দেশের ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও খাতের পরিচালন ব্যবস্থা এবং তদারকি কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে ২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি (এমআরএ) আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা খসড়া আইনে মোট ৪১টি পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের তদারকি সংস্থার মতো এনজিও খাতের অভিভাবক হিসেবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটির (এমআরএ) আইনি ক্ষমতা ও এখতিয়ার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এনজিওগুলোর নতুন লাইসেন্স প্রদান, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ ও বাতিল, প্রশাসক নিয়োগ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়গুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে এমআরএর হাতে।
আইনের কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে 'মাইক্রোক্রেডিট' শব্দের পরিবর্তে 'মাইক্রোফাইন্যান্স' শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সংস্থাটির নাম ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কারণ হিসেবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সঞ্চয় গ্রহণ, প্রবাসী আয় বিতরণ ও ক্ষুদ্র বীমাসহ নানামুখী আর্থিক সেবা প্রদান করছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নামটিতে 'ডেভেলপমেন্ট' শব্দটি যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া 'সনদ' শব্দের স্থানে 'লাইসেন্স' ব্যবহারের প্রস্তাব আনা হলেও সিডিএফ মনে করে, লাইসেন্স ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এ খাতের স্বনিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, এমআরএর প্রশাসনিক প্রধানের পদবি 'এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান' পরিবর্তন করে 'ভাইস চেয়ারম্যান' এবং তার মর্যাদা যুগ্ম সচিব থেকে বাড়িয়ে অতিরিক্ত সচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেটিতে সিডিএফও সম্মতি প্রকাশ করেছে।
খসড়া আইনের বিধান অনুসারে, আইন কার্যকরের ছয় মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামের শেষে ‘এমএফআই’ যুক্ত করা, পৃথক গঠনতন্ত্র তৈরি, সাধারণ পরিষদ ও পর্ষদ গঠন এবং সম্পদ-দায় আলাদা করে এমআরএর কাছে নতুন লাইসেন্সের আবেদন জমা দিতে হবে। ব্যর্থতায় লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সিডিএফ এই পৃথক আইনি সত্তা গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
এছাড়া তদারকি জোরদারে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক বসানোর ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমআরএর পক্ষ থেকে বলা হয়, "গ্রাহক ও জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে সে সুযোগ নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনের মতো এখানেও এ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।"
প্রতিষ্ঠানের সিইও নিয়োগে পর্ষদের স্বাধীনতার পাশাপাশি এমআরএর বাধ্যতামূলক অনাপত্তি সনদ নেওয়ার শর্ত যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্ষদে সিইওর ভূমিকা তুলে ধরে এমআরএ জানায়, "প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ঝুঁকি ও দায়ভার সিইওর ওপর থাকে। তাই নীতিনির্ধারণে তাঁর অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।"
নতুন খসড়ায় আর্থিক আত্মসাৎ ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার শাস্তি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে কঠোর করার পাশাপাশি অনাদায়ি ঋণ পুনরুদ্ধারে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন’ ব্যবহারের সুবিধা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এমআরএ উল্লেখ করেছে, জামানতহীন ক্ষুদ্রঋণে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা এড়াতে এই নতুন ব্যবস্থা পাওনা আদায় সহজ করবে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ, অলাভজনক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থের ব্যবহার এবং বিলুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করার বিষয়ে স্পষ্ট আইনি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এই সংশোধনীতে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও খাতের পরিচালন ব্যবস্থা এবং তদারকি কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে ২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি (এমআরএ) আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা খসড়া আইনে মোট ৪১টি পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক খাতের তদারকি সংস্থার মতো এনজিও খাতের অভিভাবক হিসেবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটির (এমআরএ) আইনি ক্ষমতা ও এখতিয়ার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এনজিওগুলোর নতুন লাইসেন্স প্রদান, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ ও বাতিল, প্রশাসক নিয়োগ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়গুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে এমআরএর হাতে।
আইনের কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে 'মাইক্রোক্রেডিট' শব্দের পরিবর্তে 'মাইক্রোফাইন্যান্স' শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সংস্থাটির নাম ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কারণ হিসেবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু ক্ষুদ্রঋণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সঞ্চয় গ্রহণ, প্রবাসী আয় বিতরণ ও ক্ষুদ্র বীমাসহ নানামুখী আর্থিক সেবা প্রদান করছে। তবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নামটিতে 'ডেভেলপমেন্ট' শব্দটি যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ মাইক্রোফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটি আইন’ রাখার পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া 'সনদ' শব্দের স্থানে 'লাইসেন্স' ব্যবহারের প্রস্তাব আনা হলেও সিডিএফ মনে করে, লাইসেন্স ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এ খাতের স্বনিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, এমআরএর প্রশাসনিক প্রধানের পদবি 'এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান' পরিবর্তন করে 'ভাইস চেয়ারম্যান' এবং তার মর্যাদা যুগ্ম সচিব থেকে বাড়িয়ে অতিরিক্ত সচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেটিতে সিডিএফও সম্মতি প্রকাশ করেছে।
খসড়া আইনের বিধান অনুসারে, আইন কার্যকরের ছয় মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামের শেষে ‘এমএফআই’ যুক্ত করা, পৃথক গঠনতন্ত্র তৈরি, সাধারণ পরিষদ ও পর্ষদ গঠন এবং সম্পদ-দায় আলাদা করে এমআরএর কাছে নতুন লাইসেন্সের আবেদন জমা দিতে হবে। ব্যর্থতায় লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সিডিএফ এই পৃথক আইনি সত্তা গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
এছাড়া তদারকি জোরদারে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক বসানোর ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমআরএর পক্ষ থেকে বলা হয়, "গ্রাহক ও জনস্বার্থ রক্ষায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে সে সুযোগ নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনের মতো এখানেও এ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।"
প্রতিষ্ঠানের সিইও নিয়োগে পর্ষদের স্বাধীনতার পাশাপাশি এমআরএর বাধ্যতামূলক অনাপত্তি সনদ নেওয়ার শর্ত যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্ষদে সিইওর ভূমিকা তুলে ধরে এমআরএ জানায়, "প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ঝুঁকি ও দায়ভার সিইওর ওপর থাকে। তাই নীতিনির্ধারণে তাঁর অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।"
নতুন খসড়ায় আর্থিক আত্মসাৎ ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার শাস্তি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে কঠোর করার পাশাপাশি অনাদায়ি ঋণ পুনরুদ্ধারে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন’ ব্যবহারের সুবিধা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এমআরএ উল্লেখ করেছে, জামানতহীন ক্ষুদ্রঋণে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়ানি মামলা এড়াতে এই নতুন ব্যবস্থা পাওনা আদায় সহজ করবে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ, অলাভজনক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থের ব্যবহার এবং বিলুপ্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করার বিষয়ে স্পষ্ট আইনি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এই সংশোধনীতে।

আপনার মতামত লিখুন