সংবাদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কাদের হাতে


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ পিএম

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কাদের হাতে

জানা যায়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ইত্যাদির ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনার জন্য সভাপতি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা প্রজ্ঞাপনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা হলেও সম্প্রতি তা নাকি বাতিল করা হয়েছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষও চায় লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করুক। এমনকি যে মানুষটি নিজে স্কুল-কলেজে যায়নি, সে-ও চায় না তার মতো আরেকজন গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপর খবরদারি করুক। এটা শত্রুতা নয় বা হিংসা নয়, স্রেফ একটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার বিষয়। আমি অকৃতি অধম বলে উত্তমকে অস্বীকার করি কেমনে?

আজকাল খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও উঁকি দিয়ে চলেছে; তা হলো, এই যে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি, নীতি-নির্ধারণী বা জনপ্রতিনিধিত্ব—কোথাও যদি শিক্ষাগত সনদপত্রের কোনো মূল্য না থাকে বা গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে এত হৈচৈ, এত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার হেতু কী? সমাজে রাষ্ট্রে যার কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকছে না, তার জন্য লাখ কোটি টাকার বাজেটই বা কেন? দেশের উচ্চশিক্ষা কী তবে কেবল বিদেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া আর পরদেশের সরকারের অধীনে চাকর হওয়ার দায়ে? যে দেশে শিক্ষার একাডেমিক সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য দেওয়া হবে না, সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার মূল বিষয় হলো, সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানো, যা শিক্ষিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কখনো নতুনত্ব বা সৃষ্টিশীল কার্যক্রম আশা করা যায় না। সে প্রতিষ্ঠান সরকারের হোক বা নিজেরই হোক।

২.

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এসব কমিটিতে কেবল সভাপতি নয়, অন্যান্য পদগুলো যেমন, অভিভাবক সদস্য, বিদ্যোৎসাহী সদস্য—এদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা মাপকাঠি রাখা দরকার। একটা প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে পরিচালিত করতে হলে পুরো টিমকে নিয়েই কাজ করতে হয়। সভাপতি/চেয়ারম্যান একা সফলতা আনতে পারে না।

দেশে তখন ১/১১ নামে পরিচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। আমি সরকারের চাকরিতে উপসচিব পদমর্যাদায় পরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) কর্মরত। কিছুদিন হলো একটা জেলার এডিসির পদ থেকে ঢাকায় ফিরেছি। এক দুপুরে ফোন আসে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ঢাকার কাছ থেকে। ডিসি’র নাম মো. কামাল উদ্দিন। একজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম ছিল। তিনি বললেন,

আপনার বাসা কোন এলাকায়?

বললাম, আজিমপুর গভ. কোয়ার্টারে থাকি।

খুব ভালো হয়েছে, আপনাকে ওই এলাকার একটা ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দিতে চাই।

জিজ্ঞেস করলাম, স্কুলের নামটা কী?

তিনি বললেন, 'ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল'।

এবার আমি জানতে চাইলাম, স্কুলের বিশেষ কোনো সমস্যা আছে কি না?

তিনি বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। ঢাকার প্রায় সকল স্কুলই এ সময়ে ফাঁকা। জেলা প্রশাসন থেকে আমরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্কুলের দায়িত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে ঢাকায় তাদের স্ব স্ব বাসার কাছাকাছি স্কুলগুলোতে দিতে চাচ্ছি, যাতে যাতায়াতের অসুবিধা না হয়। আর কিছু নয়।

আমি তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলাম। একটা পুরোনো ইতিহাস-খ্যাত স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যাবে। শিক্ষক, ছাত্র, স্থানীয় সুশীল সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগ হবে, তাতে মন্দ কী? তাছাড়া বাসা থেকে পদব্রজে স্কুলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ছুটির একটা দিন এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদন করলে কোনো ক্ষতি হবে না। তা-ই হলো, যথারীতি দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। বলাবাহুল্য, স্কুলটি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জনশ্রুতি আছে, সেকালে ঢাকা নগরীর পশ্চিম প্রান্ত বরাবর স্কুলটি গড়ে ওঠে বলেই নাকি ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর কর্তৃক এমন নামকরণ করা হয়েছিল। তাছাড়া এ স্কুলের বেশ কজন শিক্ষক '৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ সুলতান এবং রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদের কথা বলা আছে।

৩.

সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর, এক শনিবার সকাল ১০টার দিকে প্রথমবারের মতো স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সরকারি ছুটির দিন, তবে স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসব খোলা আছে। প্রধান শিক্ষক আলী হোসেন মিয়াকে একজন বিনয়ী, সৎ ও শিক্ষিত মানুষ বলে মনে হলো। অন্তত প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আমার সঙ্গে বেশ কজন সদস্য রয়েছে। তারা নির্বাচিত সদস্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বিশেষজন। পরিচয় হলো, তারা পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যের সময়ে এখানে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এমন। তখনই জানি, স্কুলের এসব পদের জন্যও বেশ ব্যয়বহুল নির্বাচন হয়। এতে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি হয়। আমি ধীরে ধীরে খোঁজখবর নিতে থাকি। আসলে এদের কাজটা কী?

দেশে তখন রাজনীতি নেই, অযাচিত চাপ নেই, বরং জনমনে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছিল। শুরুতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে স্কুলের ভেতরে ও বাইরে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো। হেডমাস্টার এবং সহকারী শিক্ষকদের বসার স্থানে পরিবর্তন আনা হলো। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনমাফিক নতুন নতুন ফ্যান-লাইট সংযোগ তথা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পৃথক শৌচাগারের সংস্কার করা হলো। দীর্ঘ বন্ধ থাকা লাইব্রেরিতে বসার পরিবেশ ফেরানো হলো। নিয়মিত সভা আহ্বান করে শিক্ষার পরিবেশবান্ধব অসংখ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির কক্ষে নতুন আধুনিক টিভি সংযোজন হলো। অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থানেও নতুনত্ব আনা হলো। সভায় অংশ নেওয়ার সম্মানী অর্থের বিষয়ে একটু রাশটানা হলো, সকল সভার জন্য সম্মানী থাকবে না। এটা কেবল বিশেষ সিদ্ধান্তকারী সভার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তখন শতভাগ নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হলো। সেসময়ে বার্ষিক খেলাধুলা ও জাতীয় অনুষ্ঠানে সরকারের সচিবগণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্কুলে আনা হয়েছে। এদের কেউ কেউ এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। প্রায় দু’বছরে এমন অসংখ্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ায় স্কুলের ভেতরটায় এক অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গিয়েছিল।

৪.

ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ করলাম, তিনজন নির্বাচিত সদস্যেরই মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। প্রথমে তারা আমাকে জয় করে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যেমন, সীমাহীন প্রশংসা ও অতিরিক্ত বিনয় প্রদর্শন করা, কথাবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে পুরান ঢাকার রয়েল রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির প্যাকেট বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব আসতে থাকে, কিছু দিন পরে টেলিফোনের ভাষায় হুমকির আওয়াজ। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারের কর্কশ ও ভারিক্কি কণ্ঠের সতর্ক সংকেত।

তারও কিছুদিন পরে ঢাকার ডিসি সাহেবকে মোটিভেট করার জন্য সচিব পর্যায়ে তদবির হতে থাকে। আসল কাজ আমাকে সরিয়ে তাদের পছন্দের একজন অফিসারকে বসানো। কারণ, তারা যা চান, আমাকে দিয়ে যে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেটা তারা বুঝে গেছে। যেমন, তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ করা, কয়েকজন শিক্ষকের যোগ্যতা না থাকলেও তাদের পদোন্নতি দেওয়া, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো করেনি কিন্তু এসএসসিতে অনুমতি দিতে হবে, স্কুলের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো পূর্ত কাজ তারা নিজেরাই করবেন ইত্যাদি। আর আমি চাচ্ছিলাম, স্কুলের গচ্ছিত ফান্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষার এবং একাডেমিক রেজাল্টের ওপর গুরুত্ব দিতে। মনে পড়ে, এমন প্রচ্ছন্ন অসহযোগিতা ও বৈপরীত্যের সময়ে, তখনও স্কুলটি হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মূলত সভাপতি হিসেবে আমার অর্জিত শিক্ষা, দেশপ্রেমবোধ, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও অদম্য সাহস প্রদর্শন করার মানসিকতার কারণে।

৫.

কাজেই দেশব্যাপী হাজার হাজার এমপিও-নন-এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ বা কমিটিতে অশিক্ষিত মানুষের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ—সবই বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার মূল্য কখনো হারিয়ে যাবে না। প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত গণকর্মচারী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শিক্ষিত, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্রুত অধোগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে না।

একটা জ্বলন্ত উদাহরণ কিন্তু চোখের সামনে আছে, তা হলো দেশের সকল সরকারি স্কুল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভর্তি নিয়ে বা অন্য কোনো প্রশাসনিক, আর্থিক বড় অনিয়মের অভিযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। এর কারণ ডেপুটি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন থাকেন। অন্যায়, অবিচার বা দুর্নীতি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে, তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যা কম শিক্ষিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। তাদের দায়-দায়িত্ব নেহাত কম।

কাজেই গ্রামীণ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু ধারা থেকে রক্ষা করার স্বার্থে সরকার সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তকে পুনর্বিবেচনা করার নিমিত্ত উচ্চ আদালতের পরামর্শকে আমলে নিতে পারে। এটা কারও একক দল বা মতের কথা নয়, সম্পূর্ণ জনস্বার্থ সহায়ক বিষয়। সবকিছুতে শিথিলতা আনয়ন করা শুভ হয় না, আবার সব সময় গণতান্ত্রিকও নয়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: গল্পকার ও প্রবন্ধকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কাদের হাতে

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

জানা যায়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ইত্যাদির ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনার জন্য সভাপতি নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা প্রজ্ঞাপনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা হলেও সম্প্রতি তা নাকি বাতিল করা হয়েছে। এতে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষও চায় লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করুক। এমনকি যে মানুষটি নিজে স্কুল-কলেজে যায়নি, সে-ও চায় না তার মতো আরেকজন গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপর খবরদারি করুক। এটা শত্রুতা নয় বা হিংসা নয়, স্রেফ একটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার বিষয়। আমি অকৃতি অধম বলে উত্তমকে অস্বীকার করি কেমনে?

আজকাল খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনেও উঁকি দিয়ে চলেছে; তা হলো, এই যে শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি, নীতি-নির্ধারণী বা জনপ্রতিনিধিত্ব—কোথাও যদি শিক্ষাগত সনদপত্রের কোনো মূল্য না থাকে বা গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে এত হৈচৈ, এত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার হেতু কী? সমাজে রাষ্ট্রে যার কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকছে না, তার জন্য লাখ কোটি টাকার বাজেটই বা কেন? দেশের উচ্চশিক্ষা কী তবে কেবল বিদেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া আর পরদেশের সরকারের অধীনে চাকর হওয়ার দায়ে? যে দেশে শিক্ষার একাডেমিক সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য দেওয়া হবে না, সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার মূল বিষয় হলো, সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানো, যা শিক্ষিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কখনো নতুনত্ব বা সৃষ্টিশীল কার্যক্রম আশা করা যায় না। সে প্রতিষ্ঠান সরকারের হোক বা নিজেরই হোক।

২.

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এসব কমিটিতে কেবল সভাপতি নয়, অন্যান্য পদগুলো যেমন, অভিভাবক সদস্য, বিদ্যোৎসাহী সদস্য—এদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতার একটা মাপকাঠি রাখা দরকার। একটা প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে পরিচালিত করতে হলে পুরো টিমকে নিয়েই কাজ করতে হয়। সভাপতি/চেয়ারম্যান একা সফলতা আনতে পারে না।

দেশে তখন ১/১১ নামে পরিচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। আমি সরকারের চাকরিতে উপসচিব পদমর্যাদায় পরিচালক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) কর্মরত। কিছুদিন হলো একটা জেলার এডিসির পদ থেকে ঢাকায় ফিরেছি। এক দুপুরে ফোন আসে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ঢাকার কাছ থেকে। ডিসি’র নাম মো. কামাল উদ্দিন। একজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম ছিল। তিনি বললেন,

আপনার বাসা কোন এলাকায়?

বললাম, আজিমপুর গভ. কোয়ার্টারে থাকি।

খুব ভালো হয়েছে, আপনাকে ওই এলাকার একটা ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দিতে চাই।

জিজ্ঞেস করলাম, স্কুলের নামটা কী?

তিনি বললেন, 'ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুল'।

এবার আমি জানতে চাইলাম, স্কুলের বিশেষ কোনো সমস্যা আছে কি না?

তিনি বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। ঢাকার প্রায় সকল স্কুলই এ সময়ে ফাঁকা। জেলা প্রশাসন থেকে আমরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্কুলের দায়িত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে ঢাকায় তাদের স্ব স্ব বাসার কাছাকাছি স্কুলগুলোতে দিতে চাচ্ছি, যাতে যাতায়াতের অসুবিধা না হয়। আর কিছু নয়।

আমি তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলাম। একটা পুরোনো ইতিহাস-খ্যাত স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যাবে। শিক্ষক, ছাত্র, স্থানীয় সুশীল সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগ হবে, তাতে মন্দ কী? তাছাড়া বাসা থেকে পদব্রজে স্কুলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ছুটির একটা দিন এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদন করলে কোনো ক্ষতি হবে না। তা-ই হলো, যথারীতি দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। বলাবাহুল্য, স্কুলটি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জনশ্রুতি আছে, সেকালে ঢাকা নগরীর পশ্চিম প্রান্ত বরাবর স্কুলটি গড়ে ওঠে বলেই নাকি ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর কর্তৃক এমন নামকরণ করা হয়েছিল। তাছাড়া এ স্কুলের বেশ কজন শিক্ষক '৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ সুলতান এবং রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদের কথা বলা আছে।

৩.

সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর, এক শনিবার সকাল ১০টার দিকে প্রথমবারের মতো স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সরকারি ছুটির দিন, তবে স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসব খোলা আছে। প্রধান শিক্ষক আলী হোসেন মিয়াকে একজন বিনয়ী, সৎ ও শিক্ষিত মানুষ বলে মনে হলো। অন্তত প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম, আমার সঙ্গে বেশ কজন সদস্য রয়েছে। তারা নির্বাচিত সদস্য এবং স্থানীয় প্রভাবশালী বিশেষজন। পরিচয় হলো, তারা পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যের সময়ে এখানে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এমন। তখনই জানি, স্কুলের এসব পদের জন্যও বেশ ব্যয়বহুল নির্বাচন হয়। এতে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি হয়। আমি ধীরে ধীরে খোঁজখবর নিতে থাকি। আসলে এদের কাজটা কী?

দেশে তখন রাজনীতি নেই, অযাচিত চাপ নেই, বরং জনমনে স্বস্তির আবহ বিরাজ করছিল। শুরুতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে স্কুলের ভেতরে ও বাইরে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসা হলো। হেডমাস্টার এবং সহকারী শিক্ষকদের বসার স্থানে পরিবর্তন আনা হলো। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনমাফিক নতুন নতুন ফ্যান-লাইট সংযোগ তথা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পৃথক শৌচাগারের সংস্কার করা হলো। দীর্ঘ বন্ধ থাকা লাইব্রেরিতে বসার পরিবেশ ফেরানো হলো। নিয়মিত সভা আহ্বান করে শিক্ষার পরিবেশবান্ধব অসংখ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির কক্ষে নতুন আধুনিক টিভি সংযোজন হলো। অভিভাবকদের অপেক্ষার স্থানেও নতুনত্ব আনা হলো। সভায় অংশ নেওয়ার সম্মানী অর্থের বিষয়ে একটু রাশটানা হলো, সকল সভার জন্য সম্মানী থাকবে না। এটা কেবল বিশেষ সিদ্ধান্তকারী সভার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তখন শতভাগ নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ হলো। সেসময়ে বার্ষিক খেলাধুলা ও জাতীয় অনুষ্ঠানে সরকারের সচিবগণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্কুলে আনা হয়েছে। এদের কেউ কেউ এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। প্রায় দু’বছরে এমন অসংখ্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়ায় স্কুলের ভেতরটায় এক অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গিয়েছিল।

৪.

ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার অল্প কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ করলাম, তিনজন নির্বাচিত সদস্যেরই মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। প্রথমে তারা আমাকে জয় করে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যেমন, সীমাহীন প্রশংসা ও অতিরিক্ত বিনয় প্রদর্শন করা, কথাবার্তা ছাড়াই হঠাৎ করে পুরান ঢাকার রয়েল রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির প্যাকেট বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব আসতে থাকে, কিছু দিন পরে টেলিফোনের ভাষায় হুমকির আওয়াজ। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসারের কর্কশ ও ভারিক্কি কণ্ঠের সতর্ক সংকেত।

তারও কিছুদিন পরে ঢাকার ডিসি সাহেবকে মোটিভেট করার জন্য সচিব পর্যায়ে তদবির হতে থাকে। আসল কাজ আমাকে সরিয়ে তাদের পছন্দের একজন অফিসারকে বসানো। কারণ, তারা যা চান, আমাকে দিয়ে যে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেটা তারা বুঝে গেছে। যেমন, তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ করা, কয়েকজন শিক্ষকের যোগ্যতা না থাকলেও তাদের পদোন্নতি দেওয়া, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো করেনি কিন্তু এসএসসিতে অনুমতি দিতে হবে, স্কুলের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো পূর্ত কাজ তারা নিজেরাই করবেন ইত্যাদি। আর আমি চাচ্ছিলাম, স্কুলের গচ্ছিত ফান্ড থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষার এবং একাডেমিক রেজাল্টের ওপর গুরুত্ব দিতে। মনে পড়ে, এমন প্রচ্ছন্ন অসহযোগিতা ও বৈপরীত্যের সময়ে, তখনও স্কুলটি হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মূলত সভাপতি হিসেবে আমার অর্জিত শিক্ষা, দেশপ্রেমবোধ, দৃঢ়চেতা মনোভাব ও অদম্য সাহস প্রদর্শন করার মানসিকতার কারণে।

৫.

কাজেই দেশব্যাপী হাজার হাজার এমপিও-নন-এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদ বা কমিটিতে অশিক্ষিত মানুষের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ—সবই বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার মূল্য কখনো হারিয়ে যাবে না। প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত গণকর্মচারী, শিক্ষক, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শিক্ষিত, সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্রুত অধোগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে না।

একটা জ্বলন্ত উদাহরণ কিন্তু চোখের সামনে আছে, তা হলো দেশের সকল সরকারি স্কুল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভর্তি নিয়ে বা অন্য কোনো প্রশাসনিক, আর্থিক বড় অনিয়মের অভিযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। এর কারণ ডেপুটি কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে সব সময়ই সচেতন থাকেন। অন্যায়, অবিচার বা দুর্নীতি তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে, তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। যা কম শিক্ষিত দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। তাদের দায়-দায়িত্ব নেহাত কম।

কাজেই গ্রামীণ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু ধারা থেকে রক্ষা করার স্বার্থে সরকার সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তকে পুনর্বিবেচনা করার নিমিত্ত উচ্চ আদালতের পরামর্শকে আমলে নিতে পারে। এটা কারও একক দল বা মতের কথা নয়, সম্পূর্ণ জনস্বার্থ সহায়ক বিষয়। সবকিছুতে শিথিলতা আনয়ন করা শুভ হয় না, আবার সব সময় গণতান্ত্রিকও নয়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: গল্পকার ও প্রবন্ধকার]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত