাশবনের ভেতর দিয়ে
গরম হাওয়া বয়ে যায়,
শিস দিতে দিতে।
চিরসঙ্গী
কেউ কি দরজার কড়া নাড়লো
কে? জিজ্ঞেস করি,
শাঁ শাঁ শব্দ
বাতাস হেসে বলে
এটা তো আমি।
কেউ কানে কানে আমায় বলে গেলো
আমি আছি তোমার সাথে।
আমি বলি কে তুমি?
হেসে বলে কেন আমি নিঃসঙ্গতা
তোমার চিরসঙ্গী!
গন্তব্য
তুমি কি জানো
আমরা দুটি আলাদা সত্তা
একত্রে— আমরা একটি বিশ্বাস
পড়ে আছি একে অন্যের পাশে
হয়ে সমান্তরাল রেখা।
নিঃশব্দ ভাষা
ভাবনার নৃত্যরত অদৃশ্য মুদ্রা
আঁকছে মনের আকাশে কতো কবিতা।
দুটি সত্তা
বয়ে চলে নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত হয়ে
গন্তব্য তাদের ওই একটা।
ভালো আছি
জীবনের কিছু স্বপ্ন আছে
কিছু অমূল্য রত্ন আছে
হ্যাঁ, ওই স্বপ্নে আমি আছি
হ্যাঁ, ওই স্বপ্নে তুমি আছো
আমার দীর্ঘশ্বাস আছে
তোমার মিথ্যা আশ্বাস আছে
মিলনের শুভ্র আশা আছে
বিরহের ধুধু নিরাশা আছে
তোমার জন্য ভালোবাসা আছে
আর না পাওয়ার হতাশা আছে
তোমার মধুর হাসি আছে
আমার চাপা কান্না আছে
না বলা কতো কথা আছে
না বোঝা সব ভাষা আছে
দিনের উত্তপ্ত প্রতীক্ষা আছে
রাতের ব্যাকুল ব্যথা আছে
তুমি আমার ভাবনায় আছো
স্বপ্ন হয়ে ঘুমের মাঝে আছো
তুমি আছো, আমি আছি
কিন্তু কতো দূরে দূরে আছি
এই সব নিয়ে বেঁচে আছি
আমি তো বেশ ভালো আছি।
চোখ আমার, স্বপ্ন তোমার
দুটি চোখ তো আমার!
চোখে স্বপ্ন
সেটা কেন তোমার?
না
না
যেও না,
বলেছো বার বার
সত্যি বলেছো?
না।
পাথর
পাথরের যুগ আবার ফিরে এসেছে
মন পাথর
দৃষ্টি পাথর
আবেগ পাথর
প্রেম, ভালোবাসা পাথর।
এই পাথরের শহরে
আমরা সবাই পাথর
সবই ভিন্ন ধরনের পাথর
ভিন্ন আকারের পাথর।
এখন অপেক্ষা একজন ভাস্করের
সে একদিন আসবে
এই সব পাথর কেটে
গড়বে আবার মানবতার মূর্তি
ওই দিনের অপেক্ষায়
আমাদের চোখ হয়েছে পাথর!
শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন
শব্দের ভাণ্ডার শূন্য
কণ্ঠ জানি না কোন ভয়ে রুদ্ধ
ধবধবে সাদা কাগজের পাতায়
ধ্বনি নেয় না অক্ষরের রূপ।
লেখা হয় না কোন কবিতা
লেখা হয় না কোন গল্প
মস্তিষ্কের ঘন অন্ধকার গলিতে শব্দ সব দিশেহারা।
শব্দগুলো সব নির্বাসিত
অক্ষরগুলো সব দ্বীপান্তরিত
কল্পনা সব বিতাড়িত
চিন্তা সব বহিষ্কৃত
মনের পৃথিবী একেবারে আবেগশূন্য।
এমন শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশে
প্রিয়তমা তোমার অনুরোধ
আমি যেনো লিখি কবিতা তোমার জন্য।
তুমি করেছো আবেদন
আমি বুনি আবার নতুন গান।
তোমার নিবেদন
গল্পে বুনি স্বপ্নের জাল।
তোমার কথা মেনে নিলাম কিন্তু
এনে দাও আমায় অনন্তচিন্তা করার অধিকার।
সমতল জীবন
জীবনের
উঁচুনিচু পথ
যদি সমতল হয়ে যায়
তবে
ইসিজি’র সোজা দাগের মতো
জীবন
থমকে দাঁড়ায়!
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
হাইকেল হাশমী একজন বাংলাদেশি কবি, ছোটগল্পকার ও অনুবাদক। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের ঢাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং ইতালির মিলানের বোকোনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ব্যাংকিং খাতে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘকাল। হাইকেল বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখালেখি করেন। বাংলায় তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ এবং ছয়টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। রয়েছে তার ইংরেজি কাব্যগ্রন্থও। তাঁর অনূদিত কাজের মধ্যে রয়েছে উর্দু, হিন্দি ও ইংরেজি লেখা থেকে বাংলায় অনুবাদ এবং এর বিপরীত রূপ। তাঁর সাহিত্যকর্ম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। তিনি বিখ্যাত প্রগতিশীল উর্দু কবি নওশাদ নূরীর একমাত্র পুত্র।

আপনার মতামত লিখুন