চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) চিমনিগুলো কয়েক মাস ধরে নিষ্ক্রিয়। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারটির বার্ষিক শোধনক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। বাকিটা বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কিনে মেটাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা সুয়েজ খালের অনিশ্চয়তা—যেকোনো একটা কারণেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ লাইনম্যানের মতো টান টান হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে গতি পেয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) প্রকল্প। ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য গত ৩ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। নতুন ইউনিট চালু হলে ইআরএলের শোধনক্ষমতা ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়বে। দেশের মোট শোধনক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে।
দেড় দশকের অপেক্ষা
ইআরএল-২ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২০০ একর জায়গার এক পাশে ৭০ একর জমিতে নতুন ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ফ্রান্সের টেকনিপ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু দীর্ঘদিন বৈদেশিক ঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পটি থমকে যায়।
বারবার সংশোধনের পর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ঠেকেছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায়। সম্প্রতি তা কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইডিবি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পে নতুন গতি এসেছে।
বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “ফিডটা খুবই যথার্থ হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই ফেজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস হয়ে গেলে পরবর্তী ধাপগুলোতে সেগুলো আর রিকভার করা সম্ভব হয় না।”
২০১৮ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ আজ দ্বিতীয় রিফাইনারিটি চালু থাকার কথা। কিন্তু প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। তবে ২০২৯ সালের মধ্যেই নতুন ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে ভূমিকা
ইআরএল-২ চালু হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কী পরিবর্তন আসবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। বর্তমানে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ৪০ থেকে ৪২ লাখ মেট্রিক টন। ইআরএল বছরে প্রায় ৬.৫ লাখ টন ডিজেল উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ। বাকিটা আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল মোট ১৫.৩৩ লাখ টন জ্বালানি উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ ছিল ৬.৪৮ লাখ টন।
নতুন ইউনিট চালু হলে ইআরএল বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারবে। ডিজেলের হিসাবে এটা বড় রকমের স্বস্তি। ইআরএল-২ থেকে বছরে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ টন ডিজেল পাওয়া যাবে। তাহলে দেশীয় শোধনাগার থেকে মোট ডিজেল উৎপাদন হবে প্রায় ২০ লাখ টন। বাকি ২০ থেকে ২২ লাখ টন এখনো আমদানি করতে হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিমের হিসাব মতে, “৩ মিলিয়ন টনের ৪৫% ইজ ১.২, ১.৩ মিলিয়ন টন... তার মানে আমি ১৪ লক্ষ টনের মতো ডিজেল পাব। আর আগেরটার থেকে... এখনকার রিফাইনারি থেকে আমি পাই। তো ৭ আর এটা মিলে টোটাল ২০ লক্ষ টন আমি পাব যদি আমি ৩ লাখ টনের নতুন একটা রিফাইনারি করি। এর পরেও আমাকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টন আমাকে ইমপোর্ট করতে হবে, ডিজেল।” অর্থাৎ ইআরএল-২ পুরোপুরি জ্বালানি সংকট সমাধান করবে না, তবে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব
ইআরএল-২ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতায়। গত এপ্রিলে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেলের মজুদ শেষ হয়ে প্রায় ২৬ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। কারণ সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেলের চালান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিলম্বিত হয়েছিল। সর্বশেষ চালান এসেছিল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জ্বালানি তেল আমদানিতে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে। প্রায় এক লাখ টন ধারণক্ষমতার মাদার ট্যাংকার এমটি নিনিমিয়া সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালি ও উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন। সরাসরি পথে আসার সুযোগ থাকলে সময় লাগত ১৩ থেকে ১৫ দিন। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কেনা বিপিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে প্রণালী ও সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলেও নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ইউনিটটি বড় ভূমিকা রাখবে।”
ইতোমধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধানে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার অপরিশোধিত তেলের নমুনা পরীক্ষা করে ইআরএল। এসব তেল বিদ্যমান শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাতের উপযোগী বলে চিহ্নিত হয়েছে। তবে ইআরএল-২ চালু হলে শোধনাগারটি আরও উন্নত প্রযুক্তির হবে, যা সৌদি আরব ও আমিরাতের বাইরেও আরও বেশি উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে।
শোধনক্ষমতা বাড়লেও প্রস্তুতি চাই
ইআরএল-২ প্রকল্প শুধু শোধনক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত আছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা। প্রকল্প পরিচালক ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে কার্যালয় খুলে কার্যক্রম শুরু করেছেন। ২০২৯ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সময়মতো সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মজুত সক্ষমতা। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত ১৪ দিনের। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা উচিত। সরকার মজুত ক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিপিসি ৪৩ দিনের তেল মজুতের মতো ট্যাংক চিহ্নিত করেছে। আরও ৮-১০ দিনের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “সেকেন্ড রিফাইনারি নিয়ে সব সময়ই এক ধরনের দ্বিধা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে যে এটি একেবারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত ছিল এবং দ্বিতীয় রিফাইনারি স্থাপনের যে জরুরি প্রয়োজন, সেটি কোনো সরকারের কাছেই কখনো তেমনভাবে ছিল না। তারা বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে, সিদ্ধান্তও নিয়েছে, কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত ছিল আধা-আধা বা দ্বিধান্বিত।”
তবে আইডিবি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পটি এবার আর হাফ-হার্টেড থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইআরএল-২ শুধু ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াবে না, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিতও মজবুত করবে। বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কেনার বদলে নিজস্ব শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কম হলে দেশীয় ভোক্তারাও স্বস্তিতে থাকবেন।
ইআরএল-২ কেবল একটি শোধনাগার নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার এক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আগামী কয়েক দশকে দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়বে। সেই চাহিদা মেটাতে ইআরএল-২ হয়তো যথেষ্ট হবে না, কিন্তু এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো তৃতীয় ইউনিট কিংবা আরও বড় পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করবে।

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) চিমনিগুলো কয়েক মাস ধরে নিষ্ক্রিয়। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগারটির বার্ষিক শোধনক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। বাকিটা বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কিনে মেটাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা সুয়েজ খালের অনিশ্চয়তা—যেকোনো একটা কারণেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ লাইনম্যানের মতো টান টান হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে গতি পেয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) প্রকল্প। ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য গত ৩ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। নতুন ইউনিট চালু হলে ইআরএলের শোধনক্ষমতা ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়বে। দেশের মোট শোধনক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে।
দেড় দশকের অপেক্ষা
ইআরএল-২ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২০০ একর জায়গার এক পাশে ৭০ একর জমিতে নতুন ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ফ্রান্সের টেকনিপ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। কিন্তু দীর্ঘদিন বৈদেশিক ঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পটি থমকে যায়।
বারবার সংশোধনের পর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ঠেকেছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায়। সম্প্রতি তা কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইডিবি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পে নতুন গতি এসেছে।
বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “ফিডটা খুবই যথার্থ হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই ফেজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস হয়ে গেলে পরবর্তী ধাপগুলোতে সেগুলো আর রিকভার করা সম্ভব হয় না।”
২০১৮ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ আজ দ্বিতীয় রিফাইনারিটি চালু থাকার কথা। কিন্তু প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। তবে ২০২৯ সালের মধ্যেই নতুন ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে ভূমিকা
ইআরএল-২ চালু হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কী পরিবর্তন আসবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। বর্তমানে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ৪০ থেকে ৪২ লাখ মেট্রিক টন। ইআরএল বছরে প্রায় ৬.৫ লাখ টন ডিজেল উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ। বাকিটা আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল মোট ১৫.৩৩ লাখ টন জ্বালানি উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ ছিল ৬.৪৮ লাখ টন।
নতুন ইউনিট চালু হলে ইআরএল বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করতে পারবে। ডিজেলের হিসাবে এটা বড় রকমের স্বস্তি। ইআরএল-২ থেকে বছরে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ টন ডিজেল পাওয়া যাবে। তাহলে দেশীয় শোধনাগার থেকে মোট ডিজেল উৎপাদন হবে প্রায় ২০ লাখ টন। বাকি ২০ থেকে ২২ লাখ টন এখনো আমদানি করতে হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিমের হিসাব মতে, “৩ মিলিয়ন টনের ৪৫% ইজ ১.২, ১.৩ মিলিয়ন টন... তার মানে আমি ১৪ লক্ষ টনের মতো ডিজেল পাব। আর আগেরটার থেকে... এখনকার রিফাইনারি থেকে আমি পাই। তো ৭ আর এটা মিলে টোটাল ২০ লক্ষ টন আমি পাব যদি আমি ৩ লাখ টনের নতুন একটা রিফাইনারি করি। এর পরেও আমাকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টন আমাকে ইমপোর্ট করতে হবে, ডিজেল।” অর্থাৎ ইআরএল-২ পুরোপুরি জ্বালানি সংকট সমাধান করবে না, তবে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব
ইআরএল-২ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতায়। গত এপ্রিলে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেলের মজুদ শেষ হয়ে প্রায় ২৬ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। কারণ সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেলের চালান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিলম্বিত হয়েছিল। সর্বশেষ চালান এসেছিল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জ্বালানি তেল আমদানিতে দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে। প্রায় এক লাখ টন ধারণক্ষমতার মাদার ট্যাংকার এমটি নিনিমিয়া সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর, জিব্রাল্টার প্রণালি ও উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন। সরাসরি পথে আসার সুযোগ থাকলে সময় লাগত ১৩ থেকে ১৫ দিন। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কেনা বিপিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে প্রণালী ও সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলেও নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ইউনিটটি বড় ভূমিকা রাখবে।”
ইতোমধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধানে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার অপরিশোধিত তেলের নমুনা পরীক্ষা করে ইআরএল। এসব তেল বিদ্যমান শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাতের উপযোগী বলে চিহ্নিত হয়েছে। তবে ইআরএল-২ চালু হলে শোধনাগারটি আরও উন্নত প্রযুক্তির হবে, যা সৌদি আরব ও আমিরাতের বাইরেও আরও বেশি উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে।
শোধনক্ষমতা বাড়লেও প্রস্তুতি চাই
ইআরএল-২ প্রকল্প শুধু শোধনক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত আছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা। প্রকল্প পরিচালক ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে কার্যালয় খুলে কার্যক্রম শুরু করেছেন। ২০২৯ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সময়মতো সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মজুত সক্ষমতা। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত ১৪ দিনের। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা উচিত। সরকার মজুত ক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিপিসি ৪৩ দিনের তেল মজুতের মতো ট্যাংক চিহ্নিত করেছে। আরও ৮-১০ দিনের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “সেকেন্ড রিফাইনারি নিয়ে সব সময়ই এক ধরনের দ্বিধা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে যে এটি একেবারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত ছিল এবং দ্বিতীয় রিফাইনারি স্থাপনের যে জরুরি প্রয়োজন, সেটি কোনো সরকারের কাছেই কখনো তেমনভাবে ছিল না। তারা বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে, সিদ্ধান্তও নিয়েছে, কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত ছিল আধা-আধা বা দ্বিধান্বিত।”
তবে আইডিবি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পটি এবার আর হাফ-হার্টেড থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইআরএল-২ শুধু ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াবে না, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিতও মজবুত করবে। বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কেনার বদলে নিজস্ব শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কম হলে দেশীয় ভোক্তারাও স্বস্তিতে থাকবেন।
ইআরএল-২ কেবল একটি শোধনাগার নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার এক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আগামী কয়েক দশকে দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়বে। সেই চাহিদা মেটাতে ইআরএল-২ হয়তো যথেষ্ট হবে না, কিন্তু এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো তৃতীয় ইউনিট কিংবা আরও বড় পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করবে।

আপনার মতামত লিখুন