ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতবর্ষ পার করে আরও পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে, অনেকটা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ও শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নেই এটি "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুরুতেই উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়।
পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে একটি অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা।
ভাষা আন্দোলনের আমতলা, আর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের বটতলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের মানচিত্রে যেমন ভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনি এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম ছাত্রশিবির বা কোনো ধর্মীয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্যানেল কিছুটা লিবারেল ভাবমূর্তির ছদ্মবেশে জয় পেয়েছে। জয় পাওয়ার পরই তারা ঘোষণা দেয়, তাদের ভাষায় ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’কে তারা মুছে ফেলবে। সে অনুযায়ী এক সময়ের শিবির সদস্য প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সহযোগিতায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়। টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ‘বীরত্বের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি রাখার কারণে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময়ে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।
১১ সেপ্টেম্বর ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থীরাও তাদের পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেছেন অভিন্ন আবেগে। এ বছর জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ডাকসু সংগ্রহশালায় তার তিনটি ছবি টানায় এবং ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও তাদের কিছু অপছন্দের সকল ছবি তারা নামিয়ে ফেলে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনার অবতারণা হয়। বর্তমানে সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া খুবই পরিকল্পিত ও কথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক বার্তা। তাই তো তাদের সব আয়োজন শেখ মুজিবকে ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? ঔদ্ধত্যের সকল সীমা লঙ্ঘন করে তার উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’
তরুণ শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনোনীত হন।
ওই বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। পিকেটিং থেকে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। আবার ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, তখন আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে "নো, নো" বলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তো সবারই জানা।
স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য শহীদ হয়েছেন। আর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেসকোর্স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামের এক অমর কবিতা পাঠ করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এর আগে স্বাধীনতার এমন কবিতা কে কবে শুনেছে! আর এ ঘোষণা দেওয়ার মতো জমিন তৈরি করতে শেখ মুজিবকে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ২৪টি বছর জুড়ে। সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে ওঠায় আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা।
দীর্ঘ ২৪ বছরের এই সংগ্রামে ১৪ বছরই শেখ মুজিবকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দু’বার পাকিস্তানি শাসকরা তার জন্য তো ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের আয়োজন করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং পরের বছর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাবন্দি ছিলেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও তাকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ অক্টোবরে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।
কয়েকদিন ‘হারুন আন্কেলের ভাতের হোটেলে’ থাকা ইউনূসের কিশোর-তরুণ বাহিনী এসব ইতিহাস জেনে বা না জেনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দেশজুড়ে ভেঙে ফেলেছে মুজিবের স্মৃতি ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সকল স্মৃতিচিহ্ন। ইউনূস বাহিনী আর জামাতীদের সব আয়োজন যেন শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। সেই ধারাতেই জামাত নিয়ন্ত্রিত ডাকসু প্রতিশোধ হিসেবে স্বাধীনতার নেতার ছবি নামিয়ে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাঠ ও প্রদর্শনীতে সংগতিপূর্ণভাবে জিন্নাহ থাকতেই পারেন। কিন্তু মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি উত্তোলন অনেকটা বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা তো রীতিমতো দেশদ্রোহী অপরাধ। সরকার কী করছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, আইনের আওতায় না আনলে তাদের উদ্ধত ফনার ছোবল কিন্তু খুব শীঘ্রই খেতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতির নব আবিষ্কার করেছেন। ডাকসু এখতিয়ারবহির্ভূত ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই প্রণয়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানোর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করাই নিয়ম। শিক্ষক ফলাফল দেখে তার পাঠদানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাস করবেন। এখানে ছাত্র সংসদের পুলিশি ভূমিকা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন। সারা দেশে শিক্ষক নির্যাতন, শিক্ষকদের অপদস্থ করা, জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের চেহারায় কিছুসংখ্যক তরুণ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্মাদনা এখনও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কার্যকলাপে জড়িত থাকার এক উদ্ভট অভিযোগে ৪৩৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করায় নৈরাজ্যবাদী তরুণরা শিক্ষক হেনস্তাকারী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত হয়েছে। সরকার, বিরোধীদল সবাই তো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে মরিয়া! শিক্ষকরাও যদি সে প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন, তো তারা তো সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন। নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চান না শেখ হাসিনা ফিরে আসুক, বিচারের মুখোমুখি হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারদলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা পরাভূত হবে।
শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও তার নানা পর্ব। ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে নানা সীমাবদ্ধতার এবং ভুল হাতে পড়া চব্বিশের জুলাই জাগরণ—সব ঐতিহ্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কূপমণ্ডূকতার শিকলে বেঁধে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, আমাদের মাতৃভূমিকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হবে না। কারণ জুলাইয়ে যে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের কণ্ঠে ছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ধনধান্য পুষ্পে ভরা, মুক্তির মন্দির সোপান তলে ..... ইত্যাদি দেশপ্রেমের গান। গুপ্ত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেও সেই গানে গলা মেলাতে হয়েছিল। জামাত-শিবির গোষ্ঠীকে এখনও উদার গণতন্ত্রের কথা বলতে হচ্ছে, একটা লিবারেল ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য কসরত করতে হচ্ছে। আসিফ নজরুল, আলী রিয়াজ প্রমুখদের সুর বদল করতে হচ্ছে। জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেকে সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন।
বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ অনেকবার প্রতারিত হয়েছে। আমরা বারবার প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারও দানে পাওয়া নয়—দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকসম ‘অপরাজেয় বাংলা’ অনির্বাণ শিখা হয়ে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর সে ঘোষণা দিয়ে চলেছে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতবর্ষ পার করে আরও পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুনের মতে, অনেকটা বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ও শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনালগ্নেই এটি "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে খ্যাতি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানি শাসকরা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শুরুতেই উর্দু ভাষা ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে এ অঞ্চলকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়।
পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধরনের সেই শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছে। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে একটি অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা।
ভাষা আন্দোলনের আমতলা, আর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের বটতলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের মানচিত্রে যেমন ভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনি এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এই প্রথম ছাত্রশিবির বা কোনো ধর্মীয় ছাত্রসংগঠনের সমর্থিত প্যানেল কিছুটা লিবারেল ভাবমূর্তির ছদ্মবেশে জয় পেয়েছে। জয় পাওয়ার পরই তারা ঘোষণা দেয়, তাদের ভাষায় ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’কে তারা মুছে ফেলবে। সে অনুযায়ী এক সময়ের শিবির সদস্য প্রাক্তন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সহযোগিতায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়। টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ‘বীরত্বের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি রাখার কারণে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই সময়ে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।
১১ সেপ্টেম্বর ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী যথাযথভাবে পালিত হয়েছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থীরাও তাদের পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেছেন অভিন্ন আবেগে। এ বছর জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে ডাকসু সংগ্রহশালায় তার তিনটি ছবি টানায় এবং ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হলেও তাদের কিছু অপছন্দের সকল ছবি তারা নামিয়ে ফেলে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই এক উত্তেজনার অবতারণা হয়। বর্তমানে সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া খুবই পরিকল্পিত ও কথিত ‘কালচারাল ফ্যাসিবাদ’ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার রাজনৈতিক বার্তা। তাই তো তাদের সব আয়োজন শেখ মুজিবকে ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? ঔদ্ধত্যের সকল সীমা লঙ্ঘন করে তার উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’
তরুণ শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আর ১৯৪৮ সালের শুরুতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা" ঘোষণা করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনোনীত হন।
ওই বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। পিকেটিং থেকে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। আবার ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, তখন আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে "নো, নো" বলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তো সবারই জানা।
স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য শহীদ হয়েছেন। আর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেসকোর্স থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামের এক অমর কবিতা পাঠ করেছিলেন: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এর আগে স্বাধীনতার এমন কবিতা কে কবে শুনেছে! আর এ ঘোষণা দেওয়ার মতো জমিন তৈরি করতে শেখ মুজিবকে সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ২৪টি বছর জুড়ে। সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনের সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে ওঠায় আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা।
দীর্ঘ ২৪ বছরের এই সংগ্রামে ১৪ বছরই শেখ মুজিবকে কারান্তরালে কাটাতে হয়েছে। দু’বার পাকিস্তানি শাসকরা তার জন্য তো ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের আয়োজন করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং পরের বছর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাবন্দি ছিলেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও তাকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর ১১ অক্টোবরে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।
কয়েকদিন ‘হারুন আন্কেলের ভাতের হোটেলে’ থাকা ইউনূসের কিশোর-তরুণ বাহিনী এসব ইতিহাস জেনে বা না জেনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দেশজুড়ে ভেঙে ফেলেছে মুজিবের স্মৃতি ভাস্কর্যসহ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলা সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সকল স্মৃতিচিহ্ন। ইউনূস বাহিনী আর জামাতীদের সব আয়োজন যেন শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার জন্য। সেই ধারাতেই জামাত নিয়ন্ত্রিত ডাকসু প্রতিশোধ হিসেবে স্বাধীনতার নেতার ছবি নামিয়ে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের পাঠ ও প্রদর্শনীতে সংগতিপূর্ণভাবে জিন্নাহ থাকতেই পারেন। কিন্তু মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি উত্তোলন অনেকটা বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা যা করেছে, তা তো রীতিমতো দেশদ্রোহী অপরাধ। সরকার কী করছে? সরকারের মনে রাখা উচিত, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে, আইনের আওতায় না আনলে তাদের উদ্ধত ফনার ছোবল কিন্তু খুব শীঘ্রই খেতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতির নব আবিষ্কার করেছেন। ডাকসু এখতিয়ারবহির্ভূত ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। শিক্ষকদের মূল্যায়ন শিক্ষার্থীরা করবেন—এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই প্রণয়ন করতে হবে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানোর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করাই নিয়ম। শিক্ষক ফলাফল দেখে তার পাঠদানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজনমতো পুনর্বিন্যাস করবেন। এখানে ছাত্র সংসদের পুলিশি ভূমিকা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ চিহ্নিত করে শিক্ষকদের হেনস্তা করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা ইত্যাদি এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন। সারা দেশে শিক্ষক নির্যাতন, শিক্ষকদের অপদস্থ করা, জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের চেহারায় কিছুসংখ্যক তরুণ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্মাদনা এখনও অব্যাহত আছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কার্যকলাপে জড়িত থাকার এক উদ্ভট অভিযোগে ৪৩৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করায় নৈরাজ্যবাদী তরুণরা শিক্ষক হেনস্তাকারী কার্যকলাপে আরও উৎসাহিত হয়েছে। সরকার, বিরোধীদল সবাই তো শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে মরিয়া! শিক্ষকরাও যদি সে প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন, তো তারা তো সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন। নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চান না শেখ হাসিনা ফিরে আসুক, বিচারের মুখোমুখি হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারদলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা পরাভূত হবে।
শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস ও তার নানা পর্ব। ভাষা সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে নানা সীমাবদ্ধতার এবং ভুল হাতে পড়া চব্বিশের জুলাই জাগরণ—সব ঐতিহ্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সূতিকাগার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কূপমণ্ডূকতার শিকলে বেঁধে ফেলার যে প্রচেষ্টা চলছে, আমাদের মাতৃভূমিকে ধর্মান্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে অপচেষ্টা চলছে, তা সফল হবে না। কারণ জুলাইয়ে যে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের কণ্ঠে ছিল, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, ধনধান্য পুষ্পে ভরা, মুক্তির মন্দির সোপান তলে ..... ইত্যাদি দেশপ্রেমের গান। গুপ্ত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেও সেই গানে গলা মেলাতে হয়েছিল। জামাত-শিবির গোষ্ঠীকে এখনও উদার গণতন্ত্রের কথা বলতে হচ্ছে, একটা লিবারেল ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য কসরত করতে হচ্ছে। আসিফ নজরুল, আলী রিয়াজ প্রমুখদের সুর বদল করতে হচ্ছে। জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেকে সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন।
বাংলাদেশের লড়াকু মানুষ অনেকবার প্রতারিত হয়েছে। আমরা বারবার প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারও দানে পাওয়া নয়—দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকসম ‘অপরাজেয় বাংলা’ অনির্বাণ শিখা হয়ে কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর সে ঘোষণা দিয়ে চলেছে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন