সংবাদ

পাহাড়-টিলা কেটে গড়ে উঠছে নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’


সংগ্রাম দত্ত, প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
সংগ্রাম দত্ত, প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

পাহাড়-টিলা কেটে গড়ে উঠছে নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’
পাহাড়-টিলা কেটে মৌলভীবাজারে গড়ে উঠছে নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’

পাহাড়, টিলা আর ঘন বন কেটে মৌলভীবাজারে একের পর এক গড়ে উঠছে বিলাসবহুল ও নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’। পর্যটনের প্রসারের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এমন কর্মকাণ্ড চললেও এসব রিসোর্টের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে। কারা এসব রিসোর্ট তৈরি করছে, সেগুলোর বৈধতা আছে কি না—এমন প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো।

নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জেলাজুড়ে অনুমোদনহীন রিসোর্টের সংখ্যা এখন দুই শতাধিক বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় গত কয়েক বছরে পাহাড়-টিলা কেটে, বন উজাড় করে এবং কৃষিজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠছে এসব রিসোর্ট ও কটেজ। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, রিসোর্ট তৈরির নামে প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে এসব স্থাপনার ভেতরের কার্যক্রমও থাকছে নজরদারির বাইরে।

দুই শতাধিক রিসোর্ট, মানসম্মত হাতে গোনা

২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর জেলায় কয়েকটি মানসম্মত রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এর মধ্যে গ্র্যান্ড সুলতানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পায়। কিন্তু গত তিন-চার বছরে রিসোর্ট ব্যবসার নামে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। এর মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলাতেই রয়েছে শতাধিক। উপজেলার রাধানগর এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যক্তিরাও কয়েক শতক জমি কিনে সেখানে পাহাড় কেটে কিংবা দুই-তিনটি ঘর নির্মাণ করে সেটিকে ‘রিসোর্ট’ হিসেবে পরিচালনা করছেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও সেবার মান নেই।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, জেলায় প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে শ্রীমঙ্গলেই রয়েছে শতাধিক। তবে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলা যায়—এমন প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১২টির বেশি হবে না।

তিনি বলেন, ‘৩-৪টি রুম ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে। এরা কারা, আমাদের জানা নেই।’

সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এসকে দাশ সুমন বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর লাখ টাকার বেশি কর দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছি। অথচ কেউ দুই শতক জায়গা কিনে কয়েকটি রুম বানিয়েই রিসোর্টের ব্যানার টাঙিয়ে দিচ্ছে। রিসোর্ট তৈরি করতে প্রচুর জায়গা, নিরাপত্তা ও কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। সামান্য অনুমোদন প্রক্রিয়া জোরদার হলেও এসব ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে আসত।’

রিসোর্টের আড়ালে কী চলছে?

অধিকাংশ রিসোর্টের ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নামসর্বস্ব এসব রিসোর্টের অনেকগুলোতেই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। দিন কিংবা রাত—বাইরের লোকজনকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

অনেক রিসোর্টে নেই সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা নৈশপ্রহরী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকায় ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে বাইরের কারও জানার সুযোগও থাকে না।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর রাতারাতি সেটির নাম পরিবর্তন করার খবরও পাওয়া গেছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, মালিকানা ও কার্যক্রমের ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর বক্তব্য জানা যায়নি।

পাহাড়-টিলা কেটে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি

রিসোর্ট নির্মাণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মৌলভীবাজারের পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। গভীর বনের ভেতরে তৈরি হচ্ছে কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা। কোথাও কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা ও স্থাপনা। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে বন ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে নষ্ট হবে তাদের চলাচলের স্বাভাবিক পথ ও খাদ্যের উৎস।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, ‘পাহাড়-টিলা কেটে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে কার ছায়ায় এসব রিসোর্ট হচ্ছে, তা সরকারের কোনো দপ্তর তদারকি করে না। একের পর এক সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তার তোয়াক্কা করছে না। অনতিবিলম্বে কঠোর নীতিমালা করে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

বন কমছে, লোকালয়ে আসছে বন্য প্রাণী

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চারপাশের বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা দখল করে বসতি, রিসোর্ট ও বিভিন্ন ধরনের বাগান তৈরির কারণে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। ফলে খাদ্যের সন্ধানে বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায়ই শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের বাড়িতে সাপ, অজগরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব প্রাণী উদ্ধার করে নিয়ে যান।

সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসেই বিষধর সাপসহ ১৭টি বড় আকৃতির অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ধরনের প্রাণী উদ্ধারের ঘটনা বাড়তে থাকায় বন ও পাহাড়ের ভেতরে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনেক সময় বন্য প্রাণী সড়কে চলে আসায় যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, আবাসস্থল ধ্বংসের সঙ্গে এ ধরনের প্রাণী মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।

এক দপ্তর পাঠাচ্ছে অন্য দপ্তরে

এত বিপুলসংখ্যক রিসোর্ট গড়ে উঠলেও এগুলোর অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, মালিকানা ও নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব রিসোর্টের দায় নিতে কোনো দপ্তরই স্পষ্টভাবে এগিয়ে আসছে না। এক দপ্তর দায়িত্ব ঠেলে দিচ্ছে অন্য দপ্তরের দিকে।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক গণমাধ্যম কর্মীদের মো. মাঈদুল ইসলাম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে—এমন মাত্র ৬০টি রিসোর্ট তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি শতাধিক রিসোর্ট কার অনুমোদনে চলছে, তা তাঁদের জানা নেই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে—এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা আমি প্রয়োজন মনে করি।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘আমরা প্রধানত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলো তদারকি করি। ছোট ছোট রিসোর্টগুলো হয়তো কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমোদন নিচ্ছে, আবার নাও নিতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানা নেই।’

নীতিমালা চান স্থানীয়রা

স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই মৌলভীবাজারে গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণির রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠে। এতে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

তবে গত তিন-চার বছরে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে নিয়মনীতি না মেনে যেভাবে রিসোর্ট ও কটেজ তৈরি হচ্ছে, তাতে পর্যটনের নামে পরিবেশ ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

তাদের দাবি, কোথায় রিসোর্ট করা যাবে, কতটুকু জমিতে করা যাবে, পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চলের কতটা দূরে স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে, পরিবেশগত ছাড়পত্র কীভাবে নিতে হবে, অগ্নিনিরাপত্তা ও পর্যটকদের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা থাকতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যমান রিসোর্টগুলোর মালিকানা, অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নির্মাণের বৈধতা যাচাই করে একটি সমন্বিত তালিকা করা দরকার।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানসম্মত রিসোর্ট ও অনুমোদনহীন ছোট স্থাপনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না হলে একদিকে যেমন বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে পর্যটনের নামে মৌলভীবাজারের পাহাড়, বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলও ক্রমেই সংকুচিত হবে।

পর্যটন জেলা ঘোষণার ১৮ বছর পর মৌলভীবাজারে পর্যটনের পরিসর বেড়েছে। কিন্তু সেই বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনার কার্যকর নীতিমালা কতটা এগিয়েছে—সাম্প্রতিক রিসোর্ট নির্মাণের বিস্তার সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পাহাড়-টিলা কেটে গড়ে উঠছে নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’

প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পাহাড়, টিলা আর ঘন বন কেটে মৌলভীবাজারে একের পর এক গড়ে উঠছে বিলাসবহুল ও নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’। পর্যটনের প্রসারের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এমন কর্মকাণ্ড চললেও এসব রিসোর্টের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে। কারা এসব রিসোর্ট তৈরি করছে, সেগুলোর বৈধতা আছে কি না—এমন প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো।

নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জেলাজুড়ে অনুমোদনহীন রিসোর্টের সংখ্যা এখন দুই শতাধিক বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় গত কয়েক বছরে পাহাড়-টিলা কেটে, বন উজাড় করে এবং কৃষিজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠছে এসব রিসোর্ট ও কটেজ। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, রিসোর্ট তৈরির নামে প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে এসব স্থাপনার ভেতরের কার্যক্রমও থাকছে নজরদারির বাইরে।

দুই শতাধিক রিসোর্ট, মানসম্মত হাতে গোনা

২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর জেলায় কয়েকটি মানসম্মত রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এর মধ্যে গ্র্যান্ড সুলতানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পায়। কিন্তু গত তিন-চার বছরে রিসোর্ট ব্যবসার নামে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। এর মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলাতেই রয়েছে শতাধিক। উপজেলার রাধানগর এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যক্তিরাও কয়েক শতক জমি কিনে সেখানে পাহাড় কেটে কিংবা দুই-তিনটি ঘর নির্মাণ করে সেটিকে ‘রিসোর্ট’ হিসেবে পরিচালনা করছেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও সেবার মান নেই।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, জেলায় প্রায় দুই শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে শ্রীমঙ্গলেই রয়েছে শতাধিক। তবে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলা যায়—এমন প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১২টির বেশি হবে না।

তিনি বলেন, ‘৩-৪টি রুম ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে। এরা কারা, আমাদের জানা নেই।’

সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এসকে দাশ সুমন বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর লাখ টাকার বেশি কর দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছি। অথচ কেউ দুই শতক জায়গা কিনে কয়েকটি রুম বানিয়েই রিসোর্টের ব্যানার টাঙিয়ে দিচ্ছে। রিসোর্ট তৈরি করতে প্রচুর জায়গা, নিরাপত্তা ও কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। সামান্য অনুমোদন প্রক্রিয়া জোরদার হলেও এসব ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে আসত।’

রিসোর্টের আড়ালে কী চলছে?

অধিকাংশ রিসোর্টের ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা নিয়েও স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নামসর্বস্ব এসব রিসোর্টের অনেকগুলোতেই সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। দিন কিংবা রাত—বাইরের লোকজনকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

অনেক রিসোর্টে নেই সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা নৈশপ্রহরী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকায় ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে বাইরের কারও জানার সুযোগও থাকে না।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর রাতারাতি সেটির নাম পরিবর্তন করার খবরও পাওয়া গেছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, মালিকানা ও কার্যক্রমের ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর বক্তব্য জানা যায়নি।

পাহাড়-টিলা কেটে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি

রিসোর্ট নির্মাণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মৌলভীবাজারের পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। গভীর বনের ভেতরে তৈরি হচ্ছে কটেজ ও অন্যান্য স্থাপনা। কোথাও কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা ও স্থাপনা। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে বন ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে নষ্ট হবে তাদের চলাচলের স্বাভাবিক পথ ও খাদ্যের উৎস।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, ‘পাহাড়-টিলা কেটে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে কার ছায়ায় এসব রিসোর্ট হচ্ছে, তা সরকারের কোনো দপ্তর তদারকি করে না। একের পর এক সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তার তোয়াক্কা করছে না। অনতিবিলম্বে কঠোর নীতিমালা করে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

বন কমছে, লোকালয়ে আসছে বন্য প্রাণী

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চারপাশের বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা দখল করে বসতি, রিসোর্ট ও বিভিন্ন ধরনের বাগান তৈরির কারণে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। ফলে খাদ্যের সন্ধানে বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায়ই শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের বাড়িতে সাপ, অজগরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব প্রাণী উদ্ধার করে নিয়ে যান।

সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসেই বিষধর সাপসহ ১৭টি বড় আকৃতির অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ধরনের প্রাণী উদ্ধারের ঘটনা বাড়তে থাকায় বন ও পাহাড়ের ভেতরে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল কতটা নিরাপদ আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনেক সময় বন্য প্রাণী সড়কে চলে আসায় যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, আবাসস্থল ধ্বংসের সঙ্গে এ ধরনের প্রাণী মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।

এক দপ্তর পাঠাচ্ছে অন্য দপ্তরে

এত বিপুলসংখ্যক রিসোর্ট গড়ে উঠলেও এগুলোর অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, মালিকানা ও নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব রিসোর্টের দায় নিতে কোনো দপ্তরই স্পষ্টভাবে এগিয়ে আসছে না। এক দপ্তর দায়িত্ব ঠেলে দিচ্ছে অন্য দপ্তরের দিকে।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক গণমাধ্যম কর্মীদের মো. মাঈদুল ইসলাম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে—এমন মাত্র ৬০টি রিসোর্ট তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি শতাধিক রিসোর্ট কার অনুমোদনে চলছে, তা তাঁদের জানা নেই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে—এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা আমি প্রয়োজন মনে করি।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘আমরা প্রধানত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলো তদারকি করি। ছোট ছোট রিসোর্টগুলো হয়তো কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমোদন নিচ্ছে, আবার নাও নিতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানা নেই।’

নীতিমালা চান স্থানীয়রা

স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই মৌলভীবাজারে গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণির রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠে। এতে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

তবে গত তিন-চার বছরে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে নিয়মনীতি না মেনে যেভাবে রিসোর্ট ও কটেজ তৈরি হচ্ছে, তাতে পর্যটনের নামে পরিবেশ ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

তাদের দাবি, কোথায় রিসোর্ট করা যাবে, কতটুকু জমিতে করা যাবে, পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চলের কতটা দূরে স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে, পরিবেশগত ছাড়পত্র কীভাবে নিতে হবে, অগ্নিনিরাপত্তা ও পর্যটকদের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা থাকতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যমান রিসোর্টগুলোর মালিকানা, অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নির্মাণের বৈধতা যাচাই করে একটি সমন্বিত তালিকা করা দরকার।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানসম্মত রিসোর্ট ও অনুমোদনহীন ছোট স্থাপনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না হলে একদিকে যেমন বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে পর্যটনের নামে মৌলভীবাজারের পাহাড়, বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলও ক্রমেই সংকুচিত হবে।

পর্যটন জেলা ঘোষণার ১৮ বছর পর মৌলভীবাজারে পর্যটনের পরিসর বেড়েছে। কিন্তু সেই বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনার কার্যকর নীতিমালা কতটা এগিয়েছে—সাম্প্রতিক রিসোর্ট নির্মাণের বিস্তার সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত