মেয়েটিকে হত্যা করলো। টুকরো টুকরো গোশত নদীতে ছিটিয়ে দিলো। ঘুমের মধ্যেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো মা। কাঁদতে কাঁদতে একসময় অন্ধ হলো! চোখের পানি মুছতে মুছতেই একদিন দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো! এই ঘটনায় জড়িত কেউ এখন জীবিত নেই।
আল্লার কাছে বউডার জন্য দোয়া করবি। তা করে না। খালি আকথা কুকথা কয়। ওর কথা হুনলে গুনাহ হইবো!
পেছন থেকে জন্টু মুহুরি বলে— কার কথা শুনলে গুনাহ হবে?
ছোচার মতন পিছে পিছে ঘুর ঘুর করো ক্যা?
তোকে ভালোবাসি।
আলগা খাউজানি দ্যাহাও।
টুনা তোকে বিয়ে করবে? লাঠির পিটানো সহ্য হয়, পেটের খিদে সহ্য হয় না। বুঝছিস। আমার কাছে সুখে থাকবি।
হতিনের ঘরে সুখের চাইতে আগুনে পুইড়্যা মরণ ভালো।
তোকে শহরে রাখবো।
হুনি, জাল দলিল কইর্যা বহুত পয়সা কামাও! গুড় থাকলে অনেক পিঁপড়্যা পাইব্যা।
ভেতরটা চুঁইচুঁই করে রে!
ছ্যাবলামি করো! আমারে যাইতে দেও।
না, তুই যাবি না। হাত টেনে ধরে। গাছপালায় ঘেরা সুনসান ছাতিমতলা। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। মুহুরি জোর করে মাজেদার হাতে টাকা দেয়।
হুদাহুদি টাকা দেও ক্যা? মাজেদা বলে।
মাথা ছুঁয়ে বলি, তোকে ভালোবাসি।
ভঙ্গি দ্যাহাও!
কেউ নেই। কাছে আয়।
তোমার চরিত্র খারাপ। টাকা ফেলে সে চলে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে।
তুই কি চাস বলেই মুহুরি তাকে জড়িয়ে ধরে। ঘোঁত-ঘোঁত, ক্যাঁচক্যাঁচানি শব্দে হুতুম প্যাঁচা মুহুরির মুখে নখ বসায়। ছিটকে পড়ে সে। তখন মাজেদা দ্রুত বাড়ি যায়। মা বলে— আইছত?
হঁ, মা।
রাইত করছ ক্যা? চোকের ডপটা দিয়্যা দে। খিদ্যায় মরতাছি। প্যাটটা দাউ দাউ কইর্যা পুড়তাছে। কনে গেছিলি?
আবুলের বাইত্তে। বাঁশের টাকা পাইত্যাম।
তোর পোলা দুইড্যা কনে?
ফকির বাইত্তে খিচুড়ি খাইব্যার গেছে।
জয়তুনগো পাকুড়গাছে আদাইর্যা একচোকা পেতনি দেখছে। ডরিয়্যা মরবোনে। নিয়্যা আয়। খুক খুক কাশির সঙ্গে বলে— তুলসী পাতা দে। চাবাই।
পাতা আনি?
রাইতে ছিঁড়িছ ন্যা। এটটু আদা দে। গুতুর গরু ছুটছাল। ফাতুর-ফুতুর শব্দ পাইল্যাম। বাইর্যানের বল নাই। ঝিঙা গাছগুল্যা মনে অয় গরুতে খাইছে?
খায় নাই। জাংলায় বিল্যাতি কদু ধরছে।
না ধরলে খাবি কি? আল্লায় রূপ দিছে, রূপের কপাল দেয় নাই। জামাইগুল্যা মরলো!
সব বুইড়্যা জামাই!
কি করুম! বাপ মরছে। ভাই নাই। চাইরড্যা ম্যায়া। তিনড্যা বিয়্যা দিল্যাম। ওরাও শান্তিতে নাই। বড়ডা জামাই থুইয়্যা তোর জইন্যে বিদ্যাশ গেলো। তোরে পড়াইবো। ভালো বিয়্যা দিবো। যুদ্ধের বম পইড়্যা মরলো! মুখে আঁচল দিয়ে মা কাঁদে। একটু পরে বলে— বিদ্যাশ থনে ট্যাহা আইলো। সব জামাই নিলো। ভাঙুর পোলার নগে তোর কলঙ্ক অইলো। তুই কইলি, তোরে ভালোবাসে। ওই কইলো, তুই আইব্যার কইছত। হক্কলে ছি ছি করলো! মুকে চুনকালি দিলো! তোরে মারলো! ব্যাশ্যাখানায় বেচপো। জেরুর পোলা মমিন। মমিনে কইলো, তুই কমিন। মুকের হমকে কইলো! হাউমাউ করে মা কাঁদে। চোখের পানিতে কাপড় ভিজে যায়। আকাশ বাতাস মায়ের কান্না দেখে!
মামলা করলা না ক্যা?
অন্যের ভশসায় মামলা অয় না। কুটে থনেই খাইতো। মুকছেদ মেম্বর তোরে বিয়্যা করবো। আমারে কইলো। বউ পুলাহান যাই থাকুক ভালো মানুষ আছাল। বহুত ধনী আছাল। ক্ষ্যামতা আছাল। ইজ্জত নিয়্যা বাঁচপার লাইগ্যা তোরে বিয়্যা দিল্যাম। সাতটা বছর সুকেই আছিল্যাম। ওরে মাইনসে মারলো।
ভূতের কিল মাইনসের উপর চাপাও ক্যা? ম্যাম্বররে উনার পোলারা মারছে।
কছ ক্যা! তোগোও মারবোনে। ভুল অইছ্যাল। জমিন লেইখ্যা দিব্যার কইলে, দিতো। ম্যাম্বর তোরে খুব মহব্বত করতো! তিনজন পোলাহান নিয়্যা কেরই তোরে বিয়্যা করবার চায় না। উপায় না দেইখ্যা গার্মেনছে গেলি। থাকা পারলি ন্যা। নকুইল্যা আইলো। হেন্দু! বিয়্যার পোলা। তোরে ভালোবাসে। মুছলমান অইয়্যা পোলাহানসহ তোরে বিয়্যা করবো। ঐ পলাইলো।
ঐ ফক্কড়ের কথা ছাড়ো।
অরে দ্যাহছ না?
আল্লায় ওরে যানি না দ্যাহায়।
পোলাহান হুইদ্ধ্যা গনি সরকার তোরে বিয়্যা করলো। কয়দিন পরই মরলো! পরেরডাও মরলো। দুঃখের কতা কারে কমু!
কাউরে কিচ্ছু কইয়ো না, মা। ইড্যা-ওডা কয়!
ক্যারা কয়!
বুচাই চকিদার কয়। তার বউ কয়।
চকিদার বদ। ভরা বাজারে থু থু চাটাইছ্যাল ওরে! চিন্ত্যা করিছ ন্যা। জামাইগুল্যা ধনী আছাল। একদিন সব পাবি।
ঘোড়াড্ডিম পামু!
মা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে— একদিন তুই ধনী অবি। কইল্যাম। দেহিছ। ফোকলা দাঁতে মা হি হি করে বলে— পোলা দুইড্যারে পড়া হিক্যাইছ।
কেমনে পড়বো?
তখন মা বলে— খাওন অইছে? জলদি দুইড্যা দে।
মাকে খেতে দেয়। মা গোগ্রাসে গিলে পেট ভরে। আরামসে বসে। মুখে পান। হাসি হাসি ভাব। তখন মাজেদা বলে— মা, টুনা খলিফারে চিনো?
ওর বউ মরছে।
এই ড্রেস বানিয়্যা দিছে। দ্যাহ কি সুন্দর!
দাঁতের পাটি বের করে মা বলে— ট্যাহা দিছত?
হঁ, না। টাকা নেয় নাই।
সে খিল খিল করে হাসে! পাশে থেকে মাজেদার মেয়ে বলে— নানি, তোর ম্যায়াডা ফাজিল। ডেলি ডেলি টুনা খলিফার কাছে যায়। তার সাথে খালি ঢং করে। সারা ব্যালা দেরি করে। ঐ ফাজিল ব্যাটা তোর ম্যায়ার শরীলে হাত দেয়।
চুপ কর মাগি। মেয়ের গালে জোরে থাপ্পড় মারে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে দুয়ারে ফেলে দেয়। মেয়ে কাঁদতে থাকে।
দাঁত খিঁচানো দিয়ে মা বলে— মারছ কিয়্যারে?
বহুত পাকনা। ওর জন্য কারো নগে কথাও বলবার পারি না।
ওরে নগে নিছ ন্যা। যা মন চাইবো, করবার পারবি। মা বড় একটি হাঁক ছেড়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে!
মহরমের দিন। নানি ও নাতনি ছাগলের বাচ্চা নিয়ে খেলছে। মুহুরি এসে বলে— চাচি কেমন আছো?
অহনও মরি নাইক্যা, বাজান। মাপ কইর্যা দিছ, কোন সমে যাইগ্যা!
এটা বলে না। চাচি, বাচ্চা তিনটিই কি মুকছেদ মেম্বরের?
হঁ, বাজান।
মেম্বরের ছেলেরা ভরণপোষণ দেয়?
কিচ্ছু দেয় না।
কীভাবে চলো?
আঁস-কুইরক্যা-ছাগল পালি। আনাচ-পাতি বুনি। আধাপাকি জমিনে বাঁশ আছে। টাইন্যা টুইন্যা চলে। বাজান, বেশি সুন্দর ম্যায়াগো কপাল ভালো অয় না।
কি বলো, চাচি?
হঁ বাজান। মাজেদা যেইনেই যায়, শয়তান নাগে পাছে। আমার দমডা গেলে কি করবো! আমার মাতাভরা চিন্তা! ওর ছোট পোলাডা খুব অসুস্থ। ম্যাম্বরের পোলারা চাইয়্যাও দ্যাহে না।
মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় উকিলের সঙ্গে কাজ করি। আমি ওদের কাঠগড়ায় তুলবো। পাশে একটি বিড়াল মিউ মিউ করে ওঠে। মুহুরি বলে— এতিমদের হক দিতেই হবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো, চাচি।
কছ কি রে বাজান! তোর কতায় তো ভশসা পাইব্যার নইছি।
মাজেদা কোথায়, চাচি? পিপাসা লেগেছে। এমন সময় মাজেদা বাড়ির দুয়ারে ঢুকে। মুহুরিকে দেখেই কাকনিদ্রার ভান ধরে। মা বলে— ঢুলতাছত কিয়্যারে? বাজানেরে পানি দে। টিবল থনে তাজা পানি দিছ। গ্যালাস ধুঁয়্যা দিছ।
কওন লাগবো না।
মা হাসে। মুখে আওয়াজ হয়— পাগলি কনকার।
মুহুরিকে ফকফকা কাচের গ্লাস ভর্তি পানি দেয়। পানি পান করে সে বলে— তোদের টিউবওয়েলের পানি বড় মিঠা রে!
হঁ, তোমার টান তো মিঠ্যা লাগবোই! খলিফার সঙ্গে রঙ-তামাশা করে এসেছে সে। মন চুইয়ে চুইয়ে রস পড়ছে এখনো! ভাদ্রমাস। দুয়ারে দুটি কুকুর সঙ করছে। বাঁশের লাঠিপিটা করে তাড়িয়ে দেয় সে।
মুহুরি হাসে! সে তাকে শয়তান বলে। মা দুজনকে ঘরে ডেকে নেয়। বলে, জন্টু বাজানের কতা হুনলে তোর সব পাবি। মা ঘরের বাইরে যায়। মুহুরি বলে— কথা শুনলে সব এনে দেবো। মেম্বরের ছেলেরাও সব দিতে বাধ্য হবে। মাজেদার হাত টেনে এক মুঠো টাকা দেয়।
এইটা কি দ্যাও?
বাবুটার চিকিৎসার জন্য দিলুম। কাল বিকেলে ওকে মানিকগঞ্জ ইসলামি হাসপাতালে নিস। ওখানে খরচ খুব কম হয়। ভালো ভালো ডাক্তার বসেন। আমি থাকবো। চিকিৎসা পেলে তোর বাবুটা সুস্থ হবে। ফুটফুটে চেহারা! খুব মায়া লাগে। মুহুরি চলে যায়।
টাকাগুলো মাজেদা গোনে। ফিসফিসিয়ে বলে— বিশ হাজার! হতবাক সে! টুনা তার হাতে টাকা দিয়েছে। পাঁচ দশ হিসাব করে নব্বই টাকা! বিড়বিড় করতে থাকে। মা এসে বলে— বিড়বিড় করছ ক্যা?
তোমার নাতিরে হাসপাতালে নিমু।
মা বক বক, গড় গড় করে আওয়াজ দেয়— ট্যাহা পাবি কনে?
টাকা আছে। মা অন্যদিকে চলে যায়।
পরদিন ছেলেকে হাসপাতালে নিচ্ছে মাজেদা। মাঝপথে গুরুম গুরুম শব্দে বৃষ্টি নামে। মুহুরি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো। মনে তার অগ্নিজ্বালা! বৃষ্টির অজুহাতে যদি ফিরে যায় সে। মাথা ঝিনঝিন করছে তার। বৃষ্টি থেমে যায়। সে হাসপাতালে পৌঁছায়। মুহুরির মনে টান টান উত্তেজনা! দ্রুত ছেলেকে ধরে। ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ফ্যানের নিচে বসে। ডাক্তার ছেলেকে ভালো করে দেখেন। ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছে। পনেরো দিন দেরি হলে ওকে বাঁচানো যেতো না! মাজেদাকে ধমকায়। প্রেসক্রিপশনে ঔষধ ও টেস্ট দেন। ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে বলেন। মুহুরি বলে— শুন মাজেদা, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’।
ঠিক কথা কইছো। তখন তার চোখে বিশ হাজার টাকাও ভাসে। সে চিন্তা করছে। মুহুরি ভরসা দেয়। চিকিৎসার সব টাকা সে দেবে। ছেলের সব টেস্ট রাতেই করানো হয়। রিপোর্ট পরদিন দেবে। মাজেদার মোবাইল নষ্ট হয়েছে। রাতেই নতুন মোবাইল ও মা-ছেলের ডিনারসহ হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে চলে যায় সে।
রাত একটা বাজে। ছেলে ঘুমাচ্ছে। সে ঘুমাতে পারছে না। পাড়ার খগেন মুচির শুয়োরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ হচ্ছে কক্ষে। তাকিয়ে দেখে এক মহিলা এমন অদ্ভুত শব্দ করে বিভোরে ঘুমাচ্ছে। সে একটু হাসে! নিদ্রাহীনতায় রাত কেটে যায় তার। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমায় সে। সন্ধ্যায় ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নেয়। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে ছেলেকে ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে বলেন। ছেলের চিকিৎসা চলছে। মুহুরি প্রতিদিন দামি খাবার ও পথ্য নিয়ে আসে। মা-ছেলে মজা করে খায়। দশ দিনে ছেলে সুস্থ হয়। চৌদ্দ দিনের মাথায় ছেলের চেহারায় ষোলো আনা জোশ মারে। ঐ দিন মুহুরি হাসপাতালের কাছে এক নার্সের বাসায় রাত থাকতে বলে মাজেদাকে। রাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলবে তার সঙ্গে। সে রাজি হয় না। বাড়ি গিয়ে কথা বলবে।
পরদিন সকাল এগারোটা বাজে। ছেলে আঙ্গুর মুখে দিয়ে মায়ের গলা ধরে হাসছে। মা ফোনে মুহুরিকে বাড়ি যাওয়ার কথা বলছে। দুপুরের পর সে এসে দায়-দেনা মিটিয়ে ভাড়া প্রাইভেট কারে মা-ব্যাটাকে বাড়ি পাঠায়। মা-ব্যাটা গাড়ি থেকে হাসতে হাসতে তেঁতুলতলায় নামে। সেখানে তাইজুদ্দির মা ও গ্রামের মানুষজন রয়েছে। তাইজুদ্দির মা হা করে মাজেদার দিকে তাকায়! আসমান থেকে পক্ষীর বিষ্ঠা পড়ে তার মুখে! থু থু, দুরু দুরু করতে থাকে সে!
আকাইল্যা বলে— কী অইছে জেঠি? পক্কুর গু খাইছো। মজজিদের কল থনে কুলি কইর্যা আহো।
অন্য কিছু দ্যাহছ না, বিজরমা!
কি দেহুম?
গাড়ি থনে ক্যারা নামলো?
মাজেদা নামলো।
গাড়ি পাইলো কনে? কেমনে এইগুল্যা মিল্যায়?
যা খুশি করুক। তুমিও করো গা।
ফাতরামি করছ, ফাতরা কনকার! আকাইল্যা কিছু না বলে চুপচাপ চলে যায়। তাইজুদ্দির মায়ের কথায় কেউ সাড়া দেয় না। ফলে সেও চলে যায়।
মাজেদা ও তার মা জাম্বুরা খাচ্ছে। তখন মা বলে— টুনা পতিদিন খবর পাটাইতো! দ্যাহা করছত?
না, কি দাম আছে টুনার!
মা কথা বাড়ায় না। এটা-ওটা করতে করতে রাত নয়টা বাজে। পাড়ায় হারাধন মাঝির বাড়িতে গাজির গান। সবাই গাজির পালা শুনতে যায়। মাজেদা যায়নি। সে বাড়িতে একা। মোবাইলে গান শুনছে। তার মনে নানা কথা ঘুরছে। তার জন্য এতোকিছু করলো মানুষটা! সে তার জন্য কি করলো! নার্সের বাসায়ও গেলো না। কৃতজ্ঞতা ও মায়া কাজ করছে। দিনে কথা হয়েছে। সে আসবে। এমন সময় দরজায় টুকা পড়ে। বুঝতে পারে সে। দরজা খুলে দেয়। রাতের বিজন পরিবেশে দুজন। সে প্রথমেই বিয়ের কথা তোলে। পবিত্র থাকতে চায়। মুহুরি তালবাহানা করে। অবশেষে কোরান ছুঁয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয় মহুরি। এরপর পৌনে দুই ঘণ্টা নিরিবিলি সময় কাটায় তারা। মুহুরি অতি খুশি মনে বলতে থাকে— তোর ঠোঁট দুটো টকটকে লাল! টিয়ে পাখির ঠোঁটের মতো! তোর নাক বাঁশির মতো! দুনিয়া পাগল করা হাসি তোর! জুলজুল চোখে সে শুধু মুহুরির বেঢপ চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে! কিছুই বলে না! ঐ মুহূর্তে মুহুরি একগ্লাস পানি চায়।
টুনা গান শুনতে এসেছে। মাজেদাকে খুঁজছে। পাচ্ছে না। তাদের বাড়িতে যায়। খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দে দুয়ারে প্রবেশ করতেই বড় বড় ক’টি কুকুর ঘিরে ধরে তাকে। কামড়াতে যায়। সে ভয় পায়। সুকৌশলে কেটে পড়ে টুনা। বাড়ি নিস্তব্ধ। ঘরে একটি পোকা কটকট আওয়াজ করে! মুহুরির কামরূপী মুখে মিটিমিটি হাসি বের হয়। মাজেদা জিজ্ঞেস করে— পানি মিঠ্যা! হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় সে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন পঞ্চরসের মিঠাপানির স্বাদ গ্রহণ করে সে।
মাজেদা অন্তঃসত্ত্বা! গর্ভে মুহুরির সন্তান। বিয়ের জন্য কাকুতিমিনতি করে তার কাছে। সে টাকা দেয়। বাচ্চা নষ্ট করতে বলে। রাজি হয় না সে। তাইজুদ্দির মা প্রতিদিন তার আর্থিক সচ্ছলতা দেখতে আসে। খাবার খায়। মিথ্যা গুহ্যে হাটে হাঁড়ি ফাটায়।
অন্তঃসত্ত্বার খবর ঢেকে রাখতে মাজেদার বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ। শুধু মুহুরি যেখানে যেতে বলে সেখানে যায় সে। একদিন মাজেদা ছমছমে মেজাজে হুমকি দেয়। তিনদিনের ভিতরে তাকে বিয়ে করতে হবে। অন্যথায় কাগজে তাকে দোষী লিখে আত্মহত্যা করবে। ভয়ে রাজি হয় সে।
মাজেদা কোটায় ঘুমিয়েছে। মুহুরি আসবে। সে এসেছে। কেউ দেখেনি। রাত তখন দেড়টা। আকাশে পূর্ণিমা নেই। চারদিক সাড়াশব্দহীন। মাজেদাকে নিয়ে যাবে। সে জিজ্ঞেস করে, এতো রাতে কেন? সে বলে— কাজী ঠিক করা আছে। তাদের বিয়ে হবে। কাজটি গোপনে হবে। মাজেদাকে আমগাছের নিচে নিয়ে যায়। সেখানে গাড়ি রাখা ছিলো। গাড়িতে উঠতে বাধ্য হয় সে। গাড়ি চলতে থাকে। সে জিজ্ঞেস করে, তারা কোথায় যাচ্ছে? মুহুরি বলে— কাজীর কাছে। গ্রামীণপথে গাড়ি চলছে তো চলছেই। ধৈর্য হারায় মাজেদা। মুহুরি সবুর করতে বলে। একসময় গাড়ি পদ্মার পাড়ে গিয়ে থামে। জায়গাটি মাজেদার পরিচিত। মানুষজন নেই। প্রচণ্ড ভয় পায় সে! তাকে জেলে নৌকায় উঠতে বলে। সে বলে নৌকায় কেন উঠবে? মুহুরি বলে ওখানে কাজী অপেক্ষা করছে। বিয়ে হবে নৌকায়। ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে তাকে নৌকায় ওঠায়। নৌকায় উঠেই সে নকুইল্যা ও আলিমুদ্দি খুনিকে দেখতে পায়। ঘটনা বুঝতে পারে সে। তার শরীর কাঁপতে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য মুহুরির হাতে-পায়ে ধরে। আলিমুদ্দি খুনির পায়ে ধরে। কেঁদে কেঁদে বলে— তার তিনটি এতিম সন্তান! বৃদ্ধ মা। তাদের দেখার কেউ নেই। তাকে ছেড়ে দিলে তাদের নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। কোনোদিন সে এলাকায় আসবে না। সে বেঁচে না থাকলে, তারা না খেয়ে মরে যাবে। জীবন ভিক্ষা চায় সে! চিৎকার দিয়ে কাঁদে! নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ। কোনো লাভ হয় না। তার মুখ চেপে ধরে মুহুরি ও নকুইল্যা। ওরা প্রতারক! ওরা নিষ্ঠুর! ওরা মানুষ নয়! পদ্মার পানি থেকে বাবার ডাক শুনতে পায় মাজেদা! ওরা মাজেদাকে হত্যা করে! টুকরো টুকরো মনুষ্য গোশত নদীতে ছিটিয়ে দেয়! এই দুর্বিষহ রক্তমাখা বাতাসের তাড়নায় প্রবলবেগে উথালপাথাল ঢেউ তুলে খরস্রোতা পদ্মা নদীর মিঠাপানি!

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেয়েটিকে হত্যা করলো। টুকরো টুকরো গোশত নদীতে ছিটিয়ে দিলো। ঘুমের মধ্যেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো মা। কাঁদতে কাঁদতে একসময় অন্ধ হলো! চোখের পানি মুছতে মুছতেই একদিন দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো! এই ঘটনায় জড়িত কেউ এখন জীবিত নেই।
আল্লার কাছে বউডার জন্য দোয়া করবি। তা করে না। খালি আকথা কুকথা কয়। ওর কথা হুনলে গুনাহ হইবো!
পেছন থেকে জন্টু মুহুরি বলে— কার কথা শুনলে গুনাহ হবে?
ছোচার মতন পিছে পিছে ঘুর ঘুর করো ক্যা?
তোকে ভালোবাসি।
আলগা খাউজানি দ্যাহাও।
টুনা তোকে বিয়ে করবে? লাঠির পিটানো সহ্য হয়, পেটের খিদে সহ্য হয় না। বুঝছিস। আমার কাছে সুখে থাকবি।
হতিনের ঘরে সুখের চাইতে আগুনে পুইড়্যা মরণ ভালো।
তোকে শহরে রাখবো।
হুনি, জাল দলিল কইর্যা বহুত পয়সা কামাও! গুড় থাকলে অনেক পিঁপড়্যা পাইব্যা।
ভেতরটা চুঁইচুঁই করে রে!
ছ্যাবলামি করো! আমারে যাইতে দেও।
না, তুই যাবি না। হাত টেনে ধরে। গাছপালায় ঘেরা সুনসান ছাতিমতলা। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। মুহুরি জোর করে মাজেদার হাতে টাকা দেয়।
হুদাহুদি টাকা দেও ক্যা? মাজেদা বলে।
মাথা ছুঁয়ে বলি, তোকে ভালোবাসি।
ভঙ্গি দ্যাহাও!
কেউ নেই। কাছে আয়।
তোমার চরিত্র খারাপ। টাকা ফেলে সে চলে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে।
তুই কি চাস বলেই মুহুরি তাকে জড়িয়ে ধরে। ঘোঁত-ঘোঁত, ক্যাঁচক্যাঁচানি শব্দে হুতুম প্যাঁচা মুহুরির মুখে নখ বসায়। ছিটকে পড়ে সে। তখন মাজেদা দ্রুত বাড়ি যায়। মা বলে— আইছত?
হঁ, মা।
রাইত করছ ক্যা? চোকের ডপটা দিয়্যা দে। খিদ্যায় মরতাছি। প্যাটটা দাউ দাউ কইর্যা পুড়তাছে। কনে গেছিলি?
আবুলের বাইত্তে। বাঁশের টাকা পাইত্যাম।
তোর পোলা দুইড্যা কনে?
ফকির বাইত্তে খিচুড়ি খাইব্যার গেছে।
জয়তুনগো পাকুড়গাছে আদাইর্যা একচোকা পেতনি দেখছে। ডরিয়্যা মরবোনে। নিয়্যা আয়। খুক খুক কাশির সঙ্গে বলে— তুলসী পাতা দে। চাবাই।
পাতা আনি?
রাইতে ছিঁড়িছ ন্যা। এটটু আদা দে। গুতুর গরু ছুটছাল। ফাতুর-ফুতুর শব্দ পাইল্যাম। বাইর্যানের বল নাই। ঝিঙা গাছগুল্যা মনে অয় গরুতে খাইছে?
খায় নাই। জাংলায় বিল্যাতি কদু ধরছে।
না ধরলে খাবি কি? আল্লায় রূপ দিছে, রূপের কপাল দেয় নাই। জামাইগুল্যা মরলো!
সব বুইড়্যা জামাই!
কি করুম! বাপ মরছে। ভাই নাই। চাইরড্যা ম্যায়া। তিনড্যা বিয়্যা দিল্যাম। ওরাও শান্তিতে নাই। বড়ডা জামাই থুইয়্যা তোর জইন্যে বিদ্যাশ গেলো। তোরে পড়াইবো। ভালো বিয়্যা দিবো। যুদ্ধের বম পইড়্যা মরলো! মুখে আঁচল দিয়ে মা কাঁদে। একটু পরে বলে— বিদ্যাশ থনে ট্যাহা আইলো। সব জামাই নিলো। ভাঙুর পোলার নগে তোর কলঙ্ক অইলো। তুই কইলি, তোরে ভালোবাসে। ওই কইলো, তুই আইব্যার কইছত। হক্কলে ছি ছি করলো! মুকে চুনকালি দিলো! তোরে মারলো! ব্যাশ্যাখানায় বেচপো। জেরুর পোলা মমিন। মমিনে কইলো, তুই কমিন। মুকের হমকে কইলো! হাউমাউ করে মা কাঁদে। চোখের পানিতে কাপড় ভিজে যায়। আকাশ বাতাস মায়ের কান্না দেখে!
মামলা করলা না ক্যা?
অন্যের ভশসায় মামলা অয় না। কুটে থনেই খাইতো। মুকছেদ মেম্বর তোরে বিয়্যা করবো। আমারে কইলো। বউ পুলাহান যাই থাকুক ভালো মানুষ আছাল। বহুত ধনী আছাল। ক্ষ্যামতা আছাল। ইজ্জত নিয়্যা বাঁচপার লাইগ্যা তোরে বিয়্যা দিল্যাম। সাতটা বছর সুকেই আছিল্যাম। ওরে মাইনসে মারলো।
ভূতের কিল মাইনসের উপর চাপাও ক্যা? ম্যাম্বররে উনার পোলারা মারছে।
কছ ক্যা! তোগোও মারবোনে। ভুল অইছ্যাল। জমিন লেইখ্যা দিব্যার কইলে, দিতো। ম্যাম্বর তোরে খুব মহব্বত করতো! তিনজন পোলাহান নিয়্যা কেরই তোরে বিয়্যা করবার চায় না। উপায় না দেইখ্যা গার্মেনছে গেলি। থাকা পারলি ন্যা। নকুইল্যা আইলো। হেন্দু! বিয়্যার পোলা। তোরে ভালোবাসে। মুছলমান অইয়্যা পোলাহানসহ তোরে বিয়্যা করবো। ঐ পলাইলো।
ঐ ফক্কড়ের কথা ছাড়ো।
অরে দ্যাহছ না?
আল্লায় ওরে যানি না দ্যাহায়।
পোলাহান হুইদ্ধ্যা গনি সরকার তোরে বিয়্যা করলো। কয়দিন পরই মরলো! পরেরডাও মরলো। দুঃখের কতা কারে কমু!
কাউরে কিচ্ছু কইয়ো না, মা। ইড্যা-ওডা কয়!
ক্যারা কয়!
বুচাই চকিদার কয়। তার বউ কয়।
চকিদার বদ। ভরা বাজারে থু থু চাটাইছ্যাল ওরে! চিন্ত্যা করিছ ন্যা। জামাইগুল্যা ধনী আছাল। একদিন সব পাবি।
ঘোড়াড্ডিম পামু!
মা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে— একদিন তুই ধনী অবি। কইল্যাম। দেহিছ। ফোকলা দাঁতে মা হি হি করে বলে— পোলা দুইড্যারে পড়া হিক্যাইছ।
কেমনে পড়বো?
তখন মা বলে— খাওন অইছে? জলদি দুইড্যা দে।
মাকে খেতে দেয়। মা গোগ্রাসে গিলে পেট ভরে। আরামসে বসে। মুখে পান। হাসি হাসি ভাব। তখন মাজেদা বলে— মা, টুনা খলিফারে চিনো?
ওর বউ মরছে।
এই ড্রেস বানিয়্যা দিছে। দ্যাহ কি সুন্দর!
দাঁতের পাটি বের করে মা বলে— ট্যাহা দিছত?
হঁ, না। টাকা নেয় নাই।
সে খিল খিল করে হাসে! পাশে থেকে মাজেদার মেয়ে বলে— নানি, তোর ম্যায়াডা ফাজিল। ডেলি ডেলি টুনা খলিফার কাছে যায়। তার সাথে খালি ঢং করে। সারা ব্যালা দেরি করে। ঐ ফাজিল ব্যাটা তোর ম্যায়ার শরীলে হাত দেয়।
চুপ কর মাগি। মেয়ের গালে জোরে থাপ্পড় মারে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে দুয়ারে ফেলে দেয়। মেয়ে কাঁদতে থাকে।
দাঁত খিঁচানো দিয়ে মা বলে— মারছ কিয়্যারে?
বহুত পাকনা। ওর জন্য কারো নগে কথাও বলবার পারি না।
ওরে নগে নিছ ন্যা। যা মন চাইবো, করবার পারবি। মা বড় একটি হাঁক ছেড়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে!
মহরমের দিন। নানি ও নাতনি ছাগলের বাচ্চা নিয়ে খেলছে। মুহুরি এসে বলে— চাচি কেমন আছো?
অহনও মরি নাইক্যা, বাজান। মাপ কইর্যা দিছ, কোন সমে যাইগ্যা!
এটা বলে না। চাচি, বাচ্চা তিনটিই কি মুকছেদ মেম্বরের?
হঁ, বাজান।
মেম্বরের ছেলেরা ভরণপোষণ দেয়?
কিচ্ছু দেয় না।
কীভাবে চলো?
আঁস-কুইরক্যা-ছাগল পালি। আনাচ-পাতি বুনি। আধাপাকি জমিনে বাঁশ আছে। টাইন্যা টুইন্যা চলে। বাজান, বেশি সুন্দর ম্যায়াগো কপাল ভালো অয় না।
কি বলো, চাচি?
হঁ বাজান। মাজেদা যেইনেই যায়, শয়তান নাগে পাছে। আমার দমডা গেলে কি করবো! আমার মাতাভরা চিন্তা! ওর ছোট পোলাডা খুব অসুস্থ। ম্যাম্বরের পোলারা চাইয়্যাও দ্যাহে না।
মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় উকিলের সঙ্গে কাজ করি। আমি ওদের কাঠগড়ায় তুলবো। পাশে একটি বিড়াল মিউ মিউ করে ওঠে। মুহুরি বলে— এতিমদের হক দিতেই হবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো, চাচি।
কছ কি রে বাজান! তোর কতায় তো ভশসা পাইব্যার নইছি।
মাজেদা কোথায়, চাচি? পিপাসা লেগেছে। এমন সময় মাজেদা বাড়ির দুয়ারে ঢুকে। মুহুরিকে দেখেই কাকনিদ্রার ভান ধরে। মা বলে— ঢুলতাছত কিয়্যারে? বাজানেরে পানি দে। টিবল থনে তাজা পানি দিছ। গ্যালাস ধুঁয়্যা দিছ।
কওন লাগবো না।
মা হাসে। মুখে আওয়াজ হয়— পাগলি কনকার।
মুহুরিকে ফকফকা কাচের গ্লাস ভর্তি পানি দেয়। পানি পান করে সে বলে— তোদের টিউবওয়েলের পানি বড় মিঠা রে!
হঁ, তোমার টান তো মিঠ্যা লাগবোই! খলিফার সঙ্গে রঙ-তামাশা করে এসেছে সে। মন চুইয়ে চুইয়ে রস পড়ছে এখনো! ভাদ্রমাস। দুয়ারে দুটি কুকুর সঙ করছে। বাঁশের লাঠিপিটা করে তাড়িয়ে দেয় সে।
মুহুরি হাসে! সে তাকে শয়তান বলে। মা দুজনকে ঘরে ডেকে নেয়। বলে, জন্টু বাজানের কতা হুনলে তোর সব পাবি। মা ঘরের বাইরে যায়। মুহুরি বলে— কথা শুনলে সব এনে দেবো। মেম্বরের ছেলেরাও সব দিতে বাধ্য হবে। মাজেদার হাত টেনে এক মুঠো টাকা দেয়।
এইটা কি দ্যাও?
বাবুটার চিকিৎসার জন্য দিলুম। কাল বিকেলে ওকে মানিকগঞ্জ ইসলামি হাসপাতালে নিস। ওখানে খরচ খুব কম হয়। ভালো ভালো ডাক্তার বসেন। আমি থাকবো। চিকিৎসা পেলে তোর বাবুটা সুস্থ হবে। ফুটফুটে চেহারা! খুব মায়া লাগে। মুহুরি চলে যায়।
টাকাগুলো মাজেদা গোনে। ফিসফিসিয়ে বলে— বিশ হাজার! হতবাক সে! টুনা তার হাতে টাকা দিয়েছে। পাঁচ দশ হিসাব করে নব্বই টাকা! বিড়বিড় করতে থাকে। মা এসে বলে— বিড়বিড় করছ ক্যা?
তোমার নাতিরে হাসপাতালে নিমু।
মা বক বক, গড় গড় করে আওয়াজ দেয়— ট্যাহা পাবি কনে?
টাকা আছে। মা অন্যদিকে চলে যায়।
পরদিন ছেলেকে হাসপাতালে নিচ্ছে মাজেদা। মাঝপথে গুরুম গুরুম শব্দে বৃষ্টি নামে। মুহুরি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো। মনে তার অগ্নিজ্বালা! বৃষ্টির অজুহাতে যদি ফিরে যায় সে। মাথা ঝিনঝিন করছে তার। বৃষ্টি থেমে যায়। সে হাসপাতালে পৌঁছায়। মুহুরির মনে টান টান উত্তেজনা! দ্রুত ছেলেকে ধরে। ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ফ্যানের নিচে বসে। ডাক্তার ছেলেকে ভালো করে দেখেন। ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছে। পনেরো দিন দেরি হলে ওকে বাঁচানো যেতো না! মাজেদাকে ধমকায়। প্রেসক্রিপশনে ঔষধ ও টেস্ট দেন। ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে বলেন। মুহুরি বলে— শুন মাজেদা, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’।
ঠিক কথা কইছো। তখন তার চোখে বিশ হাজার টাকাও ভাসে। সে চিন্তা করছে। মুহুরি ভরসা দেয়। চিকিৎসার সব টাকা সে দেবে। ছেলের সব টেস্ট রাতেই করানো হয়। রিপোর্ট পরদিন দেবে। মাজেদার মোবাইল নষ্ট হয়েছে। রাতেই নতুন মোবাইল ও মা-ছেলের ডিনারসহ হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে চলে যায় সে।
রাত একটা বাজে। ছেলে ঘুমাচ্ছে। সে ঘুমাতে পারছে না। পাড়ার খগেন মুচির শুয়োরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ হচ্ছে কক্ষে। তাকিয়ে দেখে এক মহিলা এমন অদ্ভুত শব্দ করে বিভোরে ঘুমাচ্ছে। সে একটু হাসে! নিদ্রাহীনতায় রাত কেটে যায় তার। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমায় সে। সন্ধ্যায় ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নেয়। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে ছেলেকে ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি রাখতে বলেন। ছেলের চিকিৎসা চলছে। মুহুরি প্রতিদিন দামি খাবার ও পথ্য নিয়ে আসে। মা-ছেলে মজা করে খায়। দশ দিনে ছেলে সুস্থ হয়। চৌদ্দ দিনের মাথায় ছেলের চেহারায় ষোলো আনা জোশ মারে। ঐ দিন মুহুরি হাসপাতালের কাছে এক নার্সের বাসায় রাত থাকতে বলে মাজেদাকে। রাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলবে তার সঙ্গে। সে রাজি হয় না। বাড়ি গিয়ে কথা বলবে।
পরদিন সকাল এগারোটা বাজে। ছেলে আঙ্গুর মুখে দিয়ে মায়ের গলা ধরে হাসছে। মা ফোনে মুহুরিকে বাড়ি যাওয়ার কথা বলছে। দুপুরের পর সে এসে দায়-দেনা মিটিয়ে ভাড়া প্রাইভেট কারে মা-ব্যাটাকে বাড়ি পাঠায়। মা-ব্যাটা গাড়ি থেকে হাসতে হাসতে তেঁতুলতলায় নামে। সেখানে তাইজুদ্দির মা ও গ্রামের মানুষজন রয়েছে। তাইজুদ্দির মা হা করে মাজেদার দিকে তাকায়! আসমান থেকে পক্ষীর বিষ্ঠা পড়ে তার মুখে! থু থু, দুরু দুরু করতে থাকে সে!
আকাইল্যা বলে— কী অইছে জেঠি? পক্কুর গু খাইছো। মজজিদের কল থনে কুলি কইর্যা আহো।
অন্য কিছু দ্যাহছ না, বিজরমা!
কি দেহুম?
গাড়ি থনে ক্যারা নামলো?
মাজেদা নামলো।
গাড়ি পাইলো কনে? কেমনে এইগুল্যা মিল্যায়?
যা খুশি করুক। তুমিও করো গা।
ফাতরামি করছ, ফাতরা কনকার! আকাইল্যা কিছু না বলে চুপচাপ চলে যায়। তাইজুদ্দির মায়ের কথায় কেউ সাড়া দেয় না। ফলে সেও চলে যায়।
মাজেদা ও তার মা জাম্বুরা খাচ্ছে। তখন মা বলে— টুনা পতিদিন খবর পাটাইতো! দ্যাহা করছত?
না, কি দাম আছে টুনার!
মা কথা বাড়ায় না। এটা-ওটা করতে করতে রাত নয়টা বাজে। পাড়ায় হারাধন মাঝির বাড়িতে গাজির গান। সবাই গাজির পালা শুনতে যায়। মাজেদা যায়নি। সে বাড়িতে একা। মোবাইলে গান শুনছে। তার মনে নানা কথা ঘুরছে। তার জন্য এতোকিছু করলো মানুষটা! সে তার জন্য কি করলো! নার্সের বাসায়ও গেলো না। কৃতজ্ঞতা ও মায়া কাজ করছে। দিনে কথা হয়েছে। সে আসবে। এমন সময় দরজায় টুকা পড়ে। বুঝতে পারে সে। দরজা খুলে দেয়। রাতের বিজন পরিবেশে দুজন। সে প্রথমেই বিয়ের কথা তোলে। পবিত্র থাকতে চায়। মুহুরি তালবাহানা করে। অবশেষে কোরান ছুঁয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয় মহুরি। এরপর পৌনে দুই ঘণ্টা নিরিবিলি সময় কাটায় তারা। মুহুরি অতি খুশি মনে বলতে থাকে— তোর ঠোঁট দুটো টকটকে লাল! টিয়ে পাখির ঠোঁটের মতো! তোর নাক বাঁশির মতো! দুনিয়া পাগল করা হাসি তোর! জুলজুল চোখে সে শুধু মুহুরির বেঢপ চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে! কিছুই বলে না! ঐ মুহূর্তে মুহুরি একগ্লাস পানি চায়।
টুনা গান শুনতে এসেছে। মাজেদাকে খুঁজছে। পাচ্ছে না। তাদের বাড়িতে যায়। খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দে দুয়ারে প্রবেশ করতেই বড় বড় ক’টি কুকুর ঘিরে ধরে তাকে। কামড়াতে যায়। সে ভয় পায়। সুকৌশলে কেটে পড়ে টুনা। বাড়ি নিস্তব্ধ। ঘরে একটি পোকা কটকট আওয়াজ করে! মুহুরির কামরূপী মুখে মিটিমিটি হাসি বের হয়। মাজেদা জিজ্ঞেস করে— পানি মিঠ্যা! হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় সে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন পঞ্চরসের মিঠাপানির স্বাদ গ্রহণ করে সে।
মাজেদা অন্তঃসত্ত্বা! গর্ভে মুহুরির সন্তান। বিয়ের জন্য কাকুতিমিনতি করে তার কাছে। সে টাকা দেয়। বাচ্চা নষ্ট করতে বলে। রাজি হয় না সে। তাইজুদ্দির মা প্রতিদিন তার আর্থিক সচ্ছলতা দেখতে আসে। খাবার খায়। মিথ্যা গুহ্যে হাটে হাঁড়ি ফাটায়।
অন্তঃসত্ত্বার খবর ঢেকে রাখতে মাজেদার বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ। শুধু মুহুরি যেখানে যেতে বলে সেখানে যায় সে। একদিন মাজেদা ছমছমে মেজাজে হুমকি দেয়। তিনদিনের ভিতরে তাকে বিয়ে করতে হবে। অন্যথায় কাগজে তাকে দোষী লিখে আত্মহত্যা করবে। ভয়ে রাজি হয় সে।
মাজেদা কোটায় ঘুমিয়েছে। মুহুরি আসবে। সে এসেছে। কেউ দেখেনি। রাত তখন দেড়টা। আকাশে পূর্ণিমা নেই। চারদিক সাড়াশব্দহীন। মাজেদাকে নিয়ে যাবে। সে জিজ্ঞেস করে, এতো রাতে কেন? সে বলে— কাজী ঠিক করা আছে। তাদের বিয়ে হবে। কাজটি গোপনে হবে। মাজেদাকে আমগাছের নিচে নিয়ে যায়। সেখানে গাড়ি রাখা ছিলো। গাড়িতে উঠতে বাধ্য হয় সে। গাড়ি চলতে থাকে। সে জিজ্ঞেস করে, তারা কোথায় যাচ্ছে? মুহুরি বলে— কাজীর কাছে। গ্রামীণপথে গাড়ি চলছে তো চলছেই। ধৈর্য হারায় মাজেদা। মুহুরি সবুর করতে বলে। একসময় গাড়ি পদ্মার পাড়ে গিয়ে থামে। জায়গাটি মাজেদার পরিচিত। মানুষজন নেই। প্রচণ্ড ভয় পায় সে! তাকে জেলে নৌকায় উঠতে বলে। সে বলে নৌকায় কেন উঠবে? মুহুরি বলে ওখানে কাজী অপেক্ষা করছে। বিয়ে হবে নৌকায়। ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে তাকে নৌকায় ওঠায়। নৌকায় উঠেই সে নকুইল্যা ও আলিমুদ্দি খুনিকে দেখতে পায়। ঘটনা বুঝতে পারে সে। তার শরীর কাঁপতে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য মুহুরির হাতে-পায়ে ধরে। আলিমুদ্দি খুনির পায়ে ধরে। কেঁদে কেঁদে বলে— তার তিনটি এতিম সন্তান! বৃদ্ধ মা। তাদের দেখার কেউ নেই। তাকে ছেড়ে দিলে তাদের নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। কোনোদিন সে এলাকায় আসবে না। সে বেঁচে না থাকলে, তারা না খেয়ে মরে যাবে। জীবন ভিক্ষা চায় সে! চিৎকার দিয়ে কাঁদে! নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ। কোনো লাভ হয় না। তার মুখ চেপে ধরে মুহুরি ও নকুইল্যা। ওরা প্রতারক! ওরা নিষ্ঠুর! ওরা মানুষ নয়! পদ্মার পানি থেকে বাবার ডাক শুনতে পায় মাজেদা! ওরা মাজেদাকে হত্যা করে! টুকরো টুকরো মনুষ্য গোশত নদীতে ছিটিয়ে দেয়! এই দুর্বিষহ রক্তমাখা বাতাসের তাড়নায় প্রবলবেগে উথালপাথাল ঢেউ তুলে খরস্রোতা পদ্মা নদীর মিঠাপানি!

আপনার মতামত লিখুন